এক ছুটির বিকেলে অনলাইনে পডকাস্ট শুনতে শুনতে হুট করেই বিশ্বসাহিত্যের বিখ্যাত লেখক ফ্রানৎস কাফকার কালজয়ী উপন্যাস ‘দ্য ট্রায়াল’-এর সঙ্গে পরিচয়। ভেবেছিলাম শতবর্ষ পুরোনো কোনো সাধারণ সাহিত্যের গল্প শুনব। কিন্তু গল্পটি যত সামনে গড়িয়েছে, তত বেশি স্তব্ধ হয়ে গিয়েছি। মনে হয়েছে, এটি কেবল শত বছর আগের কোনো কাল্পনিক চরিত্রের গল্প নয়; বরং আজকের ব্যস্ত করপোরেট জীবন ও জটিল ব্যবস্থার জালে আটকে থাকা আমাদেরই এক অচেনা আয়না।
উপন্যাসের শুরু বেশ নাটকীয়ভাবে। প্রধান চরিত্র জোসেফ কে একটি ব্যাংকের উচ্চপদস্থ ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তা। তাঁর ৩০তম জন্মদিনের সকালে হঠাৎ দুজন অচেনা লোক এসে জানায়, তিনি গ্রেপ্তার হয়েছেন। কিন্তু তাঁর অপরাধ কী বা কোন আইনে তিনি অভিযুক্ত, তা কেউ বলতে পারে না। তাঁকে কোনো কারাগারেও পাঠানো হয় না, বলা হয় তিনি যেন প্রতিদিনের মতো ব্যাংকের কাজ চালিয়ে যান। কিন্তু এই দেখানোর স্বাধীনতার আড়ালে শুরু হয় এক রহস্যময় আমলাতান্ত্রিক আদালতের তাড়া ও মনস্তাত্ত্বিক উৎপাত।
গল্পের এই জায়গায় এসেই কাফকা জীবনের এক নিষ্ঠুর সত্যকে উন্মোচিত করেছেন। যে প্রতিষ্ঠানের জন্য একজন মানুষ নিজের মেধা ও সময় উজাড় করে দেয়, কোনো অদৃশ্য চক্রান্ত বা ব্যবস্থার শিকার হলে সেই মানুষটি কতটা অসহায় হয়ে পড়ে, তা জোসেফের প্রতিটি পদে পদে ফুটে ওঠে। প্রতিদিন অফিসে গিয়ে সাধারণ কাজ করা আর ভেতরে–ভেতরে নিজেকে ‘নির্দোষ’ প্রমাণের আকুল চেষ্টা—এ দুই মানসিক চাপে কীভাবে মানুষের কর্মক্ষমতা, স্বাধীনতা ও শান্তি বিষাক্ত হয়ে যায়, তা লেখক নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
জোসেফ কে ভেবেছিলেন, সততা আর যুক্তি দিয়ে তিনি এই অদৃশ্য উৎপাত থেকে বেঁচে যাবেন। কিন্তু ক্ষমতা ও অন্ধ বিচারব্যবস্থা যখন যুক্তিহীন হয়ে পড়ে, তখন সাধারণ মানুষের মেধা ও সততা সেখানে ধূলিসাৎ হয়ে যায়। বিপদের দিনে আশপাশের পরিচিত অনেকে উপদেশ দিলেও মূল চক্রান্তের বিরুদ্ধে জোসেফকে একাই লড়তে হয়েছিল।
‘দ্য ট্রায়াল’ নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে। জীবনের এমন কঠিন পরিস্থিতিতে অন্ধভাবে কোনো ব্যবস্থার ওপর ভরসা না করে নিজের মানসিক স্বাস্থ্য, আত্মসম্মান ও স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করাটা যে কতটা জরুরি, তা এই উপন্যাস চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। সহজ উপস্থাপনা ও গভীর জীবনবোধের কারণে কাফকার এই সৃষ্টি আজও সমান প্রাসঙ্গিক। জীবনের বাস্তব রূপ আর নিজের অস্তিত্বকে নতুন করে আবিষ্কার করতে চাইলে বইটি পড়া বা শোনার অভিজ্ঞতা সত্যি অনন্য হতে পারে।
বন্ধু, রায়গঞ্জ বন্ধুসভা
শরীয়তপুরের কাজীরহাট এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মাস্টার মোস্তফা কাজীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, প্রভাব খাটানো ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হন মোস্তফা কাজী। এরপর থেকে এলাকায় বিভিন্ন জমি দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৬ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে কাজীরহাট বাজারের দোকানপ্রতি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা কাজী। এছাড়া কয়েক মাস আগে কাজীরহাটে একটি দোকান ক্রয়ের সময় ব্যবসায়ী সুমন তপাদারের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী আরও জানান, বি. কে. নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলামের কাছ থেকেও ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন মানুষকে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় ফেলে হয়রানি করার অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন মোস্তফা কাজী। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির ব্যানারে তার কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন অনেকে। এছাড়া বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি নিজ ভগ্নিপতি সিদ্দিক দেওয়ানের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোস্তফা কাজীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সচেতন মহল বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
ইউরোপের রাজধানী ব্রাসেলসে আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা জোরালো করা। এই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত আছেন। গত বছরের শুরু থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের কারণে সারা ইউরোপ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ইউরোপীয় নেতারা এখন যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরিতে কাজ করছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, “আমরা যুদ্ধের মানবিক সংকট বুঝতে পারি এবং এখন আমাদের দায়িত্ব এটি দ্রুত শেষ করার পথ খোঁজা। আমাদের প্রত্যেকের জন্যই শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।” এই বৈঠকে অস্ত্রবিরতি চুক্তি, যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলো যুদ্ধ সমাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এগুলো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ক্রমবর্ধমান পরীক্ষার চাপ এবং পরিবারের পাশাপাশি সমাজের অযৌক্তিক প্রত্যাশা। এ দুটি কারণ মিলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বেড়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা। ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করা যেন শিক্ষার্থীর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ—সব জায়গা থেকেই উচ্চ ফলাফলের প্রত্যাশা তৈরি করছে মানসিক চাপের একটি অব্যক্ত বলয়। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইহান কবির বলেন, “পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে মনে হয়, শুধু আমি না, আমার পুরো পরিবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এটা সহ্য করা খুব কঠিন।” শুধু রাইহান নয়, দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা একই অভিজ্ঞতার কথা বলছে। সামাজিক চাপ ও তুলনার সংস্কৃতি পরিস্থিতি করছে আরও জটিল পরীক্ষার নম্বর নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এখন তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া গর্ব বা অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কোন কলেজে ভর্তি হলো, কে কতো পেল—এসব তুলনার চাপে পড়াশোনার আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা তাবাসসুম বলেন, “প্রত্যাশা থাকা ভালো, কিন্তু তা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায় এবং একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব সক্ষমতা উপেক্ষা করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়। এ থেকেই জন্ম নেয় আত্মগ্লানি, হতাশা এবং মাঝে মাঝে আত্মহননের চিন্তা।” জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ নিয়মিত মানসিক চাপে থাকে। এর মধ্যে ১২ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগে এবং বড় একটি অংশ কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই দিন পার করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে ক্ষতিকর। সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, এবং পরিবারের ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ এই সমস্যার নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম হয়, সেখানে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাকে কেবল ফলাফলের সীমায় না এনে একটি মানবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা চাপ নয়, ভালোবাসা থেকে শিখবে, এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ প্রজন্ম।
বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কৃষিখাতকে চরমভাবে আঘাত করছে। অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘদিন খরা এবং হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ফসল উৎপাদনে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে। চলতি মৌসুমেই অনেক জেলায় ধান, গম, ভুট্টা এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, একদিকে যেমন আবহাওয়ার আচরণ বুঝে ওঠা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সারের দাম, কীটনাশক ও বীজের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পোকার আক্রমণ ও রোগবালাইয়ের হারও বেড়ে গেছে। এই চাপে পড়ে অনেক কৃষকই ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা। তাদের পক্ষে বারবার ক্ষতির ধাক্কা সামলে উঠে আবার নতুনভাবে চাষাবাদ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো অঞ্চলে দেখা গেছে, কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী ফসল বাদ দিয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ ও লাভজনক অন্য চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমানেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। একইসঙ্গে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে এমন জাত ও পদ্ধতি উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে যা কঠিন জলবায়ু পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কৃষি খাতকে সচল রাখা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে এখনই পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
কলম্বোর সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাব ময়দানে চলমান দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে ব্যাট হাতে আবারও ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের। টস জিতে ব্যাট করতে নেমে প্রথম ইনিংসে টাইগাররা সংগ্রহ করে মাত্র ২২০ রান, যেখানে ব্যতিক্রম ছিলেন কেবল শোয়াড ইসলাম (৪৬), মুশফিকুর রহিম (৩৫) ও লিটন দাস (৩৪)। শ্রীলঙ্কার বোলাররা শুরু থেকেই চাপ সৃষ্টি করে রাখে। ডেবিউ করা স্পিনার সোনাল দিনুষা ৩ উইকেট নিয়ে আলো ছড়ান, আর আসিথা ফার্নান্দো ও বিষ্ণু ফার্নান্দো নেন ২টি করে উইকেট। প্রথম ইনিংসের জবাবে দ্বিতীয় দিন সকালে শ্রীলঙ্কা উদ্বোধনী জুটি থেকে ভালো সূচনা পায়। ১৩.১ ওভারে কোন উইকেট না হারিয়ে সংগ্রহ করেছে ৬২ রান। ওপেনার পাথুম নিসান্কা ৩৩ এবং লাহিরু উদারা ২৮ রানে অপরাজিত রয়েছেন। বাংলাদেশের হয়ে তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ বোলিং শুরু করলেও এখনও পর্যন্ত সাফল্যের দেখা মেলেনি। শ্রীলঙ্কা এখনো বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস থেকে ১৫৮ রানে পিছিয়ে আছে, হাতে রয়েছে সকল উইকেট। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে প্রভাব এই টেস্টটি ২০২৩-২৫ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ হওয়ায় দুই দলের জন্যই পয়েন্টের লড়াই গুরুত্বপূর্ণ। সিরিজের প্রথম টেস্টে পরাজিত হওয়ায় বাংলাদেশ সিরিজে টিকে থাকতে হলে এই ম্যাচ জিততেই হবে। পরবর্তী চ্যালেঞ্জ স্লো পিচে বাংলাদেশ বোলারদের আরও পরিকল্পিত বোলিং করতে হবে। দ্রুত উইকেট তুলে না নিতে পারলে শ্রীলঙ্কা বড় লিড নিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে দেবে টাইগারদের। ফিল্ডিংয়ে মনোযোগ এবং টাইট বোলিংয়ের মাধ্যমেই দ্বিতীয় ইনিংসে নিজেদের ফিরে পাওয়ার আশায় বাংলাদেশ। সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড (দিন ২, প্রথম সেশন পর্যন্ত): বাংলাদেশ (১ম ইনিংস): ২২০/১০ শ্রীলঙ্কা (১ম ইনিংস): ৬২/০ (১৩.১ ওভার) নিসান্কা: ৩৩*, উদারা: ২৮* বাংলাদেশ বোলার: তাইজুল, মিরাজ – উইকেটহীন
প্রায় দুই মাস পর আগের মতো স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে গ্যাস সরবরাহ। শিল্পে অগ্রাধিকার দিয়ে তিন দিন ধরে দেশে গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে। বাড়তি গ্যাসের তিন ভাগের এক ভাগ বিদ্যুৎ খাতে সরবরাহ করা হচ্ছে। বাকি দুই ভাগ শিল্প খাতে।পেট্রোবাংলা সূত্র বলছে, দিনে গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট হলেও ২৬৫ থেকে ২৭০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হচ্ছিল দীর্ঘদিন ধরে। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে সরবরাহ করা হয়েছে ২৬০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে দেশি গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন করা হয়েছে ১৬১ কোটি ঘনফুট। আর এলএনজি থেকে সরবরাহ করা হয়েছে ৯৯ কোটি ঘনফুট।এর আগে গত ২১ জুলাই মহেশখালীতে মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেটের ভাসমান টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর সেটি থেকে সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এতে দিনে সরবরাহ নেমে এসেছিল ২২০ কোটি ঘনফুটে। ১৫ আগস্ট টার্মিনাল চালুর পর সরবরাহ বাড়িয়ে ২৩২ কোটি ঘনফুট করা হয়। এখন এটি আরও বাড়িয়ে আগের অবস্থায় নেওয়া হচ্ছে। গত মঙ্গলবার এলএনজি থেকে ১০১ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করায় মোট সরবরাহ ২৬৩ কোটি ঘনফুট হয়েছিল।জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, সরবরাহ বাড়ানোর পর সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে শিল্প গ্রাহকদের। বাড়তি গ্যাসের অধিকাংশ যাচ্ছে শিল্প খাতেসোমবার ব্যবসায়ীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন প্রধানমন্ত্রী। ওই অনুষ্ঠানে মঙ্গলবার থেকে শিল্পে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর ঘোষণা দেন তিনি। যদিও সোমবার রাত থেকেই প্রায় ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো হয়।জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, সরবরাহ বাড়ানোর পর সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে শিল্প গ্রাহকদের। বাড়তি গ্যাসের অধিকাংশ যাচ্ছে শিল্প খাতে। বাগেরহাটের রামপাল ও পটুয়াখালীর পায়রা তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি করে ইউনিট কারিগরি কারণে বন্ধ আছে। তাই চলমান লোডশেডিং কমাতে বিদ্যুৎ খাতেও গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বাড়ানো হয়েছে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে।গ্যাস পেলে সংকট কেটে যাবে, সারের ঘাটতি থাকবে না: শিল্প উপদেষ্টাতবে গ্যাস বিতরণ সংস্থা ও ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুসারে বাড়তি গ্যাসের পুরোটা শিল্পে সরবরাহ করা হয়নি। বুধবার এটি জানিয়ে রপ্তানি খাতের তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতের চারটি সংগঠনের পক্ষ থেকে সঞ্চালন কোম্পানি জিটিসিএলকে একটি যৌথ চিঠি দেওয়া হয়েছে। সংগঠনগুলো হলো বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, বিটিএমইএ এবং বিটিটিএলএমইএ। চিঠিতে বলা বলা হয়, দেশের সবচেয়ে বড় বিতরণ সংস্থা তিতাস গ্যাসকে শিল্প খাতের চাহিদার চেয়ে ৩০ শতাংশ কম সরবরাহ করা হচ্ছে। আর অন্য বিতরণ সংস্থাগুলোকে প্রায় ৩০ শতাংশ বাড়তি সরবরাহ করা হচ্ছে। তাঁরা দ্রুত তিতাস এলাকায় গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর দাবি জানান চিঠিতে।শিল্প, আবাসিক ও সিএনজি খাতে আগের মতো সরবরাহ করতে পারছে না তিতাস। ফলে শিল্পের পাশাপাশি আবাসিকে রান্নার কাজেও ভোগান্তি শেষ হয়নি গ্রাহকের।ঢাকা, সাভার, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও ময়মনসিংহ এলাকায় গ্যাস সরবরাহ করে তিতাস। এ সংস্থার দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, গত ২১ জুলাইয়ের আগে তিতাসকে মোট ১৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে। এর মধ্যে বিদ্যুৎ খাতে ৩০ কোটি ঘনফুট, সার কারখানায় ৭ কোটি ঘনফুট, শিল্পসহ অন্যান্য খাতে ১১৩ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করা হয়। আর গতকাল তিতাস পেয়েছে ১৩৭ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে বিদ্যুৎ খাতে ২২ কোটি ঘনফুট, সারে ৭ কোটি ঘনফুট, শিল্পসহ অন্যান্য খাতে সরবরাহ করা হয়েছে ১০৮ কোটি ঘনফুট। তার মানে শিল্প, আবাসিক ও সিএনজি খাতে আগের মতো সরবরাহ করতে পারছে না তিতাস। ফলে শিল্পের পাশাপাশি আবাসিকে রান্নার কাজেও ভোগান্তি শেষ হয়নি গ্রাহকের।পেট্রোবাংলা ও তিতাস সূত্র বলছে, ময়মনসিংহের ভালুকা শিল্প এলাকায় গ্যাসের সরবরাহ আগের ধারায় ফিরেছে। নারায়ণগঞ্জের অধিকাংশ এলাকায় সরবরাহ বেড়েছে, কিছু এলাকায় গ্যাসের চাপ এখনো কম। সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুরের চন্দ্রা, সফিপুর ও কোনাবাড়ী এলাকায় গ্যাসের সরবরাহ তেমন বাড়ানো যায়নি। নরসিংদীর কিছু এলাকায় ভালো, আর কিছু এলাকায় গ্যাস তেমন বাড়েনি।গ্যাসের সরবরাহ বেড়েছে, অগ্রাধিকারে শিল্প খাত, লোডশেডিং কিছুটা কমেছেবিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়মিত নজরদারি করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকেও পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ধীরে ধীরে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হয়ে আসছে। পরিকল্পনা অনুসারে শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে। আজ থেকে শিল্পে সরবরাহ আরও স্বাভাবিক হবে। এরপর দুটি কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্র (পায়রা ও রামপাল) থেকে উৎপাদন বাড়লে শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ আরও বাড়ানোর চেষ্টা করা হবে।সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুরের চন্দ্রা, সফিপুর ও কোনাবাড়ী এলাকায় গ্যাসের সরবরাহ তেমন বাড়ানো যায়নি। নরসিংদীর কিছু এলাকায় ভালো, আর কিছু এলাকায় গ্যাস তেমন বাড়েনি।উৎপাদনে ফিরছে শিল্পকারখানা ঢাকার সাভার উপজেলার বিভিন্ন এলাকার শিল্পকারখানাগুলোয় গ্যাসের সরবরাহ কোথাও বেড়েছে, কোথাও অপরিবর্তিত রয়েছে। আশুলিয়ার বাইপাইল–সংলগ্ন ফাউন্টেন গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারিং লিমিটেডের জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক (মানবসম্পদ) আশিকুল ইসলাম গতকাল দুপুরে প্রথম আলোকে বলেন, উৎপাদন কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে গ্যাসের চাপ কমপক্ষে ৭–৮ পিএসআই (প্রতি বর্গ ইঞ্চি) থাকতে হয়। দুই মাস ধরে ১ থেকে দেড় পিএসআই ছিল। গত বুধবার সর্বোচ্চ সোয়া ৫ পিএসআই, বৃহস্পতিবার ৭ পিএসআই পাওয়া গেছে।নারায়ণগঞ্জের শিল্পকারখানাগুলোয় গ্যাসের চাপ কিছুটা বেড়েছে। এতে অনেক কারখানায় উৎপাদন স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। তবে এখনো কিছু এলাকায় গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। সদর উপজেলার ফতুল্লার কায়েমপুর এলাকায় অবস্থিত বৃহৎ ফকির নিটওয়্যার লিমিটেডে। এই প্রতিষ্ঠানে পাইপলাইনে গ্যাসের চাপ ৫–৬ পিএসআই পাওয়া যাচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি ২৪ ঘণ্টা উৎপাদন চালাতে পারছে।একই শিল্পনগরীতে ফেয়ার অ্যাপারেলস লিমিটেডে ডাইং কারখানার মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ মাসুম প্রথম আলোকে বলেন, আগের তুলনায় গ্যাসের চাপ বেড়েছে। টানা উৎপাদনকাজ চালাতে পারছেন তাঁরা।নারায়ণগঞ্জের শিল্পকারখানাগুলোয় গ্যাসের চাপ কিছুটা বেড়েছে। এতে অনেক কারখানায় উৎপাদন স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। তবে এখনো কিছু এলাকায় গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি।সারা দেশে মোট কাপড়ের চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশ উৎপাদিত হয় নরসিংদীতে। ছোট-বড় তিন হাজারের বেশি শিল্পকারখানা রয়েছে এই জেলায়। প্রায় দুই মাস ভোগান্তির পর জেলার শিল্পকারখানাগুলোয় গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। মাধবদীর এমএমকে ডাইংয়ের স্বত্বাধিকারী মোমেন মোল্লা জানান, গ্যাসের সমস্যা এখন আর নেই, তবে বিদ্যুতের সমস্যা রয়ে গেছে।নরসিংদী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি রাশেদুল হাসান বলেন, গ্যাসের অভাবে কোনো শিল্পকারখানাই এখন বন্ধ নেই। গ্যাস পরিস্থিতি আগের অবস্থায় ফিরেছে, এটি ধরে রাখতে হবে।গাজীপুরে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় সাড়ে তিন হাজার শিল্পকারখানা রয়েছে। এর মধ্যে দুই হাজারের বেশি পোশাক কারখানা। গাজীপুরে গ্যাসের চাপ কিছুটা বাড়ার পর কারখানায় উৎপাদনে গতি ফিরেছে। কোনো কারখানায় উৎপাদন ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। টাওয়েল টেক্সের অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার ওমর ফারুক বলেন, গ্যাসের চাপ বাড়ায় কারখানায় উৎপাদন আগের তুলনায় বেড়েছে।কিছু এলাকায় গ্যাসের চাপ এখনো কম গতকাল দুপুরে সাভারের কলমা এলাকার উইন্টার ড্রেস লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক মো. রফিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, উৎপাদনের জন্য গ্যাসের চাপ অন্তত ৫ পিএসআই প্রয়োজন। গতকালও এই চাপে গ্যাস আসেনি। বয়লার বন্ধ রাখতে হয়েছে।তিতাস গ্যাস অ্যান্ড ট্রান্সমিশন ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি পিএলসির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (গাজীপুর) সাখাওয়াত হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ধীরে ধীরে সাভার উপজেলায় গ্যাসের সমস্যা অনেকটাই স্বাভাবিক হচ্ছে। দু-এক দিনের মধ্যে পুরোপুরি সমাধান হয়ে যাবে।গতকাল বেলা আড়াইটার দিকে নরসিংদীর ঘোড়াদিয়া এলাকার শিল্পী ডাইংয়ের কর্মকর্তা অমিত সাহা বলেন, ভোর থেকে গ্যাস ছিল না। তবে দুপুরের পর কারখানায় গ্যাসের চাপ দেড় পিএসআই দেখা গেছে। এ চাপে বয়লার চলে না, অন্তত আড়াই পিএসআই লাগে।তৈরি পোশাক খাতের ব্যবসায়ীদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, শিল্পাঞ্চলগুলোর অধিকাংশ জায়গায় আগের তুলনায় গ্যাস পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। কোনো কোনো এলাকায় ১২ থেকে ১৫ পিএসআই চাপেও গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। তবে কিছু জায়গায় গ্যাসের চাপ ওঠানামা করার পাশাপাশি কম চাপের তথ্যও পাওয়া গেছে।[প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন নিজস্ব প্রতিবেদক, সাভার ও প্রতিনিধি, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদী]এলএনজি টার্মিনালে মেরামতের কাজ চলছে, কমেছে গ্যাসের চাপ
‘ইশ্! কী যে মিস করেছি।’ কথাটা বলেই কিছুটা থেমে গেল শারমিন নাহার। পাশে তখন জিপিএ-৫ পাওয়া যমজ বোনের হাতে সংবর্ধনা ক্রেস্ট। প্রথম আলোর এক্সপেরিয়েন্স জোনে গেম নিয়ে ব্যস্ত বোন, আর শারমিন দাঁড়িয়ে তা দেখছে। বোনের সাফল্যে আনন্দ ও গর্ব আছে, তবু নিজের ফলের আক্ষেপটা মুহূর্তেই ফুটে উঠল তাঁর মুখে।পরক্ষণেই নিজেকে সামলে শারমিন বলল, ‘এবার মিস করেছি, তাতে কী! এইচএসসিতে ভালো ফল করে এমন আয়োজন আর মিস করতে চাই না।’শরতের স্নিগ্ধ সকালে এমন আনন্দ, স্বপ্ন আর প্রত্যয়ের গল্পে মুখর হয়ে ওঠে ঠাকুরগাঁও পর্বের জিপিএ-৫ উৎসব। এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া কৃতী শিক্ষার্থীদের নিয়ে আজ শুক্রবার সকালে শুরু হয় এ সংবর্ধনা অনুষ্ঠান।সকাল সাড়ে আটটার আগেই শিক্ষার্থীরা ঠাকুরগাঁও জেলা পরিষদ মিলনায়তনে আসতে শুরু করে। কারও সঙ্গে মা-বাবা, কেউ এসেছে ভাই-বোন বা বন্ধুদের নিয়ে। পুরোনো বন্ধুকে দেখে কেউ জড়িয়ে ধরছে, কেউ মুঠোফোনে ছবি তুলছে। উৎসবে অংশ নিতে জিপিএ-৫ পাওয়া ৯ শতাধিক শিক্ষার্থী নিবন্ধন করেছে।‘স্বপ্ন দেখো, জীবন গড়ো’ স্লোগানে সারা দেশের ৬৪টি জেলায় প্রথম আলোর আয়োজন এবং শিক্ষার ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘শিখো’র পৃষ্ঠপোষকতায় শুরু হয়েছে জিপিএ-৫ উৎসব।সকাল নয়টায় ক্রেস্ট ও স্ন্যাকস সংগ্রহের মধ্য দিয়ে আয়োজনের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। পরে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে মূল অনুষ্ঠান শুরু হয়। এতে উপস্থিত ছিলেন ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. ইস্রাফিল, ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক মো. আখতারুজ্জামান, ক্রীড়া সংগঠক আবু ইয়াসিন মাসুদ রানা ও নারী হকি দলের খেলোয়াড় রিয়া মনি। শিক্ষার্থীদের জন্য ছিল গেম, অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এতে অংশ নেন বাংলাদেশ আইডলের সেরা ১০-এর প্রতিযোগী খোকা খান।বন্ধুদের পেয়ে দুষ্টুমিতে মেতে ওঠে কেউ কেউএবারের আয়োজনের পাওয়ার্ড বাই বিকাশ। সহযোগিতায় আছে কনকর্ড গ্রুপ, ফ্রেশ, সেভয় আইসক্রিম, কনকা-গ্রী, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসি, কোয়ালিটি গ্রুপ, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি, জিংক বি, অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ইউসিএসআই ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ শাখা ক্যাম্পাস, আম্বার আইটি লিমিটেড, এটিএন বাংলা ও প্রথম আলো বন্ধুসভা।শারমিন ও তাঁর যমজ বোন পুরাতন ঠাকুরগাঁও বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে এবার এসএসসি পরীক্ষা দেয়। বোন জিপিএ-৫ পেলেও শারমিন অল্পের জন্য কাঙ্ক্ষিত ফল থেকে পিছিয়ে যায়। বোনের আনন্দ ভাগ করে নিতে সে-ও এসেছে উৎসবে। নিজের ফলের আক্ষেপের কথা বললেও ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী শারমিন।ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলার আমগাঁও গ্রামের সাদিয়া আক্তার জিপিএ-৫ পেয়েছে। অনুষ্ঠানটিতে যোগ দিতে ভোরেই প্রায় ৭০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে এসেছে সে। সাদিয়া বলে, ‘এই আয়োজনটি কিছুতেই হারাতে চাইনি। তাই ভোরেই বাড়ি থেকে রওনা হয়েছি। এখানে এসে মনে হচ্ছে, এত দূর থেকে আসার কষ্টটা সামান্যই।’নিজের সংবর্ধনা ক্রেস্টের ছবি তুলছে এক শিক্ষার্থীপীরগঞ্জ উপজেলা থেকে জিপিএ-৫ পাওয়া শারমিন আক্তারের কাছেও আয়োজনটি ছিল বিশেষ। সে বলে, ‘এখানে গোটা জেলার শিক্ষার্থীদের মেলা বসেছে। এখানে আসার জন্য আমার মধ্যে একটা ব্যাকুলতা কাজ করেছে। পথে বৃষ্টি ব্যাঘাত ঘটালেও আটকাতে পারেনি।’রানীশংকৈল উপজেলার আল হাসনা স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী সুমাইয়ার কাছে উৎসবের বড় পাওয়া নতুন বন্ধু তৈরি করা। সে বলে, ‘এই অনুষ্ঠানে এসে নতুন নতুন বন্ধুদের সঙ্গে পরিচয় হলো। এই দিনটি এত সহজে ভুলব না।’উপহার সামগ্রী সংগ্রহ করছে শিক্ষার্থীরানর্থ পয়েন্ট স্কুল ও কলেজ থেকে জিপিএ-৫ পাওয়া মায়মুনা আলিবার জন্য এ আয়োজন একটি পুরোনো স্বপ্ন পূরণের মুহূর্ত। ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় বোনের সঙ্গে প্রথম আলোর জিপিএ-৫ সংবর্ধনায় এসেছিল সে। সেদিনই এমন মঞ্চে আসার স্বপ্ন দেখেছিল। মায়মুনা বলে, ‘আয়োজন দেখে আমি ভীষণ অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম। যেকোনো মূল্যে আমাকে এখানে আসতেই হবে—এটা আমার স্বপ্ন ছিল। আজ সেই স্বপ্ন পূরণ হলো।’বালিয়াডাঙ্গীর লাহিড়ী বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয় থেকে জিপিএ-৫ পাওয়া জয়ন্ত রায় সঙ্গে করে এনেছে নবম শ্রেণির ছোট ভাই সুশান্ত রায়কে। সুশান্ত বলে, ‘এত কৃতী শিক্ষার্থী একসঙ্গে এসেছে—দেখে খুব ভালো লাগছে। আমাকেও ভালো ফল করে এমন অনুষ্ঠানে আসতে হবে।’‘এখানে এসে মনে হলো, আপনারা আমাদের জন্য ভালো কিছু ভাবেন’
এই শহরে অতীতকে জাদুঘর নয়, দেখা যায় নানাভাবে। এ শহর নিজেই গল্পকথক। বলে চলে এক রাজার গল্প। এক সাম্রাজ্যের গল্প। এক সভ্যতার গল্প। আর সারা বিশ্ব সেটাই শোনে সবিস্ময়ে।রাত গভীর। রাজপ্রাসাদের চারপাশে নিস্তব্ধতা। দূরে কোথাও প্রহরীর পায়ের শব্দ। বিশাল কক্ষের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন চীনের প্রথম সম্রাট কিন শি হুয়াং। পাশে তাঁর রানি। সম্রাটের কাঁধে আলতোভাবে হাত ছুঁয়ে রানি জানতে চাইলেন— —ঘুম আসছে না, সম্রাট? —ভাবছি, আমি চলে গেলে আমার সাম্রাজ্যের কী হবে। —সাম্রাজ্য কি কখনো চিরকাল থাকে? —সাম্রাজ্য হয়তো থাকবে না। কিন্তু আমি থাকব। —কীভাবে! —আমার সেনাবাহিনী থাকবে আমার সাথে। —মৃত্যুর পর! —হ্যাঁ। আমার সৈন্য থাকবে। হাজার হাজার সৈন্য। ঘোড়া থাকবে, রথ থাকবে, অস্ত্র থাকবে। ওরা মৃত্যুর পরও আমাকে পাহারা দেবে। —আর যদি কেউ ওদের অস্তিত্ব জানতে পারে? —তাহলে ওরা জানবে একদিন এক সম্রাট ছিল, যে মৃত্যুকেও সাম্রাজ্যের শেষ বলে মানেনি।ইতিহাসে এমন কোনো কথোপকথনের উল্লেখ নেই। তবু কয়েক হাজার বছর পর শিয়ানের মাটির নিচে দাঁড়িয়ে থাকা টেরাকোটা আর্মির দিকে তাকিয়ে মনে হলো, সম্রাটের এই কথোপকথন হয়তো সময়ের ভেতর কোথাও জমে আছে। ওই রাতে সম্রাট হয়তো জানতেন না একদিন তাঁর সাম্রাজ্য থাকবে না, প্রাসাদ থাকবে না; কিন্তু তাঁর মাটির সৈন্যরা পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে মানুষকে টেনে আনবে তাঁর হারিয়ে যাওয়া রাজধানী চাংআনে। ওই একই টানে আমারও আগমন চীনের শিয়ানে।এভাবে আজও আছে কিন শি হুয়াং আর্মিরাটেরাকোটা আর্মি এক অপার বিস্ময়এই শহরে অতীতকে শুধু জাদুঘরের কাচের ভেতর দেখতে হয় না; হাঁটতে হাঁটতে, খেতে খেতে, ঘণ্টাধ্বনি শুনতে শুনতে তাকে অনুভব করা যায়। বহু রাজবংশের রাজধানী ছিল এই শহর। বিশেষ করে হান ও তাং আমলে চাংআন ছিল চীনা সভ্যতার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র এবং সিল্ক রোডের পূর্ব প্রান্তের এক গুরুত্বপূর্ণ নগর।বিশাল হলঘরে প্রবেশমাত্রই চোখে পড়ে মাটিরঙা এক বিস্তৃত সমুদ্র। একটু পর বোঝা যায় ওগুলো সৈন্য। সারি সারি সৈন্য। হাজার হাজার। কারও হাতে অস্ত্র, কেউ অশ্বারোহী, কোথাও রথের অবশিষ্টাংশ। ওরা যেন সামনে তাকিয়ে আছে যুদ্ধের নির্দেশের অপেক্ষায়। কারও মুখে কঠোরতা, কারও মুখে অদ্ভুত স্থিরতা। আশ্চর্যের বিষয়, এত সৈন্যের মধ্যে প্রায় প্রত্যেকের মুখের গড়ন আলাদা।এত বছর ধরে থেকে গেছে মাটির নিচেটেরাকোটা আর্মির একাংশখ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকে কিন শি হুয়াং চীনের বিচ্ছিন্ন রাজ্যগুলোকে একত্র করে প্রথম ঐক্যবদ্ধ সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর মৃত্যুর পরও যেন সাম্রাজ্যের নিরাপত্তা অক্ষুণ্ন থাকে, এই বিশ্বাস থেকেই তাঁর সম্ভাব্য সমাধিস্থলকে ঘিরে তৈরি হয়েছিল বিশাল এক ভূগর্ভস্থ জগৎ। টেরাকোটা আর্মি ছিল ওই জগতের সামরিক বাহিনী।অথচ এই বাহিনী যে একদিন আবার পৃথিবীর আলো দেখবে, তা হয়তো কেউ ভাবেনি। ভূগর্ভস্থ এত বড় একটি সেনাবাহিনী কয়েক শতাব্দী নয়, দুই হাজার বছর ধরে চাপা পড়ে ছিল। ১৯৭৪ সালে স্থানীয় কৃষকেরা কূপ খনন করতে গিয়ে মাটির নিচে একটি টেরাকোটা মাথা খুঁজে পান। সেই একটি মাথা ভাঙিয়ে দিল সৈন্যদের হাজার বছরের ঘুম। সৈন্যগুলোর দিকে তাকিয়ে মনে হলো রানি যদি আজ এখানে আসতেন, তিনি হয়তো একটু হেসেই সম্রাটকে বলতেন, ‘দেখেছ? তোমার স্বপ্ন সত্যি হয়েছে। তোমার সৈন্যরা সত্যিই রয়ে গেছে।’রাজা, রাজ্যপাট নেই বটে, তবু আছে তার প্রহরীরাআজ সম্রাট নেই। সাম্রাজ্য নেই। সেই পৃথিবীও নেই। শুধু সময়ের পাহারায় দাঁড়িয়ে আছে সম্রাটের মাটির সেনাবাহিনী। সম্রাট হয়তো মৃত্যুর পরে তাঁর সাম্রাজ্যকে সঙ্গে নিতে পারেননি। কিন্তু তাঁর মাটির সৈন্যরা তাঁকে বাঁচিয়ে রেখেছে। তাঁর তৈরি সৈন্যদের সামনে দাঁড়িয়ে আমরা এখনো তাঁকে নিয়ে গল্প করি। এটাই তো অমরত্ব!কোলাহলে মুখর প্রাঙ্গণে টেরাকোটা আর্মির নীরবতা পেছনে ফেলে শহরে ফিরতেই দেখি শিয়ানের অন্য রূপ। চারপাশ ব্যস্ত। গাড়ি ছুটছে, মানুষ হাঁটছে, দোকানপাটে আলো জ্বলছে। এই আধুনিক কোলাহলের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে কয়েক শতাব্দী পুরোনো স্থাপনা; বেল টাওয়ার।মিং রাজবংশের সময় ১৩৮৪ সালে নির্মিত বেল টাওয়ারমিং রাজবংশের সময় ১৩৮৪ সালে নির্মিত বেল টাওয়ার প্রথমে অন্য জায়গায় ছিল। পরে ১৫৮২ সালে বর্তমান অবস্থানে সরিয়ে আনা হয়। একসময় এটি শহরের দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। ভোরে বেল টাওয়ারের ঘণ্টা শুনে হতো দিনের শুরু, আর সন্ধ্যায় ড্রাম টাওয়ারের ঢাক ঘোষণা করত দিনের সমাপ্তি। এখন ওই দায়িত্ব ঘড়ি আর মুঠোফোনের। এই স্থাপনা এখন সময় জানায় না, বরং সময়কে মনে করিয়ে দেয়।এই স্থাপনা শুরুতে অন্য জায়গায় ছিলচারপাশে বেশ ভিড়। অনেকেই চীনা ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে ছবি তুলছে। লম্বা পোশাক, সাজানো চুল, হাতে পাখা। যেন মিং বা তাং রাজবংশের কোনো চরিত্র। একদিকে প্রাচীন স্থাপত্য, অন্যদিকে ঐতিহ্যবাহী পোশাক আর ক্যামেরার ওপাশে দাঁড়িয়ে বর্তমানের একজন পথিক। একই ফ্রেমে তিনটি যুগ!বিকেলের শেষ আলোয় উঠে পড়লাম শিয়ানের প্রাচীন নগরপ্রাচীরে। বর্তমান প্রাচীরটি মিং রাজবংশের আমলে নির্মিত হলেও এর ভেতরে রয়েছে আরও পুরোনো তাং আমলের স্মৃতি। প্রায় ১৩ দশমিক ৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই বিশাল প্রাচীর একসময় শহরকে রক্ষা করত। এই দেয়াল দেখেছে রাজবংশের উত্থান-পতন। একসময় যার কাজ ছিল শহরকে শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করা, আজ সেই একই প্রাচীরের ওপর মানুষ হাঁটে, সাইকেল চালায়, ছবি তোলে, সূর্যাস্ত দেখে।ইতিহাসের সাক্ষী শিয়ানের এই প্রাচীন নগরপ্রাচীরসিটি ওয়ালের ইটের গায়ে জমে আছে অসংখ্য গল্পসূর্য পশ্চিমে ঢলে পড়ছে। পুরোনো ইটের গায়ে দিনের শেষ আলো। সোনালি আভায় প্রাচীরের ইটগুলো আরও পুরোনো দেখায়। এই ইটের গায়ে নিশ্চয়ই অনেক গল্প জমে আছে। সম্রাট, সৈন্য, ব্যবসায়ী, পথিক, যুদ্ধ আর শান্তির গল্প। প্রাচীরের ওপর থেকে পুরোনো ও নতুন শিয়ান পাশাপাশি দেখা যায়। নিচে আধুনিক রাস্তা, গাড়ির স্রোত, উঁচু ভবন; আর আমি দাঁড়িয়ে কয়েক শতাব্দী পুরোনো ইটের ওপর।রাত নামতেই চলে গেলাম মুসলিম কোয়ার্টারে। সরু রাস্তা। দুই পাশে অসংখ্য খাবারের দোকান। মানুষের ভিড়। দোকানের আলো। গ্রিলের ধোঁয়া। আর বাতাসে ভেসে বেড়ানো জিরা, মরিচ আর মাংসের গন্ধ। কোথাও কাঠিতে গেঁথে আগুনের ওপর সেঁকা হচ্ছে মাংস। কোথাও চওড়া ‘বিয়াং-বিয়াং’ নুডলস তৈরি হচ্ছে, কোথাও গোল রুটির ভেতর মাংসের পুর। দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে খাবারের গন্ধ নিতে নিতে মনে হয় সিল্ক রোড শুধু রেশম আর মসলা বহন করেনি; বহন করেছে মানুষের স্বাদ, ভাষা আর সংস্কৃতিও।শিয়ানের মুসলিমদের ইতিহাস বেশ পুরনোশিয়ানের মুসলিম সম্প্রদায়ের ইতিহাস সিল্ক রোডের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। তাং যুগ থেকেই মধ্য এশিয়া, পারস্য ও পশ্চিম এশিয়া থেকে ব্যবসায়ী ও ভ্রমণকারীরা চাংআনে আসতেন। তাঁদের অনেকেই এখানে বসতি গড়েন। সেই দীর্ঘ সাংস্কৃতিক বিনিময়ের জীবন্ত উত্তরাধিকার আজকের মুসলিম কোয়ার্টার। সভ্যতা কখনো একা তৈরি হয় না। মানুষ আসে। মানুষ মেশে। সংস্কৃতি বদলায়। এরপর তৈরি হয় একটি শহর। এখানে ইতিহাস হাঁটে, কথা বলে, রান্না করে, খাবারের গন্ধ ছড়ায়। এখানে ইতিহাসকে পড়তে হয় না, খেতে হয়।খাওয়া শেষে রাস্তায় বেরিয়ে দেখি, রাত আরও গভীর। কিন্তু শিয়ান ঘুমায়নি। বরং অন্য এক জীবন শুরু হয়েছে। দূরে ঝলমলে বেল টাওয়ার। চারপাশে রাতের শহর। আর কোথাও অচেনা সুরে গান। কয়েক হাজার বছরের পুরোনো এই শহর যেন নিজের বর্তমানটাকে আমার সামনে মেলে ধরেছে। ইতিহাস মৃত কোনো বিষয় নয়। সে বেঁচে থাকে। কখনো মাটির সৈন্যের চোখে। কখনো প্রাচীন ইটের গায়ে। কখনো বেল টাওয়ারের ছায়ায়। কখনো মসলার গন্ধে ভরা কোনো সরু গলিতে। আবার কখনো অচেনা সুরের কোনো গানে।ঘুমায় না শিয়ানহোস্টেলে ফেরার পথে আবার সম্রাটের কথা মনে পড়ল। তাঁর ইচ্ছা পূরণ হয়েছে। তবে তাঁর কল্পনার মতো করে নয়। তাঁর সৈন্যরা এখন আর কোনো সম্রাটকে পাহারা দেয় না। এরা দুই হাজার দুইশ বছর ধরে পাহারা দেয় একটি গল্পকে। একটি সাম্রাজ্যের গল্প। একটি সভ্যতার গল্প। আর আমাদের মতো পথিকদের মনে জমে থাকা বিস্ময়ের গল্প।আর শিয়ান? শিয়ান যেন এক অতন্দ্র প্রহরী; যে এক হাতে ধরে রেখেছে অতীত, অন্য হাতে বর্তমান। আজ আমি আসলে একটি শহর দেখিনি। আমি হেঁটেছি কয়েক হাজার বছরের ভেতর দিয়ে। এক দিনে; মাত্র এক দিনে।ছবি: লেখক