অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি। যা হয়তো আপনি আজীবন কল্পনা করেছেন, স্বপ্নে দেখেছেন, কখনো জেগে থেকেও চোখ বন্ধ করে অনুভব করতে চেয়েছেন, সেই স্বর্গের মতো সুখী জীবনটি যদি একদিন হঠাৎ আপনার দরজায় এসে দাঁড়ায়? ঘুম থেকে উঠে দেখলেন, চারপাশটা ঠিক আগের মতোই আছে, অথচ আপনার ভেতরটা বদলে গেছে।
বুকের ওপর জমে থাকা অদৃশ্য পাথরটি নেই, মাথার ভেতর ঘুরপাক খাওয়া দুশ্চিন্তাগুলো নেই, গতকালের কষ্টগুলো যেন অনেক দূরের কোনো গল্প। জানালার বাইরে তাকিয়ে মনে হলো, পৃথিবীটা এত সুন্দর ছিল, অথচ এতদিন আপনি তা দেখতে পাননি।
কীভাবে সম্ভব? কোথায় যাবেন? কী চাইবেন? চলুন, আজ কিছুক্ষণের জন্য বাস্তবতার হিসাবটা পাশে রেখে অনুভূতির এক ভ্রমণে বেরিয়ে পড়ি। এখানে আপনাকে কেউ জিজ্ঞেস করবে না, আপনার কত টাকা আছে, কী হারিয়েছেন, কোথায় ব্যর্থ হয়েছেন, কিংবা জীবনে কতবার কেঁদেছেন। এখানে শুধু একটি প্রশ্ন, আপনি কী চান?
বলুন, কী চাই? এক কাপ চা? নাকি গাঢ় সুগন্ধের কফি? অথবা এমন কোনো অমৃতের স্বাদ, যার সঙ্গে পৃথিবীর কোনো পানীয়ের তুলনা চলে না? আপনি যা চাইবেন, তাই যেন আপনার সামনে হাজির। চায়ের কাপটি হাতে নিতেই তার সঙ্গে মিশে যাবে ভোরের মাটির গন্ধ, দূরের পাখির ডাক আর এমন এক প্রশান্তি, যার কথা আপনি হয়তো বহুদিন ভুলে গেছেন। কফি চাইলে তার গন্ধে যেন পাহাড়ি সকালের উষ্ণতা। আর যদি সেই অমৃত চান, এক চুমুকেই মনে হবে, এতদিন যে স্বাদের খোঁজে ছিলেন, সেটি হয়তো আপনার জিভে নয়, আপনার স্মৃতির কোনো অচেনা কোণে লুকিয়ে ছিল।
কোথায় যাচ্ছি, এখনই জানতে চাইবেন না। শুধু আমার সঙ্গে কয়েক পা হাঁটুন। চারপাশে অন্ধকার। এত গভীর অন্ধকার যে নিজের হাতটিও ঠিকমতো দেখা যায় না। কিন্তু ভয় পাবেন না। দূরে কোথাও অদ্ভুত এক আলো দেখা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, ঘন জঙ্গলের বুক চিরে কেউ যেন একটি পথ রেখে দিয়েছে। বাতাসে অচেনা ফুলের গন্ধ। কোথাও অদৃশ্য কোনো পাখি ডাকছে। পাতার ওপর শিশির জমে আছে। পায়ের নিচে নরম মাটি। যত এগিয়ে যাচ্ছেন, আলোটা তত পরিষ্কার হচ্ছে।
আর হঠাৎ…
জঙ্গল শেষ।
আপনার সামনে খুলে গেল এমন এক দৃশ্য, যা হয়তো পৃথিবীর কোনো ছবিতেও পুরোপুরি আঁকা সম্ভব নয়। দূরে বরফে ঢাকা পাহাড়, তার নিচে নীলাভ হ্রদ। পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসছে সরু জলপ্রপাত। আকাশে ভোরের প্রথম আলো। চারপাশে এমন নিস্তব্ধতা, যেখানে নিজের হৃদস্পন্দনও শোনা যায়। আপনি থেমে গেলেন। আমি শুধু বললাম, “কেমন লাগছে?” আপনি হয়তো কোনো উত্তর দিতে পারবেন না। কারণ এমন সৌন্দর্যের সামনে ভাষা অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায়।
আপনি যদি বলেন, “আমি সমুদ্র দেখতে চাই।” চোখ ফেরাতেই পাহাড়ের জায়গায় দেখা যাবে অসীম নীল সমুদ্র। ঢেউ এসে আপনার পায়ের কাছে ভেঙে পড়ছে। নরম বালুর ওপর আপনি খালি পায়ে হাঁটছেন। বাতাসে লবণের গন্ধ, দূরে সূর্য ধীরে ধীরে জলের মধ্যে ডুবে যাচ্ছে।
আপনি যদি বলেন, “না, আমি পাহাড়েই থাকতে চাই।” তাহলে আবার ফিরে আসবে সেই পাহাড়। কুয়াশা নেমে আসবে উপত্যকায়। দূরে কোনো কাঠের ঘর থেকে ধোঁয়া উঠবে। মনে হবে, পৃথিবীর সব ব্যস্ততা থেকে আপনি বহু দূরে চলে এসেছেন।
আর যদি বলেন, “আমি শুধু একটু শান্তি চাই।” তাহলে এবার কোনো দৃশ্য বদলাবে না। শুধু চারপাশের সব শব্দ ধীরে ধীরে থেমে যাবে।
আপনি বুঝতেও পারবেন না কখন এই ভ্রমণটি আপনাকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর জায়গা থেকে আপনার নিজের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতিগুলোর দিকে নিয়ে গেছে। হঠাৎ মনে পড়বে সেই মানুষটির কথা, যাকে আপনি বহুদিন আগে হারিয়েছেন। সে হয়তো আপনার বাবা, মা, কোনো প্রিয় বন্ধু, কিংবা এমন কেউ, যার সঙ্গে আর কোনোদিন কথা বলা সম্ভব হয়নি। আপনি তাকিয়ে দেখবেন, সে আপনার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে। আপনি তার হাত ধরবেন। কিছু বলার প্রয়োজন হবে না। হয়তো চোখের জলই অনেক কথা বলে দেবে।
এখানে সময়ের কোনো দেয়াল নেই। অতীত আর বর্তমানের মাঝেও কোনো দরজা নেই। আপনি চাইলে ফিরে যেতে পারেন আপনার শৈশবে, সেই বয়সে যখন একটি বিকেলই ছিল আনন্দের জন্য যথেষ্ট। মাঠের ওপর দিয়ে দৌড়াবেন, বৃষ্টিতে ভিজবেন, কাদায় পা ডোবাবেন, কোনো কারণ ছাড়াই হাসবেন। তখন বুঝতে পারবেন, সুখ কখনো খুব বড় কোনো জিনিস ছিল না। আমরা বড় হতে হতে তাকে জটিল করে ফেলেছি।
এখানে আপনার কোনো দুঃস্বপ্ন নেই। আছে স্বপ্ন। কোনো ভয় নেই। আছে কৌতূহল। কোনো অভিযোগ নেই। আছে কৃতজ্ঞতা। আর কোনো তাড়া নেই। আপনি যেখানে আছেন, সেখানেই থাকার মতো যথেষ্ট সময় আছে।
কিন্তু একটা অদ্ভুত ব্যাপার আছে। এই পৃথিবীতে আপনি যত বেশি কিছু চাইবেন, তত বেশি কিছু আপনার সামনে আসবে না। বরং ধীরে ধীরে আপনি বুঝতে শুরু করবেন, আপনার আসল চাওয়া কত সামান্য। হয়তো আপনি আর প্রাসাদ চাইছেন না, শুধু এমন একটি ঘর চাইছেন যেখানে সন্ধ্যায় ফিরে এসে শান্তিতে বসতে পারেন। কোটি টাকা চাইছেন না, শুধু এমন কিছু মানুষ চাইছেন যারা আপনাকে ভালোবাসে। দীর্ঘ জীবন চাইছেন না, শুধু বেঁচে থাকা প্রতিটি দিনকে অর্থপূর্ণ করতে চাইছেন।
হঠাৎ আপনি খেয়াল করবেন, আপনার পাশে যে মানুষটি এতক্ষণ চুপচাপ বসে ছিল, সে আপনাকে বলছে, “তুমি এতদিন সুখ খুঁজতে কোথায় কোথায় গেলে? সুখ তো তোমার কাছেই ছিল।” আপনি অবাক হয়ে তাকাবেন। সে হাসবে। “তুমি শুধু দেখতে পাওনি।”
হয়তো তখনই আপনার মনে হবে, এই জায়গাটি কোথাও বাইরে নয়। কোনো দূর দেশের পাহাড়ে নয়, কোনো বিলাসবহুল দ্বীপে নয়, কোনো রাজপ্রাসাদেও নয়। এই জায়গাটি আপনার নিজের ভেতরেই ছিল। শুধু দুঃস্বপ্ন, দুশ্চিন্তা, অভিমান, ভয় আর না-পাওয়ার হিসাব এত বেশি জায়গা দখল করে রেখেছিল যে, সেখানে সুখের জন্য একটু জায়গাও অবশিষ্ট ছিল না।
তাই আজ, যখন মনটা খুব ক্লান্ত হয়ে যাবে, যখন পৃথিবীটাকে অসহ্য মনে হবে, যখন মনে হবে কেউ আপনাকে বুঝছে না, তখন একটু থামুন। চোখ বন্ধ করুন। গভীরভাবে শ্বাস নিন। নিজেকে প্রশ্ন করুন, “আমি আসলে কী চাই?” তারপর উত্তরটির দিকে হাঁটতে শুরু করুন।
হয়তো আপনি কোথাও যাবেন না। আপনার ঘরেই থাকবেন। আপনার চায়ের কাপটিও আগের মতোই থাকবে। জানালার বাইরের পৃথিবীও বদলাবে না। কিন্তু আপনি যদি নিজের ভেতরের দরজাটা একটু খুলে দেন, তাহলে দেখবেন, সেই দরজার ওপাশে একটি ছোট্ট পৃথিবী অপেক্ষা করছে, যেখানে আপনি আবার স্বপ্ন দেখতে পারেন।
সেই পৃথিবীর প্রবেশমূল্য কত? কিছুই না। শুধু একটু সময়, একটু কল্পনা, আর নিজের প্রতি একটু মমতা।
হয়তো এখানেই আমাদের এই স্বপ্নের ভ্রমণ থেকে ফিরে এসে একটু থামা দরকার। কারণ মানুষের জীবনে এমন সময় আসতেই পারে, যখন চারপাশের সব দরজা একে একে বন্ধ হয়ে যায়। প্রিয় মানুষকে হারাতে হয়, নিজের ওপর বিশ্বাস নড়বড়ে হয়ে যায়, দীর্ঘদিনের চেষ্টা ব্যর্থ হয়, ভবিষ্যৎ অন্ধকার মনে হয়। তখন মনে হতে পারে, আর কোনো পথ নেই।
কিন্তু ইতিহাস আমাদের অন্য একটি কথা বলে। ইসলামের ইতিহাসে আমরা দেখি, রাসুলুল্লাহ হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনেও এমন এক গভীর দুঃসময় এসেছিল। মক্কার সেই কঠিন সময়ে তিনি হারিয়েছিলেন তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী হজরত খাদিজা (রা.)-কে, হারিয়েছিলেন তাঁর চাচা আবু তালিবকে, যিনি তাঁকে দীর্ঘদিন রক্ষা ও সমর্থন করেছিলেন। এরপর তায়েফে গিয়েও তিনি প্রত্যাখ্যাত ও নির্যাতিত হন। সেই সময়টিকে ইসলামী ঐতিহ্যে ‘আমুল হুযন’, অর্থাৎ দুঃখের বছর, বলা হয়।
আর সেই গভীর সংকটের সময়ের পরই আসে ইসরা ও মিরাজের সেই মহান রাত, যে রাতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাঁর প্রিয় নবী (সা.)-কে মক্কা থেকে বায়তুল মুকাদ্দাস এবং সেখান থেকে আসমানের উচ্চতম স্তরে নিয়ে যান। ইসলামী বর্ণনা অনুযায়ী, এই অসাধারণ যাত্রার মধ্যেই পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের বিধানও দেওয়া হয়।
এখানে আমাদের জন্য একটি গভীর শিক্ষা আছে। মিরাজ আমাদের জন্য পুনরাবৃত্তি করার মতো কোনো ঘটনা নয়, কারণ এটি ছিল রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বিশেষ মুজিজা। কিন্তু মিরাজের আগে যে অন্ধকার সময় এসেছিল, তার পরেও আল্লাহর পক্ষ থেকে যে আলো এসেছিল, সেই শিক্ষাটি আমাদের সবার জন্য।
অন্ধকার মানেই পথ শেষ হয়ে গেছে, তা নয়। কখনো কখনো জীবনের সবচেয়ে কঠিন রাতের পরেই মানুষের সামনে নতুন ভোরের দরজা খুলে যায়। যে দরজাটি আজ বন্ধ মনে হচ্ছে, তার ওপারে হয়তো এমন একটি পথ অপেক্ষা করছে, যার কথা আপনি এখনো কল্পনাও করতে পারছেন না।
তাই দুঃস্বপ্নকে সত্যি বলে মেনে নেবেন না। দুশ্চিন্তাকে ভবিষ্যতের ভবিষ্যদ্বাণী ভাববেন না। আজকের ব্যর্থতাকে জীবনের শেষ অধ্যায় মনে করবেন না।
একটু থামুন। নিজের ভেতরে ফিরে তাকান। প্রার্থনায় দাঁড়ান। আশা ধরে রাখুন। আপনার সাধ্য অনুযায়ী চেষ্টা চালিয়ে যান। আর মনে রাখুন, কষ্টের সময়টি আপনার পুরো জীবন নয়, এটি আপনার জীবনের একটি অধ্যায় মাত্র।
হয়তো আপনার মিরাজ হবে না। আমারও হবে না। কিন্তু আপনার জীবনে এমন একটি সকাল আসতেই পারে, যেদিন ঘুম থেকে উঠে আপনি দেখবেন, যে জীবনটাকে একসময় অসহ্য মনে হয়েছিল, সেই জীবনেই আবার আলো ফিরে এসেছে।
আর তখন হয়তো আপনি পেছনে ফিরে তাকিয়ে বলবেন, “সেদিন আমি ভেবেছিলাম সব শেষ। অথচ সেদিনই হয়তো আমার নতুন পথের শুরু হয়েছিল।”
তাই চলুন, স্বপ্ন দেখা বন্ধ না করি। কারণ কখনো কখনো মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে শুধু তার আজকের বাস্তবতা নয়, আগামী দিনের একটি সুন্দর সম্ভাবনার স্বপ্ন। আর সেই স্বপ্নের দরজাটি হয়তো এখনো খোলা আছে। শুধু আপনাকেই সেখানে পৌঁছানোর জন্য আরেকটু পথ হাঁটতে হবে।
রহমান মৃধা
গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন
ই-মেইল: rahman.mridha@gmail.com
এমআরএম
শরীয়তপুরের কাজীরহাট এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মাস্টার মোস্তফা কাজীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, প্রভাব খাটানো ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হন মোস্তফা কাজী। এরপর থেকে এলাকায় বিভিন্ন জমি দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৬ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে কাজীরহাট বাজারের দোকানপ্রতি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা কাজী। এছাড়া কয়েক মাস আগে কাজীরহাটে একটি দোকান ক্রয়ের সময় ব্যবসায়ী সুমন তপাদারের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী আরও জানান, বি. কে. নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলামের কাছ থেকেও ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন মানুষকে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় ফেলে হয়রানি করার অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন মোস্তফা কাজী। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির ব্যানারে তার কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন অনেকে। এছাড়া বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি নিজ ভগ্নিপতি সিদ্দিক দেওয়ানের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোস্তফা কাজীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সচেতন মহল বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
ইউরোপের রাজধানী ব্রাসেলসে আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা জোরালো করা। এই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত আছেন। গত বছরের শুরু থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের কারণে সারা ইউরোপ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ইউরোপীয় নেতারা এখন যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরিতে কাজ করছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, “আমরা যুদ্ধের মানবিক সংকট বুঝতে পারি এবং এখন আমাদের দায়িত্ব এটি দ্রুত শেষ করার পথ খোঁজা। আমাদের প্রত্যেকের জন্যই শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।” এই বৈঠকে অস্ত্রবিরতি চুক্তি, যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলো যুদ্ধ সমাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এগুলো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ক্রমবর্ধমান পরীক্ষার চাপ এবং পরিবারের পাশাপাশি সমাজের অযৌক্তিক প্রত্যাশা। এ দুটি কারণ মিলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বেড়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা। ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করা যেন শিক্ষার্থীর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ—সব জায়গা থেকেই উচ্চ ফলাফলের প্রত্যাশা তৈরি করছে মানসিক চাপের একটি অব্যক্ত বলয়। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইহান কবির বলেন, “পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে মনে হয়, শুধু আমি না, আমার পুরো পরিবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এটা সহ্য করা খুব কঠিন।” শুধু রাইহান নয়, দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা একই অভিজ্ঞতার কথা বলছে। সামাজিক চাপ ও তুলনার সংস্কৃতি পরিস্থিতি করছে আরও জটিল পরীক্ষার নম্বর নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এখন তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া গর্ব বা অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কোন কলেজে ভর্তি হলো, কে কতো পেল—এসব তুলনার চাপে পড়াশোনার আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা তাবাসসুম বলেন, “প্রত্যাশা থাকা ভালো, কিন্তু তা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায় এবং একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব সক্ষমতা উপেক্ষা করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়। এ থেকেই জন্ম নেয় আত্মগ্লানি, হতাশা এবং মাঝে মাঝে আত্মহননের চিন্তা।” জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ নিয়মিত মানসিক চাপে থাকে। এর মধ্যে ১২ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগে এবং বড় একটি অংশ কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই দিন পার করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে ক্ষতিকর। সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, এবং পরিবারের ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ এই সমস্যার নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম হয়, সেখানে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাকে কেবল ফলাফলের সীমায় না এনে একটি মানবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা চাপ নয়, ভালোবাসা থেকে শিখবে, এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ প্রজন্ম।
বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কৃষিখাতকে চরমভাবে আঘাত করছে। অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘদিন খরা এবং হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ফসল উৎপাদনে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে। চলতি মৌসুমেই অনেক জেলায় ধান, গম, ভুট্টা এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, একদিকে যেমন আবহাওয়ার আচরণ বুঝে ওঠা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সারের দাম, কীটনাশক ও বীজের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পোকার আক্রমণ ও রোগবালাইয়ের হারও বেড়ে গেছে। এই চাপে পড়ে অনেক কৃষকই ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা। তাদের পক্ষে বারবার ক্ষতির ধাক্কা সামলে উঠে আবার নতুনভাবে চাষাবাদ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো অঞ্চলে দেখা গেছে, কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী ফসল বাদ দিয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ ও লাভজনক অন্য চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমানেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। একইসঙ্গে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে এমন জাত ও পদ্ধতি উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে যা কঠিন জলবায়ু পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কৃষি খাতকে সচল রাখা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে এখনই পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
কলম্বোর সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাব ময়দানে চলমান দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে ব্যাট হাতে আবারও ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের। টস জিতে ব্যাট করতে নেমে প্রথম ইনিংসে টাইগাররা সংগ্রহ করে মাত্র ২২০ রান, যেখানে ব্যতিক্রম ছিলেন কেবল শোয়াড ইসলাম (৪৬), মুশফিকুর রহিম (৩৫) ও লিটন দাস (৩৪)। শ্রীলঙ্কার বোলাররা শুরু থেকেই চাপ সৃষ্টি করে রাখে। ডেবিউ করা স্পিনার সোনাল দিনুষা ৩ উইকেট নিয়ে আলো ছড়ান, আর আসিথা ফার্নান্দো ও বিষ্ণু ফার্নান্দো নেন ২টি করে উইকেট। প্রথম ইনিংসের জবাবে দ্বিতীয় দিন সকালে শ্রীলঙ্কা উদ্বোধনী জুটি থেকে ভালো সূচনা পায়। ১৩.১ ওভারে কোন উইকেট না হারিয়ে সংগ্রহ করেছে ৬২ রান। ওপেনার পাথুম নিসান্কা ৩৩ এবং লাহিরু উদারা ২৮ রানে অপরাজিত রয়েছেন। বাংলাদেশের হয়ে তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ বোলিং শুরু করলেও এখনও পর্যন্ত সাফল্যের দেখা মেলেনি। শ্রীলঙ্কা এখনো বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস থেকে ১৫৮ রানে পিছিয়ে আছে, হাতে রয়েছে সকল উইকেট। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে প্রভাব এই টেস্টটি ২০২৩-২৫ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ হওয়ায় দুই দলের জন্যই পয়েন্টের লড়াই গুরুত্বপূর্ণ। সিরিজের প্রথম টেস্টে পরাজিত হওয়ায় বাংলাদেশ সিরিজে টিকে থাকতে হলে এই ম্যাচ জিততেই হবে। পরবর্তী চ্যালেঞ্জ স্লো পিচে বাংলাদেশ বোলারদের আরও পরিকল্পিত বোলিং করতে হবে। দ্রুত উইকেট তুলে না নিতে পারলে শ্রীলঙ্কা বড় লিড নিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে দেবে টাইগারদের। ফিল্ডিংয়ে মনোযোগ এবং টাইট বোলিংয়ের মাধ্যমেই দ্বিতীয় ইনিংসে নিজেদের ফিরে পাওয়ার আশায় বাংলাদেশ। সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড (দিন ২, প্রথম সেশন পর্যন্ত): বাংলাদেশ (১ম ইনিংস): ২২০/১০ শ্রীলঙ্কা (১ম ইনিংস): ৬২/০ (১৩.১ ওভার) নিসান্কা: ৩৩*, উদারা: ২৮* বাংলাদেশ বোলার: তাইজুল, মিরাজ – উইকেটহীন
কিশোরগঞ্জে পুলিশের কাছ থেকে হাতকড়াসহ পালিয়ে যাওয়া কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতা রেনু মিয়াকে প্রায় সাড়ে আট ঘণ্টা পর আটক করে পুলিশ। সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) রাত ১০টার দিকে কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার ছয়সূতি ইউনিয়নের নিজ এলাকা থেকে রেনু মিয়াকে আটক করা হয়। এর আগে দুপুর দেড়টার দিকে নিজ বাড়ি থেকে গ্রেফতারের পর হাতকড়া পরা অবস্থায় পালিয়ে যান তিনি। রেনু মিয়া ছয়সূতি ইউনিয়নের ৯ নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি। তিনি ওই এলাকার ইল্লাত মিয়ার ছেলে। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার অভিযোগে কুলিয়ারচর থানায় করা একটি মামলার আসামি তিনি। মামলা হওয়ার পর থেকেই পলাতক ছিলেন। থানা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সোমবার দুপুর ১২টার অভিযান চালিয়ে নিজ বাড়ি থেকে রেনু মিয়াকে গ্রেফতার করা হয়। তাকে গ্রেফতারের খবরে স্থানীয় লোকজন বাড়ির সামনে জড়ো হন। ওই সময় কোনো হট্টগোল না হলেও মানুষের ভিড়ের সুযোগে হাতকড়া পরা অবস্থাতেই পুলিশের কাছ থেকে কৌশলে পালিয়ে যান তিনি। এরপরই শুরু হয় তাকে ধরতে পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান। পুলিশের একাধিক দল বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালানোর পাশাপাশি তার নিজ এলাকাতেও নজরদারি বাড়ায়। দীর্ঘ অভিযানের পর রাত ১০টার দিকে নিজ এলাকা থেকেই রেনু মিয়াকে আটক করে পুলিশ। কুলিয়ারচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাজী আরিফ উদ্দিন বলেন, হাতকড়াসহ পালিয়ে যাওয়া রেনু মিয়াকে রাত ১০টার দিকে আটক করা হয়েছে। তাকে থানায় নেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এসকে রাসেল/কেজে/এএসএম
দৈনিক সমকালের বরিশালের সাবেক ব্যুরো প্রধান সদ্য প্রয়াত সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জির পরিবারের কাছে বকেয়া পাওনা বাবদ ১০ লাখ টাকার চেক দিয়েছে সমকাল কর্তৃপক্ষ। সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) পুলক চ্যাটার্জির স্ত্রী প্রিয়ঙ্কা চ্যাটার্জির ব্যাংক হিসাবে সমকালের পক্ষ থেকে ওই অর্থ জমা দেওয়া হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন দৈনিক সমকালের বর্তমান বরিশাল ব্যুরো প্রধান সুমন চৌধুরী। এর আগে শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় নগরীর প্যারারা রোডে সমকাল কার্যালয়ের ভেতর থেকে ৫৭ বছর বয়সি সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জির মরদেহ ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার করে পুলিশ। আরও পড়ুন মৃত্যুর আগে পুলকের আবেগঘন বার্তা, ‘ক্ষমা করে দিও, কিছুই থেমে থাকে না’ পরিবার ও দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩ সালের মে মাসে পুলক চ্যাটার্জিকে সমকাল থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। চাকরি হারানোর পর তিনি বেকার ছিলেন। এসময় তিনি গভীর মানসিক কষ্টে ছিলেন বলে জানিয়েছেন স্বজনেরা। মৃত্যুর আগে পুলক চ্যাটার্জি পাঁচটি চিরকুট লিখে যান। এর মধ্যে একটি চিরকুটে দীর্ঘদিনের সহকর্মী সুমন চৌধুরীর উদ্দেশে সমকাল কার্যালয়ে গচ্ছিত থাকা তার পাওনা টাকা উদ্ধার করে পরিবারের কাছে হস্তান্তরের অনুরোধ করা হয়েছিল। মৃত্যুর তিনদিন পর সেই পাওনা অর্থই পরিবারের কাছে পৌঁছে দিলো সমকাল কর্তৃপক্ষ। পুলক চ্যাটার্জি একসময় বরিশাল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। সাংবাদিকতা জীবনে তিনি বরিশালের গণমাধ্যম অঙ্গনে দীর্ঘদিন সক্রিয় ছিলেন। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী প্রিয়ঙ্কা চ্যাটার্জি ও একমাত্র কন্যা প্রকৃতিকে রেখে গেছেন। চিরকুটে স্ত্রী ও কন্যার উদ্দেশে পুলক লিখেছিলেন, ‘আমাকে ক্ষমা করে দিও। পৃথিবীতে কারও জন্য কিছু থেমে থাকে না।’ ছোট ভাই দীপক চ্যাটার্জির প্রতিও তিনি তার স্ত্রী ও সন্তানকে আগলে রাখার আকুতি জানিয়েছেন বলে পরিবার সূত্রে জানা গেছে। পুলিশ ঘটনাটিকে প্রাথমিকভাবে আত্মহত্যা বলে ধারণা করছে। তবে উদ্ধার হওয়া চিরকুটগুলোর সত্যতা যাচাই এবং ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর বিষয়ে বিস্তারিত জানা যাবে বলে জানিয়েছেন কোতোয়ালী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আল মামুন উল ইসলাম। শাওন খান/এফএ
একসময় এখানে আগুনে গলত লোহার টুকরা। বিশাল চিমনি দিয়ে উঠত ধোঁয়া। হাজারো শ্রমিকের কর্মচাঞ্চল্যে মুখর থাকত কর্ণফুলী নদীর তীরের চট্টগ্রাম স্টিল মিলস। সেই কারখানা এখন আর নেই। তবে কারখানাটির জায়গায় শিল্পের কর্মকাণ্ড থেমে থাকেনি। পুরোনো স্টিল মিলের ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে গড়ে উঠেছে সারি সারি কারখানা। এসব কারখানায় তৈরি হচ্ছে পর্বতারোহীর সাইকেল, তাঁবু, খনিশ্রমিকের জুতা, ঝুলন্ত বিছানা (হ্যামক), স্লিপিং ব্যাগ, গাড়ির কভার, ভারোত্তোলনের বেল্ট। চট্টগ্রাম স্টিল মিলস এখন পরিচিত কর্ণফুলী ইপিজেড নামে। এই ইপিজেডের কারখানায় তৈরি সব পণ্যই রপ্তানি হয় বিদেশে। সর্বশেষ গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিশ্বের ৬ মহাদেশের ৮০টি দেশ ও অঞ্চলে রপ্তানি হয়েছে কর্ণফুলী ইপিজেডের পণ্য। এই তালিকায় আছে ইউরোপের ২৯ দেশ, যুক্তরাষ্ট্রসহ উত্তর আমেরিকার ছয় দেশ। বন্ধ হয়ে যাওয়া একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ভারী শিল্পের জায়গা কীভাবে নতুন ধরনের রপ্তানি শিল্পকেন্দ্রে রূপ নিল গত শনিবার সরেজমিনে ঘুরে সেই চিত্রই পাওয়া গেল। ২০০৬ সালের ১২ সেপ্টেম্বর যাত্রা শুরু হয় কর্ণফুলী ইপিজেডের। বিশেষায়িত এই শিল্পাঞ্চল এরই মধ্যে দুই দশক পূর্ণ করেছে।স্টিল মিল থেকে শিল্পাঞ্চলষাটের দশকে কর্ণফুলী নদীর তীরে গড়ে উঠে চট্টগ্রাম স্টিল মিলস। ১৯৬৭ সালে কারখানাটিতে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়। সরকারি এই কারখানায় বিলেট, পাতসহ নানা ধরনের ইস্পাতপণ্য তৈরি হতো। সময়ের ব্যবধানে আর্থিক সংকটে পড়ে মিলটি। ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়েও বড় ক্ষতি হয় মিলটির। আর্থিক সংকটে পড়ে ১৯৯৯ সালের ৭ জুলাই কারখানাটি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ২০০৩ সালে সরকার সেখানে ইপিজেড (রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল) গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেয়। পুরোনো স্থাপনা সরিয়ে নতুন অবকাঠামো নির্মাণের পর ২০০৬ সালের ১২ সেপ্টেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া কর্ণফুলী ইপিজেডের উদ্বোধন করেন। বর্তমানে প্রায় ২০৯ একর জায়গার ওপর প্রতিষ্ঠিত এই ইপিজেডে মোট বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ৭৮ কোটি ৭৩ লাখ মার্কিন ডলার। কর্মসংস্থান হয়েছে ৮০ হাজার লোকের।রেসিং সাইকেল থেকে ঘোড়ার স্যাডল প্যাডবাংলাদেশের রপ্তানি বললেই প্রথমে মনে আসে তৈরি পোশাকের কথা। কর্ণফুলী ইপিজেডেও পোশাক কারখানা রয়েছে। তবে পোশাকের পাশাপাশি রয়েছে নানা বৈচিত্র্যময় পণ্য তৈরির কারখানাও। এসব পণ্যও রপ্তানি হচ্ছে।গত শনিবার সরেজমিন দেখা যায়, ইপিজেডের করভো সাইকেলস লিমিটেড নামের প্রতিষ্ঠানে তৈরি হচ্ছে নানা ধরনের সাইকেল। কারখানাতে প্রতিদিন ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ সাইকেল তৈরি হয়। গত অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি ১ কোটি ১৮ লাখ ডলার মূল্যের সাইকেল রপ্তানি করেছে।প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক দেব কুমার দাশ প্রথম আলোকে বলেন, মাউন্টেন, রেসিং, ফোল্ডিং সাইকেলসহ বিশেষায়িত সাইকেল তৈরি হয় তাঁদের কারখানায়। এসব সাইকেল রপ্তানি হয় ইউরোপের বাজারে। প্রতিটি সাইকেলের গড় রপ্তানিমূল্য ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত।কর্ণফুলী ইপিজেডে বৈচিত্র্যময় পণ্যে তৈরির আরেক প্রতিষ্ঠান অফমা ক্যাম্প লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি ক্যাম্পিংয়ে ব্যবহৃত নানা ধরনের সামগ্রী তৈরি ও রপ্তানি করে। তাদের রপ্তানির তালিকায় রয়েছে হ্যামক বা ঝুলন্ত বিছানা, স্লিপিং ব্যাগ, বালিশ, ঘোড়ার স্যাডল প্যাড ইত্যাদি। বিশ্বের ২১টি দেশে তাদের পণ্য রপ্তানি হয়। গত অর্থবছর প্রতিষ্ঠানটি রপ্তানি করেছে ৪ কোটি ২৫ লাখ ডলারের পণ্য। অফমা ক্যাম্প লিমিটেডের বড় ক্রেতা ফরাসি ক্রীড়া ও আউটডোর পণ্যের খুচরা বিক্রেতা ডিক্যাথেলন।সরেজমিনে এই ইপিজেডের পার্ক বাংলাদেশ লিমিটেড নামের প্রতিষ্ঠান ঘুরে দেখা যায়, তাদের কারখানায় তৈরি হচ্ছে নানা ধরনের ব্যাগ ও ভারোত্তোলনের বেল্ট। নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিষ্ঠানটির একজন কর্মকর্তা জানান, ভারোত্তোলনের সময় কোমর ও পিঠে সাপোর্ট দিতে এই বেল্ট ব্যবহার করা হয়। দক্ষিণ কোরিয়ার মালিকানাধীন এই কারখানা গত অর্থবছরে ৬ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে।প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মেজর জেনারেল (অব) সৈয়দ ইউসুফ মাহবুব আলী সাংবাদিকদের জানান, সার্ফিং ব্যাগ, ট্রাভেল ব্রাগ, ব্যাকপ্যাক, লেডিস ব্যাগ থেকে শুরু করে হরেক রকমের ব্যাগ তৈরি হয় তাঁদের কারখানায়। প্রতি মাসে ছয় লাখ পিস ব্যাগ তৈরি হচ্ছে এই কারখানায়।কর্ণফুলী ইপিজেডের বিদেশি মালিকানাধীন আরেক প্রতিষ্ঠান শিন চ্যাং শুজ (বিডি) লিমিটেডে তৈরি হয় নানা ধরনের সেইফটি শু। কারখানাটির ব্যবস্থাপক দীপংকর দাশ জানান, এই কারখানা থেকে মাইনিং শু (খননকাজে শ্রমিকদের ব্যবহারের জুতা) ও ভারী কাজে ব্যবহারের জুতা তৈরি হয়।কর্ণফুলী ইপিজেড থেকে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হয় কাঠের চেয়ারসহ নানা ধরনের আসবাবসামগ্রী। ট্রেন্ডেক্স ফার্নিচার নামের একটি প্রতিষ্ঠান এসব আসবাব রপ্তানি করে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের ভ্রমণপ্রিয় মানুষের জন্য তাঁবু যাচ্ছে এই ইপিজেড থেকে। গত অর্থবছরে ৩ কোটি ৭২ লাখ ডলারের তাঁবু রপ্তানি করেছে এইচকেডি আউটডোর ইনোভেশনস লিমিটেডসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান।শুধু বৈচিত্র্যময় পণ্যই নয়, পোশাকও তৈরি হচ্ছে এই ইপিজেডে। ইপিজেডে অবস্থিত ক্যানপার্ক বাংলাদেশ লিমিটেডের কারখানা ঘুরে দেখা যায়, সারি সারি লাইনে কারখানাটির শ্রমিকেরা পোশাক তৈরির কাজে ব্যস্ত।ক্যানপার্কের পরিচালক (মানবসম্পদ) মো. খলিলুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, কর্ণফুলী ইপিজেডে ১১ হাজার শ্রমিক কাজ করছেন তাঁদের কারখানায়। এনবিআরের তথ্য জানাচ্ছে, গত অর্থবছরে এই ইপিজেড থেকে ক্যানপার্ক রপ্তানি করেছে প্রায় ২৮ কোটি ডলারের পণ্য। রাল্ফ লরেন, মার্কস অ্যান্ড স্পেন্সার, হুগো বস, কন্টুরের মতো বিখ্যাত ক্রেতারা ক্যানপার্ক থেকে পোশাক কিনছে।সব মিলিয়ে গত অর্থবছরে কর্ণফুলী ইপিজেড থেকে ১২৩ কোটি ডলার পণ্য রপ্তানি হয়েছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে গত অর্থবছর পর্যন্ত মোট রপ্তানি হয়েছে ১ হাজার ৪১৬ কোটি ডলারের পণ্য।জানতে চাইলে কর্ণফুলী ইপিজেডের নির্বাহী পরিচালক মাহবুব আহমেদ সিদ্দিক জানান, পোশাকের গণ্ডি পেরিয়ে কেইপিজেড এখন উচ্চমূল্যের বৈচিত্র্যময় পণ্য তৈরির কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।বদলে যাওয়া শিল্পকেন্দ্রচট্টগ্রাম স্টিল মিলসে একসময় সর্বোচ্চ প্রায় ১০ হাজার শ্রমিক কাজ করতেন। মিলটি বন্ধ হওয়ার সময় সেখানে কর্মরত শ্রমিকের সংখ্যা ছিল প্রায় দুই হাজার। আর বন্ধ সেই মিলে ইপিজেড গড়ে তোলার পর এখন সেখানে প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ৮০ হাজার মানুষের।কর্ণফুলী ইপিজেডের দুই দশক পূর্তি উপলক্ষে বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষ বা বেপজার আয়োজনে গত শনিবার পতেঙ্গায় সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করে সংস্থাটি। কেইপিজেডের অতিরিক্ত নির্বাহী পরিচালক মো. খালেদ চৌধুরীর সঞ্চালনায় কর্ণফুলী ইপিজেডের দুই দশকের বিনিয়োগ, রপ্তানি, কর্মসংস্থান ও শিল্পায়নের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন বেপজার নির্বাহী পরিচালক আনোয়ার পারভেজ।অনুষ্ঠানে জানানো হয়, বর্তমানে কর্ণফুলী ইপিজেডে চালু শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে ৪১টি। এর মধ্যে ২৯টি শতভাগ বিদেশি মালিকানাধীন, তিনটি যৌথ এবং ৯টি দেশীয় মালিকানার। আরও পাঁচটি প্রতিষ্ঠান চালুর পর্যায়ে রয়েছে। বাংলাদেশসহ ১৪টি দেশের বিনিয়োগ রয়েছে কর্ণফুলী ইপিজেডে।শুধু কর্মসংস্থান নয়, ইপিজেড ঘিরে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ছে। ইপিজেডে কর্মরত ৮০ হাজার শ্রমিকের একজন পাওলো ফুটওয়্যার (বিডি) লিমিটেডের হাফিজা আকতার। তিনি জানান, বরিশাল থেকে আসার পর এই ইপিজেডে প্রতিষ্ঠানটিতে চাকরিতে যোগদান করেছেন ২০০৭ সালে। বেতন-ভাতা ও কাজের পরিবেশ ভালো থাকায় আর কোথাও যাননি। পরিবারের ভরণপোষণ তাঁর বেতন-ভাতা দিয়েই চলছে।বেপজার সদস্য (ইনভেস্টমেন্ট প্রমোশন) মো. তানভীর হোসাইন বলেন, কর্ণফুলী ইপিজেডে কর্মরত শ্রমিকেরা মাসে ২৩৫ কোটি টাকার বেশি বেতন–ভাতা পাচ্ছেন। শুধু বেতন–ভাতাই নয়, কারখানা ঘিরে সরঞ্জাম সরবরাহ, খাদ্যপণ্য সরবরাহসহ বিশাল অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞ চলছে। সার্বিকভাবে যা দেশের রপ্তানি বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখছে।