স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সময় নিয়ে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সঙ্গে সরকারের কিছুটা সমন্বয়হীনতা সামনে এসেছে। গত সোমবার ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের সম্ভাব্য সময়সূচি ঘোষণা করেছে ইসি। এক দিন পর গতকাল মঙ্গলবার বিষয়টি নিয়ে সরকারের দুজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি সরকারের সঙ্গে যথাযথ যোগাযোগ না করার অভিযোগ আনেন। এমনকি ইসির এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
গত সোমবার সাত ধাপে ইউপি নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণা করে ইসি বলেছিল, এটি প্রাথমিক সিদ্ধান্ত। ১৭ সেপ্টেম্বর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর সঙ্গে বৈঠক করে দিন-তারিখ চূড়ান্ত করা হবে।
গতকাল মঙ্গলবার সকালে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম সাংবাদিকদের বলেন, ইউপি নির্বাচনের সময়সূচির বিষয়ে সরকার কিছু জানে না। এ বিষয়ে সরকারের সঙ্গে ইসির কোনো আলোচনাও হয়নি।
প্রতিমন্ত্রীর এই বক্তব্যের কিছু সময় পর ইসি সচিবালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, ইউপি নির্বাচনের যে সম্ভাব্য সময় নির্ধারণ করা হয়েছে, তা একেবারেই প্রাথমিক সময়সূচি। ১৭ সেপ্টেম্বর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর সঙ্গে আলোচনার পর সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হবে।
ইসি সূত্র জানায়, আইন অনুযায়ী স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সময়সূচি নির্ধারণের এখতিয়ার নির্বাচন কমিশনের। এখানে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে তফসিল চূড়ান্ত করার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। তবে রীতি হচ্ছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগে ইসি ও সরকারের স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠিক আলোচনা করে। চিঠি আদান-প্রদানও হয়। এবার এখনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়নি। তবে ইসি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর কোনগুলো নির্বাচন দেওয়ার সময় হয়েছে, কোথাও সীমানাসংক্রান্ত বা আইনি জটিলতা আছে কি না—এসব তথ্য চেয়ে গত জুলাইয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভাসংক্রান্ত তথ্য পাঠায় মন্ত্রণালয়। সিটি করপোরেশন, পৌরসভার তথ্য এখনো ইসি পায়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এখন বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী বক্তব্য দেওয়ায় ইসি কিছুটা অস্বস্তির মধ্যে পড়েছে। এ ছাড়া দুটি ধাপের ভোটের ঘোষিত তারিখ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তবে ইসি মনে করছে, তারা আইনি এখতিয়ার বলেই সম্ভাব্য সময়সূচি ঘোষণা করেছে। এখানে তাদের দিক থেকে কোনো ত্রুটি হয়নি।
ইসি প্রথম ধাপে ১২ নভেম্বর, দ্বিতীয় ধাপে ১৩ ডিসেম্বর, তৃতীয় ধাপে ৩০ ডিসেম্বর, চতুর্থ ধাপে ১৭ জানুয়ারি এবং পঞ্চম ধাপে ৪ ফেব্রুয়ারি, ষষ্ঠ ধাপে আগামী বছরের ২২ এপ্রিল এবং সপ্তম ধাপে ২৭ মে ভোট করার সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে ৩০ ডিসেম্বর বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। এই দিন ভোটের সম্ভাব্য তারিখ রাখায় বিএনপি নেতাদের কেউ কেউ অনানুষ্ঠানিকভাবে ইসির কাছে আপত্তি জানিয়েছেন বলে একটি সূত্র জানিয়েছে। এ ছাড়া ১৩ ডিসেম্বর জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষার গণিত বিষয়ে পরীক্ষা রয়েছে। পরীক্ষার সময় পরিবর্তন না করলে এদিন ভোট করা সম্ভব হবে না। কারণ, পরীক্ষার দিন ভোট হওয়ার নজির নেই।
স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর দাবি ইসি আলোচনা করেনি
গতকাল সকালে সচিবালয়ে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম সাংবাদিকদের বলেন, ইউপি নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার বিষয়ে সরকার কিছু জানে না। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ও কিছু জানে না। নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সরকারের এ বিষয়ে কোনো চিঠি-চালাচালি হয়নি। অন্য কোনো মাধ্যমে আলোচনাও হয়নি।
নির্বাচন কমিশন স্বাধীন, তাদের নির্বাচন করার সাংবিধানিক ক্ষমতা আছে মন্তব্য করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী সরকারের সঙ্গে আলোচনার পর তারিখ ঘোষণা করে। প্রস্তুতি সভা বা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভা করা হয়। এতে বাজেটসহ বিভিন্ন বিষয় থাকে।
অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান গতকাল দুপুরে সচিবালয়ে সরকারের কার্যক্রম সম্পর্কে জানাতে ডাকা সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্নের জবাবে বলেন, সংবিধানে জাতীয় ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য ইসি স্বাধীন হলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সিদ্ধান্ত সরকারের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমেই নির্ধারিত হয়। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সরকারের সিদ্ধান্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচন কমিশন ও সরকার সমন্বয় করে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।
প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য শিরোধার্য বললেন ইসি সচিব
গতকাল সকালে নির্বাচন ভবনে ইসি সচিব আখতার আহমেদ বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে, এটি নিশ্চিত। তবে নির্বাচন কবে এবং কী পদ্ধতিতে বা কোন পর্যায়ে হবে, তা নিয়ে কমিশনে দুই দিন ধরে প্রাক্-প্রস্তুতিমূলক আলোচনা হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় সোমবার একটি সম্ভাব্য সময়সূচি ঘোষণা করা হয়েছে। তবে এটি একেবারেই প্রাথমিক সময়সূচি।
স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে ইসি সচিব আখতার আহমেদ বলেন, ‘উনি (প্রতিমন্ত্রী) যেটা বলেছেন, সেটা শিরোধার্য। তবে এ বিষয়ে পাল্টা কোনো মন্তব্য করার ধৃষ্টতা আমি দেখাব না। নো কমেন্টস ফ্রম মাই সাইড।’
সরকারের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ইসি সচিব বলেন, আলোচনা একটা চলমান প্রক্রিয়া। কার সঙ্গে কখন, কীভাবে আলোচনা হয়েছে, এ বিষয়ে এ মুহূর্তে বাড়তি কোনো মন্তব্য করতে তিনি রাজি নন।
এনসিপির ক্ষোভ
সরকারের প্রতি ইসির ‘অনুগত আচরণ এবং কমিশনের ওপর সরকারের অন্যায় হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে’ ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানিয়েছে এনসিপি। গতকাল এক বিবৃতিতে দলটি বলেছে, স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইসির নিজস্ব সিদ্ধান্ত ও অবস্থান থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যকে ‘শিরোধার্য’ মেনে ইসি সচিবের চুপসে যাওয়া প্রমাণ করে, কমিশন স্বাধীন ভূমিকা প্রয়োগ করতে পারছে না। এটি পুরোপুরি সরকারের আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। সরকারের প্রভাবে ও চাপে পড়ে নির্বাচন কমিশন একেক সময় একেক রকম কথা বলে খামখেয়ালিপনা প্রদর্শন করছে, যা নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের ন্যূনতম গ্যারান্টিও ধ্বংস করে দিচ্ছে। দলটি ইসিসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নির্বাহী বিভাগের ‘অবৈধ প্রভাব বিস্তার ও অগণতান্ত্রিক হস্তক্ষেপ’ অবিলম্বে বন্ধ করার দাবি জানিয়েছে।
এখতিয়ার ইসির
সংবিধানে বলা আছে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ও সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান করবে ইসি। এ ছাড়া সংবিধান বা অন্য কোনো আইনের দ্বারা নির্ধারিত অন্য কোনো দায়িত্ব কমিশন পালন করবে।
স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন আইনে নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ইসিকে। যেমন ইউনিয়ন পরিষদ আইনের ২০ ধারায় বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশন কর্তৃক প্রণীত বিধি অনুসারে ইসি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের নির্বাচনের আয়োজন, পরিচালনা ও সম্পাদন করবে। কোন কোন বিষয়ে ইসি বিধান করতে পারবে, সেটাও এই ধারায় বলা আছে। সেখানে বলা হয়েছে, ভোট গ্রহণের তারিখ, সময়, স্থান ও নির্বাচন পরিচালনাসংক্রান্ত অন্যান্য বিষয়ে বিধান করতে পারবে ইসি। উপজেলা পরিষদ আইনেও একই কথা বলা আছে।
শরীয়তপুরের কাজীরহাট এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মাস্টার মোস্তফা কাজীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, প্রভাব খাটানো ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হন মোস্তফা কাজী। এরপর থেকে এলাকায় বিভিন্ন জমি দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৬ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে কাজীরহাট বাজারের দোকানপ্রতি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা কাজী। এছাড়া কয়েক মাস আগে কাজীরহাটে একটি দোকান ক্রয়ের সময় ব্যবসায়ী সুমন তপাদারের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী আরও জানান, বি. কে. নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলামের কাছ থেকেও ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন মানুষকে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় ফেলে হয়রানি করার অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন মোস্তফা কাজী। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির ব্যানারে তার কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন অনেকে। এছাড়া বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি নিজ ভগ্নিপতি সিদ্দিক দেওয়ানের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোস্তফা কাজীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সচেতন মহল বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
ইউরোপের রাজধানী ব্রাসেলসে আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা জোরালো করা। এই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত আছেন। গত বছরের শুরু থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের কারণে সারা ইউরোপ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ইউরোপীয় নেতারা এখন যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরিতে কাজ করছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, “আমরা যুদ্ধের মানবিক সংকট বুঝতে পারি এবং এখন আমাদের দায়িত্ব এটি দ্রুত শেষ করার পথ খোঁজা। আমাদের প্রত্যেকের জন্যই শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।” এই বৈঠকে অস্ত্রবিরতি চুক্তি, যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলো যুদ্ধ সমাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এগুলো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ক্রমবর্ধমান পরীক্ষার চাপ এবং পরিবারের পাশাপাশি সমাজের অযৌক্তিক প্রত্যাশা। এ দুটি কারণ মিলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বেড়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা। ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করা যেন শিক্ষার্থীর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ—সব জায়গা থেকেই উচ্চ ফলাফলের প্রত্যাশা তৈরি করছে মানসিক চাপের একটি অব্যক্ত বলয়। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইহান কবির বলেন, “পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে মনে হয়, শুধু আমি না, আমার পুরো পরিবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এটা সহ্য করা খুব কঠিন।” শুধু রাইহান নয়, দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা একই অভিজ্ঞতার কথা বলছে। সামাজিক চাপ ও তুলনার সংস্কৃতি পরিস্থিতি করছে আরও জটিল পরীক্ষার নম্বর নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এখন তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া গর্ব বা অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কোন কলেজে ভর্তি হলো, কে কতো পেল—এসব তুলনার চাপে পড়াশোনার আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা তাবাসসুম বলেন, “প্রত্যাশা থাকা ভালো, কিন্তু তা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায় এবং একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব সক্ষমতা উপেক্ষা করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়। এ থেকেই জন্ম নেয় আত্মগ্লানি, হতাশা এবং মাঝে মাঝে আত্মহননের চিন্তা।” জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ নিয়মিত মানসিক চাপে থাকে। এর মধ্যে ১২ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগে এবং বড় একটি অংশ কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই দিন পার করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে ক্ষতিকর। সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, এবং পরিবারের ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ এই সমস্যার নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম হয়, সেখানে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাকে কেবল ফলাফলের সীমায় না এনে একটি মানবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা চাপ নয়, ভালোবাসা থেকে শিখবে, এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ প্রজন্ম।
বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কৃষিখাতকে চরমভাবে আঘাত করছে। অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘদিন খরা এবং হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ফসল উৎপাদনে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে। চলতি মৌসুমেই অনেক জেলায় ধান, গম, ভুট্টা এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, একদিকে যেমন আবহাওয়ার আচরণ বুঝে ওঠা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সারের দাম, কীটনাশক ও বীজের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পোকার আক্রমণ ও রোগবালাইয়ের হারও বেড়ে গেছে। এই চাপে পড়ে অনেক কৃষকই ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা। তাদের পক্ষে বারবার ক্ষতির ধাক্কা সামলে উঠে আবার নতুনভাবে চাষাবাদ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো অঞ্চলে দেখা গেছে, কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী ফসল বাদ দিয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ ও লাভজনক অন্য চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমানেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। একইসঙ্গে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে এমন জাত ও পদ্ধতি উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে যা কঠিন জলবায়ু পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কৃষি খাতকে সচল রাখা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে এখনই পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
কলম্বোর সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাব ময়দানে চলমান দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে ব্যাট হাতে আবারও ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের। টস জিতে ব্যাট করতে নেমে প্রথম ইনিংসে টাইগাররা সংগ্রহ করে মাত্র ২২০ রান, যেখানে ব্যতিক্রম ছিলেন কেবল শোয়াড ইসলাম (৪৬), মুশফিকুর রহিম (৩৫) ও লিটন দাস (৩৪)। শ্রীলঙ্কার বোলাররা শুরু থেকেই চাপ সৃষ্টি করে রাখে। ডেবিউ করা স্পিনার সোনাল দিনুষা ৩ উইকেট নিয়ে আলো ছড়ান, আর আসিথা ফার্নান্দো ও বিষ্ণু ফার্নান্দো নেন ২টি করে উইকেট। প্রথম ইনিংসের জবাবে দ্বিতীয় দিন সকালে শ্রীলঙ্কা উদ্বোধনী জুটি থেকে ভালো সূচনা পায়। ১৩.১ ওভারে কোন উইকেট না হারিয়ে সংগ্রহ করেছে ৬২ রান। ওপেনার পাথুম নিসান্কা ৩৩ এবং লাহিরু উদারা ২৮ রানে অপরাজিত রয়েছেন। বাংলাদেশের হয়ে তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ বোলিং শুরু করলেও এখনও পর্যন্ত সাফল্যের দেখা মেলেনি। শ্রীলঙ্কা এখনো বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস থেকে ১৫৮ রানে পিছিয়ে আছে, হাতে রয়েছে সকল উইকেট। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে প্রভাব এই টেস্টটি ২০২৩-২৫ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ হওয়ায় দুই দলের জন্যই পয়েন্টের লড়াই গুরুত্বপূর্ণ। সিরিজের প্রথম টেস্টে পরাজিত হওয়ায় বাংলাদেশ সিরিজে টিকে থাকতে হলে এই ম্যাচ জিততেই হবে। পরবর্তী চ্যালেঞ্জ স্লো পিচে বাংলাদেশ বোলারদের আরও পরিকল্পিত বোলিং করতে হবে। দ্রুত উইকেট তুলে না নিতে পারলে শ্রীলঙ্কা বড় লিড নিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে দেবে টাইগারদের। ফিল্ডিংয়ে মনোযোগ এবং টাইট বোলিংয়ের মাধ্যমেই দ্বিতীয় ইনিংসে নিজেদের ফিরে পাওয়ার আশায় বাংলাদেশ। সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড (দিন ২, প্রথম সেশন পর্যন্ত): বাংলাদেশ (১ম ইনিংস): ২২০/১০ শ্রীলঙ্কা (১ম ইনিংস): ৬২/০ (১৩.১ ওভার) নিসান্কা: ৩৩*, উদারা: ২৮* বাংলাদেশ বোলার: তাইজুল, মিরাজ – উইকেটহীন
নওগাঁর প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে উঠে এসে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) থেকে শিক্ষাজীবন শেষ করেছেন আজন্ম দৃষ্টিহীন শাকিল হোসেন। দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া শাকিল মেধা ও অদম্য পরিশ্রমে শিক্ষাজীবন সফলভাবে শেষ করলেও চাকরি নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েন। বিভিন্ন দপ্তরে চাকরির জন্য ঘুরেও সাড়া পাননি তিনি। শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগে সেই অপেক্ষার অবসান হয়েছে। মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) ঢাকার গুলশানে বিএনপির চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক ও শিল্প মন্ত্রণালয়বিষয়ক উপদেষ্টা এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. ফরিদুল ইসলামের হাত থেকে নিয়োগপত্র গ্রহণ করেন শাকিল হোসেন। জানা গেছে, শাকিলের চাকরির বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরে এলে তিনি তার উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভীকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। পরে রিজভী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের সহযোগিতায় তাকে চাকরির ব্যবস্থা করেন। শাকিলকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা হিসেবে তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। শাকিল নওগাঁর একটি প্রত্যন্ত গ্রামের দরিদ্র পরিবারের সন্তান। আজন্ম দৃষ্টিহীন হলেও মেধা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে স্কুল-কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করেন। তবে শিক্ষাজীবন শেষ করার পর চাকরি পাওয়াই তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। চাকরির জন্য বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরলেও দৃষ্টিহীনতার কারণে তার চাকরি পাওয়ার স্বপ্ন অধরাই থেকে যাচ্ছিল। অবশেষে প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগে সেই অপেক্ষার অবসান হলো। নিয়োগপত্র প্রদান অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোর্শেদ হাসান খান, নওগাঁ-৫ আসনের সংসদ সদস্য মো. জাহিদুল ইসলাম ধলু এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভীর এপিএস জাহেদুল আলম। কেএইচ/কেএইচকে
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলার রায়ে ওবায়দুল কাদেরসহ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের শীর্ষস্থানীয় সাত নেতাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এই সাজা দেওয়া হয়েছে ‘সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’র (শীর্ষ নেতৃত্বের দায়) দায়ে।আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের দণ্ডিত পাঁচ নেতার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির অর্ধেক বাজেয়াপ্ত করার আদেশও দেওয়া হয়েছে। বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি বিতরণ করা হবে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার ও আহত ব্যক্তিদের মধ্যে। বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি বিক্রি করে জুলাই ফাউন্ডেশন বা অন্য কোনো বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তাঁদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ গতকাল মঙ্গলবার এই রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় গত বছরের ১৭ নভেম্বর আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সভাপতি ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। ১০ মাস পর আরেকটি মামলায় গতকাল দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলো। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অন্যরা হলেন দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম এবং সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত। বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খানকে এবং ছাত্রলীগের (বর্তমানে নিষিদ্ধ) সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনানকেও মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত এই সাত আসামিই পলাতক। তাঁদের মধ্যে ওবায়দুল কাদের, বাহাউদ্দিন নাছিম, মোহাম্মদ আলী আরাফাত, শেখ ফজলে শামস পরশ ও মাইনুল হোসেন খানের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির অর্ধেক বাজেয়াপ্ত করার আদেশ দেওয়া হয়েছে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। এরপর পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরু হয়। এসব অপরাধের ঘটনায় সপ্তম রায় হলো গতকাল।দুটি ট্রাইব্যুনালের ৭টি রায়ে ৬৮ আসামিকে সাজা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানসহ ২২ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এই ২২ আসামির মধ্যে ১৮ জন পলাতক। কারাগারে আছেন চারজন।রায়ের আগে যা বললেন ট্রাইব্যুনালতিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল গতকাল বেলা ১১টা ৫৫ মিনিটে এজলাসে আসেন। পরে কয়েকটি মামলার শুনানি করেন ট্রাইব্যুনাল। এরপর দুপুর ১২টা ১০ মিনিটে ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামির বিরুদ্ধে করা মামলার রায় ঘোষণা শুরু হয়।ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী রায় ঘোষণার শুরুতে বলেন, এই মামলার অনেক কাগজ। তাঁদের পড়তে কষ্ট হয়েছে। রায় দিতে কষ্ট হয়েছে। প্রসিকিউশনেরও কম কষ্ট হয়নি। সাক্ষীরাও কষ্ট করেছেন। তদন্ত কর্মকর্তা অবর্ণনীয় পরিশ্রম করেছেন। সাংবাদিকেরাও সহযোগিতা করেছেন। সবাইকে ধন্যবাদ।বিচারপতি নজরুল ইসলাম বলেন, রায়ের কপি ৫৫০ পৃষ্ঠার বেশি। পৃষ্ঠা আরও বাড়বে। পুরো রায় ইংরেজিতে। তবে সহজে বোঝার জন্য এর কিছু অংশ বাংলা করে আনা হয়েছে। তিনি বলেন, তাঁদের পুরো রায় পড়া উচিত ছিল। আসামিরা উপস্থিত থাকলে পড়ে শোনাতেন। এরপর আসামিদের কার কী সাজা, তা ঘোষণা করেন তিনি।কী অপরাধ, কী সাজা ওবায়দুল কাদেরওবায়দুল কাদেরএই মামলার রায়ে প্রত্যেক আসামির বিরুদ্ধে চারটি করে অভিযোগ আনা হয়েছে। এর মধ্যে ওবায়দুল কাদেরের বিরুদ্ধে আনা চারটি অভিযোগের সব কটিতেই তিনি দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। চারটি অভিযোগের তিনটিতে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একটিতে (দুই নম্বর অভিযোগ) দেওয়া হয়েছে আমৃত্যু কারাদণ্ড।প্রথম অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১১ জুলাই বিকেল ৫টা ৫০ মিনিটে ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেনের মুঠোফোনে কথোপকথন হয়। আন্দোলন দমনের সরাসরি নির্দেশ দিয়ে সাদ্দামকে তখন কাদের বলেছিলেন, ‘মারো না কেন ওদের, প্রশ্রয় দাও কেন?’১৫ জুলাই ধানমন্ডির আওয়ামী লীগ সভাপতির দলীয় কার্যালয়ে ওবায়দুল কাদের সংবাদ সম্মেলনে ‘আত্মস্বীকৃত রাজাকারদের জবাব দেবে ছাত্রলীগ’ বলে বক্তব্য দেন। এ বক্তব্যের মাধ্যমে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে ছাত্রলীগকে লেলিয়ে দেন ওবায়দুল কাদের।ওবায়দুল কাদেরের এমন নির্দেশনার পর ১৬ জুলাই আওয়ামী সন্ত্রাসীরা গুলি করে চট্টগ্রামের চান্দগাঁও থানার মুরাদপুর এলাকায় মোহাম্মদ ওয়াসিম, ফয়সাল আহম্মেদ শান্ত ও মো. ফারুককে হত্যা করে। একই দিন রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদসহ সারা দেশে ছয়জন নিরীহ-নিরস্ত্র আন্দোলনকারীকে হত্যা করা হয়। এর জন্য তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।দুই নম্বর অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১৭ জুলাই রাজধানীর তেজগাঁওয়ের দলীয় কার্যালয়ে নেতা–কর্মীদের নিজ নিজ এলাকায় প্রস্তুতি ও প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য নির্দেশ দেন ওবায়দুল কাদের।পরদিন ১৮ জুলাই ধানমন্ডির আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এ আন্দোলনকে সরকারবিরোধী ও ষড়যন্ত্রমূলক আখ্যা দেন ওবায়দুল কাদের।১৯ জুলাই গণভবনে আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলের প্রধানদের বৈঠক শেষে কারফিউ জারি ও সেনাবাহিনী মোতায়েনের প্রসঙ্গে ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন, ‘এটা অবশ্যই কারফিউ, সেটা শুট অ্যাট সাইট হবে।’ওবায়দুল কাদেরের এসব নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা গুলি করে মিরপুরে ১৮ জুলাই শেখ শাহরিয়ার বিন মতিনসহ ৩ জন, ১৯ জুলাই আসিফ ইকবালসহ ৩০ জন, ২০ জুলাই সিফাত হোসেন, মহাখালী এলাকায় ৬ জনসহ সারা দেশে অসংখ্য আন্দোলনকারীকে হত্যা করে।তিন নম্বর অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট ধানমন্ডির আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে ওবায়দুল কাদের এক সংবাদ সম্মেলনে পাড়া-মহল্লায় অবস্থান নিয়ে আন্দোলনকে রুখে দিতে দলের নেতা-কর্মীদের নির্দেশ দেন। তাঁরএই নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা গুলি করে মিরপুরে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট শাহরিয়ার হাসান আলভী, মিরাজ ফরাজি, মহিউদ্দিনসহ ১২ জনকে, ফেনীর মহিপালে ইশতিয়াক আহাম্মেদসহ ৭ জনকে এবং লক্ষ্মীপুর সদরে সাদ-আল আফনানসহ ৪ জনকে হত্যা করে। একইভাবে ৫ আগস্ট মিরপুরে মাহফুজুল আলমসহ ২০ জনকে এবং রাজশাহী মহানগরে রায়হান আলী, সাকিব আনজুমসহ সারা দেশে অসংখ্য আন্দোলনকারীকে হত্যা করা হয়।চার নম্বর অভিযোগে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সরকারের মন্ত্রী হিসেবে দল ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর ওবায়দুল কাদেরের নিয়ন্ত্রণ ছিল। তারপরও তিনি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতন প্রতিরোধ করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছেন।বাহাউদ্দিন নাছিমআ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিমবাহাউদ্দিন নাছিমের বিরুদ্ধে আনা চারটি অভিযোগের মধ্যে একটি (দুই নম্বর অভিযোগ) থেকে তাঁকে খালাস দেওয়া হয়েছে। খালাস পাওয়া অভিযোগটি হলো, নাছিমের নিজ জেলা মাদারীপুরে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন দমনে সাবেক মেয়র খালিদ হোসেনের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক তদারক করতেন তিনি। সেখানে ১৮ জুলাই দীপ্ত দে এবং ১৯ জুলাই তৌহিদকে হত্যা এবং অসংখ্য আন্দোলনকারীকে গুরুতর জখম করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ছত্রচ্ছায়ায় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগের ক্যাডাররা।তিন ও চার নম্বর অভিযোগে বাহাউদ্দিন নাছিমকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে নাছিমের প্ররোচনায় ৪ আগস্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি আওয়ামী সন্ত্রাসীরা আসামির নির্বাচনী এলাকা বাংলামোটরে তিনজনকে এবং পল্টন নাইটিঙ্গেল মোড়ে একজনকে হত্যা করে। পরদিন ৫ আগস্ট ঢাকা মেডিকেলের সামনে রাকিব হোসেনসহ গুলিস্তান, বাংলামোটর ও চানখাঁরপুল এলাকায় মোট ১৩ জনকে হত্যা করে।এক নম্বর অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় নাছিমকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, তিনি ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত থেকে অপরাধ সংঘটনে সমর্থন ও প্ররোচনা দেন।মোহাম্মদ আলী আরাফাতমোহাম্মদ আলী আরাফাতসাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাতের বিরুদ্ধে আনা চারটি অভিযোগের মধ্যে একটিতে (তিন নম্বর অভিযোগ) খালাস দেওয়া হয়েছে। তিন নম্বর অভিযোগে আরাফাতের বিরুদ্ধে ‘জয়েন্ট ক্রিমিনাল এন্টারপ্রাইজের’ (যৌথ অপরাধমূলক উদ্যোগ) অভিযোগ আনা হয়েছিল।দুই নম্বর অভিযোগে আরাফাতকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এক ও চার নম্বর অভিযোগে তাঁকে দেওয়া হয়েছে মৃত্যুদণ্ড। এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই দিবাগত রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় গিয়ে আরাফাত বিভিন্ন রকম উসকানিমূলক বক্তব্য দেন। ১৯ জুলাই আরাফাত প্রেস ব্রিফিংয়ে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের সন্ত্রাসী তকমা দেন। পাশাপাশি তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টানা পাঁচ বছর অস্ত্র-গুলি ব্যবহার করার মতো মজুতের বিষয় উল্লেখ করে হুমকি দেন। তাঁর নির্বাচনী এলাকায় ১৯ জুলাই হামলা চালিয়ে মো. শাহজাহান, গনি মিয়াসহ ছয় আন্দোলনকারীকে গুলি করে হত্যা করে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগসহ অন্যান্য দলীয় সশস্ত্র ক্যাডাররা। এই হত্যাকাণ্ডের সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন আরাফাত।শেখ ফজলে শামস পরশশেখ ফজলে শামসযুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশের বিরুদ্ধে আনা চারটি অভিযোগের একটিতে (এক নম্বর অভিযোগ) তাঁকে খালাস দেওয়া হয়েছে। এক নম্বর অভিযোগে পরশের বিরুদ্ধে জয়েন্ট ক্রিমিনাল এন্টারপ্রাইজের (যৌথ অপরাধমূলক উদ্যোগ) অভিযোগ আনা হয়েছিল।পরশকে দুই নম্বর অভিযোগে আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং তিন ও চার নম্বর অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এসব অভিযোগের মধ্যে আছে শেখ হাসিনা ও ওবায়দুল কাদেরের নির্দেশনা মোতাবেক সারা দেশে আন্দোলন নস্যাতের জন্য পরশ যুবলীগকে বিভিন্ন নির্দেশনা দেন। তাঁর নির্দেশে যুবলীগের নেতা-কর্মীরা সশস্ত্র অবস্থায় দেশের বিভিন্ন স্থানে আগ্নেয়াস্ত্র, দেশি অস্ত্রসহ আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালিয়ে নিরীহ-নিরস্ত্র ছাত্র-জনতাকে হত্যা ও গুরুতর আহত করে।মাইনুল হোসেন খান নিখিলমাইনুল হোসেন খান নিখিলযুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল চারটি অভিযোগেই দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। এক নম্বর অভিযোগে আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং দুই, তিন ও চার নম্বর অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে ওবায়দুল কাদেরের নির্দেশ ও প্ররোচনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ১৯ জুলাই মাইনুল নিজে অস্ত্র হাতে নিয়ে মিরপুর এলাকায় মহড়া দেন। সেদিন তাঁর নেতৃত্ব ও নির্দেশে মিরপুরে নির্বিচার গুলি চালিয়ে রুস্তম, আসিফ ইকবালসহ ২৬ জনকে হত্যা করা হয়।সাদ্দাম হোসেনসাদ্দাম হোসেনছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন চারটি অভিযোগেই দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। এক ও দুই নম্বর অভিযোগে আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং তিন ও চার নম্বর অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের মধ্যে রয়েছে তিনি ১৫ জুলাই ‘কোটা সংস্কার আন্দোলন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করবে’ বলে উসকানিমূলক বক্তব্য দেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা ১৮ জুলাই নির্বিচার গুলি করে, যাতে সারা দেশে ২৩ জন নিহত হন।শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনানের বিরুদ্ধে আনা চারটি অভিযোগের সব কটিতেই তিনি দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। এক ও দুই নম্বর অভিযোগে আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং তিন ও চার নম্বর অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ইনান শিক্ষার্থীদের আন্দোলন প্রতিহত করার জন্য নির্দেশ দেন। তাঁর নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কমিটি, ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ ছাত্রলীগের কমিটি, ঢাকা কলেজের কমিটির সদস্যরা হামলা চালান। ১৬ জুলাই সারা দেশে ছয়জন নিহত হন।রায়ে বলা হয়, ওবায়দুল কাদের ছাড়াও দণ্ডপ্রাপ্ত অন্য আসামিদের নিজ সংগঠন ও দল এবং সরকারে নিয়ন্ত্রণ ছিল। আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সংসদ সদস্য হিসেবে দল ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর নাছিমের নিয়ন্ত্রণ ছিল। প্রতিমন্ত্রী হিসেবে আওয়ামী লীগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গণমাধ্যমের ওপর আরাফাতের নিয়ন্ত্রণ ছিল।যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ এবং সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিলের তাঁদের সংগঠনের ওপর নিয়ন্ত্রণ ছিল। একইভাবে সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনানের নিয়ন্ত্রণ ছিল ছাত্রলীগের ওপরেও।রায়ে বলা হয়, নিজ সংগঠন ও দল এবং সরকারে নিয়ন্ত্রণ থাকা সত্ত্বেও এই সাত আসামি গণ-অভ্যুত্থানের সময় নেতা-কর্মীদের অপরাধ থেকে বিরত রাখতে এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে তাঁরা ব্যর্থ হয়েছেন। এই অভিযোগে প্রত্যেককে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। এটি সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটির দায়।‘সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটি ও ব্যক্তিগত দায়’আমিনুল ইসলামসাত আসামির মৃত্যুদণ্ডের রায়ে শুকরিয়া আদায় করেছেন ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। রায় ঘোষণার পর নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, এই মামলার আসামিদের বিরুদ্ধে ‘সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’ ছিল। তাঁদের প্রত্যেকের ব্যক্তিগত দায়ও ছিল।ব্রিফিংয়ে একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, আসামিদের অনুপস্থিতিতে বিচার নিয়ে মানবাধিকার সংগঠন উদ্বেগ জানিয়েছে। জবাবে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, কোনো অপরাধী যদি ইচ্ছাকৃতভাবে পলাতক থাকে, আইনে যেভাবে বিধান আছে, সেভাবেই বিচারকার্য পরিচালিত হয়েছে। অতএব এখানে কোনো মানবাধিকার সংগঠনের মন্তব্যের অবকাশ নেই।চিফ প্রসিকিউটর আরও বলেন, রায় প্রকাশিত হওয়ার ৩০ দিন পর্যন্ত আপিল করার সুযোগ থাকবে। এর মধ্যে সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার সুযোগ নেই। আপিল না হলে রায় বাস্তবায়ন করতে বাধা নেই।ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত ছিলেন জুলাই শহীদ মেহেরুন্নেসা তানহার বাবা মোশারফ হোসেন এবং মামলার সাক্ষী রাজনৈতিক বিশ্লেষক আশরাফ কায়সার ও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সমন্বয়ক মাহিন সরকার। আসামিপক্ষে রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী ছিলেন ইসরাত জাহান ও এম হাসান ইমাম। তাঁরা রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।৪৫৪ দিনে তদন্ত থেকে রায়প্রসিকিউশন জানিয়েছে, ওবায়দুল কাদেরসহ এই মামলার দণ্ডিত সাত আসামির বিষয়ে তদন্ত শুরু হয়েছিল গত বছরের ১৮ জুন। তদন্ত সংস্থা প্রতিবেদন দাখিল করে গত বছরের ৭ ডিসেম্বর। পরে ১৮ ডিসেম্বর ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন (রাষ্ট্রপক্ষ)।এরপর চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি এই মামলার আসামিদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করেন ট্রাইব্যুনাল। ১৭ ফেব্রুয়ারি সূচনা বক্তব্য উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়। সেদিন সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়। ২৮ এপ্রিল সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়। ২৯ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ নেওয়া হয়েছে। গত ৫ আগস্ট যুক্তিতর্ক শুরু হয়। উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষ হয় ১৭ আগস্ট। গতকাল রায় ঘোষণা করা হলো।ওবায়দুল কাদের, নাছিম, আরাফাত ও নিখিলের কী কী সম্পত্তি, মূল্য কত
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের নেতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি স্থাপন ও বঙ্গবন্ধুর ছবি সরিয়ে ফেলার ঘটনায় নিন্দা, ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক। একই সঙ্গে ঐতিহাসিক নথি সরিয়ে ফেলা ও ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ তুলে এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তির দাবি জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের এই প্ল্যাটফর্ম। মঙ্গলবার এক বিজ্ঞপ্তিতে শিক্ষক নেটওয়ার্ক এসব দাবি জানায়।সংস্কারের পর গত রোববার ডাকসু সংগ্রহশালাটি আবার চালু করা হয়। সংগ্রহশালায় নতুন করে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর তিনটি ছবি রাখা হয়। এর মধ্যে একটি ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) দেওয়া জিন্নাহর সেই ভাষণের ছবি, যেখানে তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘কেবল উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’। এ ছাড়া ১৯৪০ সালের মার্চে লাহোরে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের বার্ষিক সম্মেলনের একটি দলীয় ছবি, ডন পত্রিকার একটি প্রতিবেদনের কাটিং এবং ছাত্রসংঘের সাবেক নেতা আবদুল মালেকের ছবি স্থান পায়। অন্যদিকে বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আগে থাকা একক বা ঐতিহাসিক কোনো ছবি রাখা হয়নি।জিন্নাহর ছবি ছেঁড়ার ঘটনাকে ‘মব’ উল্লেখ করে বিচার দাবি করলেন ডাকসু নেতারাশিক্ষক নেটওয়ার্কের প্রতিনিধিদল সরাসরি ডাকসু সংগ্রহশালা পরিদর্শন করে এসব পরিবর্তনের সত্যতা পেয়েছে বলে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ স্বাধীন বাংলাদেশের কোনো নাগরিক নন; বরং তিনি তৎকালীন পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলনের সূচনাপর্বে ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’ ঘোষণা দিয়ে বাঙালি জাতির স্বাধিকার ও আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের ওপর সরাসরি আঘাত হেনেছিলেন। এ ছাড়া ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী যে বর্বর গণহত্যা চালায়, সে জন্য তারা কখনোই আনুষ্ঠানিক ক্ষমা চায়নি। এমন একটি রাষ্ট্রের বিতর্কিত শাসকের ছবি যথাযথ ঐতিহাসিক তথ্য ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ইতিহাস ও সংগ্রামের স্মারকে স্থান পাওয়া বাঙালি জাতির জন্য চরম অবমাননাকর।‘ইতিহাস মুছে ফেলার অপচেষ্টা’শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ও জাতীয় মুক্তির প্রতিটি আন্দোলনের ‘প্রধানতম নেপথ্য রূপকার’ উল্লেখ করে শিক্ষক নেটওয়ার্ক বলেছে, যেকোনো রাজনৈতিক নেতৃত্বের মতোই তিনি বিতর্কের ঊর্ধ্বে নন। তবে পতিত আওয়ামী লীগ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) নেত্রী ও তাঁর কন্যা শেখ হাসিনার ওপর ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে মুক্তিযুদ্ধের আগের ইতিহাসের গুরুত্ব মুছে দিতেই এই ছবি সরানো হয়েছে। এটি কেবল অসংবেদনশীলতাই নয়, বরং ইতিহাস থেকে মূল নায়কদের মুছে ফেলার এক নিকৃষ্ট ও পরিকল্পিত অপচেষ্টা।ডাকসু সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি, আর কী যুক্ত হলো, কী বাদ গেলবিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে এবং এরপরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের স্থানীয় দোসরদের (রাজাকার ও আলবদর) চালানো নৃশংস গণহত্যা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায়। সংগ্রহশালা থেকে এসব আলোকচিত্র বা নথি সরিয়ে ফেলাকে ‘মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসবিরোধী নির্দিষ্ট উগ্র ধর্মীয় গোষ্ঠীর রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের অপচেষ্টা’ আখ্যা দিয়ে শিক্ষক নেটওয়ার্ক বলেছে, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা এটি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারে না।ডাকসুর সংগ্রহশালা থেকে জিন্নাহর ছবি ছিঁড়ে ফেললেন এক শিক্ষার্থী‘নীতিমালার তোয়াক্কা করা হয়নি’ডাকসু সংগ্রহশালাকে অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম আকর উল্লেখ করে শিক্ষক নেটওয়ার্কের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এখানে যেকোনো প্রকার পরিবর্তন, পরিবর্ধন বা সংস্কারের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পূর্বানুমতি ও সুনির্দিষ্ট নীতিমালা অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করে ছাত্র সংসদের নেতাদের খেয়ালখুশিমতো বা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মর্জিতে বা উগ্র ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে এখানে পরিবর্তনের সুযোগ নেই।এ ঘটনায় শিক্ষক নেটওয়ার্ক তিন দফা দাবি জানিয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে শিক্ষকেরা অবিলম্বে এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহি ও শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান। একই সঙ্গে সংগ্রহশালা থেকে সরিয়ে ফেলা স্মারকগুলো পুনর্বহাল এবং সেগুলোর তালিকা প্রকাশের দাবি জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের এই প্ল্যাটফর্ম।পদদলিত করতে ডাকসুর প্রবেশপথ ও সংগ্রহশালার মেঝেতে জিন্নাহ-গোলাম আযমের ছবি