জাতীয়

শাহ আবদুল করিমের ‘রাজনীতি’

News সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২৬ 0
শাহ আবদুল করিমের ‘রাজনীতি’
শাহ আবদুল করিমের ‘রাজনীতি’

বাউল শাহ আবদুল করিমকে অনেকে শুধু মরমি গীতিকার হিসেবে চেনেন। কিন্তু তাঁর গানে ও জীবনে মিশে আছে গভীর রাজনীতি—হাওরের দুঃখী মানুষের কথা, রাষ্ট্রের শোষণ আর সমাজ ভাঙনের আখ্যান। ‘দেশের দুঃখ-দুর্দশার ছবি’ আঁকতে গিয়ে করিম কীভাবে হয়ে উঠলেন সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর, এ নিয়ে লিখেছেন সহুল আহমদ

কেউ বলে শাহ আবদুল করিম কেউ বলে পাগল
যার যা ইচ্ছা তা–ই বলে, বুঝি না আসল-নকল।
                                            —কালনীর ঢেউ

বাউল শাহ আবদুল করিমের জীবন ও গানে আষ্টেপৃষ্ঠে থাকা রাজনীতির খবর তাঁর ভক্ত-মুরিদ ও বিশ্লেষকদের কল্যাণে রাষ্ট্র হয়ে করিম-চর্চায় প্রবলভাবেই প্রতিষ্ঠিত। যতীন সরকার দরদের সঙ্গে তাঁর গান ও গীতে সন্ধান করেছিলেন ‘সর্বহারার দুঃখজয়ের মন্ত্র’, বলেছিলেন, মার্ক্স-এঙ্গেলস পড়ে করিম ‘দুঃখনিরোধের পথের সন্ধান করেননি’, বরঞ্চ ‘দুঃখের ভেতরে থেকেই তিনি অবলোকন করেছেন দুঃখের সব কারণ বা হেতুসমূহকে।’ আবার তাঁর জীবনী নিয়ে আলাপগুলোয় বাংলাদেশের মূলধারার ইতিহাসচর্চার গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে করিমের সম্পর্কের দিকে জোর দেওয়া হয়েছে। কাগমারী সম্মেলনে তাঁর যোগদানের বৃত্তান্ত বারবার উঠে এসেছে গানে, আত্মস্মৃতি ও আলাপচারিতায়। ফলে রাজনীতির সঙ্গে তাঁর জীবনের সম্পৃক্ততা এবং গানের মধ্যে গণমানুষের দুঃখ–দুর্দশা তুলে ধরার রাজনীতি—দুটো আলাপই প্রতিষ্ঠিত। এ লেখাটাকেও একই কিসিমের বলে ধরে নেওয়া যায়, তবে লেখার শেষের দিকে দাবি করা হবে, আবদুল করিমের একটা বিষয় করিম-চর্চায় যথেষ্ট মনোযোগ পায়নি।

একটি ইশতেহার

বাউল করিমের ‘মন মজালে ওরে বাউলা গান’কে তাঁর পুরো বাউল–জীবনের ইশতেহার হিসেবে পাঠ করা যেতে পারে। তাঁর জনপ্রিয় এই গানের ছত্রে ছত্রে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন গান গাওয়ার উদ্দেশ্য ও টান। গানের প্রথম অংশেই গানের প্রতি তাঁর সীমাহীন টান ও তীব্র ভালোবাসা প্রকাশিত হয়: ‘অন্তরে আসিয়া যখন দিলে তুমি ইশারা/ তোমার সঙ্গ নিলাম আমি সঙ্গে নিয়া একতারা/ মন মানে না তোমায় ছাড়া/ তোমাতে সঁপেছি প্রাণ।’ গানে গানে সুরে সুরে মনের কথা প্রকাশ করাই তাঁর কাছে রাত-দিনের সাধনার বিষয়: ‘কী করে পাব তোমারে তাই ভাবি দিনরজনী/ মনের কথা প্রকাশ করি কথায় দিয়ে রাগিণী।’

কিন্তু এই ‘এশকে দিলদরিয়ার পানি’ কোন দিকে বয়ে যায়? গানে সুরে তিনি তাঁর মনের কোন কথাটা প্রকাশ করতে চান? এই গানের শেষাংশেই তিনি এই সওয়ালের মোক্ষম জবাব দিয়েছেন। নিজেকে মরমি কবিদের থেকে পৃথক করে বলেন, মরমিরা তত্ত্বগান গেয়ে থাকেন। বাউল করিমেরও অসংখ্য গান যে মরমি তত্ত্বগানের চৌহদ্দিতেই থাকবে এর স্বীকৃতি খোদ প্রখ্যাত সুধীর চক্রবর্তীর জবানেই পাওয়া যায়: ‘অখণ্ড বাংলার লোকায়ত সাধনার একজন মরমি গীতিকার রূপে শাহ আবদুল করিমের একটি স্থায়ী আসন…আমাদের পাততেই হবে।’ আরেকজন সংগীত বিশ্লেষক আবদুল করিমকে যেভাবে ‘সীমার মাঝে অসীমের সন্ধান, দেহ থেকে দেহাতীতে, রূপ থেকে অরূপে যাওয়ার সাধনায় নিমগ্ন’ বলে চিহ্নিত করেছেন, তাতেও এই মরমি পরিচয়টাই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

শাহ আবদুল করিমের প্রচুর গানে একটা অতীতের চেহারা পাওয়া যায়, সেখানে ‘সেই সময়/জমানা’ বনাম ‘এই সময়/জমানা’–এর মধ্যকার তুলনামূলক আলাপ বিধৃত থাকে। আমাদের প্রজন্মের কাছে সম্ভবত তাঁর সবচেয়ে জনপ্রিয় গান ‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম’। গানটা এই ঘরানার একেবারে ধ্রুপদি নজির হিসেবে পাঠ করা যেতে পারে।

কিন্তু আবদুল করিম কোনো রাখঢাক না রেখেই বলেন, মরমি কবিরা যেখানে তত্ত্বগান গেয়ে থাকেন, সেখানে তাঁর কাজ দেশের দুঃখ–দুর্দশার ছবি এবং বিপন্ন মানুষের দাবি তুলে ধরা। তাঁর গান, আত্মস্মৃতি ও প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে হাওর অঞ্চলের মানুষের দুঃখ–দুর্দশার কথা বারবার নানাভাবে উঠে আসে। হাওরাঞ্চলের মানুষের দারিদ্র্য, প্রকৃতির বিরুদ্ধে নিত্য সংগ্রাম, দুর্দশাগ্রস্ত জীবনযাপন তুলে ধরে এসব থেকে তাঁর জনপদকে মুক্ত করাই যেন তাঁর আশা-আকাঙ্ক্ষা-স্বপ্ন-সাধনা।

১৯৯৭ সালে এক সাক্ষাৎকারে তাঁকে বলতে শোনা যায়, ‘আপনারা আমার গাঁয়ে এসেছেন, দেখে যান এখানে, এই বিশাল ভাটি অঞ্চলজুড়ে মানুষগুলো কী অপরিসীম দুঃখ-দুর্দশা নিয়ে বাস করে। যখন মাঝে মাঝে শহরে যাই, স্তম্ভিত হয়ে এই ব্যবধান লক্ষ করি। লোকে কয়, আমি নিরন্ন দুস্থ মানুষের কবি, আমি আসলে তাক ধরে দুস্থদের জন্য কিছু লিখিনি। আমি শুধু নিজের কথা বলে যাই, ভাটি অঞ্চলের একজন বঞ্চিত নিঃস্ব দুঃখী মানুষ আমি, আমার কথা সব হাভাতে মানুষের কথা হয়ে যায়। … দ্যাখেন তো এই অঞ্চল ঘুরে মানুষের আয়ের কোনো উৎস আছে কি না।’

সাক্ষাৎকারগ্রহীতা উল্লেখ করেছিলেন, এই কথাগুলো বলার সময় ‘করিম শাহ ক্রমে উত্তেজিত এবং চোখ দুটো আর্দ্র হয়ে উঠছে’.../ ‘করিম শাহর চোখে অশ্রুধারা’ পড়ছিল। তাঁর মতে, ‘মানুষই যদি না থাকে তাহলে দেহসাধনা করবে কে?’ তাই তিনি ‘সুযোগ পেলেই মানুষের দুঃখ-দুর্দশার কথা তুলে’ ধরেন। যে ‘বাউলা’ গানে তাঁর মন মজেছে, সেখানে আসলে তিনি এই ছবি তুলে ধরে শান্তিবিধান চান: ‘আমি তুলে ধরি দেশের দুঃখ-দুর্দশার ছবি/ বিপন্ন মানুষের দাবি—/ করিম চায় শান্তিবিধান…’।

করিমের এই গান প্রচণ্ড রাজনৈতিক, যেমন করে তাঁর এই ‘সিদ্ধান্ত’ও রাজনৈতিক।

‘সময়’–এর চেহারা

শাহ আবদুল করিমের প্রচুর গানে একটা অতীতের চেহারা পাওয়া যায়, সেখানে ‘সেই সময়/জমানা’ বনাম ‘এই সময়/জমানা’–এর মধ্যকার তুলনামূলক আলাপ বিধৃত থাকে। আমাদের প্রজন্মের কাছে সম্ভবত তাঁর সবচেয়ে জনপ্রিয় গান ‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম’। গানটা এই ঘরানার একেবারে ধ্রুপদি নজির হিসেবে পাঠ করা যেতে পারে। পুরো গানটাই আদতে অতীতের স্মৃতিচারণা; ফেলে আসা দিনগুলোতে কী করতেন, কেমন উদ্‌যাপনযোগ্য ছিল সমাজ, তারই চিত্র এঁকেছেন। স্মৃতিচারণার পর একেবারে শেষে বলেছেন, ‘করি ভাবনা সেদিন আর পাব না/ ছিল বাসনা সুখী হইতাম/ দিন হতে দিন আসে যে কঠিন/ করিম দীনহীন কোন পথে যাইতাম’।

“মন” বলতে আমরা যে জিনিসটাকে বোঝাই, সেটার চিহ্নমাত্রও থাকল না আর। তা ছাড়া সবচেয়ে আক্ষেপ লাগে যখন দেখি যে এই বিজ্ঞান বা যন্ত্রসভ্যতার ফল ভোগ করছে কয়েকজন হাতে গোনা কোটিপতি। এই যন্ত্রসভ্যতা ফলত ধনী-গরিবের মধ্যকার বৈষম্যকে আকাশ-পাতাল পর্যায়ে উন্নীত করেছে।

আরেক গানে তিনি আরও স্পষ্ট করে বলেন, ‘অতীত বর্তমানে কি আর মিল আছে?/ নিঃস্বার্থ ভালোবাসা নাই ঘুরছে সব স্বার্থের পাছে’। তাঁর এই ঘরানার সব গানেই ‘যায় দিন ভালো’র সুর আছে। এই সুরের মধ্যে বর্তমান নিয়ে হতাশা লেপটে থাকে; হতাশাগ্রস্ত বর্তমান নিয়ে আক্ষেপেরও বহিঃপ্রকাশ এই মনোভাব।

বিভিন্ন গানে ‘সেদিন/সেই সময়/সেই জমানা’র বা অতীতের যে চেহারা বাউল শাহ আবদুল করিম দেখান, সেখানে একটা জীবন্ত ‘সমাজ’–এর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়, বা বলা যায় তিনি এর সন্ধান আমাদের সামনে হাজির করতে চান, কিন্তু সেই সমাজ এখন গরহাজির। সেই সমাজের নানা সাংস্কৃতিক ইশারাও গানে লেপটে থাকে। তাহলে বর্তমানে কী আছে? এই সময় বা বর্তমানে আদতে সেই ‘সমাজ’ বিলীন হয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন আত্মস্মৃতিমূলক গানে তিনি এর কারণ ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, এই সমাজে ‘মামলা-মোকদ্দমা’, ‘নির্বাচন’ ইত্যাদিসহ আধুনিক রাষ্ট্রের শুঁড় ও সরঞ্জাম প্রবেশ করেছে। এগুলো তাঁর ফেলে আসা সমাজজীবন ধ্বংস করেছে, মানুষে মানুষে হিংসা-দ্বেষ বৃদ্ধি করেছে।

ইতিহাসবিদ ই পি টমসন বলেছিলেন, সম্ভবত পরিসংখ্যানের গড় আর মানুষের অভিজ্ঞতা প্রায়ই উল্টো পথে হাঁটে। ‘সেই সময়ে’ কি সংকট ছিল না? অভাব-অনটন ছিল না? ‘সেই সময়’ থেকে কি ‘এই সময়ে’ মানুষের আয়–রোজগার বৃদ্ধি পায়নি? করিমের এলাকায় কি আগের চেয়ে রাস্তাঘাট ভালো হয়নি? নগরায়ণ ও শহরায়ণের ছোঁয়া লাগেনি? তবু করিম আমাদের আরেক অভিজ্ঞতা ও স্মৃতির কথা শোনান। টমসনকে স্মরণ করে বলা যায়, মানুষের মাথাপিছু সম্পদের পরিমাণ যেভাবে বাড়ে, একইভাবে তো তাদের জীবনযাপনে অস্থিরতা, অশান্তি, হতাশাও বৃদ্ধি পেতে থাকে। সেই সামাজিক জীবন ভেঙে যাওয়ার উপক্রমে জনজীবনে যে অস্থিরতা ও হতাশা ‘অতীত’ সম্পর্কে স্মৃতি রোমন্থনের জন্ম দেয়, তারই প্রতিচ্ছবির দেখা মেলে করিমের গানে।

শাহ আবদুল করিমের এই ‘অতীতমুখিনতা’ নিয়ে তাঁকে সওয়াল করা হয়েছিল। তিনি কি তবে বর্তমান থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন, বা নিচ্ছেন? করিমের জবাবে আমরা এই উন্নয়নের বিপরীতে হাঁটা মানুষের অভিজ্ঞতা পাই: ‘বর্তমান আমার কাছে গৌণ কোনো বিষয় নয়। আমার চোখের সামনে এই পরিবেশ-পরিপার্শ্ব আমূল বদলে গেছে। নগরায়ণ ও যন্ত্রসভ্যতার বিকাশ মানুষের জীবনযাত্রার মানকে পরিবর্তন করেছে। আমি একে খারাপ চোখে দেখি না। কিন্তু আমার কান্না পায়, ভেতরে তীব্র হাহাকার অনুভব করি, যখন দেখি যে চোখের সামনে অবিকল যন্ত্র হয়ে উঠল মানুষগুলো। “মন” বলতে আমরা যে জিনিসটাকে বোঝাই, সেটার চিহ্নমাত্রও থাকল না আর। তা ছাড়া সবচেয়ে আক্ষেপ লাগে যখন দেখি যে এই বিজ্ঞান বা যন্ত্রসভ্যতার ফল ভোগ করছে কয়েকজন হাতে গোনা কোটিপতি। এই যন্ত্রসভ্যতা ফলত ধনী-গরিবের মধ্যকার বৈষম্যকে আকাশ-পাতাল পর্যায়ে উন্নীত করেছে।’

তাঁর মতে, এখানে নির্বাচনব্যবস্থাটাই এমন হয়ে গেছে যে এর উসিলায় এক গ্রামের মানুষ পাঁচ দলে বিভক্ত হয়ে দলাদলি, মারামারি, মামলা-মোকদ্দমা করে। প্রতি নির্বাচনের মৌসুম ‘স্ফুলিঙ্গ থেকে দাবানল’ তৈরি করে এবং নির্বাচনের পর ধীরে ধীরে তা স্তিমিত হয়, কিন্তু তিন-চার বছর পর আবার শুরু হয়।

শাহ আবদুল করিম অতীতে মানুষের ‘মন’–এর অনুসন্ধান করেন, যা তাঁর মতে, নগরায়ণের ফলে ‘যন্ত্রে’ রূপান্তরিত হয়েছে। অতীতের সামাজিক উদ্‌যাপনের সঙ্গে ‘যন্ত্র’-এর প্রবল বৈপরীত্য। ধনী–গরিবের বৈষম্যের কারণেই নগরায়ণ ও বিজ্ঞানের সুফল গুটিকয় লোক ছাড়া আর কেউ পাচ্ছে না।

সবাই প্রতিযোগিতায় নেমেছে, সবাই সবাইকে শত্রু ভাবছে। প্রতিযোগী ‘মন’-এর কি আর ‘যন্ত্র’ না হয়ে উপায় থাকে? কিন্তু বাউল তো এটা চান না। তিনি অতীত রোমন্থন করতে পারেন, কিন্তু হতাশ নন। তিনি বারবার গানে–গীতে বিপ্লবের কথা বলেন, পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেন।

রাষ্ট্রের অন্দর

মোটাদাগে রাজনৈতিকতার দুটি পরিসর থাকে। একটি হচ্ছে যেখানে নাগরিক তার দাবিদাওয়া নানা অপ্রাতিষ্ঠানিক কায়দায় তুলে ধরে; আরেকটি হচ্ছে, যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক আদব–লেহাজে রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের ক্ষমতাসম্পর্কের বিবিধ সুরত নিয়ে বাতচিত করে। আবদুল করিমের রাজনীতি নিয়ে এতক্ষণ যা আলাপ হয়েছে, তা আসলে প্রথমাংশের বিষয়। এবং সাধারণত তাঁর গানে যে রাজনীতির অনুসন্ধান করা হয়েছে, সেটা আসলে এই জায়গা থেকেই: তিনি কীভাবে সাধারণ মানুষের দুঃখ–দুর্দশার কথা বলেছেন। কিন্তু তাঁর গানে এর পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় পরিসর বিষয়ে যে আলাপ পাওয়া যায়, তা নিয়ে খুব একটা আলোচনা এখনো হয়নি।

১৯৯৮ সালে প্রকাশিত শাহ আবদুল করিমের ভাটির চিঠি এই দিক থেকে এক অনন্য সৃষ্টি। এখানে তিনি ভাটি অঞ্চলের জীবনযাপন তুলে ধরার পাশাপাশি নিজেদের প্রাত্যহিক জীবনের অভিজ্ঞতায় এই আধুনিক ‘রাষ্ট্র’ ও এর কলকবজার জটিলতা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছেন। হাওর অঞ্চলের জীবনযাপন থেকে গল্প শুরু করে ধারাবাহিকভাবে সেটা নিয়ে গেছেন রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সমস্যা চিহ্নিতকরণের দিকে এবং তাতে যে ইশারা দিয়েছেন, সেটা এখনো আমাদের রাজনৈতিক মহল মানতে নারাজ।

যেমন, ধরা যাক নির্বাচনের কথা। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ‘নির্বাচন’ তো একেবারে প্রধান ফটক বা ন্যূনতম। কিন্তু আমাদের এখানে নির্বাচনব্যবস্থা যে রূপ ধারণ করেছে, সেটার মধ্যেই যে সহিংসতার আঁচ লেপটে আছে, তা আবদুল করিমের নজর এড়ায়নি। তাঁর মতে, এখানে নির্বাচনব্যবস্থাটাই এমন হয়ে গেছে যে এর উসিলায় এক গ্রামের মানুষ পাঁচ দলে বিভক্ত হয়ে দলাদলি, মারামারি, মামলা-মোকদ্দমা করে। প্রতি নির্বাচনের মৌসুম ‘স্ফুলিঙ্গ থেকে দাবানল’ তৈরি করে এবং নির্বাচনের পর ধীরে ধীরে তা স্তিমিত হয়, কিন্তু তিন-চার বছর পর আবার শুরু হয়। এই ব্যবস্থা মানুষের মধ্যে অবিশ্বাস বাড়ানোর ও ভালোবাসা-সম্প্রীতি কমানোর হাতিয়ার হয়ে উঠেছে বলে তিনি মনে করেন। বাংলাদেশের নির্বাচনকেন্দ্রিক গণতান্ত্রিক রাজনীতি যে পথ হারাবে, সহিংসতার জন্ম দেবে, তার পূর্বাভাস যেন তিনি দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার মাধ্যমেই পেয়েছিলেন।

চমস্কি যা বলার চেষ্টা করেছিলেন, আবদুল করিমের জবানিতেও আমরা তা শুনি: ‘নিরপেক্ষ থাকে যারা সাধারণ মানুষ/ চারদিকের তাড়নায় হয়ে যায় বেহুঁশ।’ এই বেহুঁশ ও বেহাল নাগরিকদের জন্য আবদুল করিমের গান ও গীতিকবিতা কিছুটা হলেও পথ দেখাতে পারে।

কিন্তু আবদুল করিম এখানেই তাঁর আলাপ শেষ করেননি। তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন শাসনতান্ত্রিক কাঠামো নিয়েই। যেখানে নির্বাচন এলে ‘ভালো মানুষ’ বা ‘সৎ লোকের’ শাসন নিয়ে আলাপের জোয়ার বয়ে যায়, সেখানে আবদুল করিমের রায় হচ্ছে, এই শাসনকাঠামোতে ভালো লোক (বা পড়তে পারেন, সৎ লোক) গেলেও আখেরে কোনো লাভ হবে না। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও রাজনীতিবিশারদেরা যা তত্ত্বকথায় বিগত দশক যাবৎ বলার চেষ্টা করে যাচ্ছেন, করিম সেটা বলছেন তাঁর মতো করে:

শোষকের শাসনতন্ত্র বহাল থাকিলে।
কী হবে পার্লামেন্টে ভালো লোক দিলে।।
শোষকের তৈরি শাসনকাঠামো যে তার।
কৃষক-মজুর শোষণের হাতিয়ার।।
কাল যা ছিল আজো আছে ভেবে দেখ তাই।
এই তন্ত্রে শোষিতের পক্ষে কিছুই লেখা নাই।

এরপর তিনি বলার চেষ্টা করেছেন, যতক্ষণ পর্যন্ত না শাসনকাঠামো গণমুখী করা যাবে, ততক্ষণ আমাদের ভাগ্য পাল্টাবে না। তিনি যখন বলেন, ‘চারদিকে টাকার জয়, গরিবের মরণ/ চলেছে আমলাতান্ত্রিক নির্মম শোষণ’, তখন কোর্ট-কাছারি, আদালত, আমলাতন্ত্র থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গকে গণমুখী করার বাসনাই পরিষ্কার হয়।

এ লেখায় আদতে আবদুল করিমের তিনটি গানকে কেন্দ্র করে তাঁর রাজনৈতিক অভিমুখ ধরার চেষ্টা করেছি। এবার ইতি টানা যেতে পারে। একবার নোম চমস্কিকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, ‘আপনি তো এত সুন্দর সুন্দর বিষয়ে কথা বলেন, সাধারণ মানুষ এগুলো শোনে না কেন?’ চমস্কি তখন অনেকটা এভাবে উত্তর দিয়েছিলেন, এই নিওলিবারেল জমানা মানুষকে তো পেরেশানির মধ্যে ফেলে রেখেছে, যাকে টেবিলে খাবার জোগাড় করতেই সপ্তাহে ৫০ ঘণ্টা করে কাজ করতে হয়; যদি আজকে অসুস্থ হই, আগামী মাসের বাসাভাড়া কীভাবে জোগাড় করা হবে, এই ভাবনাতেই উদ্বিগ্ন থাকতে হয়, অথবা বাচ্চাটাকে অসুস্থ রেখে কাজে গেলে বাচ্চাটার কী হবে, এমন হাজারো দুশ্চিন্তায় আমজনতা যখন বেহাল হয়ে থাকে, তখন তারা ওই ভাবনার সময় কোথায় পাবে? তারা কখন ভাববে, আমি এটা হব, ওটা হতে চাই? এই পরিকল্পিত শৃঙ্খলিত বাসিন্দাদের সেই চিন্তা করার মতো সময় থাকে না। চমস্কি যা বলার চেষ্টা করেছিলেন, আবদুল করিমের জবানিতেও আমরা তা শুনি: ‘নিরপেক্ষ থাকে যারা সাধারণ মানুষ/ চারদিকের তাড়নায় হয়ে যায় বেহুঁশ।’

এই বেহুঁশ ও বেহাল নাগরিকদের জন্য আবদুল করিমের গান ও গীতিকবিতা কিছুটা হলেও পথ দেখাতে পারে।

  • লেখায় ব্যবহৃত গান ও সাক্ষাৎকারের হদিস: শুভেন্দু ইমাম (সংকলন ও সম্পাদনা), শাহ আবদুল করিম রচনাসমগ্র, বইপত্র, ২০১৩

  • সহুল আহমদ: লেখক ও গবেষক

Popular post
কাজীরহাটে বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও ভূমি দখলের অভিযোগ

শরীয়তপুরের কাজীরহাট এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মাস্টার মোস্তফা কাজীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, প্রভাব খাটানো ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হন মোস্তফা কাজী। এরপর থেকে এলাকায় বিভিন্ন জমি দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৬ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে কাজীরহাট বাজারের দোকানপ্রতি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা কাজী। এছাড়া কয়েক মাস আগে কাজীরহাটে একটি দোকান ক্রয়ের সময় ব্যবসায়ী সুমন তপাদারের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী আরও জানান, বি. কে. নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলামের কাছ থেকেও ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন মানুষকে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় ফেলে হয়রানি করার অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন মোস্তফা কাজী। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির ব্যানারে তার কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন অনেকে। এছাড়া বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি নিজ ভগ্নিপতি সিদ্দিক দেওয়ানের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোস্তফা কাজীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সচেতন মহল বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

ইউক্রেন যুদ্ধের মাঝে শান্তি আলোচনা জোরালো করতে ইউরোপীয় নেতাদের বৈঠক

ইউরোপের রাজধানী ব্রাসেলসে আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা জোরালো করা। এই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত আছেন। গত বছরের শুরু থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের কারণে সারা ইউরোপ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ইউরোপীয় নেতারা এখন যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরিতে কাজ করছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, “আমরা যুদ্ধের মানবিক সংকট বুঝতে পারি এবং এখন আমাদের দায়িত্ব এটি দ্রুত শেষ করার পথ খোঁজা। আমাদের প্রত্যেকের জন্যই শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।” এই বৈঠকে অস্ত্রবিরতি চুক্তি, যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলো যুদ্ধ সমাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এগুলো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলছে পরীক্ষার চাপ ও সামাজিক প্রত্যাশা

দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ক্রমবর্ধমান পরীক্ষার চাপ এবং পরিবারের পাশাপাশি সমাজের অযৌক্তিক প্রত্যাশা। এ দুটি কারণ মিলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বেড়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা।   ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করা যেন শিক্ষার্থীর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ—সব জায়গা থেকেই উচ্চ ফলাফলের প্রত্যাশা তৈরি করছে মানসিক চাপের একটি অব্যক্ত বলয়। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইহান কবির বলেন, “পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে মনে হয়, শুধু আমি না, আমার পুরো পরিবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এটা সহ্য করা খুব কঠিন।” শুধু রাইহান নয়, দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা একই অভিজ্ঞতার কথা বলছে।   সামাজিক চাপ ও তুলনার সংস্কৃতি পরিস্থিতি করছে আরও জটিল পরীক্ষার নম্বর নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এখন তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া গর্ব বা অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কোন কলেজে ভর্তি হলো, কে কতো পেল—এসব তুলনার চাপে পড়াশোনার আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা তাবাসসুম বলেন, “প্রত্যাশা থাকা ভালো, কিন্তু তা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায় এবং একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব সক্ষমতা উপেক্ষা করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়। এ থেকেই জন্ম নেয় আত্মগ্লানি, হতাশা এবং মাঝে মাঝে আত্মহননের চিন্তা।”   জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ নিয়মিত মানসিক চাপে থাকে। এর মধ্যে ১২ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগে এবং বড় একটি অংশ কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই দিন পার করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে ক্ষতিকর।   সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, এবং পরিবারের ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ এই সমস্যার নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম হয়, সেখানে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাকে কেবল ফলাফলের সীমায় না এনে একটি মানবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা চাপ নয়, ভালোবাসা থেকে শিখবে, এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ প্রজন্ম।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ফসলের উৎপাদন হুমকিতে, কৃষকদের দুশ্চিন্তা বেড়েছে

বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কৃষিখাতকে চরমভাবে আঘাত করছে। অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘদিন খরা এবং হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ফসল উৎপাদনে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে।   চলতি মৌসুমেই অনেক জেলায় ধান, গম, ভুট্টা এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, একদিকে যেমন আবহাওয়ার আচরণ বুঝে ওঠা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সারের দাম, কীটনাশক ও বীজের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পোকার আক্রমণ ও রোগবালাইয়ের হারও বেড়ে গেছে। এই চাপে পড়ে অনেক কৃষকই ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।   জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা। তাদের পক্ষে বারবার ক্ষতির ধাক্কা সামলে উঠে আবার নতুনভাবে চাষাবাদ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো অঞ্চলে দেখা গেছে, কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী ফসল বাদ দিয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ ও লাভজনক অন্য চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমানেও প্রভাব ফেলতে পারে।   বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। একইসঙ্গে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে এমন জাত ও পদ্ধতি উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে যা কঠিন জলবায়ু পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে।   দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কৃষি খাতকে সচল রাখা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে এখনই পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।

ব্যাটিং বিপর্যয়ে দিন শুরু, লড়াইয়ে ফিরতে মরিয়া টাইগাররা

কলম্বোর সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাব ময়দানে চলমান দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে ব্যাট হাতে আবারও ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের। টস জিতে ব্যাট করতে নেমে প্রথম ইনিংসে টাইগাররা সংগ্রহ করে মাত্র ২২০ রান, যেখানে ব্যতিক্রম ছিলেন কেবল শোয়াড ইসলাম (৪৬), মুশফিকুর রহিম (৩৫) ও লিটন দাস (৩৪)। শ্রীলঙ্কার বোলাররা শুরু থেকেই চাপ সৃষ্টি করে রাখে। ডেবিউ করা স্পিনার সোনাল দিনুষা ৩ উইকেট নিয়ে আলো ছড়ান, আর আসিথা ফার্নান্দো ও বিষ্ণু ফার্নান্দো নেন ২টি করে উইকেট। প্রথম ইনিংসের জবাবে দ্বিতীয় দিন সকালে শ্রীলঙ্কা উদ্বোধনী জুটি থেকে ভালো সূচনা পায়। ১৩.১ ওভারে কোন উইকেট না হারিয়ে সংগ্রহ করেছে ৬২ রান। ওপেনার পাথুম নিসান্কা ৩৩ এবং লাহিরু উদারা ২৮ রানে অপরাজিত রয়েছেন। বাংলাদেশের হয়ে তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ বোলিং শুরু করলেও এখনও পর্যন্ত সাফল্যের দেখা মেলেনি। শ্রীলঙ্কা এখনো বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস থেকে ১৫৮ রানে পিছিয়ে আছে, হাতে রয়েছে সকল উইকেট। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে প্রভাব এই টেস্টটি ২০২৩-২৫ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ হওয়ায় দুই দলের জন্যই পয়েন্টের লড়াই গুরুত্বপূর্ণ। সিরিজের প্রথম টেস্টে পরাজিত হওয়ায় বাংলাদেশ সিরিজে টিকে থাকতে হলে এই ম্যাচ জিততেই হবে। পরবর্তী চ্যালেঞ্জ স্লো পিচে বাংলাদেশ বোলারদের আরও পরিকল্পিত বোলিং করতে হবে। দ্রুত উইকেট তুলে না নিতে পারলে শ্রীলঙ্কা বড় লিড নিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে দেবে টাইগারদের। ফিল্ডিংয়ে মনোযোগ এবং টাইট বোলিংয়ের মাধ্যমেই দ্বিতীয় ইনিংসে নিজেদের ফিরে পাওয়ার আশায় বাংলাদেশ। সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড (দিন ২, প্রথম সেশন পর্যন্ত): বাংলাদেশ (১ম ইনিংস): ২২০/১০ শ্রীলঙ্কা (১ম ইনিংস): ৬২/০ (১৩.১ ওভার) নিসান্কা: ৩৩*, উদারা: ২৮* বাংলাদেশ বোলার: তাইজুল, মিরাজ – উইকেটহীন

জাতীয়

View more
শিয়ান: এক দিনে হাজার বছর
শিয়ান: এক দিনে হাজার বছর

এই শহরে অতীতকে জাদুঘর নয়, দেখা যায় নানাভাবে। এ শহর নিজেই গল্পকথক। বলে চলে এক রাজার গল্প। এক সাম্রাজ্যের গল্প। এক সভ্যতার গল্প। আর সারা বিশ্ব সেটাই শোনে সবিস্ময়ে।রাত গভীর। রাজপ্রাসাদের চারপাশে নিস্তব্ধতা। দূরে কোথাও প্রহরীর পায়ের শব্দ। বিশাল কক্ষের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন চীনের প্রথম সম্রাট কিন শি হুয়াং। পাশে তাঁর রানি। সম্রাটের কাঁধে আলতোভাবে হাত ছুঁয়ে রানি জানতে চাইলেন— —ঘুম আসছে না, সম্রাট? —ভাবছি, আমি চলে গেলে আমার সাম্রাজ্যের কী হবে। —সাম্রাজ্য কি কখনো চিরকাল থাকে? —সাম্রাজ্য হয়তো থাকবে না। কিন্তু আমি থাকব। —কীভাবে! —আমার সেনাবাহিনী থাকবে আমার সাথে। —মৃত্যুর পর! —হ্যাঁ। আমার সৈন্য থাকবে। হাজার হাজার সৈন্য। ঘোড়া থাকবে, রথ থাকবে, অস্ত্র থাকবে। ওরা মৃত্যুর পরও আমাকে পাহারা দেবে। —আর যদি কেউ ওদের অস্তিত্ব জানতে পারে? —তাহলে ওরা জানবে একদিন এক সম্রাট ছিল, যে মৃত্যুকেও সাম্রাজ্যের শেষ বলে মানেনি।ইতিহাসে এমন কোনো কথোপকথনের উল্লেখ নেই। তবু কয়েক হাজার বছর পর শিয়ানের মাটির নিচে দাঁড়িয়ে থাকা টেরাকোটা আর্মির দিকে তাকিয়ে মনে হলো, সম্রাটের এই কথোপকথন হয়তো সময়ের ভেতর কোথাও জমে আছে। ওই রাতে সম্রাট হয়তো জানতেন না একদিন তাঁর সাম্রাজ্য থাকবে না, প্রাসাদ থাকবে না; কিন্তু তাঁর মাটির সৈন্যরা পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে মানুষকে টেনে আনবে তাঁর হারিয়ে যাওয়া রাজধানী চাংআনে। ওই একই টানে আমারও আগমন চীনের শিয়ানে।এভাবে আজও আছে কিন শি হুয়াং আর্মিরাটেরাকোটা আর্মি এক অপার বিস্ময়এই শহরে অতীতকে শুধু জাদুঘরের কাচের ভেতর দেখতে হয় না; হাঁটতে হাঁটতে, খেতে খেতে, ঘণ্টাধ্বনি শুনতে শুনতে তাকে অনুভব করা যায়। বহু রাজবংশের রাজধানী ছিল এই শহর। বিশেষ করে হান ও তাং আমলে চাংআন ছিল চীনা সভ্যতার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র এবং সিল্ক রোডের পূর্ব প্রান্তের এক গুরুত্বপূর্ণ নগর।বিশাল হলঘরে প্রবেশমাত্রই চোখে পড়ে মাটিরঙা এক বিস্তৃত সমুদ্র। একটু পর বোঝা যায় ওগুলো সৈন্য। সারি সারি সৈন্য। হাজার হাজার। কারও হাতে অস্ত্র, কেউ অশ্বারোহী, কোথাও রথের অবশিষ্টাংশ। ওরা যেন সামনে তাকিয়ে আছে যুদ্ধের নির্দেশের অপেক্ষায়। কারও মুখে কঠোরতা, কারও মুখে অদ্ভুত স্থিরতা। আশ্চর্যের বিষয়, এত সৈন্যের মধ্যে প্রায় প্রত্যেকের মুখের গড়ন আলাদা।এত বছর ধরে থেকে গেছে মাটির নিচেটেরাকোটা আর্মির একাংশখ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকে কিন শি হুয়াং চীনের বিচ্ছিন্ন রাজ্যগুলোকে একত্র করে প্রথম ঐক্যবদ্ধ সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর মৃত্যুর পরও যেন সাম্রাজ্যের নিরাপত্তা অক্ষুণ্ন থাকে, এই বিশ্বাস থেকেই তাঁর সম্ভাব্য সমাধিস্থলকে ঘিরে তৈরি হয়েছিল বিশাল এক ভূগর্ভস্থ জগৎ। টেরাকোটা আর্মি ছিল ওই জগতের সামরিক বাহিনী।অথচ এই বাহিনী যে একদিন আবার পৃথিবীর আলো দেখবে, তা হয়তো কেউ ভাবেনি। ভূগর্ভস্থ এত বড় একটি সেনাবাহিনী কয়েক শতাব্দী নয়, দুই হাজার বছর ধরে চাপা পড়ে ছিল। ১৯৭৪ সালে স্থানীয় কৃষকেরা কূপ খনন করতে গিয়ে মাটির নিচে একটি টেরাকোটা মাথা খুঁজে পান। সেই একটি মাথা ভাঙিয়ে দিল সৈন্যদের হাজার বছরের ঘুম। সৈন্যগুলোর দিকে তাকিয়ে মনে হলো রানি যদি আজ এখানে আসতেন, তিনি হয়তো একটু হেসেই সম্রাটকে বলতেন, ‘দেখেছ? তোমার স্বপ্ন সত্যি হয়েছে। তোমার সৈন্যরা সত্যিই রয়ে গেছে।’রাজা, রাজ্যপাট নেই বটে, তবু আছে তার প্রহরীরাআজ সম্রাট নেই। সাম্রাজ্য নেই। সেই পৃথিবীও নেই। শুধু সময়ের পাহারায় দাঁড়িয়ে আছে সম্রাটের মাটির সেনাবাহিনী। সম্রাট হয়তো মৃত্যুর পরে তাঁর সাম্রাজ্যকে সঙ্গে নিতে পারেননি। কিন্তু তাঁর মাটির সৈন্যরা তাঁকে বাঁচিয়ে রেখেছে। তাঁর তৈরি সৈন্যদের সামনে দাঁড়িয়ে আমরা এখনো তাঁকে নিয়ে গল্প করি। এটাই তো অমরত্ব!কোলাহলে মুখর প্রাঙ্গণে টেরাকোটা আর্মির নীরবতা পেছনে ফেলে শহরে ফিরতেই দেখি শিয়ানের অন্য রূপ। চারপাশ ব্যস্ত। গাড়ি ছুটছে, মানুষ হাঁটছে, দোকানপাটে আলো জ্বলছে। এই আধুনিক কোলাহলের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে কয়েক শতাব্দী পুরোনো স্থাপনা; বেল টাওয়ার।মিং রাজবংশের সময় ১৩৮৪ সালে নির্মিত বেল টাওয়ারমিং রাজবংশের সময় ১৩৮৪ সালে নির্মিত বেল টাওয়ার প্রথমে অন্য জায়গায় ছিল। পরে ১৫৮২ সালে বর্তমান অবস্থানে সরিয়ে আনা হয়। একসময় এটি শহরের দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। ভোরে বেল টাওয়ারের ঘণ্টা শুনে হতো দিনের শুরু, আর সন্ধ্যায় ড্রাম টাওয়ারের ঢাক ঘোষণা করত দিনের সমাপ্তি। এখন ওই দায়িত্ব ঘড়ি আর মুঠোফোনের। এই স্থাপনা এখন সময় জানায় না, বরং সময়কে মনে করিয়ে দেয়।এই স্থাপনা শুরুতে অন্য জায়গায় ছিলচারপাশে বেশ ভিড়। অনেকেই চীনা ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে ছবি তুলছে। লম্বা পোশাক, সাজানো চুল, হাতে পাখা। যেন মিং বা তাং রাজবংশের কোনো চরিত্র। একদিকে প্রাচীন স্থাপত্য, অন্যদিকে ঐতিহ্যবাহী পোশাক আর ক্যামেরার ওপাশে দাঁড়িয়ে বর্তমানের একজন পথিক। একই ফ্রেমে তিনটি যুগ!বিকেলের শেষ আলোয় উঠে পড়লাম শিয়ানের প্রাচীন নগরপ্রাচীরে। বর্তমান প্রাচীরটি মিং রাজবংশের আমলে নির্মিত হলেও এর ভেতরে রয়েছে আরও পুরোনো তাং আমলের স্মৃতি। প্রায় ১৩ দশমিক ৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই বিশাল প্রাচীর একসময় শহরকে রক্ষা করত। এই দেয়াল দেখেছে রাজবংশের উত্থান-পতন। একসময় যার কাজ ছিল শহরকে শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করা, আজ সেই একই প্রাচীরের ওপর মানুষ হাঁটে, সাইকেল চালায়, ছবি তোলে, সূর্যাস্ত দেখে।ইতিহাসের সাক্ষী শিয়ানের এই প্রাচীন নগরপ্রাচীরসিটি ওয়ালের ইটের গায়ে জমে আছে অসংখ্য গল্পসূর্য পশ্চিমে ঢলে পড়ছে। পুরোনো ইটের গায়ে দিনের শেষ আলো। সোনালি আভায় প্রাচীরের ইটগুলো আরও পুরোনো দেখায়। এই ইটের গায়ে নিশ্চয়ই অনেক গল্প জমে আছে। সম্রাট, সৈন্য, ব্যবসায়ী, পথিক, যুদ্ধ আর শান্তির গল্প। প্রাচীরের ওপর থেকে পুরোনো ও নতুন শিয়ান পাশাপাশি দেখা যায়। নিচে আধুনিক রাস্তা, গাড়ির স্রোত, উঁচু ভবন; আর আমি দাঁড়িয়ে কয়েক শতাব্দী পুরোনো ইটের ওপর।রাত নামতেই চলে গেলাম মুসলিম কোয়ার্টারে। সরু রাস্তা। দুই পাশে অসংখ্য খাবারের দোকান। মানুষের ভিড়। দোকানের আলো। গ্রিলের ধোঁয়া। আর বাতাসে ভেসে বেড়ানো জিরা, মরিচ আর মাংসের গন্ধ। কোথাও কাঠিতে গেঁথে আগুনের ওপর সেঁকা হচ্ছে মাংস। কোথাও চওড়া ‘বিয়াং-বিয়াং’ নুডলস তৈরি হচ্ছে, কোথাও গোল রুটির ভেতর মাংসের পুর। দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে খাবারের গন্ধ নিতে নিতে মনে হয় সিল্ক রোড শুধু রেশম আর মসলা বহন করেনি; বহন করেছে মানুষের স্বাদ, ভাষা আর সংস্কৃতিও।শিয়ানের মুসলিমদের ইতিহাস বেশ পুরনোশিয়ানের মুসলিম সম্প্রদায়ের ইতিহাস সিল্ক রোডের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। তাং যুগ থেকেই মধ্য এশিয়া, পারস্য ও পশ্চিম এশিয়া থেকে ব্যবসায়ী ও ভ্রমণকারীরা চাংআনে আসতেন। তাঁদের অনেকেই এখানে বসতি গড়েন। সেই দীর্ঘ সাংস্কৃতিক বিনিময়ের জীবন্ত উত্তরাধিকার আজকের মুসলিম কোয়ার্টার। সভ্যতা কখনো একা তৈরি হয় না। মানুষ আসে। মানুষ মেশে। সংস্কৃতি বদলায়। এরপর তৈরি হয় একটি শহর। এখানে ইতিহাস হাঁটে, কথা বলে, রান্না করে, খাবারের গন্ধ ছড়ায়। এখানে ইতিহাসকে পড়তে হয় না, খেতে হয়।খাওয়া শেষে রাস্তায় বেরিয়ে দেখি, রাত আরও গভীর। কিন্তু শিয়ান ঘুমায়নি। বরং অন্য এক জীবন শুরু হয়েছে। দূরে ঝলমলে বেল টাওয়ার। চারপাশে রাতের শহর। আর কোথাও অচেনা সুরে গান। কয়েক হাজার বছরের পুরোনো এই শহর যেন নিজের বর্তমানটাকে আমার সামনে মেলে ধরেছে। ইতিহাস মৃত কোনো বিষয় নয়। সে বেঁচে থাকে। কখনো মাটির সৈন্যের চোখে। কখনো প্রাচীন ইটের গায়ে। কখনো বেল টাওয়ারের ছায়ায়। কখনো মসলার গন্ধে ভরা কোনো সরু গলিতে। আবার কখনো অচেনা সুরের কোনো গানে।ঘুমায় না শিয়ানহোস্টেলে ফেরার পথে আবার সম্রাটের কথা মনে পড়ল। তাঁর ইচ্ছা পূরণ হয়েছে। তবে তাঁর কল্পনার মতো করে নয়। তাঁর সৈন্যরা এখন আর কোনো সম্রাটকে পাহারা দেয় না। এরা দুই হাজার দুইশ বছর ধরে পাহারা দেয় একটি গল্পকে। একটি সাম্রাজ্যের গল্প। একটি সভ্যতার গল্প। আর আমাদের মতো পথিকদের মনে জমে থাকা বিস্ময়ের গল্প।আর শিয়ান? শিয়ান যেন এক অতন্দ্র প্রহরী; যে এক হাতে ধরে রেখেছে অতীত, অন্য হাতে বর্তমান। আজ আমি আসলে একটি শহর দেখিনি। আমি হেঁটেছি কয়েক হাজার বছরের ভেতর দিয়ে। এক দিনে; মাত্র এক দিনে।ছবি: লেখক

News সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২৬ 0
যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে পরিযায়ী পাখির ওড়ার জন্য আলো নিভিয়ে রাখার অনুরোধ

যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে পরিযায়ী পাখির ওড়ার জন্য আলো নিভিয়ে রাখার অনুরোধ

খাবার, গ্যাস, বিদ্যুৎ, প্রসাধনী, ঘরেই যেভাবে সব তৈরি করেন সংগীত-কাব্যা দম্পতি

খাবার, গ্যাস, বিদ্যুৎ, প্রসাধনী, ঘরেই যেভাবে সব তৈরি করেন সংগীত-কাব্যা দম্পতি

প্রিন্সেস ডায়ানার মৃত্যুর পর চার্লসকে দেখে মনে হয়েছিল, তিনি ‘লটারি’ জিতেছেন

প্রিন্সেস ডায়ানার মৃত্যুর পর চার্লসকে দেখে মনে হয়েছিল, তিনি ‘লটারি’ জিতেছেন

অভিভাবকেরা কখন একজন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের কাছে যাবেন
অভিভাবকেরা কখন একজন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের কাছে যাবেন

প্রথম আলো ট্রাস্টের একটি আয়োজন বিনা মূল্যে মাদকবিরোধী পরামর্শ সহায়তা সভা। এ আয়োজনের আওতায় ৩০ আগস্ট ২০২৬ তারিখে প্রথম আলোর কার্যালয় কারওয়ান বাজারে ১৮০ তম অনলাইন পরামর্শ সহায়তা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় উপস্থিত থেকে পরামর্শ প্রদান করেন জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ডা. জোবায়ের মিয়া। এইবারের বিষয়টি ছিল—‘সন্তানের মন বোঝার উপায়।’ অনুষ্ঠানটি সাক্ষাৎকার আকারে তুলে ধরা হলো। উক্ত অনুষ্ঠানের আলোচনা থেকে একটি পরামর্শ তুলে ধরা হলো।অভিভাবকেরা কখন বুঝবেন যে ঘরের চেষ্টার বাইরে একজন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সহায়তা প্রয়োজন?এমন প্রশ্নের উত্তরে ডা. জোবায়ের মিয়া বলেন, ‘যখন দেখা যাবে যে সব ধরনের বন্ধুত্বপূর্ণ চেষ্টা সত্ত্বেও ৬ মাস বা ১ বছর ধরে সন্তানের রেজাল্ট ক্রমাগত খারাপ হচ্ছে, আচরণে তীব্র পরিবর্তন এসেছে, বা মারাত্মক ডিভাইস আসক্তি / মাদকাসক্তির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, তখন কোনো দ্বিধা না করে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে। অভিভাবকদের বুঝতে হবে, রোগের চিকিৎসা এবং আচরণগত কাউন্সেলিং সময়মতো শুরু করলে সন্তানকে স্বাভাবিক ও সুন্দর জীবনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।’ 

News সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২৬ 0
কোম্পানির মালিকানা ছাড়া ব্যাংকের প্রতিনিধি পরিচালক হওয়া যাবে না

কোম্পানির মালিকানা ছাড়া ব্যাংকের প্রতিনিধি পরিচালক হওয়া যাবে না

মাছ ধরা, সঙ্গে দুরন্তপনা

মাছ ধরা, সঙ্গে দুরন্তপনা

বাণিজ্যমন্ত্রীর গাড়ি থামিয়ে বঞ্চনার প্রতিকার চাইলেন টিসিবির বঞ্চিত ডিলাররা

বাণিজ্যমন্ত্রীর গাড়ি থামিয়ে বঞ্চনার প্রতিকার চাইলেন টিসিবির বঞ্চিত ডিলাররা

বইয়ের পাতায় চেনা জীবন—কাফকার ‘দ্য ট্রায়াল’
বইয়ের পাতায় চেনা জীবন—কাফকার ‘দ্য ট্রায়াল’

এক ছুটির বিকেলে অনলাইনে পডকাস্ট শুনতে শুনতে হুট করেই বিশ্বসাহিত্যের বিখ্যাত লেখক ফ্রানৎস কাফকার কালজয়ী উপন্যাস ‘দ্য ট্রায়াল’-এর সঙ্গে পরিচয়। ভেবেছিলাম শতবর্ষ পুরোনো কোনো সাধারণ সাহিত্যের গল্প শুনব। কিন্তু গল্পটি যত সামনে গড়িয়েছে, তত বেশি স্তব্ধ হয়ে গিয়েছি। মনে হয়েছে, এটি কেবল শত বছর আগের কোনো কাল্পনিক চরিত্রের গল্প নয়; বরং আজকের ব্যস্ত করপোরেট জীবন ও জটিল ব্যবস্থার জালে আটকে থাকা আমাদেরই এক অচেনা আয়না।উপন্যাসের শুরু বেশ নাটকীয়ভাবে। প্রধান চরিত্র জোসেফ কে একটি ব্যাংকের উচ্চপদস্থ ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তা। তাঁর ৩০তম জন্মদিনের সকালে হঠাৎ দুজন অচেনা লোক এসে জানায়, তিনি গ্রেপ্তার হয়েছেন। কিন্তু তাঁর অপরাধ কী বা কোন আইনে তিনি অভিযুক্ত, তা কেউ বলতে পারে না। তাঁকে কোনো কারাগারেও পাঠানো হয় না, বলা হয় তিনি যেন প্রতিদিনের মতো ব্যাংকের কাজ চালিয়ে যান। কিন্তু এই দেখানোর স্বাধীনতার আড়ালে শুরু হয় এক রহস্যময় আমলাতান্ত্রিক আদালতের তাড়া ও মনস্তাত্ত্বিক উৎপাত।গল্পের এই জায়গায় এসেই কাফকা জীবনের এক নিষ্ঠুর সত্যকে উন্মোচিত করেছেন। যে প্রতিষ্ঠানের জন্য একজন মানুষ নিজের মেধা ও সময় উজাড় করে দেয়, কোনো অদৃশ্য চক্রান্ত বা ব্যবস্থার শিকার হলে সেই মানুষটি কতটা অসহায় হয়ে পড়ে, তা জোসেফের প্রতিটি পদে পদে ফুটে ওঠে। প্রতিদিন অফিসে গিয়ে সাধারণ কাজ করা আর ভেতরে–ভেতরে নিজেকে ‘নির্দোষ’ প্রমাণের আকুল চেষ্টা—এ দুই মানসিক চাপে কীভাবে মানুষের কর্মক্ষমতা, স্বাধীনতা ও শান্তি বিষাক্ত হয়ে যায়, তা লেখক নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।‘আরুশি ও একটি মিছরিদানা আংটি’: গল্প শেষ, রেশ কি শেষজোসেফ কে ভেবেছিলেন, সততা আর যুক্তি দিয়ে তিনি এই অদৃশ্য উৎপাত থেকে বেঁচে যাবেন। কিন্তু ক্ষমতা ও অন্ধ বিচারব্যবস্থা যখন যুক্তিহীন হয়ে পড়ে, তখন সাধারণ মানুষের মেধা ও সততা সেখানে ধূলিসাৎ হয়ে যায়। বিপদের দিনে আশপাশের পরিচিত অনেকে উপদেশ দিলেও মূল চক্রান্তের বিরুদ্ধে জোসেফকে একাই লড়তে হয়েছিল।‘দ্য ট্রায়াল’ নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে। জীবনের এমন কঠিন পরিস্থিতিতে অন্ধভাবে কোনো ব্যবস্থার ওপর ভরসা না করে নিজের মানসিক স্বাস্থ্য, আত্মসম্মান ও স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করাটা যে কতটা জরুরি, তা এই উপন্যাস চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। সহজ উপস্থাপনা ও গভীর জীবনবোধের কারণে কাফকার এই সৃষ্টি আজও সমান প্রাসঙ্গিক। জীবনের বাস্তব রূপ আর নিজের অস্তিত্বকে নতুন করে আবিষ্কার করতে চাইলে বইটি পড়া বা শোনার অভিজ্ঞতা সত্যি অনন্য হতে পারে।বন্ধু, রায়গঞ্জ বন্ধুসভা

News সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২৬ 0
‘গাছের জন্য’ বানালেন বাড়ি, এখন ছাদবাগানে লাখ টাকার ব্যবসা

‘গাছের জন্য’ বানালেন বাড়ি, এখন ছাদবাগানে লাখ টাকার ব্যবসা

রপ্তানিকারকদের আগ্রহ কম, তবু বিদেশে ১০ মেলা আয়োজন করতে চায় ইপিবি

রপ্তানিকারকদের আগ্রহ কম, তবু বিদেশে ১০ মেলা আয়োজন করতে চায় ইপিবি

যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে মাথা খুলেছে মেসির

যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে মাথা খুলেছে মেসির

0 Comments