আজকের দিনে কেউ আসবে না তুমি কুমকুম মেখেছ কি না দেখতে!
তোমার চুলে ফুল না ঝরা পাতা, মুখে হাসি না কান্না,
আজকের দিনে তুষার পড়লে তোমাকে বাঁচাতে কেউ আসবে না!
না প্রিয় কুকুর, না প্রেমিক, না পেটুক বিড়াল!
আজকে শহর সব থেকে নিষ্ঠুর, বছরের নিষ্ঠুরতম দিন আজ,
দুঃখ পেলে পাবে, মরলে মরবে, তোমার কান্না মিশে যাবে
কার্জন হলের পুকুরে; আজকে দুপুরে জেনে নাও ভালোবাসা কাকে বলে,
তোমার তুচ্ছ জীবনে এসেছে শিক্ষার দিন, শিক্ষার্থিনী, শেখো,
আজকের দিনে কেউ আসবে না, তুমি নববধূ হতে চাও কি না জানতে!
তোমার আঙুলে আজ কাঁটা ফুটুক, ব্যথা দিক, কাল তুমি গোলাপের দিবাস্বপ্ন দেখো!
২.
আজ কোনো শীত নেই, মাশরেফা, আজ এক তুখোড় দিনের শেষে
অতীতের ভূতে-পাওয়া গল্পের মতন মৃদু সন্ধ্যা নেমে আসবে চরাচরে;
আজ এত বিপন্ন, তবু মনে হচ্ছে ফিরে ফিরে, কিছু একটা বুঝি নেমে এলো
গহন, অসহ, একঘেয়ে সমতায়; হয়তো একটা পাখি, হয়তোবা একটা পালকই মাত্র-
অথচ তাতেও খুশি আমি; টেবিলে ছড়ানো আগাছার মতো শত শত শত বই,
পাণ্ডুলিপি, তেলাপোকা, উঁই; বিকট শব্দে প্রিয়তম অস্তিত্বরা হাসছে হো হো করে,
হাসছে শয়তান, হাসছে মাংস, আর মাংসের খুপরিতে আত্মাও খুন হচ্ছে হেসে,
হাসছে গাঁড়ল আবহাওয়া, হাসছে কাগজে লুকিয়ে থাকা ম্লান,
একটা পালক এসে ঘুমিয়ে গিয়েছে অগোচর, পালকের নাম মাশরেফা, কিংবা,
হতে পারে, নামহীন, অনিশ্চিত; কিন্তু এসেছে তো! আসবে তো! হাসো, আরও হাসো,
হে অস্তিত্বমালা, হাসো; আজ বিপুল দিনের শেষে উড়ে আসবে সন্ধ্যা, আর সঙ্গে কিছু পাখি,
কিছু পাখি রতিশেষে পালকের ওম থুয়ে যাবে; আর আমি আমার অন্তরালে, আবডালে,
মাশরেফা, মাশরেফা বলে নিষ্পলক ডেকে যাব; আজ কোনো কিচিরমিচির নেই,
শীত নেই, অস্থিরতা নেই; আছে কেবলই সম্পন্ন এক চরাচর, স্বাভাবিক, মাশরেফাময়, মোলায়েম।
৩.
হাজার বছর ধরে ভালোবাসো, কেউ দেখুক, না দেখুক;
মনে করো তোমার পা সাপে কেটেছে, তুমি বুঝতে পারোনি,
বা হয়তো দংশনকে ভেবেছ আদর। নীল হলো সারা গা,
দুচোখে বাজল ধূসর বাঁশি, তুমি টানটান হয়ে রইলে,
তবু বুঝলে না, এটা প্রজাপতি নয়, এটা সাপ, এটা ঘাতক!
হঠাৎ তাবৎ রক্ত কেঁদে উঠল নবজাতকের মতো,
ভাবলে, মরেই যাচ্ছ, কিন্তু না; এ আসলে আনন্দ,
এই বিষ, বিষে বিষক্ষয়, বেঁচে থাকা, একরাশ বুদ্বুদ!
কেউ শুনুক, না শুনুক, ভালোবাসো হাজার বছর ধরে,
তোমাকে যে সাপে কেটেছে, এ কথা কেউ না জানলেও চলবে!
৪.
কিছুই না; আগামসি লেনের তন্দুরি
যেমন সকালবেলা উষ্ণ হয়ে ওঠে,
যেমন তিনটে খেলে ক্ষুধাই থাকে না;
তেমনই তোমার কোনো ছবি হয়তোবা,
(পুরান ঢাকার রোদে তোলা হয়তোবা)
শান্তি দেয়, মাশরেফা; কিছুই না, যেন
তুমিই মামুলি এই আগামসি লেন।
৫.
কোনো ব্যস্ততা নেই; পিস্তলের ট্রিগারে আঙুল রেখে
চেয়ে আছি জানালায় হতভম্ব প্রেমিকের মতো;
আগামসি লেনে আজ দল বেঁধে মেঘের ভেতরে
উড়ে যাচ্ছে শত শত অর্বাচীন কাক; ভাবি, ওদের দুর্দান্ত চপলতা
পেলে তো ভালোই হতো; হয়তোবা আমারই ভোতরে ঘন মেঘ আছে,
জায়গা আছে ঢের লুকানোর, কিন্তু আমিই জানি না;
সারাক্ষণ চোখ মেলে থাকি, দেখি রণে, বনে, জলে, জঙ্গলে
আমিই ব্যাপৃত শুধু, আমারই পাপের ভারে ঈশ্বরের কাঁধ ভেঙে গেছে;
আমারই সকাল শুধু সকালের মতন লাগে না;
হয়তোবা কিছুতে কিছুই হয় না, দরজা খোলে না
অস্তিত্বের; কেবল ধোঁয়ার মতো ভেন্টিলেটরের ছিদ্র দিয়ে
যেটুকু পালানো যায়, যেতে হবে স্রেফ সেটুকুই।
আজ এই সমাসন্ন শীতের সকালে বসে তাই নির্নিমেষ
চেয়ে আছি আগামসি লেনে; স্মৃতি নেই, প্রতিবাদ নেই,
বলবার কোনো দীক্ষা কিংবা অভিলাষও নেই, শুধু
ট্রিগারে আঙুল রেখে ব্যর্থ কল্পনায় ডুবে যেতে যেতে ভাবি,
যা হোক, শিকল ভালো, অন্তত নিঃসংকোচে বসে থাকা যায়;
সাঁতারের চেয়ে ভালো ঘটনাপ্রবাহে ভেসে যাওয়া।
৬.
দূর, দূর থেকে যত পাখি
উড়ে আসে, চোখ মেলে থাকি,
তাদেরই মধ্যে সে কি আছে?
ভিড়ের মধ্যে সে কি থাকে?
নাকি সে-ই ভিড়? সে-ই দেশ,
টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া;
মাশরেফা, শুধু মাশরেফা?
৭.
আজ বিচক্ষণ মনে হচ্ছে শুধু পাখিদের, যারা নাকি
রক্তের নির্দেশে আগুপিছু না ভেবেই উড়ে যায়
অচেনা হাওরে; যেতে যেতে, শত শত ডানার শীৎকারে
পাল্টে দেয় দৃশ্যপট; যেখানে কেবল নেতি ছিল, নির্ভাবনা ছিল,
সেখানেই কিছুটা ঝলক আনে সন্তানের, কিছু সম্ভাবনা
হুট করে জেগে ওঠে, মাশরেফা; আজ আমি কেবল তাদেরই মধ্যে
অসংখ্য নাটক ঘটে যেতে দেখি; মনে হয়, এই নীরবতা,
দুরূহ মূকাভিনয় তাদের অস্তিত্বে নেই, স্মৃতি নেই, বন্দোবস্ত নেই
আপসের; শুধু ডানা আছে, ডানায় পাতাল আছে লুকোনোর মতো;
আমিও তো লুকোতেই চাই; সরে যেতে চাই খল রঙ্গমঞ্চ থেকে
পরাভূত শয়তানের বেশে; বিভিন্ন মণ্ডল থেকে উৎসারিত প্রৌঢ় নক্ষত্রেরা
আমার কন্দরে নেমে খেলা করে, আমি খেলি, খেলনা ফেলে
উঠে আসি কখনোসখনো; ভাবি, ওই তো হাওরে জেগে আছে
শত শত পাখি; রংচঙে খেলনার চেয়েও আনন্দিত, প্রিয়, তৎপর;
আমি কি ওদেরই মতো একরত্তি অস্তিত্বের নাগপাশ ঠেলে উড়ে যাব
অন্য কোনো অস্তিত্বের নিগূঢ় প্রান্তরে, ধরো, তোমার প্রাণেরই কোনো
হাওরে-বাঁওড়ে, মাশরেফা? এই বিস্রস্ত গোল্লাছুট, এই আমরণ বালকতা
কখনো কি মুছে ফেলা যাবে না? আজকে শুধু পাখিদেরই মনে হচ্ছে
রাজ্যত্যাগী, জ্ঞানী, নিঃসংশয়; ইচ্ছে হয় তাদেরই ডানায় শুয়ে মিলেমিশে যেতে
অকাতর, বিচূর্ণ দৃশ্যের মতো, জায়মান, অপারগ, পরিসীমাবিহীন আকাশে।
৮.
প্রায়শই কিছুই লাগে না।
একটা দেয়াল ঠিকই আপন স্বভাবে ভেঙে পড়ে;
দেয়ালের এপারে–ওপারে
যারা ছিল, আশ্চর্যজনকভাবে যারা
দেয়ালে দুকান পেতে গড়ে তুলেছিল যোগাযোগ—
তারা হতভম্ব, খুব অন্ধ হয়ে যায়,
আনাগোনাহীন, প্রায় বোবা হয়ে যায়;
দেয়াল কিংবা দেয়ালের না থাকায়
আসলেই বড্ড যায় আসে।
৯.
আমি স্বপ্নের মধ্যে স্বপ্নে দেখেছি একটা স্বপ্ন
ধীরস্থিরভাবে উড়ে যাচ্ছে টিকাটুলির দিকে,
যেখানে তুমি ঘুমিয়ে আছ,
যদিও মুখভাব দেখে মনে হচ্ছে, মশকরা করছ ঘুমের সঙ্গে,
আর একটা ছুরি যেমন আয়েশ করে বুকের ভেতরে গেঁথে যায়,
তেমনি ওই স্বপ্নটা যখন প্রেতচ্ছায়ার মতো
তোমার ঘুমন্ত শত শত চোখের ভেতরে ঢুকে পড়বে,
তখন মুখভাব দেখে মনে হবে, তুমি মশকরা করছ স্বপ্নের সঙ্গে,
স্বপ্নের মতো, সেয়ানে সেয়ানে...
১০.
এই মাশরেফা যে-ই হোক, যে পালকই হোক, তাকে আমি
লুকিয়ে রেখেছি যত্ন করে;
পাখির বুকের গূঢ় পালকের মতো;
নদীর গহন পলি-মৃত্তিকার মতো;
এই নদী যে নদীই হোক, যে পলিই হোক, তাকে আমি
লোকচক্ষু, লোলচক্ষু থেকে,
সমূহ উন্মাদনা, বিশ্রম্ভালাপ থেকে দূরে
লুকিয়ে রেখেছি, তাকে সরিয়ে রেখেছি যত্ন করে।
শরীয়তপুরের কাজীরহাট এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মাস্টার মোস্তফা কাজীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, প্রভাব খাটানো ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হন মোস্তফা কাজী। এরপর থেকে এলাকায় বিভিন্ন জমি দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৬ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে কাজীরহাট বাজারের দোকানপ্রতি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা কাজী। এছাড়া কয়েক মাস আগে কাজীরহাটে একটি দোকান ক্রয়ের সময় ব্যবসায়ী সুমন তপাদারের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী আরও জানান, বি. কে. নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলামের কাছ থেকেও ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন মানুষকে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় ফেলে হয়রানি করার অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন মোস্তফা কাজী। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির ব্যানারে তার কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন অনেকে। এছাড়া বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি নিজ ভগ্নিপতি সিদ্দিক দেওয়ানের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোস্তফা কাজীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সচেতন মহল বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
ইউরোপের রাজধানী ব্রাসেলসে আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা জোরালো করা। এই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত আছেন। গত বছরের শুরু থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের কারণে সারা ইউরোপ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ইউরোপীয় নেতারা এখন যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরিতে কাজ করছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, “আমরা যুদ্ধের মানবিক সংকট বুঝতে পারি এবং এখন আমাদের দায়িত্ব এটি দ্রুত শেষ করার পথ খোঁজা। আমাদের প্রত্যেকের জন্যই শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।” এই বৈঠকে অস্ত্রবিরতি চুক্তি, যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলো যুদ্ধ সমাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এগুলো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ক্রমবর্ধমান পরীক্ষার চাপ এবং পরিবারের পাশাপাশি সমাজের অযৌক্তিক প্রত্যাশা। এ দুটি কারণ মিলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বেড়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা। ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করা যেন শিক্ষার্থীর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ—সব জায়গা থেকেই উচ্চ ফলাফলের প্রত্যাশা তৈরি করছে মানসিক চাপের একটি অব্যক্ত বলয়। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইহান কবির বলেন, “পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে মনে হয়, শুধু আমি না, আমার পুরো পরিবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এটা সহ্য করা খুব কঠিন।” শুধু রাইহান নয়, দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা একই অভিজ্ঞতার কথা বলছে। সামাজিক চাপ ও তুলনার সংস্কৃতি পরিস্থিতি করছে আরও জটিল পরীক্ষার নম্বর নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এখন তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া গর্ব বা অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কোন কলেজে ভর্তি হলো, কে কতো পেল—এসব তুলনার চাপে পড়াশোনার আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা তাবাসসুম বলেন, “প্রত্যাশা থাকা ভালো, কিন্তু তা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায় এবং একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব সক্ষমতা উপেক্ষা করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়। এ থেকেই জন্ম নেয় আত্মগ্লানি, হতাশা এবং মাঝে মাঝে আত্মহননের চিন্তা।” জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ নিয়মিত মানসিক চাপে থাকে। এর মধ্যে ১২ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগে এবং বড় একটি অংশ কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই দিন পার করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে ক্ষতিকর। সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, এবং পরিবারের ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ এই সমস্যার নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম হয়, সেখানে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাকে কেবল ফলাফলের সীমায় না এনে একটি মানবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা চাপ নয়, ভালোবাসা থেকে শিখবে, এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ প্রজন্ম।
বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কৃষিখাতকে চরমভাবে আঘাত করছে। অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘদিন খরা এবং হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ফসল উৎপাদনে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে। চলতি মৌসুমেই অনেক জেলায় ধান, গম, ভুট্টা এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, একদিকে যেমন আবহাওয়ার আচরণ বুঝে ওঠা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সারের দাম, কীটনাশক ও বীজের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পোকার আক্রমণ ও রোগবালাইয়ের হারও বেড়ে গেছে। এই চাপে পড়ে অনেক কৃষকই ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা। তাদের পক্ষে বারবার ক্ষতির ধাক্কা সামলে উঠে আবার নতুনভাবে চাষাবাদ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো অঞ্চলে দেখা গেছে, কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী ফসল বাদ দিয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ ও লাভজনক অন্য চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমানেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। একইসঙ্গে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে এমন জাত ও পদ্ধতি উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে যা কঠিন জলবায়ু পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কৃষি খাতকে সচল রাখা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে এখনই পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
কলম্বোর সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাব ময়দানে চলমান দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে ব্যাট হাতে আবারও ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের। টস জিতে ব্যাট করতে নেমে প্রথম ইনিংসে টাইগাররা সংগ্রহ করে মাত্র ২২০ রান, যেখানে ব্যতিক্রম ছিলেন কেবল শোয়াড ইসলাম (৪৬), মুশফিকুর রহিম (৩৫) ও লিটন দাস (৩৪)। শ্রীলঙ্কার বোলাররা শুরু থেকেই চাপ সৃষ্টি করে রাখে। ডেবিউ করা স্পিনার সোনাল দিনুষা ৩ উইকেট নিয়ে আলো ছড়ান, আর আসিথা ফার্নান্দো ও বিষ্ণু ফার্নান্দো নেন ২টি করে উইকেট। প্রথম ইনিংসের জবাবে দ্বিতীয় দিন সকালে শ্রীলঙ্কা উদ্বোধনী জুটি থেকে ভালো সূচনা পায়। ১৩.১ ওভারে কোন উইকেট না হারিয়ে সংগ্রহ করেছে ৬২ রান। ওপেনার পাথুম নিসান্কা ৩৩ এবং লাহিরু উদারা ২৮ রানে অপরাজিত রয়েছেন। বাংলাদেশের হয়ে তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ বোলিং শুরু করলেও এখনও পর্যন্ত সাফল্যের দেখা মেলেনি। শ্রীলঙ্কা এখনো বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস থেকে ১৫৮ রানে পিছিয়ে আছে, হাতে রয়েছে সকল উইকেট। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে প্রভাব এই টেস্টটি ২০২৩-২৫ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ হওয়ায় দুই দলের জন্যই পয়েন্টের লড়াই গুরুত্বপূর্ণ। সিরিজের প্রথম টেস্টে পরাজিত হওয়ায় বাংলাদেশ সিরিজে টিকে থাকতে হলে এই ম্যাচ জিততেই হবে। পরবর্তী চ্যালেঞ্জ স্লো পিচে বাংলাদেশ বোলারদের আরও পরিকল্পিত বোলিং করতে হবে। দ্রুত উইকেট তুলে না নিতে পারলে শ্রীলঙ্কা বড় লিড নিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে দেবে টাইগারদের। ফিল্ডিংয়ে মনোযোগ এবং টাইট বোলিংয়ের মাধ্যমেই দ্বিতীয় ইনিংসে নিজেদের ফিরে পাওয়ার আশায় বাংলাদেশ। সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড (দিন ২, প্রথম সেশন পর্যন্ত): বাংলাদেশ (১ম ইনিংস): ২২০/১০ শ্রীলঙ্কা (১ম ইনিংস): ৬২/০ (১৩.১ ওভার) নিসান্কা: ৩৩*, উদারা: ২৮* বাংলাদেশ বোলার: তাইজুল, মিরাজ – উইকেটহীন
মাগুরা জেলা কারাগারে থাকা নূর আলম মুন্সি (৫০) নামের এক সাজাপ্রাপ্ত কয়েদির মৃত্যু হয়েছে। মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৫টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। নিহত নূর আলম মুন্সি মাগুরা শহরের ভিটাসাইর এলাকার মৃত মুন্সি সব্দার হোসেনের ছেলে। ২০১৯ সালের একটি মাদক মামলায় (জিআর ১৯১৯/১৯, মামলা নং ৩৫১/১৯) এক বছর দুই মাসের কারাদণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে গত ৮ সেপ্টেম্বর থেকে তিনি মাগুরা জেলা কারাগারে সাজা ভোগ করছিলেন। মাগুরা জেলা কারাগারের জেল সুপার শেখ মো. মহিউদ্দীন হায়দার জানান, গত ১৩ সেপ্টেম্বর কারাগারে নূর আলম হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাকে তাৎক্ষণিকভাবে মাগুরা ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার পর অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকের পরামর্শে অ্যাম্বুলেন্সে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। পরবর্তীতে সেখানেও তার শারীরিক পরিস্থিতির অবনতি ঘটলে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। মঙ্গলবার বিকেল ৫টার দিকে ঢামেকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। নূর আলমের পরিবার এই মৃত্যুকে ঘিরে গভীর সন্দেহ প্রকাশ করেছে। নিহতের ভাই মঞ্জুরুল আলম অভিযোগ করে বলেন, ‘গত ৮ সেপ্টেম্বর আমার ভাইকে সম্পূর্ণ সুস্থ ও স্বাভাবিক অবস্থায় কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। ১৩ সেপ্টেম্বর তিনি অসুস্থ হলেও কারা কর্তৃপক্ষ আমাদের কিছুই জানায়নি। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় হঠাৎ করে তার মৃত্যুর খবর দেওয়া হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘একজন সুস্থ মানুষ কারাগারে গিয়ে কয়েকদিনের মধ্যে কীভাবে মারা গেলেন, তা নিয়ে আমাদের মধ্যে তীব্র সন্দেহ রয়েছে। আমরা এই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত এবং ন্যায়বিচার দাবি করছি।’ বর্তমানে নূর আলমের মরদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। কারা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পর মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে। মো. মিনারুল ইসলাম জুয়েল/কেজে/এএসএম
বাবার হাত ধরে স্কুল থেকে ফিরেছিল সকাল। মসজিদের সামনে খেলতে গিয়ে আর বাড়ি ফেরেনি সাত বছরের শিশুটি। আট বছর পেরিয়ে গেলেও তার অপেক্ষায় পরিবার। আবার কার্টুন দেখতে দেখতে যাদব কখন যে বাড়ির বাইরে চলে গেছে, তা জানে না তার পরিবারের কেউ। অন্যদিকে মাহি রাগ করে ঘর ছেড়ে ১১ দিন পর নিজেই ফিরে এসেছে। তিনটি ঘটনা তিন রকম বাস্তবতা। কিন্তু প্রশ্ন একটাই, শিশুরা নিখোঁজ হচ্ছে কেন, আর নিখোঁজ হওয়ার পর তাদের কতজনের সন্ধান মিলছে? সকালের পরিবার জানিয়েছে, নিখোঁজের সময় সিসিটিভির ফুটেজে লাল জ্যাকেট পরিহিত দুজনকে তাদের ছেলেকে রিকশায় করে নিয়ে যেতে দেখা গেলেও দীর্ঘ আট বছর পেরিয়ে গেলেও তারা আর সকালের খোঁজ পাননি। তারা দাবি করেন, ছেলেকে অপহরণ করা হয়েছে। তবে কী উদ্দেশ্যে অপহরণ করা হতে পারে, সেই ব্যাখ্যা জানেন না সকালের বাবা ইসমাইল। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেছে। ছেলেকে ফেরাতে লাখ লাখ টাকা খরচ করলেও এখন পর্যন্ত মুক্তিপণ চেয়ে কোনো ফোনও পাননি তিনি। এদিকে, গত ৩০ জুলাই প্রতিদিনের মতো ছেলে যাদবকে তার দাদুর কাছে রেখে ঢাকার সাভার এলাকার নিজ কর্মস্থলে গিয়েছিলেন পোশাকশ্রমিক অর্চনা রানী দাস। এর কিছুক্ষণ পর ফোনে জানতে পারেন ছেলে নিখোঁজের ঘটনা। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত এত খোঁজাখুঁজির পরও সন্ধান মেলেনি যাদবের। পরিবারের ভাষ্য, টিভি দেখতে দেখতে বাসার বাইরে বের হয়েছিল যাদব। তবে আর ফিরে আসেনি সে। যাদবকে কেউ নিয়ে গেছে, নাকি নিজে থেকে কোথাও চলে গেছে, সে বিষয়ে স্পষ্ট করতে পারেনি তার পরিবার। একই সঙ্গে মুক্তিপণের জন্যও কোনো ফোন পাননি তারা। পরিবারের ছোট সদস্যদের হারিয়ে যাওয়া এবং পুরোপুরি নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি মেনে নিতে পারছেন না কেউ। ফলে প্রশ্ন তুলছেন, কোথায় হারিয়ে গেল তাদের স্বজন? আরও পড়ুন ১৫ হাজার শিশু নিখোঁজের কারণ জানালো পুলিশ, এখনো উদ্ধার হয়নি ২ হাজার সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে ১৫ হাজারের বেশি শিশু নিখোঁজ হওয়ার খবর প্রকাশ হয়। তবে এসব প্রতিবেদনে নিখোঁজ শিশুদের কতজন উদ্ধার হয়েছে বা পরিবারের কাছে ফিরে এসেছে, তা উল্লেখ না থাকায় শিশু নিখোঁজের পূর্ণাঙ্গ চিত্র প্রতিফলিত হয়নি বলে জানায় পুলিশ সদর দপ্তর। শূন্য থেকে ৯ বছর বয়সী শিশুরা সাধারণত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে অপরিচিত স্থানে গিয়ে পথ হারানো, পরিবারের সদস্যদের নাম-ঠিকানা বলতে না পারা কিংবা একা বাড়ি ফেরার সময় অন্যত্র চলে যাওয়ার কারণে নিখোঁজ হয়। গত ৩ সেপ্টেম্বর পুলিশ সদর দপ্তর থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশুর নিখোঁজের জিডি হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে বা তারা পরিবারের কাছে ফিরে এসেছে। তবে এখনো নিখোঁজ ২ হাজার ৩৮ শিশু, যা মোট নিখোঁজের প্রায় ১৩ শতাংশ। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে শূন্য থেকে ৯ বছর বয়সী ৪৭৪ শিশুর নিখোঁজের জিডি হয়েছে। এর মধ্যে ৪০৬ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে এবং ৬৮ জন এখনো নিখোঁজ। ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে অভিমান, পড়ালেখার চাপ, অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ার পর লজ্জায় পালিয়ে থাকা, স্বাধীনভাবে জীবনযাপনের আকাঙ্ক্ষা, পরিবারের কাছ থেকে অর্থ বা অন্য সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা, পারিবারিক কলহ ও অশান্তি এবং বন্ধু বা সহপাঠীদের প্রভাবকে নিখোঁজ হওয়ার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে পুলিশ। এছাড়া ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশু নিখোঁজের সংখ্যা ১৫ হাজার ২৪৩। তাদের মধ্যে ১৩ হাজার ২৭৩ জন উদ্ধার হয়েছে এবং এক হাজার ৯৭০ জন এখনো নিখোঁজ। পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স বলছে, সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে ১৫ হাজারের বেশি শিশু নিখোঁজ হওয়ার খবর প্রকাশ হয়েছে। তবে এসব প্রতিবেদনে নিখোঁজ শিশুদের কতজন উদ্ধার হয়েছে বা পরিবারের কাছে ফিরে এসেছে, তা উল্লেখ না থাকায় শিশু নিখোঁজের পূর্ণাঙ্গ চিত্র প্রতিফলিত হয়নি। এতে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ বিষয়ে স্থানীয় পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট থানার মাধ্যমে যাচাই-বাছাই করে পুলিশ বলছে, সাত মাসে নিখোঁজ হওয়া মোট ১৫ হাজার ৭১৭ শিশুর মধ্যে ২ হাজার ৩৮ জন এখনো উদ্ধার হয়নি। আরও পড়ুন নিখোঁজ শিশুদের উদ্ধারে রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ চান স্বজনরা পুলিশ সদর দপ্তর বলছে, শূন্য থেকে ৯ বছর বয়সী শিশুরা সাধারণত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে অপরিচিত স্থানে গিয়ে পথ হারানো, পরিবারের সদস্যদের নাম-ঠিকানা বলতে না পারা কিংবা একা বাড়ি ফেরার সময় অন্যত্র চলে যাওয়ার কারণে নিখোঁজ হয়। ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে অভিমান, পড়ালেখার চাপ, অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ার পর লজ্জায় পালিয়ে থাকা, স্বাধীনভাবে জীবনযাপনের আকাঙ্ক্ষা, পরিবারের কাছ থেকে অর্থ বা অন্য সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা, পারিবারিক কলহ ও অশান্তি এবং বন্ধু বা সহপাঠীদের প্রভাবকে নিখোঁজ হওয়ার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে পুলিশ। পুলিশ আরও জানিয়েছে, বর্তমানে অনলাইন জিডি সুবিধা চালু হওয়ায় নিখোঁজ সংক্রান্ত জিডির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে শিশু নিখোঁজের জিডি হয়েছিল ১৭ হাজার ৮০৮টি। ২০২৪ সালে তা কমে ১৬ হাজার ৪১৪ হলেও ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ২২ হাজার ৫৫০টিতে। গত ৩০ আগস্ট ময়মনসিংহের আকুয়া পূর্ব নয়াপাড়া থেকে নিখোঁজ হয় ১৪ বছর বয়সী সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী মাহি। টানা ১০ দিন নিখোঁজ থাকলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ও পরিবারের কেউই তার হদিস মেলাতে পারেননি। এরপর ১১তম দিনে নিজেই অবস্থান জানায় মাহি। ফিরে যায় বাড়িতে। মাহির পরিবারের সঙ্গে কথা হয় জাগো নিউজের। পরিবার জানায়, ৩০ আগস্ট (রোববার) মায়ের মোবাইল ফোন নিয়ে দুই ভাইয়ের মনোমালিন্য হয়। এরপর মাহি রাগ করে ৫০ টাকা নিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে যায়। পরে রাত ৩টার ময়মনসিংহগামী ট্রেনে চড়ে পৌঁছে যায় রাজধানীর কমলাপুরে। বিভিন্ন হোটেলে ঘুরে একটি কাজ জোগাড় করে। সারারাত কাজ শেষে ক্লান্ত শরীরে সারাদিন ঘুমিয়ে পার করে অনেকটাই পরিবারের কথা ভুলে থাকত সে। পরে এভাবেই কেটে যায় ১১ দিন। পরিবার অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তার সন্ধান পায়নি। ১১ দিন পর গত ৯ সেপ্টেম্বর নিজে থেকেই বাড়িতে ফোন দিয়ে নিজের অবস্থানের কথা জানায় মাহি। এরপর তাকে উদ্ধার করে বাড়িতে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। তিনি আমার কেসটা পিবিআইতে হ্যান্ডওভার করেন। সে সময় একটা মাত্র ক্লু—সিসিটিভির একটা ফুটেজ ছিল। যেখানে দেখা যাচ্ছিল আমার ছেলেকে দুজন রিকশায় বসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তাদের চেহারা দেখা যায় না। এরপর পিবিআইয়ের সিআইজি বিভিন্ন জায়গায় আমার মামলার তদন্ত হলেও ছেলেকে আর খুঁজে পাইনি। কী বলছে ভুক্তভোগী পরিবার ২০১৮ সালের ২১ জানুয়ারি রাজধানীর লালবাগের খান মোহাম্মদ মসজিদ এলাকা থেকে হারিয়ে যায় ইসমাইল হাসানের ছেলে সকাল। সে সময় সকালের বয়স ছিল ৭ বছর। নিখোঁজ সকালের বাবা ইসমাইল হাসান রাজন বলেন, ‘খান মোহাম্মদ মসজিদের ওখানে আমার ছেলে খেলছিল। ওখানে লাল জ্যাকেট পরা একটা লোক আসছে। এসে বলছে, চলো তোমাকে ভিডিও গেমস খেলতে নিয়ে যাই। এই কথা বলে নিয়ে গেছে। আমি তখন বাসায় ঘুমিয়ে ছিলাম। অন্য বাচ্চাদের কাছে শুনেছি। এর ঘণ্টাখানেক আগে আমি আমার ছেলেকে স্কুল থেকে নিয়ে আসি। বিকেল সাড়ে ৩টায় স্কুল ছুটি হয়েছে। এরপর আমি ওকে বাসায় নিয়ে আইসা, বাসায় ঘুমায় গেছি। ও (নিখোঁজ ছেলে) কী করছে, খাওয়া-দাওয়া কইরা প্রতিদিনের মতো ওই মসজিদের সামনে খেলতে যায়। ঠিক পৌনে ৫টায় হঠাৎ সবাই চিল্লাচিল্লি, কান্নাকাটি করে। এই সকালরে জানি কে নিয়ে গেছে—এভাবে চিল্লাপাল্লা করছে। পরে আমি দৌড়াইতে দৌড়াইতে গেছি। আমার বন্ধু যারা ছিল, তাদের দিয়ে চারদিকে হোন্ডা ছাড়ছি। কোনো জায়গায় পাইনি। পরে মাইকিং করা হয়েছে। অনেক খোঁজাখুঁজি করছি, পাইনি। ছেলের জন্য কাঁদতে কাঁদতে ব্রেইন স্ট্রোক পর্যন্ত করেছি। স্ট্রোক করে এক সাইড পঙ্গু হয়ে গেছি। এখন আমি প্যারালাইজড রোগী।’ আরও পড়ুন শিশুরা হারিয়ে যাচ্ছে কোথায়, কেন? থানার সহযোগিতা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সেসময় বেগম খালেদা জিয়া গ্রেফতার হয়েছিলেন। থানা সেই সময় ভিআইপি কেস নিয়ে ব্যস্ত ছিল। আমার কেসের উন্নতি না দেখে আমি পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে গিয়ে আইজির সঙ্গে দেখা করি। সেই সময় আইজিপি ছিলেন জাবেদ পাটোয়ারী। তার সঙ্গে দেখা করি। তাকে সব বুঝিয়ে বললে তিনি আমার কেসটা পিবিআইতে হ্যান্ডওভার করেন। সে সময় একটা মাত্র ক্লু—সিসিটিভির একটা ফুটেজ ছিল। যেখানে দেখা যাচ্ছিল আমার ছেলেকে দুজন রিকশায় বসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তাদের চেহারা দেখা যায় না। এরপর পিবিআইয়ের সিআইজি বিভিন্ন জায়গায় আমার মামলার তদন্ত হলেও ছেলেকে আর খুঁজে পাইনি।’ পরিবারে স্ত্রী ও এক মেয়ে। মেয়ের বয়স ২১ বছর। আর নিখোঁজ ছেলের বর্তমান বয়স প্রায় ১৬ বছর। মেয়ে তেজগাঁও কলেজে অনার্স প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। পরিবার কীভাবে চলে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মানুষের সাহায্যে চলে। আমি একসময় কন্ট্রাক্টর ছিলাম। পরে আমার জমানো যা ছিল, আমার স্ত্রীর যত সোনা ছিল, সব বিক্রি করে ফকির-কবিরাজ-তান্ত্রিক—বাংলাদেশের এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে আমি না গেছি। সে সময় আমার নগদ টাকা ছিল ২৭ লাখ টাকা। এই ২৭ লাখ টাকা শুধু ফকিরে খাইছে। এই ফকিরেই আজ আমারে রাস্তার ফকির বানিয়ে দিয়েছে। আজ আমরা টোটালি নিঃস্ব। আত্মীয়স্বজন, বন্ধু, এলাকার বড় ভাই-ছোট ভাই—সবার সহযোগিতায় আজ আমার সংসার চলে।’ গত ৩০ জুলাই রাজধানীর সাভার এলাকা থেকে নিখোঁজ হয় গার্মেন্টসকর্মী অর্চনা রানীর ছেলে যাদব কর্মকার (৫)। অর্চনা রানী জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমি একজন পোশাক শ্রমিক। গত জুলাই মাসের ৩০ তারিখ প্রতিদিনের মতোই অফিসে চলে যাই। এর দুই ঘণ্টা পরে আমার বাবা আমাকে ফোন দিয়ে বলে, মা, দাদুরে পাওয়া যাচ্ছে না। তা আমি কই, যাদবরে পাওয়া যাচ্ছে না। ও গেছে কই?’ আরও পড়ুন কাফরুলে শিশু অপহরণের অভিযোগে গ্রেফতার নারী কারাগারে ‘আমার বাবা আমার বাসায় আমার সঙ্গে থাকে। গরিব মানুষ আমরা। আমি ডিউটি করি, আর আমার বাবা ছেলেরে সঙ্গে সঙ্গে দেখে রাখে। আমি অফিসে গেলে আমার ছেলে নাকি বাবারে বলেছে, দাদু দোকানে যাব। তখন বাবা বলেছে, বৃষ্টি কমলে আমরা দোকানে যাব। তখন বাবা বলছে, তুমি আমার কাছে একটু ঘুমাও। এরপর আমার ছেলে নাকি বলছে, দাদু কার্টুন ছেড়ে দাও, আমি কার্টুন দেখি। এরপর বাবা কার্টুন চালিয়ে দিয়ে ঘুমিয়ে গেছে। এরপর ঘুম থেকে ফাল দিয়ে উঠে দেখে যাদব নেই। পরে আমি এসে কোনো খোঁজ না পেয়ে অটো নিয়ে পুরো এলাকায় মাইকিং করেও খোঁজ পাইনি।’ ‘পরে ওইদিন আবার থানায় গেছি। গিয়ে আমি সব বললাম। তখন তারা আমাকে বললো, ২৪ ঘণ্টা না গেলে জিডি নেবে না। পরে আমরা বললাম, একটা বাচ্চা মানুষ—২৪ ঘণ্টার মধ্যে কিছু একটা হয়ে যেতে পারে। পরে কী করব? জিডি নিলো না, চলে আসলাম। পরদিন গিয়ে জিডি করলাম। এই জিডি যার দায়িত্বে দিয়েছে, উনি যায়-আসে তদন্ত করে। আজ পর্যন্ত এটাই চলছে। কোনো গুরুত্ব দিচ্ছে না।’—এই বলে কান্না করতে করতে ছেলের সন্ধান চান তিনি। কোনো সময় মুক্তিপণ চেয়ে ফোন এসেছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘না, এমন কোনো ফোন আসেনি।’ আগস্ট মাসের ৩০ তারিখ রোববার বনানী সৈনিক ক্লাব ফুটওভার ব্রিজে জুতা কিনতে গিয়ে বড় মেয়ে সাইবাকে (৪) হারিয়ে ফেলেন বিথী। বিথী জাগো নিউজকে বলেন, ‘আগস্ট মাসের ৩০ তারিখ রোববার বিকেল আনুমানিক ৫টা। আমি আমার মাইয়া দুইডারে লইয়া বিকালে সৈনিক ক্লাব ফুটওভার ব্রিজে জুতা কিনতে গেছিলাম। বড় মেয়ের জন্য জুতা কিনতে গেছি। ছোট মেয়ের বয়স ১ বছর। ও আমার কোলে। আর বড় মেয়ের হাতটা ছেড়ে জুতা দেখছি, দাম-দর করে জুতাটা কিনছি। এরপর পিছে তাকায় দেখি আমার মেয়ে নেই। ব্রিজের ওপর ছিলাম। সঙ্গে সঙ্গেই আমার মায়েডারে খুঁজছি, যে গেল কই। খুঁজে দেখি আশপাশের কোনো জায়গায় নেই। পায়ে হেঁটে যতটুকু খোঁজা যায়, সবটুকু খুঁজছি। আশপাশে যত জায়গা আছে, সব খুঁজে ফেলেছি।’ তিনি বলেন, ‘বনানীর সোসাইটিতে আমি কাজ করতাম। এরপর মেয়েকে খুঁজে না পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে আমার স্বামীকে ফোন দিয়ে বলেছি, সাইবার আব্বু, আমি তো সাইবারে পাইতেছি না। জুতা কিনতে গিয়ে হাতটা ছাড়ছি আর সাইবারে খুইজ্জা পাইতাছি না। এরপর সঙ্গে সঙ্গে ওর আব্বু চলে আসলো। আমরা দুজন মিলে অনেক খুঁজছি, কিন্তু কোথাও পাইনি। পরে ৭টার দিকে থানায় গিয়ে কইলাম—স্যার, আমার মাইয়াটা হারায় গেছে। তখন স্যার বলে, তোমাদের বাচ্চা তোমরা খেয়াল রাখো না কেন? তোমাদের বাচ্চা হারায় গেছে, এইডা কি আমরা খুঁজে দিবো? তারপর বলে, ২৪ ঘণ্টার আগে জিডি নেওয়া হয় না। যাও, আরও খোঁজো।’ আরও পড়ুন গোসলে নেমে দুই রোহিঙ্গা শিশু নিখোঁজ, একজনের মরদেহ উদ্ধার ‘তারপর আমরা গিয়ে আবার সবদিকে অনেক খুঁজলাম। রাত ১০টার দিকে আবার থানায় গিয়ে বললাম—স্যার, এমন জায়গা বাদ নেই যে খুঁজিনি। পুরো বনানী হেঁটে হেঁটে খুঁজেছি, কিন্তু আমার মাইয়ারে তো পাইলাম না। এরপরও আমার জিডি নিলো না। আমি আমার আম্মুরে ফোন দিলাম—আম্মু, আমার মাইয়াডা হারায় গেছে। থানাতো জিডি নিতেছে না। পরদিন সকালেই আম্মু চলে আসছে। এসে আমার সঙ্গে থানায় গিয়ে অনেক অনুরোধ করার পরও জিডি নিলো না। পরে আম্মু এক ম্যাডামরে ধরছে। আম্মু ম্যাডামরে সবকিছু বুঝাইয়া বললো। পরে বড় ওসির সঙ্গে কথা বইলা জিডির অনুমোদন করায় দিলো। পরে ওইদিনও জিডি হলো না। কইলো, আজকে সার্ভারের সমস্যা। আপনারা কালকে আসেন। পরদিন মঙ্গলবার আবার গেলাম। আমার মাইয়া হারাইছে রোববার আর মঙ্গলবার ৩টায় জিডিটা হাতে দেছে।’ মহিলা পরিষদের উদ্বেগ এদিকে, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় সম্প্রতি শিশু নিখোঁজ ও গুম হওয়ার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ। সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) সংগঠনের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম ও সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে এ উদ্বেগ জানানো হয়। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সম্প্রতি রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিশুদের নিখোঁজ ও গুম হওয়ার ঘটনা ঘটছে। নিখোঁজ শিশুদের কেউ কেউ বাড়ির সামনে খেলা করতে গিয়ে, স্কুল থেকে বাসায় ফেরার পথে, বিভিন্ন সময়ে নানা ধরনের প্রলোভনের শিকার হয়ে, অপরিচিত স্থানে ঘুরতে গিয়ে পথ ভুলে যাওয়ার কারণে নিখোঁজ হচ্ছে। চলতি বছর সাত মাসে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিশু নিখোঁজ ও গুম হয়ে যাওয়ার ঘটনা আতঙ্কজনক। উদ্বেগজনকভাবে শিশু নিখোঁজ বেড়ে যাওয়া সাধারণ জনগণের মধ্যে একটি নিরাপত্তাহীনতার শঙ্কা তৈরি করছে এবং সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির সূচক তৈরি করছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন নিখোঁজ থাকা শিশু কোনো পাচার চক্রের শিকার হচ্ছে কি না বা কোনো অসাধু অপরাধজগতে পা রাখছে কি না, তা নিয়ে জনমনে আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। আকস্মিকভাবে শিশু নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা সামাজিক নিরাপত্তার ঘাটতির বিষয়টি সামনে নিয়ে আসছে। আরও পড়ুন নিখোঁজের পাঁচদিন পর ২ বছরের শিশু উদ্ধার নিখোঁজ শিশুদের সন্ধানে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের নজরদারি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ। একই সঙ্গে শিশু নিখোঁজের সঙ্গে জড়িত অপরাধী চক্রকে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণসহ যথাযথ শাস্তি নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছে। এদিকে, সারাদেশে উদ্বেগজনক হারে শিশু নিখোঁজের ঘটনায় সরকারকে আইনি নোটিশ দেওয়া হয়েছে। রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) ব্যারিস্টার ইশরাত হাসান সরকারকে এ নোটিশ দেন। এই সাত মাসে যত শিশু অপহরণ হয়েছে, তার মধ্যে বেশিরভাগ হয়েছে জয়পুরহাটে। আমাদের হিসাব অনুযায়ী, সারাদেশে অপহৃত শিশুদের মধ্যে ৩৫ শতাংশ জয়পুরহাটের। আমাদের যে হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডার আছে, তারা তাদের বাড়ি গিয়েছে। তাদের বাবা-মায়ের কাছে এ বিষয়ে কথা বলতে চেয়েছে। অধিকাংশই বলেছে, আমরা এ বিষয়ে কথা বলতে চাই না। নোটিশে সারাদেশে উদ্বেগজনক হারে শিশু নিখোঁজের ঘটনা প্রতিরোধ, নিখোঁজ শিশুদের দ্রুত সন্ধান ও উদ্ধার, কেন্দ্রীয় মিসিং চিলড্রেন ডেটাবেজ/পোর্টাল প্রতিষ্ঠা ও কার্যকর মিসিং চাইল্ড অ্যালার্ট সিস্টেম চালুসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়। অপহরণের চেয়ে নিখোঁজ বেশি শিশু নিখোঁজের বিষয়ে জানতে চাইলে মানবাধিকার সংস্থা মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা অ্যাডভোকেট সাইদুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘অপহরণের চেয়ে নিখোঁজের সংখ্যাটা বেশি। এমন অপহরণ আবার হচ্ছে না যে ওদের কাছ থেকে মুক্তিপণ চাচ্ছে।’ ‘অনেকেই সন্তান নিখোঁজ হলে জানায় না’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এই সাত মাসে যত শিশু অপহরণ হয়েছে, তার মধ্যে বেশিরভাগ হয়েছে জয়পুরহাটে। আমাদের হিসাব অনুযায়ী, সারাদেশে অপহৃত শিশুদের মধ্যে ৩৫ শতাংশ জয়পুরহাটের। আমাদের যে হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডার আছে, তারা তাদের বাড়ি গিয়েছে। তাদের বাবা-মায়ের কাছে এ বিষয়ে কথা বলতে চেয়েছে। অধিকাংশই বলেছে, আমরা এ বিষয়ে কথা বলতে চাই না। জয়পুরহাটের কেউ এ বিষয়ে কথা বলতে চায়নি। বলে, আমাদের শিশু নিখোঁজ হয়েছে, আমরা কাউকে বলিনি, থানায় যাইনি—আপনারা কেন আমাদের ঝামেলা করছেন।’ তিনি বলেন, ‘যদি আইনি ঝামেলা বা জিডি করতে গিয়ে কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়, সে ক্ষেত্রে আমাদের বললে আমরা তাদের সহযোগিতা করবো।’ মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ শিশু ও কিশোর মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ডা. সাদিয়া আফরিন জাগো নিউজকে বলেন, কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে বাবা-মায়ের সঙ্গে মতপার্থক্য বা দ্বন্দ্ব, স্কুলে বুলিং এবং পারিবারিক পরিবেশে সমস্যা থাকলে অনেক সময় এ ধরনের প্রবণতা দেখা যায়। বাবা-মায়ের মধ্যে বিচ্ছেদ বা দাম্পত্য কলহের কারণেও শিশুরা আবেগীয় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়। তখন রাগ বা আবেগের বশে হঠাৎ বাসা থেকে বের হয়ে যাওয়া কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে চলে যাওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। তিনি বলেন, আচরণগত সমস্যার ক্ষেত্রে অনেক সময় শিশুরা এতটাই আবেগপ্রবণ ও সিদ্ধান্তে আবেগনির্ভর হয়ে পড়ে যে, বাবা-মায়ের অনুমতি ছাড়াই বাসার বাইরে চলে যায়। কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে পরিবারে যতটা নিরাপদ, বাইরের জগৎ কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, এ বিষয়ে যথেষ্ট পরিপক্বতা থাকে না। ফলে তাদের সহজেই ফুসলিয়ে কোথাও নিয়ে যাওয়া বা অপহরণ করা সম্ভব হয়। ডা. সাদিয়া আফরিন বলেন, শিশু অপহরণ বা তাদের শিশুশ্রমে নিয়োজিত করা বড় ধরনের অপরাধ। তাই পরিবারে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কিশোর-কিশোরীদের আবেগীয় ও সামাজিক পরিবর্তন সম্পর্কে বাবা-মায়ের সচেতন থাকা জরুরি। রাগের সময় ‘বাসা থেকে বের হয়ে যা’, এ ধরনের কথা বলা থেকেও অভিভাবকদের বিরত থাকতে হবে। তিনি আরও বলেন, শিশু হঠাৎ চুপ হয়ে গেলে, অতিরিক্ত রাগারাগি করলে বা আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। কিশোর-কিশোরীদের মানসিক ও সামাজিক পরিবর্তন সম্পর্কে অভিভাবকরা সচেতন হয়ে তাদের বোঝার চেষ্টা করলে রাগের বশে বাসা থেকে বের হয়ে যাওয়া বা দীর্ঘ সময় অনুমতি ছাড়া বাইরে থাকার প্রবণতা কমানো সম্ভব। কেআর/এসএইচএস/এমএফএ
স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা সম্প্রতি অভিযোগ করেছেন, জাতীয় সংসদের অধিবেশনে তাঁকে অকথ্য ভাষায় গালাগালি করা হয়েছে। তিনি বলেছেন, এ ধরনের আচরণ কোনো সংসদীয় রীতিনীতির মধ্যে পড়ে না। সংসদে ভিন্নমত, তর্ক-বিতর্ক, হইচই থাকবে, কিন্তু অকথ্য গালাগালি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। সংসদে নিজের মতামত প্রকাশের পূর্ণ ক্ষমতা আছে একজন সংসদ সদস্যের, আছে ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ। একজন সংসদ সদস্য যেহেতু জনপ্রতিনিধি, তাই কথা বলার সময় তাঁদের মাননীয় সংসদ সদস্য বলে সম্বোধন করা হয়। এমনকি স্পিকার পর্যন্ত সেভাবেই কথা বলেন ও সম্বোধন করেন। সেই সংসদে যখন একজন সংসদ সদস্যকে মত প্রকাশের দায়ে অকথ্য ভাষায় গালাগালির শিকার হতে হয়, তখন বুঝতে হবে সব ক্ষেত্রেই আমাদের সংস্কৃতির মান নিম্নমুখী। অশ্লীল গালাগালি এখন গৃহ ও রাজপথ থেকে সংসদে পৌঁছে গেছে। বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে হিংস্র ও অশ্লীল ভাষার প্রচার একদিকে যেমন বাংলা ভাষাকে অসম্মান করছে, অন্যদিকে সামাজিক ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে দূষিত করছে। নোংরা ভাষা রাজনীতিকে নোংরা করে, বিভাজন সৃষ্টি করে এবং মানুষের মূল্যবোধ নষ্ট করে। তাই আমরা যত দ্রুত সম্ভব ভাষা সন্ত্রাস ও ভাষা ব্যবহারে অশ্লীলতার হাত থেকে মুক্ত হতে চাই। ভাব, ভালোবাসা, রাগ, অভিমান, ক্ষোভ—সবকিছু প্রকাশের মাধ্যম হচ্ছে ভাষা। ব্যক্তিক, রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিসরে আমরা অনেকেই এখন যে ভাষা ব্যবহার করছি, সেই ভাষার গুণগত মান ক্রমশ নিচের দিকে নামছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজনৈতিক স্লোগান, দলের অভ্যন্তরীণ বক্তৃতা এবং প্রতিপক্ষকে আঘাত হানার জন্য যেভাবে ভাষার ব্যবহার করা হচ্ছে, তাতে ভাষার সৌন্দর্য ও শালীনতা নেই বললেই চলে। সুস্থ সমালোচনার জায়গায় ব্যক্তিগত আক্রমণ, কুৎসিত ইঙ্গিত এবং গালিগালাজ যেন রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছে। একটা সময় যে শব্দ বা বাক্যকে আমরা সমাজের নিচু মানুষের ব্যবহৃত ভাষা বলে ভাবতাম, তাই এখন শোভা পাচ্ছে আমাদের এক শ্রেণির ছাত্রছাত্রী ও তরুণ নেতাদের মুখে, মিছিলে, দুই পক্ষের কোন্দলে, স্লোগানে, এমনকি রাজনৈতিক আড্ডায়। কলেজছাত্র সিফাত আবদুল্লাহ তাঁর বাসায় অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল আসার অভিযোগ তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে লাইভ ভিডিও প্রকাশ করেছেন কিছুদিন আগে, সেই ভিডিওর ভাষা এতটাই অশ্লীল ও অশ্রাব্য ছিল, যা প্রকাশ্যে উচ্চারণ করাটাই একধরনের অপরাধ বলে মনে হয়।সিফাত সেখানে এই কদর্য ভাষায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও সরকারের বিরুদ্ধে। যে শব্দ প্রয়োগ করে অন্য যে কাউকে গালি দেওয়াটা অপরাধ, সেখানে তিনি এই ভাষা ব্যবহার করেছেন সরকারপ্রধানের উদ্দেশ্যে। অত্যন্ত অশালীন ও কটূক্তিপূর্ণ বক্তব্য দিয়ে সমালোচনা করার অধিকার কারও নাই, থাকা উচিতও নয়। এ ঘটনায় পুলিশ সিফাতকে গ্রেফতার করার পর কেউ কেউ বলছেন, প্রতিবাদ করাটা তাঁর অধিকার। পুলিশ কেন তাঁকে আটক করবে? প্রতিবাদ করে সিফাত কোনো অন্যায় করেননি। অবশ্যই প্রতিবাদ করাটা মানুষের অধিকার। কোনো ইস্যুতে কেউ যদি বিক্ষুব্ধ হন, তিনি বা তাঁরা প্রতিবাদ করতেই পারেন। কিন্তু সেই প্রতিবাদের ভাষা অশ্লীল হতে হবে কেন? প্রকাশ্যে কেউ কারও বিরুদ্ধে এত অশ্লীল মন্তব্য করতে পারে, তা কল্পনাও করা যায় না। সিফাতের ভিডিও দেখে মনে হলো, ও যেন ইচ্ছা করেই প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সরকারের উদ্দেশ্যে বাজে কথা বলছেন। এ ঘটনার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবার নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে প্রতিবাদ, স্লোগান এবং সামাজিক মাধ্যমে অশ্লীল ভাষার ব্যবহার নিয়ে। এই আলোচনা উঠেছিল গত দুই-আড়াই বছর আগেই, যখন এ দেশের তরুণ-তরুণীদের একটা অংশ বিভিন্ন ধরনের অশ্লীল শব্দ প্রয়োগ করে স্লোগান রচনা করতে শুরু করে। তারা তাদের দাবি আদায়ের জন্য অসম্ভব নোংরা ও অর্থহীন বাক্য ব্যবহার করতে থাকে। সংগ্রামের ভাষাকে দেওয়া হলো এক অশ্লীল রূপ। আমরা কি ভুলে গেছি যে গালি এবং সমালোচনা, বিশেষ করে রাজনৈতিক সমালোচনা, এক জিনিস নয়। রাজনৈতিক সমালোচনা করাটা জনগণের অধিকার, কিন্তু গালি দেওয়াটা নয়। এমনকি অন্যান্য ক্ষেত্রেও কারও অধিকার নেই তার অধীনস্থ কাউকে বাজে গালিগালাজ করে অপমান করার। সন্তানকেও গালি দেওয়াটা এখন অপরাধের পর্যায়েই পড়ে। প্রয়োজনে বা অপ্রয়োজনে অশ্লীল গালিগালাজের মাত্রাটা যেন লাগামছাড়া হয়ে গেছে। শুধু বিরক্তি প্রকাশের ক্ষেত্রেই নয়, সব ক্ষেত্রেই। প্রতিবাদ বা অন্যান্য বার্তা প্রচারের জন্য খুব শক্তিশালী একটি মাধ্যম হচ্ছে দেয়াল লিখন ও চিকা মারা। অথচ ৫ আগস্টের পর দেয়াল লিখনগুলোও কেমন যেন বদলে গিয়েছিল। আন্দোলনের ইস্যুগুলো কাজে লাগিয়ে কেউ যখন অশ্লীল স্লোগান প্রতিবাদের অস্ত্র বানায়, তখন তা আন্দোলনের নৈতিক মানকে খর্ব করে। প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে চালু হয়েছে অশালীনতার চর্চা। সবচেয়ে বড় শঙ্কা, এই প্রবণতা কি সমাজে অশ্লীলতাকে স্বাভাবিক করে তুলেছে? যে শব্দগুলো একসময় মানুষ এড়িয়ে চলত, কদর্য বলে মনে করত, সেই শব্দই এখন কিছু শিক্ষিত-অশিক্ষিত মানুষের মধ্যে গ্রহণীয় হতে চলেছে। এর আগেও বাংলাদেশে অনেক আন্দোলন, সংগ্রাম হয়েছে। এরশাদবিরোধী আন্দোলন ছিল খুব বড় একটি আন্দোলন, অথচ সেই সময়ের সৃজনশীল স্লোগানে ছিল দাবি আদায়ের কথা। আর ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধ-পূর্ববর্তী অন্যান্য আন্দোলনের স্লোগান, পোস্টার, দেয়ালচিত্র ছিল প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের হাতিয়ার। বড় বড় কবি, সাহিত্যিক, শিল্পীরা তখন স্লোগান লিখতেন, পোস্টার আঁকতেন। স্লোগানগুলো শুধু রাজনৈতিক দাবি ছিল না, ছিল মানুষের আশা, আকাঙ্ক্ষা ও সংগ্রামী মনোভাবের বার্তা। এখন কথায়, লেখায় বা যে কোনো ক্ষেত্রে ভাষা প্রয়োগের ভেতর ঢুকেছে অশ্লীলতা। কোনো কারণ ছাড়াই বা তুচ্ছ কারণে অনলাইন ও অফলাইনে মানুষকে বাজে কথা বলা, অশ্লীল ইঙ্গিত করা ও অশ্লীল কাজ করে অপমান করতে একবারও ভাবছি না। এও একধরনের সন্ত্রাস, ভাষা সন্ত্রাস। ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক বা ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলোতে ভাষা ও আধেয় ব্যবহারের কোনো নীতি-নৈতিকতা নেই। যে কেউ যে কোনো ধরনের ম্যাটার আপলোড করতে পারেন। শ্লীল-অশ্লীল ভাষা বা ছবি ব্যবহারের ব্যাপারে নেই কোনো বিধিনিষেধ। সামাজিক মাধ্যমের এই যথেচ্ছ ব্যবহারের কারণে কুরুচিপূর্ণ ভাষার বিস্তার বেশি ঘটছে। কারও কারও মধ্যে এভাবেই সস্তা জনপ্রিয়তা ও ভিউ পাওয়ার মানসিকতা লক্ষ করা যায়। অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশি লাইক, কমেন্ট বা ‘ভিউ’ পাওয়ার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে ট্রল, রিল, ভিডিও বা বিনোদনের নামে অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ শব্দ ব্যবহার করছে। ফেক আইডি বা ছদ্মনাম ব্যবহার করে চলছে সাইবার বুলিং। যে কেউ অন্যকে আক্রমণাত্মক বা অশালীন ভাষায় গালিগালাজ করতে পারে এবং করছে। কারণ এতে সরাসরি ধরা পড়ার ভয় থাকে না। যুবসমাজ যখন ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে অশ্লীলতাকে বেছে নেয়, শিশুরাও তখন সেইসব ভাষাকেই গ্রহণ করতে শেখে। মতবিরোধ হলে, যুক্তি দিয়ে কথা না বলে, অপর পক্ষকে বাজে ভাষা ব্যবহার করে মানসিকভাবে আঘাত বা অপমান করার ট্রেন্ড তৈরি হয়েছে। পত্রপত্রিকার বা ইলেকট্রনিক মিডিয়ার নিউজ বা মতামত কলামের নিচে যেসব মন্তব্য করা হয়, তা দেখলে অবাক হতে হয়। বিশ্বাস করা যায় না, কোনো পড়াশোনা জানা মানুষ এত অশ্লীল মন্তব্য করতে পারে। মন্তব্যগুলো নিছক গালাগালি নয়, নারীর বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, মা-বোনকে নিয়ে কুৎসিত তুলনা। শুধু গণমাধ্যমে মন্তব্য করার ক্ষেত্রে নয়, অশ্লীলতার যে ঢেউ সামাজিকমাধ্যম ও মিছিলে ছড়িয়ে পড়েছে, তার প্রায় পুরোটাই নারীদেহকে কেন্দ্র করে ও নারীবিদ্বেষী। এই অপসংস্কৃতি থেকে আমাদের মুক্তি কবে, কীভাবে হবে জানি না। তবে জাতিগতভাবে যে আমরা ডুবে যাচ্ছি, তা স্পষ্ট। যখন সমাজে ভাষা প্রয়োগের অশ্লীলতা, অন্যকে অপমান করার প্রবণতা, জীবনযাপনে বিলাসিতা, দুর্নীতি ও আদর্শের অভাব দেখা দেয়, তখন বুঝতে হবে এটি সমাজের নৈতিক শক্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে। সমাজে যখন এমন অশ্লীল ভাষার ব্যবহার স্বাভাবিক হয়ে ওঠে, তখন নারী নিজ থেকেই পিছিয়ে যেতে শুরু করেন। জুলাই আন্দোলনের পর নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতিতে নারীদের নিরাপত্তা এবং সামাজিক স্বাধীনতায় নেতিবাচক প্রভাব ও নিপীড়নের ঘটনা বেড়েছে। আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী প্রথম সারির নারীরা স্বীকার করেছেন যে, অনলাইন ও অফলাইনে নারীদের লক্ষ্য করে ট্রল, গালাগালি এবং সাইবার বুলিং বেড়েছে। সেই নারী নেতৃত্বের বড় একটি অংশ রাজপথ, সংগঠন, এমনকি জনপরিসর থেকেও অনেকটা সরে গেছেন; কিংবা নিজেদের গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছেন। অশ্লীল ভাষা শুধুমাত্র বক্তৃতা বা স্লোগানেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। এটি সমাজে সহিংস মনোভাব ও বিভাজনের কারণও হচ্ছে। রাজনৈতিক সংঘাত বৃদ্ধি পাচ্ছে, ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব এবং দলীয় সংঘর্ষ তীব্র হচ্ছে। বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে হিংস্র ও অশ্লীল ভাষার প্রচার একদিকে যেমন বাংলা ভাষাকে অসম্মান করছে, অন্যদিকে সামাজিক ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে দূষিত করছে। নোংরা ভাষা রাজনীতিকে নোংরা করে, বিভাজন সৃষ্টি করে এবং মানুষের মূল্যবোধ নষ্ট করে। তাই আমরা যত দ্রুত সম্ভব ভাষা সন্ত্রাস ও ভাষা ব্যবহারে অশ্লীলতার হাত থেকে মুক্ত হতে চাই। ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ লেখক : যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলাম লেখক। এইচআর/এএসএম