আজ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ১৫০তম জন্মবার্ষিকী। প্রায় এক শতাব্দী ধরে তাঁর গল্প ও চরিত্র ভারতীয় উপমহাদেশের সিনেমাকে প্রভাবিত করেছে। নির্বাক সিনেমা থেকে ওটিটি—মুখ ও মাধ্যম বদলেছে, শরৎচন্দ্র থেকে গেছেন।
জন্মের দেড় শ বছর পরও তাঁর দেবদাস প্রেমে ব্যর্থ হন, পার্বতীকে হারান; শ্রীকান্ত পথে বেরিয়ে পড়েন, ললিতা আবার দাঁড়ান শেখরের সামনে। শুধু মুখগুলো বদলে যায়। দেবদাস কখনো প্রমথেশ বড়ুয়া, কখনো কুন্দনলাল সায়গল, দিলীপ কুমার, বুলবুল আহমেদ, শাহরুখ খান কিংবা একালের শাকিব খান।
আর পার্বতী? যুগে যুগে সেই চরিত্রে এসেছেন যমুনা বড়ুয়া, সুচিত্রা সেন, কবরী, ঐশ্বরিয়া রাই কিংবা অপু বিশ্বাস। ‘পরিণীতা’র ললিতাও বারবার বদলেছেন—মীনা কুমারী থেকে অঞ্জনা, বিদ্যা বালান। রাজলক্ষ্মী হয়েছেন সুচিত্রা সেন, ‘দত্তা’র বিজয়া হয়েছেন সুচিত্রা থেকে ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত।
সময় বদলেছে, দেশ বদলেছে, বদলেছে পর্দায় গল্প বলার ভাষা। নির্বাক পর্দা কথা বলতে শিখেছে, সাদা–কালো সিনেমা রঙিন হয়েছে; সিনেমা হলের পাশে এসেছে টেলিভিশন, তারপর ওটিটি। বদলেছেন দেবদাস, পার্বতী, চন্দ্রমুখী, ললিতা, রাজলক্ষ্মীরা। শুধু ফুরোয়নি শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের গল্প।
আজ ১৫ সেপ্টেম্বর কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্মের ১৫০ বছর। ১৮৭৬ সালের এই দিনে হুগলির দেবানন্দপুরে জন্মেছিলেন তিনি। মানুষের প্রেম, বিরহ, সংসার, দারিদ্র্য, সামাজিক বৈষম্য, নারীর অবস্থান, ব্যক্তিস্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা—জটিল বিষয়গুলো তিনি বলেছেন সহজ গল্পে। আর সেই গল্পে আছে দৃশ্য, নাটকীয়তা, আবেগ ও মনে রাখার মতো চরিত্র। সম্ভবত সে কারণেই চলচ্চিত্রের গোড়ার যুগ থেকে নির্মাতারা বারবার তাঁর কাছে ফিরেছেন।
‘দেবদাস’, ‘পরিণীতা’, ‘শ্রীকান্ত’, ‘দত্তা’, ‘চরিত্রহীন’, ‘বড়দিদি’, ‘মেজদিদি’, ‘গৃহদাহ’, ‘দেনা–পাওনা’, ‘পল্লীসমাজ’, ‘পথের দাবী’, ‘পণ্ডিতমশাই’, ‘নিষ্কৃতি’, ‘বিন্দুর ছেলে’—একটির পর একটি রচনা পর্দায় এসেছে। কোনোটি একবার নয়, বারবার। বাংলা-হিন্দির গণ্ডিও পেরিয়েছে তাঁর গল্প।
সিনেমার প্রায় জন্মলগ্নেই শরৎচন্দ্র
পর্দায় শরৎচন্দ্রর যাত্রা শুরু হয়েছিল সবাক সিনেমারও আগে। ১৯২৮ সালে নরেশ মিত্র ‘দেবদাস’কে নির্বাক চলচ্চিত্রে রূপ দেন। বাংলা সবাক চলচ্চিত্রের গোড়ার যুগেই শরৎচন্দ্র হয়ে ওঠেন নির্মাতাদের অন্যতম সাহিত্যিক আশ্রয়।
১৯৩১ সালে প্রেমাঙ্কুর আতর্থীর পরিচালনায় তৈরি হয় ‘দেনা–পাওনা’। নিউ থিয়েটার্সের ছবিটিতে অভিনয় করেন দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, জহর গঙ্গোপাধ্যায়, অমর মল্লিকসহ অনেকে। চিত্রগ্রহণে ছিলেন নীতিন বসু, সংগীতে রাইচাঁদ বড়াল।
পরের বছর নিউ থিয়েটার্সের ব্যানারে শিশির ভাদুড়ীর পরিচালনায় আসে ‘পল্লীসমাজ’। এরপর ১৯৩৫ সালে এল সেই উপন্যাস, যেটি শরৎচন্দ্র ও ভারতীয় চলচ্চিত্রের সম্পর্ককে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেল—‘দেবদাস’।

‘দেবদাস’ মরে না
উপন্যাসে দেবদাসের মৃত্যু হয়েছে বহু আগেই, কিন্তু সিনেমার পর্দায় চরিত্রটির যেন মৃত্যু নেই। এক প্রজন্মের দেবদাস বিদায় নিয়েছেন, আরেক প্রজন্মে অন্য কোনো জনপ্রিয় অভিনেতা এসে তাঁর জায়গা নিয়েছেন। ১৯৩৫ সালে নিউ থিয়েটার্সের ব্যানারে প্রমথেশ বড়ুয়া বাংলায় নির্মাণ করেন ‘দেবদাস’। নামভূমিকায় ছিলেন নিজেই, পার্বতী যমুনা বড়ুয়া, চন্দ্রমুখী চন্দ্রাবতী দেবী। একই বছর হিন্দি সংস্করণও নির্মিত হয় প্রমথেশ বড়ুয়ার পরিচালনায়। সেখানে দেবদাস কুন্দনলাল সায়গল। এরপর বাংলা ও হিন্দির সীমানা পেরিয়ে তেলেগু, তামিল, মালয়ালমসহ বিভিন্ন ভাষায় পৌঁছে যায় গল্পটি।
কিন্তু এতবার কেন ফিরে আসে দেবদাস
এ প্রশ্নের একটি উত্তর পাওয়া যায় চলচ্চিত্র–গবেষক পীযূষ রায়ের লেখায়। এডিনবরার গবেষণা সাময়িকী ‘দ্য সাউথ এশিয়ানিস্ট’-এ প্রকাশিত তাঁর ‘ফিল্মিং আ মেটাফর’ প্রবন্ধে তিনি দেখিয়েছেন, অসংখ্য চলচ্চিত্ররূপের মধ্য দিয়ে দেবদাস আর শুধু শরৎচন্দ্রর উপন্যাসের একটি চরিত্রে আটকে থাকেনি। ভারতীয় সমাজে ব্যর্থ বা পরিণতিহীন প্রেমের পরিচিত প্রতীকে পরিণত হয়েছে চরিত্রটি।
উপন্যাসে দেবদাসের মৃত্যু হয়েছে বহু আগেই, কিন্তু সিনেমার পর্দায় চরিত্রটির যেন মৃত্যু নেই। এক প্রজন্মের দেবদাস বিদায় নিয়েছেন, আরেক প্রজন্মে অন্য কোনো জনপ্রিয় অভিনেতা এসে তাঁর জায়গা নিয়েছেন।

দেবদাসের এই দীর্ঘ পর্দাযাত্রা নিয়ে লিখেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব আইওয়ার চলচ্চিত্র–গবেষক কোরি কে ক্রিকমারও। বিশ্ববিদ্যালয়টির ভারতীয় সিনেমাবিষয়ক ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ‘দ্য দেবদাস ফেনোমেনন’ লেখায় ১৯৩৫ সালের প্রমথেশ বড়ুয়া, ১৯৫৫ সালের বিমল রায় ও ২০০২ সালের সঞ্জয় লীলা বানসালির ‘দেবদাস’ পাশাপাশি রেখে বিশ্লেষণ করেছেন তিনি। তাঁর পর্যবেক্ষণেও বারবার চলচ্চিত্রায়ণের মধ্য দিয়ে গল্পটি ভারতীয় জনপ্রিয় সংস্কৃতির পরিচিত অংশ হয়ে ওঠার বিষয়টি এসেছে।
সিনেমার ইতিহাসের দিকে তাকালেও কথাটির প্রমাণ মেলে। পঞ্চাশের দশকের হিন্দি ছবির দর্শকের কাছে দেবদাসের মুখ দিলীপ কুমার। আশির দশকে বাংলাদেশের দর্শক চরিত্রটিকে দেখেছেন বুলবুল আহমেদের মুখে। নতুন শতাব্দীতে সঞ্জয় লীলা বানসালি দেবদাস করলেন শাহরুখ খানকে। অনুরাগ কশ্যপ ‘দেব.ডি’-তে অভয় দেওলকে দিয়ে চরিত্রটিকে নিয়ে গেলেন একেবারে নতুন সময়ের ভারতে। বাংলাদেশেও তিন দশকের ব্যবধানে চাষী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় দেবদাস হলেন শাকিব খান।
তাই ‘দেবদাস’-এর ইতিহাস শুধু একই উপন্যাস বারবার চলচ্চিত্রে রূপ দেওয়ার ইতিহাস নয়; একই গল্পকে একেক প্রজন্মের তারকা, নির্মাতা ও দর্শকের নতুন করে নিজের করে নেওয়ার ইতিহাসও।
দিলীপ কুমারের দেবদাস, সুচিত্রার পার্বতী
প্রমথেশ বড়ুয়ার ‘দেবদাস’ মুক্তির দুই দশক পর ১৯৫৫ সালে হিন্দি সিনেমায় আবার ফিরলেন শরৎচন্দ্রর সেই ট্র্যাজিক নায়ক। এবার পরিচালক বিমল রায়, দেবদাস দিলীপ কুমার, পার্বতী সুচিত্রা সেন, চন্দ্রমুখী বৈজয়ন্তীমালা। চুনিলালের চরিত্রে মতিলাল। তত দিনে ‘আন্দাজ’, ‘দাগ’, ‘আন’-এর মতো ছবিতে অভিনয় করে হিন্দি সিনেমার প্রথম সারির নায়ক দিলীপ কুমার। বিষণ্ন ও ট্র্যাজিক চরিত্রে অভিনয়ের জন্যও তাঁর আলাদা পরিচিতি তৈরি হয়েছিল। ‘দেবদাস’ যেন সেই অভিনয়-ইমেজের চূড়ান্ত এক পরীক্ষা। ভালোবাসার মানুষকে হারিয়ে ধীরে ধীরে মদ ও আত্মধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাওয়া দেবদাসকে সংযত অভিনয়ে তুলে ধরেন তিনি। ছবিটির জন্য ফিল্মফেয়ারে সেরা অভিনেতার পুরস্কারও পান দিলীপ কুমার।
ছবিটি সুচিত্রা সেনের জন্যও বিশেষ। বাংলা ছবিতে তখন তিনি প্রতিষ্ঠিত তারকা। ‘দেবদাস’ দিয়েই হিন্দি চলচ্চিত্রে তাঁর অভিষেক। অর্থাৎ বাংলা সিনেমার সুচিত্রাকে সর্বভারতীয় দর্শক প্রথম দেখলেন শরৎচন্দ্রর পার্বতী হিসেবে। দিলীপ কুমারের দেবদাসের পাশে তাঁর পার্বতীতেও ছিল অভিমান, ভালোবাসা ও আত্মমর্যাদার মিশেল।
চন্দ্রমুখীর চরিত্রে বৈজয়ন্তীমালা ছবিটির আরেক গুরুত্বপূর্ণ মুখ। চুনিলাল চরিত্রে মতিলালের অভিনয়ও স্বীকৃতি পায়; ফিল্মফেয়ারে সেরা পার্শ্ব অভিনেতার পুরস্কার পান তিনি।
বিমল রায়ের ‘দেবদাস’-এর বড় শক্তি ছিল এর সংযম। জমকালো আয়োজনের বদলে মুখের অভিব্যক্তি, আলোছায়া, নীরবতা ও বিষণ্ন আবহের মধ্য দিয়ে এগোয় গল্প। শচীন দেববর্মনের সংগীতও সেই আবহের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
প্রমথেশ বড়ুয়া-কুন্দনলাল সায়গলের পর নতুন প্রজন্মের দর্শকের কাছে দেবদাসের মুখ হয়ে উঠলেন দিলীপ কুমার; পার্বতী পেল সুচিত্রা সেনের মুখ, চন্দ্রমুখী বৈজয়ন্তীমালার। প্রায় অর্ধশতক পর একই গল্প যখন আবার হিন্দি সিনেমায় এল, তার চেহারাই গেল বদলে।

ঐশ্বরিয়ার পার্বতী, মাধুরীর চন্দ্রমুখী
২০০২ সালে সঞ্জয় লীলা বানসালি নির্মাণ করলেন ‘দেবদাস’। নামভূমিকায় শাহরুখ খান, পার্বতী ঐশ্বরিয়া রাই, চন্দ্রমুখী মাধুরী দীক্ষিত। চুনিলালের চরিত্রে জ্যাকি শ্রফ। তখন শাহরুখ বলিউডের শীর্ষ তারকাদের একজন, ঐশ্বরিয়া ও মাধুরীও জনপ্রিয়তার তুঙ্গে। শরৎচন্দ্রর বহু পুরোনো কাহিনি নতুন শতাব্দীতে পেল বলিউডের বড় তারকা-সমাবেশ। বিমল রায়ের সংযত বিষণ্নতার জায়গায় বানসালি বেছে নিলেন বিপুল জাঁকজমক। বিশাল সেট, ঝাড়বাতি, রঙের বাহার, অলংকার ও পোশাকের আয়োজন, সঙ্গে গান ও নাচ—শরৎচন্দ্রর ট্র্যাজেডি এখানে হয়ে উঠল চোখধাঁধানো দৃশ্যকাব্য।
‘সিলসিলা ইয়ে চাহত কা’, ‘মার ডালা’, ‘বৈরি পিয়া’ থেকে ‘ডোলা রে ডোলা’—গানগুলো ছবির বাইরেও জনপ্রিয়তা পায়। বিশেষ করে ঐশ্বরিয়া ও মাধুরীর ‘ডোলা রে ডোলা’ হিন্দি সিনেমার বহুল আলোচিত নৃত্যদৃশ্যগুলোর একটি হয়ে ওঠে।
এখানেই বানসালি মূল উপন্যাস থেকে বড় একটি স্বাধীনতা নেন। শরৎচন্দ্রর ‘দেবদাস’-এ পার্বতী ও চন্দ্রমুখীর দেখা হয় না। অথচ বানসালি শুধু তাঁদের মুখোমুখিই করেননি, ‘ডোলা রে ডোলা’য় দুজনকে একসঙ্গে নাচিয়েছেন। উপন্যাসে দেবদাসকে ঘিরে দুটি আলাদা জগতের বাসিন্দা দুই নারী সিনেমায় এসে দাঁড়ালেন একই ফ্রেমে।
ছবিটির আন্তর্জাতিক যাত্রাও উল্লেখযোগ্য। ২০০২ সালের কান চলচ্চিত্র উৎসবে প্রতিযোগিতার বাইরে প্রদর্শিত হয় ‘দেবদাস’। পরে বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র বিভাগে অস্কারের জন্য ভারতের আনুষ্ঠানিক প্রবেশিকা হিসেবেও পাঠানো হয় ছবিটি। দেশে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও ফিল্মফেয়ারেও একাধিক স্বীকৃতি পায়। কিন্তু বানসালি যখন শরৎচন্দ্রকে তাঁর সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ রূপগুলোর একটি দিলেন, মাত্র সাত বছর পর অনুরাগ কশ্যপ একই ‘দেবদাস’কে নিয়ে হাঁটলেন প্রায় উল্টো পথে।
২০০৯ সালে এল ‘দেব.ডি’। দেবদাস এখানে দেব, পার্বতী পারো, চন্দ্রমুখীর আধুনিক প্রতিরূপ চন্দা। দেবের চরিত্রে অভয় দেওল, পারো মাহি গিল, চন্দা কালকি কোয়েচলিন। শরৎচন্দ্রর দেবদাসকে অনুরাগ কশ্যপ নিয়ে এলেন সমকালীন দিল্লি ও পাঞ্জাবের পৃথিবীতে। পুরোনো সামাজিক পরিসরের বদলে এল মুঠোফোন, শহুরে জীবন, হোটেল, মাদক ও যৌনতার নতুন বাস্তবতা। কিন্তু দেবের ভেতরের আত্মধ্বংসের প্রবণতা থেকে গেল। বদলে গেল নারী চরিত্রও। কশ্যপের পারো অপেক্ষা করে থাকা অসহায় প্রেমিকা নন। দেবের প্রত্যাখ্যানের পর নিজের জীবন থামিয়ে রাখেন না তিনি। চন্দাও শরৎচন্দ্রর চন্দ্রমুখীর সরাসরি অনুলিপি নয়।
২০০২ সালে বানসালি একই গল্পকে তারকা, পোশাক, নাচ-গান আর বিশাল সেটে মহাকাব্যিক করে তুললেন; সাত বছর পর কশ্যপ সেই গল্পের কাঠামো ভেঙে তাকে সমকালীন তরুণদের প্রেম, যৌনতা, অপরাধবোধ ও আত্মধ্বংসের গল্প বানালেন। উৎস একই, কিন্তু সিনেমা দুটি যেন দুই মেরুর।

আমাদের দেবদাস
শরৎচন্দ্রর সঙ্গে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সম্পর্কও দীর্ঘ। স্বাধীনতার পর এ দেশের সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্রের উল্লেখযোগ্য সংযোজন চাষী নজরুল ইসলামের ‘দেবদাস’। ১৯৮২ সালে মুক্তি পাওয়া ছবিতে দেবদাসের চরিত্রে বুলবুল আহমেদ, পার্বতী কবরী এবং চন্দ্রমুখী আনোয়ারা। শরৎচন্দ্রর পরিচিত প্রেম-বিরহের গল্পকে বাংলাদেশের শিল্পীদের মুখে নতুন করে দেখেছিলেন দর্শক।
চাষী নজরুল ইসলামের জন্য ‘দেবদাস’ একবার চলচ্চিত্রায়িত করেই শেষ হয়ে যায়নি। ৩১ বছর পর তিনি আবার ফিরে গেলেন একই উপন্যাসে। তত দিনে বদলে গেছে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্প, দর্শকের রুচি ও তারকাব্যবস্থা। দ্বিতীয় ‘দেবদাস’-এ নামভূমিকায় শাকিব খান, পার্বতী অপু বিশ্বাস, চন্দ্রমুখী মৌসুমী। ছবিটি মুক্তি পায় ২০১৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি। এ ছবির জন্য চন্দ্রমুখী চরিত্রে মৌসুমী জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা অভিনেত্রীর সম্মান পান। একই ছবির গানের জন্য রুনা লায়লা ও সাবিনা ইয়াসমীন যৌথভাবে সেরা নারী কণ্ঠশিল্পীর জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান। মৌসুমী একই চরিত্রের জন্য মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কারেও সেরা চলচ্চিত্র অভিনেত্রীর স্বীকৃতি পান।
বাংলাদেশের দুই ‘দেবদাস’ তাই শুধু একই উপন্যাসের দুটি চলচ্চিত্ররূপ নয়; দুই সময়ের ঢাকাই ছবিরও দলিল। একদিকে বুলবুল আহমেদ-কবরী-আনোয়ারার প্রজন্ম, অন্যদিকে শাকিব খান-অপু বিশ্বাস-মৌসুমীর প্রজন্ম। মাঝখানে তিন দশকের বেশি ব্যবধান, কিন্তু গল্প একই। একই পরিচালক নিজের চলচ্চিত্রজীবনের দুই ভিন্ন সময়ে একই উপন্যাসে ফিরেছেন—শরৎচন্দ্রর গল্পের দীর্ঘায়ু বোঝাতে বাংলাদেশের এ উদাহরণ তাই বিশেষ।

‘দেবদাস’ ছাড়াও হিন্দি সিনেমার শরৎচন্দ্র
হিন্দি চলচ্চিত্রে শরৎচন্দ্র মানেই শুধু ‘দেবদাস’ নয়। তাঁর বাঙালি চরিত্রগুলো বারবার সর্বভারতীয় সিনেমার চরিত্র হয়ে উঠেছে। ১৯৫৩ সালে বিমল রায় নির্মাণ করেন ‘পরিণীতা’। শেখর অশোক কুমার, ললিতা মীনা কুমারী। পরের বছর তাঁর পরিচালনায় আসে ‘বিরাজ বৌ’ অবলম্বনে ‘বিরাজ বহু’। বিরাজের চরিত্রে কামিনী কৌশল, নীলাম্বরের চরিত্রে অভি ভট্টাচার্য। অভিনয়ের জন্য ফিল্মফেয়ারে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার পান কামিনী কৌশল।
১৯৬৭ সালে হৃষিকেশ মুখোপাধ্যায় ‘মেজদিদি’ অবলম্বনে নির্মাণ করেন ‘মাঝলি দিদি’। অভিনয়ে মীনা কুমারী ও ধর্মেন্দ্র। ছবিটি ভারতের পক্ষ থেকে অস্কারের বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র বিভাগে পাঠানো হয়েছিল। চিত্রনাট্যের জন্য নবেন্দু ঘোষ পেয়েছিলেন ফিল্মফেয়ার পুরস্কার।
১৯৭৫ সালে শরৎচন্দ্রর ‘পণ্ডিতমশাই’ অবলম্বনে ‘খুশবু’ নির্মাণ করেন গুলজার। অভিনয়ে হেমা মালিনী ও জিতেন্দ্র। দুই বছর পর বাসু চট্টোপাধ্যায় নির্মাণ করেন ‘স্বামী’। অভিনয়ে শাবানা আজমি ও গিরিশ কারনাড। ছবিটির জন্য ১৯৭৮ সালে মরণোত্তর সেরা গল্পকারের ফিল্মফেয়ার পুরস্কার দেওয়া হয় শরৎচন্দ্রকে।
১৯৮০ সালে বাসু চট্টোপাধ্যায় আবার তাঁর কাছে ফিরলেন। এবার ‘নিষ্কৃতি’ অবলম্বনে ‘আপনে পরায়ে’। শাবানা আজমি, অমল পালেকার, উৎপল দত্ত ও গিরিশ কারনাড অভিনীত ছবিতে একান্নবর্তী পরিবারের সম্পর্ক ও টানাপোড়েন নতুন করে জায়গা পেল হিন্দি সিনেমায়। শরৎচন্দ্র তখন আর কেবল বাংলা চলচ্চিত্রের সাহিত্যিক নন, হিন্দি সিনেমার ইতিহাসেরও অংশ।

ললিতারও বারবার জন্ম
দেবদাসের মতো না হলেও ‘পরিণীতা’ও বারবার নতুন প্রজন্মের কাছে ফিরেছে। ১৯৪২ সালে বাংলায় ‘পরিণীতা’ নির্মাণ করেন পশুপতি চট্টোপাধ্যায়। ১৯৫৩ সালে বিমল রায়ের হিন্দি সংস্করণে ললিতা মীনা কুমারী, শেখর অশোক কুমার। ১৯৬৯ সালের বাংলা সংস্করণে শেখর সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, ললিতা মৌসুমী চট্টোপাধ্যায়। বাংলাদেশেও ‘পরিণীতা’ নির্মিত হয়েছে। ১৯৮৬ সালে আলমগীর কবির পরিচালিত ছবিতে শেখর ইলিয়াস কাঞ্চন, ললিতা অঞ্জনা।
তারপর ২০০৫ সালে প্রদীপ সরকারের ‘পরিণীতা’। ললিতার চরিত্রে বিদ্যা বালান, শেখর সাইফ আলী খান, গিরিন সঞ্জয় দত্ত। এই ছবি দিয়ে হিন্দি চলচ্চিত্রে নায়িকা হিসেবে বড় পর্দায় অভিষেক হয় বিদ্যা বালানের। পুরোনো কলকাতার আবহে নতুন প্রজন্মের দর্শকের কাছে আবার ফিরল শরৎচন্দ্রর ললিতা। ললিতার বয়স যেন বাড়ে না; শুধু তাঁকে অভিনয় করা অভিনেত্রীরা বদলে যান।

কানন দেবীর শরৎচন্দ্র
বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি কানন দেবী শুধু অভিনেত্রী ও গায়িকা হিসেবেই নন, প্রযোজক হিসেবেও বারবার ফিরে গেছেন শরৎচন্দ্রর কাছে। তাঁর শ্রীমতী পিকচার্সের ব্যানারে ১৯৫০ সালে তৈরি হয় ‘মেজদিদি’। নামভূমিকায় কানন দেবী। একই প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান থেকে পরে আসে শরৎচন্দ্রর কাহিনিনির্ভর আরও ছবি।
১৯৫৮ সালে কানন দেবীর প্রযোজনাতেই তৈরি হয় ‘রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত’। শরৎচন্দ্রর গল্পে একসঙ্গে এলেন বাংলা চলচ্চিত্রের সবচেয়ে জনপ্রিয় জুটিগুলোর একটি—উত্তমকুমার ও সুচিত্রা সেন। রাজলক্ষ্মী সুচিত্রা, শ্রীকান্ত উত্তম।
পরের বছর আসে ‘ইন্দ্রনাথ শ্রীকান্ত ও অন্নদাদিদি’; পরে ‘অভয়া ও শ্রীকান্ত’। একজন প্রযোজক বারবার একই সাহিত্যিকের কাছে ফিরে যাচ্ছেন—শরৎচন্দ্রর গল্পের পর্দা-আকর্ষণেরও প্রমাণ এটি।
উত্তম-সুচিত্রার শরৎচন্দ্র
বাংলা চলচ্চিত্রে উত্তমকুমার-সুচিত্রা সেন জুটিকে সাধারণত রোমান্টিক ছবির অনন্য প্রতীক হিসেবেই দেখা হয়। কিন্তু তাঁদের অভিনয়জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশজুড়ে আছেন শরৎচন্দ্রও। ১৯৫৭ সালের ‘চন্দ্রনাথ’-এ নামভূমিকায় উত্তমকুমার, সরযূ সুচিত্রা সেন। পরের বছর আসে ‘রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত’। হরিদাস ভট্টাচার্য পরিচালিত, কানন দেবীর শ্রীমতী পিকচার্স প্রযোজিত ছবিতে শ্রীকান্ত উত্তম, রাজলক্ষ্মী সুচিত্রা। পরিচিত নায়ক-নায়িকা সত্তার বাইরে এখানে পাওয়া যায় বিষণ্ন, পরিণত এক সম্পর্ক।
প্রায় এক দশক পর আবার শরৎচন্দ্রর কাছে ফিরলেন দুজন। ১৯৬৭ সালের ‘গৃহদাহ’-তে মহিম উত্তমকুমার, অচলা সুচিত্রা সেন। মৃণালের চরিত্রে সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়, সুরেশ প্রদীপ কুমার। সম্পর্ক, আকর্ষণ, বিবাহ ও মানসিক দ্বন্দ্বের গল্পে উত্তম-সুচিত্রার পরিচিত রসায়ন এখানে পেল ভিন্ন মাত্রা। এরপর ১৯৬৯ সালে ‘কমললতা’। কমললতা সুচিত্রা, শ্রীকান্ত আবার উত্তম। ‘রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত’র ১১ বছর পর শ্রীকান্ত হয়ে ফিরলেন উত্তম, তবে এবার তাঁর বিপরীতে রাজলক্ষ্মী নন, কমললতা। অর্থাৎ শরৎচন্দ্রর গল্পে উত্তম-সুচিত্রা একই ধরনের প্রেমিক-প্রেমিকা হয়ে আটকে থাকেননি। ‘চন্দ্রনাথ’-এ চন্দ্রনাথ-সরযূ, ‘রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত’-তে শ্রীকান্ত-রাজলক্ষ্মী, ‘গৃহদাহ’-তে মহিম-অচলা, ‘কমললতা’য় শ্রীকান্ত-কমললতা—প্রতিটি সম্পর্কের আবেগ ও সংকট আলাদা।
উত্তমকুমারের শরৎচন্দ্র-যাত্রা অবশ্য সুচিত্রাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ১৯৭২ সালে মনু সেন পরিচালিত ‘বিরাজ বৌ’-এ নীলাম্বরের চরিত্রে উত্তম, বিরাজ মাধবী মুখোপাধ্যায়।
আর ১৯৭৭ সালের ‘সব্যসাচী’ উত্তমের শরৎচন্দ্র-অভিনয়ে একেবারেই অন্য মাত্রা যোগ করে। পীযূষ বসু পরিচালিত ছবিটির উৎস শরৎচন্দ্রর রাজনৈতিক উপন্যাস ‘পথের দাবী’। নামভূমিকায় উত্তমকুমার। প্রেমিক নায়কের পরিচিত পরিসর থেকে বেরিয়ে এখানে তিনি বিপ্লবী সব্যসাচী।
অন্যদিকে উত্তমকে ছাড়াও শরৎচন্দ্রর অন্যতম স্মরণীয় নারী চরিত্র হয়েছেন সুচিত্রা। অজয় করের ১৯৭৬ সালের ‘দত্তা’য় বিজয়া তিনি, নরেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, রাসবিহারী উৎপল দত্ত।
শরৎচন্দ্রর সঙ্গে উত্তম-সুচিত্রার সম্পর্ক তাই শুধু কয়েকটি সাহিত্যনির্ভর ছবিতে অভিনয়ের হিসাব নয়। একই সাহিত্যিকের গল্পে বাংলা সিনেমার সবচেয়ে জনপ্রিয় জুটিকে দর্শক বারবার পেয়েছেন, কিন্তু প্রতিবারই আলাদা চরিত্র ও আলাদা সম্পর্কের মধ্যে।
৭২ বছর পরও বিজয়া
‘দত্তা’র প্রথম বাংলা চলচ্চিত্ররূপ আসে ১৯৫১ সালে। সৌমেন মুখোপাধ্যায় পরিচালিত ছবিতে বিজয়ার চরিত্রে সুনন্দা দেবী, নরেন পূর্ণেন্দু মুখোপাধ্যায়। ১৯৭৬ সালে অজয় কর আবার উপন্যাসটি নিয়ে ছবি করেন। এবার বিজয়া সুচিত্রা সেন, নরেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। এরও প্রায় অর্ধশতাব্দী পরে, ২০২৩ সালে আবার ‘দত্তা’। নির্মল চক্রবর্তী পরিচালিত ছবিতে বিজয়ার চরিত্রে ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত। ১৯৫১ থেকে ২০২৩—৭২ বছরের ব্যবধানে একই বিজয়া নতুন অভিনেত্রী, নতুন নির্মাতা ও নতুন দর্শকের সামনে ফিরে এসেছেন। শরৎচন্দ্রর গল্পের স্থায়িত্বের আরেকটি উদাহরণ।

শ্রীকান্তও পথচলা থামাননি
‘শ্রীকান্ত’ যেন শরৎচন্দ্রর সবচেয়ে ভ্রমণপিপাসু চরিত্র। উপন্যাসেই তাঁর জীবন এক জায়গায় থেমে থাকেনি; শৈশবের স্মৃতি, রাজলক্ষ্মী, অন্নদাদিদি, অভয়া, কমললতা—একেক পর্বে একেক মানুষ ও অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন তিনি। সেই বিস্তৃত কাহিনির সুবিধাই নিয়েছেন চলচ্চিত্র নির্মাতারা। পুরো ‘শ্রীকান্ত’ এক ছবিতে ধরার বদলে কখনো রাজলক্ষ্মী, কখনো অন্নদাদিদি, কখনো অভয়া, কখনো কমললতাকে কেন্দ্র করে আলাদা আলাদা চলচ্চিত্র তৈরি হয়েছে।
১৯৫৮ সালে হরিদাস ভট্টাচার্য পরিচালিত ‘রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত’-তে শ্রীকান্ত হন উত্তমকুমার, রাজলক্ষ্মী সুচিত্রা সেন। কানন দেবীর শ্রীমতী পিকচার্স প্রযোজিত ছবিটি শরৎচন্দ্রর ‘শ্রীকান্ত’ অবলম্বনে নির্মিত। পরের বছর একই প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ও একই পরিচালকের ‘ইন্দ্রনাথ শ্রীকান্ত ও অন্নদাদিদি’-তে উপন্যাসের অন্য অধ্যায় উঠে আসে পর্দায়। সেখানে অন্নদাদিদির চরিত্রে কানন দেবী, কিশোর শ্রীকান্ত সজল ঘোষ এবং ইন্দ্রনাথ পার্থপ্রতিম চৌধুরী।
এরপর ১৯৬৫ সালে হরিদাস ভট্টাচার্য নির্মাণ করেন ‘অভয়া ও শ্রীকান্ত’। এবার শ্রীকান্তর চরিত্রে বসন্ত চৌধুরী, অভয়া মালা সিনহা। অর্থাৎ সাত বছরের মধ্যে ‘শ্রীকান্ত’র তিনটি আলাদা পর্ব নিয়ে তিনটি চলচ্চিত্র তৈরি হলো; একই চরিত্র শ্রীকান্তও পেলেন আলাদা অভিনেতার মুখ।
১৯৬৯ সালে এল হরিসাধন দাশগুপ্ত পরিচালিত ‘কমললতা’। আবার শ্রীকান্ত হলেন উত্তমকুমার, কিন্তু এবার তাঁর সামনে রাজলক্ষ্মী নন, কমললতা। চরিত্রটিতে সুচিত্রা সেন। ১৯৫৮ সালের ‘রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত’র ১১ বছর পর একই উত্তম-সুচিত্রাকে দর্শক শরৎচন্দ্রর ‘শ্রীকান্ত’র জগতেই পেলেন, তবে সম্পর্ক ও চরিত্রের সমীকরণ সম্পূর্ণ আলাদা।
শ্রীকান্তর এই যাত্রায় বাংলাদেশেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ আছে। ১৯৮৭ সালে বুলবুল আহমেদ নির্মাণ করেন ‘রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্ত’। শ্রীকান্তর চরিত্রে ছিলেন বুলবুল আহমেদ নিজেই, রাজলক্ষ্মী শাবানা। সঙ্গে ছিলেন রাজ্জাক, প্রবীর মিত্র, নূতনসহ অনেকে। শরৎচন্দ্রর ‘শ্রীকান্ত’ অবলম্বনে নির্মিত ছবিটির চিত্রনাট্যও করেন বুলবুল আহমেদ। অর্থাৎ ‘দেবদাস’-এর মতো ‘শ্রীকান্ত’ও বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে পেয়েছে নিজস্ব পর্দারূপ।
টেলিভিশনেও শ্রীকান্তর পথচলা থামেনি। ১৯৮৭ সালে দূরদর্শনে প্রচারিত হিন্দি ধারাবাহিক ‘শ্রীকান্ত’-তে নামভূমিকায় ছিলেন ফারুক শেখ, রাজলক্ষ্মী সুজাতা মেহতা এবং অভয়া মৃণাল কুলকার্নি। ধারাবাহিকটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে পরবর্তী সময়ের ভারতীয় সিনেমার আরেক বড় অভিনেতার নাম—ইরফান খান। তখন ক্যারিয়ারের একেবারে শুরুর দিকে থাকা ইরফান অভিনয় করেছিলেন অভয়ার স্বামীর চরিত্রে।
নতুন শতাব্দীতেও শ্রীকান্তকে ছাড়েনি সিনেমা। ২০০৪ সালে অঞ্জন দাস নির্মাণ করেন ‘ইতি শ্রীকান্ত’। এবার শ্রীকান্ত আদিল হুসেইন, রাজলক্ষ্মী রিমা সেন, কমললতা সোহা আলী খান। ছবিটি শরৎচন্দ্রর ‘শ্রীকান্ত’ অবলম্বনেই নির্মিত। আগের চলচ্চিত্রগুলো যেখানে উপন্যাসের নির্দিষ্ট পর্ব বা নারী চরিত্রকে কেন্দ্র করে এগিয়েছে, অঞ্জন দাসের ছবিতে শ্রীকান্তর জীবনে রাজলক্ষ্মী ও কমললতার উপস্থিতি এবং তাঁর নিজের মানসিক টানাপোড়েনকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
ফলে ‘শ্রীকান্ত’র পর্দাযাত্রা এক অর্থে শরৎচন্দ্রর গল্পের অভিযোজনক্ষমতারও উদাহরণ। একই উপন্যাস থেকে কখনো ‘রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত’, কখনো ‘ইন্দ্রনাথ শ্রীকান্ত ও অন্নদাদিদি’, কখনো ‘অভয়া ও শ্রীকান্ত’, কখনো ‘কমললতা’, কখনো ‘রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্ত’, আবার কখনো ‘ইতি শ্রীকান্ত’—একেক নির্মাতা বেছে নিয়েছেন একেক অধ্যায় ও সম্পর্ক।
তারপরও যাত্রা শেষ হয়নি। সিনেমা ও টেলিভিশন পেরিয়ে নতুন শতকে শ্রীকান্ত পৌঁছে গেছেন ওটিটিতে। সেখানে আবার বদলেছে তাঁর সময়, পেশা, জীবনযাপন ও সম্পর্কের ভাষা—শরৎচন্দ্রর ভবঘুরে শ্রীকান্ত হয়ে উঠেছেন একেবারে নতুন সময়ের মানুষ।
নতুন শতকের শরৎচন্দ্র: এবার ওটিটিতে
শরৎচন্দ্রর গল্পের পর্দাযাত্রা সিনেমা হল বা টেলিভিশনেই থেমে থাকেনি। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের যুগেও নতুন প্রজন্মের নির্মাতারা ফিরে গেছেন তাঁর কাছে। তবে এবার অনেক ক্ষেত্রেই লক্ষ্য মূল উপন্যাসকে হুবহু পর্দায় তুলে আনা নয়; পরিচিত চরিত্র ও সম্পর্কের সূত্র রেখে গল্পকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে সমকালীন সমাজে। এর উল্লেখযোগ্য উদাহরণ ‘চরিত্রহীন’। শরৎচন্দ্রর এই উপন্যাস বাংলাদেশের চলচ্চিত্রেও এসেছে। ১৯৭৫ সালে বেবী ইসলাম একই নামে ছবি নির্মাণ করেন। অভিনয়ে ছিলেন মীনা খান, প্রবীর মিত্রসহ অনেকে। ছবিটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সংগীত পরিচালনা ও চিত্রগ্রহণ বিভাগে স্বীকৃতি পায়।
চার দশকের বেশি সময় পর ‘চরিত্রহীন’–কে নতুনভাবে আবিষ্কার করে বাংলা ওটিটি। ২০১৮ সালে হইচইয়ে শুরু হয় একই নামের ওয়েব সিরিজ। পরিচালক দেবালয় ভট্টাচার্য। শরৎচন্দ্রর উপন্যাসের কিরণময়ী, সতীশ, সাবিত্রী, উপেন্দ্রদের সূত্র থাকলেও গল্পটিকে নিয়ে যাওয়া হয় সমকালীন পৃথিবীতে।
কিরণময়ীর চরিত্রে নয়না গাঙ্গুলি, সতীশ সৌরভ দাস। বিভিন্ন মৌসুমে যুক্ত হন স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়, মুমতাজ সরকারসহ আরও অনেকে। একটি শতবর্ষের বেশি পুরোনো উপন্যাসকে ঘিরে সিরিজটি গড়ায় তিন মৌসুম পর্যন্ত। পরের মৌসুমগুলোতে অবশ্য মূল উপন্যাস থেকে দূরত্ব বাড়িয়ে চরিত্র ও গল্পের নতুন শাখাও তৈরি হয়েছে। শরৎচন্দ্র এখানে তাই শুধু অভিযোজনের লেখক নন, নতুন গল্প তৈরিরও সূচনাবিন্দু।
এরপর ২০২২ সালে হইচইয়ে এল ‘শ্রীকান্ত’। সানি ঘোষ রায় পরিচালিত ৯ পর্বের সিরিজটিকে প্ল্যাটফর্মটি শরৎচন্দ্রর উপন্যাসের আধুনিক ‘মিউজিক্যাল রিটেইলিং’ হিসেবে পরিচয় করিয়েছে।
শ্রীকান্ত এখানে আর আগের শতকের ভবঘুরে যুবক নন; সমকালীন সময়ের একজন ডিজাইনার। চরিত্রটিতে ঋষভ বসু। রাজলক্ষ্মী সোহিনী সরকার, অভয়া মধুমিতা সরকার। শ্রীকান্ত-রাজলক্ষ্মীর পুরোনো সম্পর্কের সূত্র ধরে গল্পকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বর্তমান সময়ের প্রেম ও সম্পর্কের জগতে।
এখানেই ওটিটিতে শরৎচন্দ্রর ফিরে আসার তাৎপর্য। পুরোনো অনেক চলচ্চিত্ররূপে মূল কাহিনি ও সময়কাল ধরে রাখার চেষ্টা ছিল। ডিজিটাল যুগের নির্মাতারা বরং প্রশ্ন করছেন—শ্রীকান্ত, রাজলক্ষ্মী, অভয়া কিংবা কিরণময়ী যদি আজকের মানুষ হতেন, তাঁদের জীবন কেমন হতো? একসময় শরৎচন্দ্রর চরিত্রদের দেখতে দর্শককে সিনেমা হলে যেতে হতো। পরে তাঁরা এলেন টেলিভিশনে। এখন ‘চরিত্রহীন’ কিংবা ‘শ্রীকান্ত’ দেখা যায় মুঠোফোনে।

কেন ফুরোয় না শরৎচন্দ্র
প্রশ্নটা তাই আসেই—শরৎচন্দ্রর গল্প কেন এতবার পর্দায় ফেরে? একটি কারণ তাঁর গল্পের দৃশ্যমানতা। কাহিনিতে ঘটনা আছে, নাটকীয়তা আছে, শক্তিশালী চরিত্র আছে, দ্বন্দ্ব আছে, আবেগ আছে। পাঠক অনেক সময় পড়তে পড়তেই যেন দৃশ্য দেখতে পান।
আরও বড় কারণ তাঁর চরিত্র। শরৎচন্দ্র যে সমাজের কথা লিখেছিলেন, সেই সমাজ অনেকটাই বদলে গেছে। বদলেছে পরিবার ও সামাজিক কাঠামো। কিন্তু প্রেম, প্রত্যাখ্যান, শ্রেণি বিভাজন, নারীর সামাজিক অবস্থান, পরিবারের সঙ্গে ব্যক্তিস্বাধীনতার সংঘাত কিংবা আত্মমর্যাদার প্রশ্ন কি শেষ হয়ে গেছে?
দেবদাস পার্বতীকে ভালোবাসেন, কিন্তু সময়মতো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। ললিতা ভালোবাসেন, কিন্তু তাঁর আত্মমর্যাদাও আছে। রাজলক্ষ্মীর প্রেমের সঙ্গে জড়িয়ে আছে নিজের পরিচয়ের লড়াই। বিজয়া, অচলা, মৃণাল কিংবা চন্দ্রমুখীরও আছে নিজস্ব অবস্থান। সময় বদলালেও তাই চরিত্রগুলোর আবেগ ও সংকট একেবারে অচেনা হয়ে যায় না।
এ জায়গাটিই ধরেছিলেন নির্মাতা প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য। ২০১৯ সালে শরৎচন্দ্রর ‘শ্রীকান্ত’–কে সমকালীন সময়ে এনে ‘রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত’ নির্মাণ করেন তিনি। ‘স্ক্রল ডট ইন’–কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে প্রদীপ্ত বলেন, উপন্যাসটি যেমন আছে, সেটিকে চলচ্চিত্রে হুবহু নকল করার অর্থ তিনি দেখেন না; তাঁর চলচ্চিত্র তাঁর নিজের কল্পনায় দেখা শ্রীকান্ত। চরিত্রগুলোকে নিজের মতো করে ভেঙেছেন তিনি। ছবির অনেক কিছুই এমনভাবে রাখতে চেয়েছেন, যেন ঘটনাগুলো যেকোনো শতকেই ঘটতে পারে। তাঁর আরও সরল ব্যাখ্যা—শ্রীকান্তর মতো ভবঘুরে মানুষ এখনো আছেন।
শরৎচন্দ্রর গল্পের এই সময় অতিক্রম করার ক্ষমতার কথা অন্যভাবে বলেছেন নির্মাতা অদিতি রায়ও। ২০২৪ সালে ‘পরিণীতা’–কে ওয়েব সিরিজে নিয়ে আসার সময় ‘দ্য টেলিগ্রাফ’–কে তিনি বলেন, এটি প্রেমের গল্প বলেই যেকোনো সময়ের জন্য প্রাসঙ্গিক। ভালোবাসার সঙ্গে রাগ, অভিমান ও সম্পর্কের টানাপোড়েন আগেও ছিল, এখনো আছে; হয়তো সম্পর্কের প্রকৃতি বদলেছে। শরৎচন্দ্রর নারী চরিত্রের মধ্যেও তিনি স্বাধীনতার বোধ খুঁজে পান। তাঁর চোখে ললিতা শুধু কষ্ট সহ্য করে যাওয়া নারী নন; প্রয়োজন হলে তিনি নিজের পথও তৈরি করে নেন।
সম্ভবত এ কারণেই একই চরিত্রকে একেক সময়ের নির্মাতা একেকভাবে দেখতে পারেন। বিমল রায়ের ‘দেবদাস’ সংযত ও বিষণ্ন। সঞ্জয় লীলা বানসালির ‘দেবদাস’ রং, সংগীত ও বিশাল আয়োজনের আবেগময় প্রদর্শনী। অনুরাগ কশ্যপের ‘দেব.ডি’ একই গল্পের ভিত ব্যবহার করে একুশ শতকের প্রেম, যৌনতা ও আত্মধ্বংসের গল্প।
ওটিটির ‘শ্রীকান্ত’ কিংবা ‘চরিত্রহীন’ আবার দেখিয়ে দিয়েছে, চরিত্রের পোশাক, পেশা, জীবনযাপন, এমনকি চারপাশের পৃথিবী বদলে দিয়েও শরৎচন্দ্রকে নতুন প্রজন্মের কাছে নিয়ে যাওয়া যায়।
সম্ভবত এখানেই শরৎচন্দ্রর পর্দায় টিকে থাকার রহস্য। সময় বদলায়, চরিত্রের মুখ বদলায়, বদলে যায় গল্প বলার মাধ্যম। কিন্তু মানুষের প্রেম, অভিমান, আকাঙ্ক্ষা, আত্মমর্যাদা আর সম্পর্কের সংঘাত থেকে যায়। সেই চেনা অনুভূতিগুলোই নতুন সময়ের নির্মাতাদের শরৎচন্দ্রর কাছে বারবার ফিরিয়ে আনে।
মানুষের প্রেম, বিরহ, সংসার, দারিদ্র্য, সামাজিক বৈষম্য, নারীর অবস্থান, ব্যক্তিস্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা—জটিল বিষয়গুলো তিনি বলেছেন সহজ গল্পে। আর সেই গল্পে আছে দৃশ্য, নাটকীয়তা, আবেগ ও মনে রাখার মতো চরিত্র।

দেড় শ বছরেও পর্দা ছাড়েননি
শরৎচন্দ্রর জন্ম ১৮৭৬ সালে, মৃত্যু ১৯৩৮ সালে। অথচ তাঁর চরিত্ররা এখনো পর্দার মানুষ। ১৯২৮ সালের নির্বাক ‘দেবদাস’ থেকে ২০২৩ সালের ‘দত্তা’—তাঁর পর্দাযাত্রাও প্রায় এক শতাব্দীর। এর মধ্যে বদলে গেছে ভারতীয় উপমহাদেশ, বদলেছে সমাজ, বদলেছে সিনেমা।
অভিনেতাদের মুখ বদলেছে। নির্বাক পর্দা কথা বলতে শিখেছে। সাদা–কালো সিনেমা রঙিন হয়েছে। সিনেমা হলের পাশে এসেছে টেলিভিশন, কম্পিউটার, স্মার্টফোন ও ওটিটি। তবু দেবদাস আবার প্রেমে পড়েছেন, আবার হারিয়েছেন পার্বতীকে। ললিতা আবার দাঁড়িয়েছেন শেখরের সামনে। রাজলক্ষ্মীর সঙ্গে আবার দেখা হয়েছে শ্রীকান্তর। নতুন মুখ নিয়ে বিজয়া আবার ফিরেছেন পর্দায়।
সবচেয়ে বিস্ময়কর হলো, নতুন প্রজন্ম শুধু পুরোনো শরৎচন্দ্রকে পুনর্নির্মাণ করছে না, নিজেদের সময়ের মতো করে তাঁকে নতুন করে আবিষ্কার করছে। প্রমথেশ বড়ুয়া থেকে বিমল রায়, উত্তম-সুচিত্রা থেকে শাহরুখ-ঐশ্বরিয়া-মাধুরী, বুলবুল-কবরী থেকে শাকিব-অপু-মৌসুমী, সেখান থেকে ওটিটির ‘শ্রীকান্ত’—প্রজন্মের পর প্রজন্ম বদলে গেছে । শরৎচন্দ্র থেকে গেছেন। জন্মের ১৫০ বছর পূর্ণ হলো তাঁর। কিন্তু পর্দায় তাঁর গল্পের বয়স যেন এখনো বাড়েনি। দেড় শ বছরেও তাই পর্দা ছাড়েননি শরৎচন্দ্র।
শরীয়তপুরের কাজীরহাট এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মাস্টার মোস্তফা কাজীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, প্রভাব খাটানো ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হন মোস্তফা কাজী। এরপর থেকে এলাকায় বিভিন্ন জমি দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৬ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে কাজীরহাট বাজারের দোকানপ্রতি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা কাজী। এছাড়া কয়েক মাস আগে কাজীরহাটে একটি দোকান ক্রয়ের সময় ব্যবসায়ী সুমন তপাদারের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী আরও জানান, বি. কে. নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলামের কাছ থেকেও ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন মানুষকে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় ফেলে হয়রানি করার অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন মোস্তফা কাজী। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির ব্যানারে তার কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন অনেকে। এছাড়া বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি নিজ ভগ্নিপতি সিদ্দিক দেওয়ানের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোস্তফা কাজীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সচেতন মহল বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
ইউরোপের রাজধানী ব্রাসেলসে আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা জোরালো করা। এই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত আছেন। গত বছরের শুরু থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের কারণে সারা ইউরোপ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ইউরোপীয় নেতারা এখন যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরিতে কাজ করছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, “আমরা যুদ্ধের মানবিক সংকট বুঝতে পারি এবং এখন আমাদের দায়িত্ব এটি দ্রুত শেষ করার পথ খোঁজা। আমাদের প্রত্যেকের জন্যই শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।” এই বৈঠকে অস্ত্রবিরতি চুক্তি, যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলো যুদ্ধ সমাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এগুলো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ক্রমবর্ধমান পরীক্ষার চাপ এবং পরিবারের পাশাপাশি সমাজের অযৌক্তিক প্রত্যাশা। এ দুটি কারণ মিলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বেড়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা। ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করা যেন শিক্ষার্থীর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ—সব জায়গা থেকেই উচ্চ ফলাফলের প্রত্যাশা তৈরি করছে মানসিক চাপের একটি অব্যক্ত বলয়। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইহান কবির বলেন, “পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে মনে হয়, শুধু আমি না, আমার পুরো পরিবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এটা সহ্য করা খুব কঠিন।” শুধু রাইহান নয়, দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা একই অভিজ্ঞতার কথা বলছে। সামাজিক চাপ ও তুলনার সংস্কৃতি পরিস্থিতি করছে আরও জটিল পরীক্ষার নম্বর নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এখন তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া গর্ব বা অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কোন কলেজে ভর্তি হলো, কে কতো পেল—এসব তুলনার চাপে পড়াশোনার আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা তাবাসসুম বলেন, “প্রত্যাশা থাকা ভালো, কিন্তু তা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায় এবং একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব সক্ষমতা উপেক্ষা করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়। এ থেকেই জন্ম নেয় আত্মগ্লানি, হতাশা এবং মাঝে মাঝে আত্মহননের চিন্তা।” জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ নিয়মিত মানসিক চাপে থাকে। এর মধ্যে ১২ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগে এবং বড় একটি অংশ কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই দিন পার করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে ক্ষতিকর। সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, এবং পরিবারের ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ এই সমস্যার নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম হয়, সেখানে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাকে কেবল ফলাফলের সীমায় না এনে একটি মানবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা চাপ নয়, ভালোবাসা থেকে শিখবে, এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ প্রজন্ম।
বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কৃষিখাতকে চরমভাবে আঘাত করছে। অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘদিন খরা এবং হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ফসল উৎপাদনে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে। চলতি মৌসুমেই অনেক জেলায় ধান, গম, ভুট্টা এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, একদিকে যেমন আবহাওয়ার আচরণ বুঝে ওঠা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সারের দাম, কীটনাশক ও বীজের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পোকার আক্রমণ ও রোগবালাইয়ের হারও বেড়ে গেছে। এই চাপে পড়ে অনেক কৃষকই ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা। তাদের পক্ষে বারবার ক্ষতির ধাক্কা সামলে উঠে আবার নতুনভাবে চাষাবাদ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো অঞ্চলে দেখা গেছে, কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী ফসল বাদ দিয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ ও লাভজনক অন্য চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমানেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। একইসঙ্গে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে এমন জাত ও পদ্ধতি উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে যা কঠিন জলবায়ু পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কৃষি খাতকে সচল রাখা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে এখনই পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
কলম্বোর সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাব ময়দানে চলমান দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে ব্যাট হাতে আবারও ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের। টস জিতে ব্যাট করতে নেমে প্রথম ইনিংসে টাইগাররা সংগ্রহ করে মাত্র ২২০ রান, যেখানে ব্যতিক্রম ছিলেন কেবল শোয়াড ইসলাম (৪৬), মুশফিকুর রহিম (৩৫) ও লিটন দাস (৩৪)। শ্রীলঙ্কার বোলাররা শুরু থেকেই চাপ সৃষ্টি করে রাখে। ডেবিউ করা স্পিনার সোনাল দিনুষা ৩ উইকেট নিয়ে আলো ছড়ান, আর আসিথা ফার্নান্দো ও বিষ্ণু ফার্নান্দো নেন ২টি করে উইকেট। প্রথম ইনিংসের জবাবে দ্বিতীয় দিন সকালে শ্রীলঙ্কা উদ্বোধনী জুটি থেকে ভালো সূচনা পায়। ১৩.১ ওভারে কোন উইকেট না হারিয়ে সংগ্রহ করেছে ৬২ রান। ওপেনার পাথুম নিসান্কা ৩৩ এবং লাহিরু উদারা ২৮ রানে অপরাজিত রয়েছেন। বাংলাদেশের হয়ে তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ বোলিং শুরু করলেও এখনও পর্যন্ত সাফল্যের দেখা মেলেনি। শ্রীলঙ্কা এখনো বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস থেকে ১৫৮ রানে পিছিয়ে আছে, হাতে রয়েছে সকল উইকেট। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে প্রভাব এই টেস্টটি ২০২৩-২৫ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ হওয়ায় দুই দলের জন্যই পয়েন্টের লড়াই গুরুত্বপূর্ণ। সিরিজের প্রথম টেস্টে পরাজিত হওয়ায় বাংলাদেশ সিরিজে টিকে থাকতে হলে এই ম্যাচ জিততেই হবে। পরবর্তী চ্যালেঞ্জ স্লো পিচে বাংলাদেশ বোলারদের আরও পরিকল্পিত বোলিং করতে হবে। দ্রুত উইকেট তুলে না নিতে পারলে শ্রীলঙ্কা বড় লিড নিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে দেবে টাইগারদের। ফিল্ডিংয়ে মনোযোগ এবং টাইট বোলিংয়ের মাধ্যমেই দ্বিতীয় ইনিংসে নিজেদের ফিরে পাওয়ার আশায় বাংলাদেশ। সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড (দিন ২, প্রথম সেশন পর্যন্ত): বাংলাদেশ (১ম ইনিংস): ২২০/১০ শ্রীলঙ্কা (১ম ইনিংস): ৬২/০ (১৩.১ ওভার) নিসান্কা: ৩৩*, উদারা: ২৮* বাংলাদেশ বোলার: তাইজুল, মিরাজ – উইকেটহীন
রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, কৃষিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের যথেচ্ছ ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে কৃষকসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে আরও সচেতন হতে হবে। তিনি বলেন, অধিকমাত্রায় ও অপ্রয়োজনীয় রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে মাটির স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের দীর্ঘমেয়াদি ভয়াবহ ক্ষতি হচ্ছে। রাষ্ট্রপতি এ ব্যাপারে কৃষকদের সজাগ ও সতর্ক করতে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান। বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) দুপুরে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে তিনি এসব কথা বলেন। সাক্ষাৎকালে রাষ্ট্রপতি টেকসই ও আধুনিক কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে গবেষণালব্ধ প্রযুক্তির মাঠপর্যায়ে কার্যকর প্রয়োগ, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, এবং পরিবেশবান্ধব কৃষি চর্চার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি কৃষি শিক্ষা, গবেষণা ও সম্প্রসারণ কার্যক্রমের মধ্যে আরও নিবিড় সমন্বয় প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান। এসময় রাষ্ট্রপতিকে শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. মো. আব্দুল লতিফের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদল বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক কার্যক্রম সম্পর্কে অবহিত করেন। সাক্ষাৎকালে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের সচিবরা উপস্থিত ছিলেন। কেএইচ/এমআইএইচএস
ইয়েমেনে সৌদি আরবের একটি এফ–১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবি করেছে হুতিরা। ইরানপন্থী হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি আজ বুধবার এ দাবি করেন। এক বিবৃতিতে ইয়াহিয়া সারি বলেন, ইয়েমেনের মারিব এলাকায় ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য একটি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে সৌদি আরবের যুদ্ধবিমানটি ভূপাতিত করা হয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্রটি স্থানীয়ভাবে নির্মিত।
‘মন্ট্রিল প্রটোকলের’ সফল বাস্তবায়নে বিশ্বব্যাপী ওজোনস্তরের ক্ষয়রোধ ও এটি পুনরুদ্ধার হচ্ছে, যা ২০৪০ সালের মধ্যে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারে। তবে সিএফসি ও এইচএফসির মতো ক্ষতিকর গ্যাসের অপ্রত্যাশিত নির্গমনে ওজোনস্তর স্বাভাবিক হতে বিলম্ব হতে পারে।বিশ্ব ওজোন দিবস আজ। এ পৃথিবীর প্রাণ ও প্রকৃতির জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ ওজোনস্তরের ক্ষয় এবং এটির ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে বিশ্বজুড়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে প্রতিবছর ১৬ সেপ্টেম্বর দিবসটি পালন করা হয়।ওজোনস্তরের গুরুত্ব, এটির ক্ষয়জনিত ঝুঁকি ও পরিবেশ রক্ষায় করণীয় বিষয়গুলো সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরাই দিবসটি পালনের মূল উদ্দেশ্য।পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের ওজোনস্তর ধ্বংসকারী উপাদানগুলোর উপস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও কমানোর লক্ষ্যে ১৯৮৭ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর ‘মন্ট্রিল প্রটোকল’ সই হয়েছিল। ঐতিহাসিক এ উদ্যোগের কথা স্মরণে রেখে ১৯৯৪ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ১৬ সেপ্টেম্বরকে ‘আন্তর্জাতিক ওজোনস্তর সুরক্ষা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে।ওয়ার্ল্ড মিটিওরোলজিক্যাল অর্গানাইজেশন বা বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) আজ বুধবার আন্তর্জাতিক ওজোনস্তর সুরক্ষা দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ওজোনস্তর পুনরুদ্ধারে দারুণ কিছু সাফল্যের কথা তুলে ধরেছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জের কথাও বলা হয়েছে।ডব্লিউএমওর তথ্য অনুযায়ী, গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে অ্যান্টার্কটিক ওজোন গহ্বরটি গত কয়েক দশকের মধ্যে আকারে সবচেয়ে ছোটগুলোর একটি ছিল। ১৯৯২ সালে ওজোনস্তর ক্ষয়ের মারাত্মক চিত্র বিজ্ঞানীদের সামনে চলে আসে। এর পর থেকে যতবার ওজোন গহ্বর মাপা হয়েছে, তার মধ্যে গত বছরের গহ্বরটি ছিল তালিকায় চতুর্থ বা পঞ্চম ক্ষুদ্রতম।এ নিয়ে টানা দ্বিতীয় বছর বিজ্ঞানীরা ওজোন গহ্বরের আকার ১৯৯০ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত স্বাভাবিক গড়ের চেয়ে ছোট আকার দেখতে পেলেন। এর অর্থ, ওজোনস্তরের ক্ষত দিন দিন সেরে উঠছে।‘মন্ট্রিল প্রটোকল’ সফলভাবে বাস্তবায়িত হওয়ার কারণে ওজোনস্তর এখন পুনরুদ্ধারের পথে রয়েছে। বিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিক মূল্যায়ন বলছে, এটি আনুমানিক ২০৪০ সালের মধ্যে ১৯৮০ সালের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারে।বছরভিত্তিক এ পরিবর্তনের পেছনে আবহাওয়া বড় ভূমিকা পালন করছে বলে ধারণা করা হয়। ওজোনস্তর গহ্বরের আকারে এ ধরনের ওঠানামা মূলত এটি স্বাভাবিক হয়ে ওঠার দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়ারই একটি অংশ।এ প্রবণতা প্রমাণ করে যে ওজোন ক্ষয়কারী পদার্থের বিরুদ্ধে ‘মন্ট্রিল প্রটোকল’ দারুণভাবে সফল হয়েছে। অতীতে ফ্রিজ কিংবা অগ্নিনির্বাপক ফোমে যে ক্লোরোফ্লোরোকার্বন বা সিএফসি ব্যবহার করা হতো, এ চুক্তির মাধ্যমে তা সফলভাবে পর্যায়ক্রমে অনেকটাই কমিয়ে আনা গেছে।ডব্লিউএমওর মহাসচিব সেলেস্তে সাউলো এ পরিস্থিতিকে এক ‘বড় পরিবেশগত সাফল্য’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, ২০০০ সাল থেকে পৃথিবীর ওজোনস্তর আবার ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। ডব্লিউএমও আশা প্রকাশ করেছে, আগামী কয়েক দশকের মধ্যে এ স্তর পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে উঠবে।আগে আগুন নেভাতে অগ্নিনির্বাপক ফোমে ক্লোরোফ্লোরোকার্বন বা সিএফসি ব্যবহার করা হতো। এ গ্যাস ওজোনস্তরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকরডব্লিউএমও গ্লোবাল অ্যাটমোস্ফিয়ার ওয়াচ নেটওয়ার্ক নিয়মিতভাবে ওজোনস্তরের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে ও গবেষকদের নির্ভরযোগ্য তথ্য দিয়ে সহায়তা করে।বায়ুমণ্ডলে থাকা ওজোন গ্যাসের প্রায় ৯০ শতাংশই ভূপৃষ্ঠের প্রায় ১৫ থেকে ৩৫ কিলোমিটার ওপরে অবস্থিত স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার স্তর বা স্ট্র্যাটোমণ্ডলে থাকে।বিজ্ঞানীরা বলছেন, বায়ুমণ্ডলে থাকা সব ওজোনকে যদি পৃথিবীপৃষ্ঠে এনে এক জায়গায় স্তর হিসেবে তৈরি করা যেত, তবে পুরো পৃথিবীজুড়ে সে স্তরের পুরুত্ব হতো মাত্র ৩ মিলিমিটারের মতো। অথচ এ অত্যন্ত পাতলা স্তরই সূর্য থেকে আসা ক্ষতিকর অতিবেগুনি বা ইউভি রশ্মির বড় একটি অংশ শোষণ করে নেয়। এ স্তরটি না থাকলে পৃথিবীতে জীবনের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা কঠিন হতো।নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি থেকে ইউরোপের কিছু অঞ্চলে অতিবেগুনি রশ্মির বিকিরণ প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। গবেষকেরা দেখেছেন, ওজোনস্তর ক্ষয়ে যাওয়া এবং আকাশে মেঘের পরিমাণ কমে যাওয়ার কারণে মূলত এমনটি ঘটে।মানুষ বেশি সময় অতিবেগুনি রশ্মির সংস্পর্শে এলে ত্বকের ক্যানসারসহ বিভিন্ন গুরুতর রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেকটা বেড়ে যায়।ডব্লিউএমওর বুলেটিনে বলা হয়েছে, ক্রমবর্ধমান এ ঝুঁকির কারণে এখন লক্ষ্যভিত্তিক ও কার্যকর ইউভি সুরক্ষাব্যবস্থা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।‘গ্লোবাল অ্যাকশন ফর এ কুলার প্ল্যানেট’ এ বছর বিশ্ব ওজোন দিবসের প্রতিপাদ্য হলো, ‘গ্লোবাল অ্যাকশন ফর এ কুলার প্ল্যানেট’ বা পৃথিবীকে শীতল রাখতে বৈশ্বিক উদ্যোগ।১৯৮৭ সালের ‘মন্ট্রিল প্রটোকলে’ ওজোন ক্ষয়কারী উপাদানগুলো নিষিদ্ধ করা হয় এবং সেসব উপাদানের ব্যবহার কমিয়ে আনতে বেশ কিছু কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।গত প্রায় চার দশকের বায়ুমণ্ডলীয় পরিমাপ বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা দেখেছেন, বায়ুমণ্ডলে নিষিদ্ধ সেসব ওজোন ক্ষয়কারী পদার্থের উপস্থিতি বেশ কমেছে। এর মধ্যেও কিছু অপ্রত্যাশিত নির্গমন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেমন ২০১৮ সাল পর্যন্ত সিএফসি-১১ ও মাঝেমধ্যে হাইড্রোফ্লোরোকার্বন (এইচএফসি)-২৩ গ্যাসের অপ্রত্যাশিত নির্গমন লক্ষ করা গেছে।এ ধরনের অপ্রত্যাশিত ঘটনা রোধ করতে ও সরকারি নীতিনির্ধারকদের সঠিক পদক্ষেপ নিতে সহায়তা করতে বায়ুমণ্ডলের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।ওজোন বুলেটিনে বর্তমান পর্যবেক্ষণব্যবস্থার কাঠামোর প্রতিও দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। আগে এ ধরনের পর্যবেক্ষণে প্রধানত ডবসন ও ব্রুওয়ার স্পেকট্রোফটোমিটার ব্যবহার করা হতো।কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, ২০০০ সালের শুরুর দিকে যেখানে প্রায় ১৩০টি সক্রিয় স্টেশন ছিল, তা কমে এখন ১১০টিতে ঠেকেছে। বিশেষত, যেসব অঞ্চলে ওজোন পর্যবেক্ষণ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, প্রায়ই দেখা যায় সেসব এলাকার স্টেশনগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।তবে বর্তমানে নতুন প্রজন্মের অ্যারে স্পেকট্রোমিটারের ব্যবহার বাড়ছে। এগুলোর মূল লক্ষ্য, স্ট্র্যাটোমণ্ডলের ওজোন পর্যবেক্ষণ করা নয়, বরং বাতাসের গুণমান বা বায়ুদূষণ পরিমাপ করা।মন্ট্রিল প্রটোকলের সফল বাস্তবায়নে ওজোনস্তর এখন পুনরুদ্ধারের পথে রয়েছে। বিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিক মূল্যায়ন বলছে, গড় হিসাবে সারা পৃথিবীর ওজোনস্তর আনুমানিক ২০৪০ সালের মধ্যে ১৯৮০ সালের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারে। অবশ্য আর্কটিক অঞ্চলে এটি ২০৪৫ সাল ও অ্যান্টার্কটিকে ২০৬৬ সাল পর্যন্ত লেগে যেতে পারে।২০০৫ সাল থেকে ক্ষয়ের প্রবণতা কমে যাওয়ার পেছনে ওজোনস্তরের ঘুরে দাঁড়ানোর প্রমাণ স্যাটেলাইট ডেটা ও মডেল সিমুলেশনে স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছে। তবে এর পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জও রয়ে গেছে। শিল্পকারখানায় কাঁচামাল বা ফিডস্টক হিসেবে যেসব রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়, তার অবশিষ্টাংশ থেকে ওজোন ক্ষয়কারী উপাদানের নির্গমন বেড়েছে।গবেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, এসব উপাদানের অতিরিক্ত নির্গমনের ফলে মধ্য অক্ষাংশে ওজোনস্তর স্বাভাবিক হতে প্রায় ৭ বছর দেরি হতে পারে। পরিস্থিতি সাপেক্ষে এ বিলম্বের সময় ৬ থেকে ১১ বছরে গড়াতে পারে।ইন্দোনেশিয়ায় বায়ুর গুণমান মাপার একটি যন্ত্রওজোনস্তরের ক্ষয় নিয়ে বিজ্ঞানীদের দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি তথ্য দিয়ে শেষ করা যাক। বিজ্ঞানীরা বলেছেন, বায়ুমণ্ডল থেকে একটিমাত্র ক্লোরিন পরমাণু পুরোপুরি হারিয়ে যাওয়ার আগে সেটি ১ লাখের বেশি ওজোন অণু ধ্বংস করতে পারে।তাই পরিবেশবিদেরা মনে করেন, ওজোনস্তর রক্ষায় চলমান আন্তর্জাতিক লড়াইয়ে কোনো ধরনের শিথিলতার সুযোগ নেই।{তথ্যসূত্র: ডয়চে ভেলে ও ওয়ার্ল্ড মিটিওরোলজিক্যাল অর্গানাইজেশন}ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যই ওজোনস্তর রক্ষা করা জরুরি