কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে বিশ্বজুড়ে যখন চাকরি হারানোর শঙ্কা বাড়ছে, প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ও গবেষক সানি মো. আশরাফ খান দেখছেন ভিন্ন এক সম্ভাবনা। তাঁর মতে, সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে এআই বাংলাদেশের কর্মশক্তিকে প্রতিস্থাপন নয়, বরং বহুগুণ বেশি উৎপাদনশীল করে তুলতে পারে। দুই দশকের বেশি সময় ধরে প্রযুক্তি, ডিজিটাল রূপান্তর ও মানবসম্পদ উন্নয়নে কাজ করছেন আশরাফ খান। ২০০৮ সালে ইনফ্রাটেক কনসালট্যান্টস লিমিটেড প্রতিষ্ঠা করেন; বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির ভাইস চেয়ারম্যান। এআই-সক্ষম জনশক্তি, এজেন্টিক এআই, ভার্চ্যুয়াল রেমিট্যান্স এবং ভবিষ্যতের শিক্ষা নিয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন সানি মো. আশরাফ খান। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন রাহিতুল ইসলাম।
অনেক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান বলছে, এআই ও অটোমেশন বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে বিপুলসংখ্যক চাকরি কমিয়ে দিতে পারে। আপনিও কি এই আশঙ্কা করেন?
সানি মো. আশরাফ খান: আশঙ্কাটি একেবারে অমূলক নয়। আমরা যদি কিছু না করি, অটোমেশন অবশ্যই কিছু প্রচলিত কাজের প্রয়োজন কমিয়ে দেবে। কিন্তু প্রযুক্তির ইতিহাস বলছে, প্রযুক্তি শুধু কাজ বিলুপ্ত করে না; কাজের ধরনও বদলে দেয়। তাই আসল প্রশ্ন এআই আসবে কি না, সেটি নয়। এআই তো এরই মধ্যে এসে গেছে। প্রশ্ন হলো, আমাদের মানুষ কি এর জন্য প্রস্তুত?
আমরা যদি কর্মশক্তিকে এআই-সক্ষম করে তুলতে পারি, তাহলে যে কর্মী আজ প্রযুক্তির কারণে চাকরি হারানোর ভয় পাচ্ছেন, তিনিই আগামী দিনে অনেক বেশি উৎপাদনশীল হয়ে উঠতে পারেন। একজন এআই-সক্ষম কর্মী অনেক ক্ষেত্রে আগে ৫ বা ১০ জন মিলে যে কাজ করতেন, তার বড় অংশ একাই করতে পারবেন। আমাদের লক্ষ্য তাই মেশিনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা নয়; মেশিনকে কাজে লাগানোর সক্ষমতা তৈরি করা।
‘এআই-সক্ষম জনশক্তি’ বলতে আপনি ঠিক কী বোঝাচ্ছেন?
সানি মো. আশরাফ খান: একসময় কম্পিউটার জানা আলাদা দক্ষতা ছিল। পরে সেটি প্রায় সব পেশার অংশ হয়ে গেছে। এআইয়ের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটবে। একজন দরজি এআই দিয়ে পোশাকের নকশা তৈরি ও বাজার বিশ্লেষণ করতে পারেন। একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা উৎপাদন পরিকল্পনা, হিসাব, বিপণন কিংবা বিদেশি ক্রেতা খুঁজতে এআই ব্যবহার করতে পারেন। একজন তরুণ কোডিংয়ে বিশেষজ্ঞ না হয়েও এআইয়ের সহায়তায় অ্যাপ্লিকেশন তৈরি করতে পারেন। আমরা দীর্ঘদিন প্রযুক্তি আমদানি করেছি। এখন আমার ভাবনা হলো, এআই যুগে বাংলাদেশের অন্যতম বড় রপ্তানি সক্ষমতা হওয়া উচিত এআই-সক্ষম মানবসম্পদ। বিশ্বে দক্ষ মানুষের চাহিদা থাকবে, কিন্তু দক্ষতার সংজ্ঞা বদলে যাবে। বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠীকে যদি এখনই সেই নতুন দক্ষতায় তৈরি করতে পারি, তাহলে আমাদের সামনে বিশাল বৈশ্বিক বাজার রয়েছে।
আপনার প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে সরকারি ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছে। সেই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের মানবসম্পদ সম্পর্কে আপনাকে কী শিখিয়েছে?
সানি মো. আশরাফ খান: সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো বাংলাদেশে মেধার অভাব নেই, সুযোগে প্রবেশের পথের অভাব আছে। আমাদের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যেসব কর্মসূচির নকশা ও বাস্তবায়নে আমি নেতৃত্ব দিয়েছি, সেগুলোতে সাড়ে ৩২ হাজারের বেশি মানুষ বিভিন্ন ধরনের দক্ষতা প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় ৯ হাজার তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবী এবং ৪ হাজারের বেশি মোবাইল অ্যাপ ডেভেলপার রয়েছেন। আমরা সব সময় একটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়েছি, প্রশিক্ষণই শেষ কথা নয়; প্রশিক্ষণের পর আয় হচ্ছে কি না, সেটিই আসল। বিশ্বব্যাংক অর্থায়িত কর্মসূচির মাধ্যমে ১ হাজারের বেশি স্টার্টআপকে সহায়তা এবং তিন হাজারের বেশি উদ্যোক্তাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, যাঁদের ৩৬ শতাংশ নারী। আমার অভিজ্ঞতা হলো, একজন সাধারণ তরুণকে যদি বাস্তব দক্ষতা, বাজার এবং আয়ের একটি পরিষ্কার পথ দেখানো যায়, তিনি নিজের জীবন নিজেই বদলে দিতে পারেন। তাই আমি মনে করি, মানবসম্পদ উন্নয়ন কোনো সামাজিক ব্যয় নয়; এটি একটি দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক বিনিয়োগ।

আমরা এখন জেনারেটিভ এআই নিয়ে কথা বলছি, কিন্তু এর পরের ধাপ কী?
সানি মো. আশরাফ খান: আমার কাছে মনে হয়, এখানেই পরবর্তী বড় পরিবর্তনটি ঘটবে। আমরা এখন যে এআই ব্যবহার করছি, তাকে সাধারণত একটি প্রশ্ন করি বা নির্দেশনা দিই সে উত্তর দেয়, লেখা তৈরি করে, ছবি বানায়, কোড লেখে কিংবা বিশ্লেষণ করে। পরবর্তী ধাপ হচ্ছে এজেন্টিক এআই; অর্থাৎ এআই শুধু আমাকে বলবে না কী করতে হবে, আমার অনুমতি ও নির্ধারিত সীমার মধ্যে আমার হয়ে কাজও করবে। ধরুন, আমি বললাম, আগামী সপ্তাহে আমাকে থাইল্যান্ড যেতে হবে। আজকের এআই আমাকে ফ্লাইট ও হোটেলের তালিকা দিতে পারে। ভবিষ্যতের এআই এজেন্ট আমার পছন্দ জানবে, ক্যালেন্ডার দেখবে, ফ্লাইট খুঁজবে, হোটেল তুলনা করবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন অ্যাপ্লিকেশন ও ডিজিটাল সেবা ব্যবহার করে পুরো কাজটি এগিয়ে নেবে। গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বা লেনদেনে আমার অনুমোদন থাকবে, কিন্তু প্রতিটি ধাপে আমাকে নিজে বসে কাজ করতে হবে না। এআই তার পরিবেশ ও স্ক্রিন বুঝে বিভিন্ন টুল ব্যবহার করে ব্যবহারকারীকে সহায়তা করতে পারে। বড় পরিবর্তনটি হলো আজ আমরা সফটওয়্যার চালাই; আগামী দিনে এআই আমাদের হয়ে সফটওয়্যার চালাবে। একজন মানুষকে হয়তো এখন পাঁচটি অ্যাপ খুলে ২০টি ধাপ অনুসরণ করে একটি কাজ করতে হয়। ভবিষ্যতে তিনি শুধু তাঁর লক্ষ্যটি বলবেন। তাঁর এআই এজেন্ট প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন সফটওয়্যার, তথ্য ও ডিজিটাল সেবা ব্যবহার করে কাজটি সম্পন্ন করার চেষ্টা করবে। তখন একজন মানুষের উৎপাদনশীলতার সংজ্ঞাই বদলে যাবে। তাই আমাদের তরুণদের শুধু এআই ব্যবহার শেখালে হবে না; এআই এজেন্ট তৈরি, পরিচালনা ও কাজে লাগানোও শেখাতে হবে। ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতা শুধু মানুষ বনাম এআই নয়; বরং এআই ব্যবহারকারী একজন মানুষ বনাম দক্ষভাবে একাধিক এআই এজেন্ট পরিচালনা করতে সক্ষম আরেকজন মানুষের মধ্যেও হতে পারে।
বিশ্বজুড়ে কয়েকজন এআই গবেষক চাকরি ছেড়ে সতর্ক করছেন, ভবিষ্যতে এআই মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে, এমনকি মানবজাতির জন্য বিপজ্জনকও হতে পারে। এসব খবর সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয় তৈরি করছে। আমাদের কি সত্যিই এআইকে ভয় পাওয়া উচিত?
সানি মো. আশরাফ খান: দেখুন, এআইয়ের ঝুঁকি বোঝার জন্য ভবিষ্যতে কী হবে, তার জন্য অপেক্ষা করতে হবে না। এআই দিয়ে প্রতারণা হচ্ছে, ভুয়া ছবি-ভিডিও ও খবর তৈরি হচ্ছে, সাইবার অপরাধ হচ্ছে—এমনকি ভুল তথ্য দিয়ে মানুষের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার চেষ্টা হচ্ছে—এসব আমরা এর মধ্যেই দেখছি। তাই শুধু ‘একদিন এআই মানুষকে মেরে ফেলবে কি না’, এই ভয় নিয়ে আলোচনা করলে আজকের বাস্তব সমস্যাগুলোই আড়ালে পড়ে যাবে। আমি বিষয়টিকে গাড়ির সঙ্গে তুলনা করি। গাড়ি যেমন আমাদের জীবন অনেক সহজ করেছে, তেমনি গাড়ি দিয়ে দুর্ঘটনাও ঘটে। তাই আমরা গাড়ি নিষিদ্ধ করিনি। আমরা ব্রেক বানিয়েছি, ট্রাফিক আইন করেছি, ড্রাইভিং লাইসেন্স করেছি, সিটবেল্ট দিয়েছি। এআইয়ের ক্ষেত্রেও আমাদের ঠিক এটাই করতে হবে—প্রযুক্তি বন্ধ করা নয়, প্রযুক্তির সঙ্গে তার নিরাপত্তার ব্যবস্থাও তৈরি করা। যেসব গবেষক সতর্ক করছেন, তাঁদের মূল উদ্বেগটা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁরা বলছেন না যে আজকের এআই কাল সকালেই মানুষকে মেরে ফেলবে। প্রশ্নটা হচ্ছে, আগামী দিনের এআই যখন আরও শক্তিশালী হবে এবং মানুষের হয়ে নিজে নিজে কাজ করতে পারবে, তখন আমরা তার ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ কীভাবে নিশ্চিত করব? ধরুন, আজ আমি এআইকে একটি প্রশ্ন করি, সে আমাকে উত্তর দেয়। কিন্তু আমরা যে এজেন্টিক এআইয়ের দিকে যাচ্ছি, সেখানে আমি তাকে একটি কাজ দেব, আর সে আমার হয়ে বিভিন্ন সফটওয়্যার ব্যবহার করবে, তথ্য খুঁজবে, সিদ্ধান্তের অপশন তৈরি করবে এবং অনেক কাজ নিজেই এগিয়ে নেবে। তখন তাকে কতটুকু স্বাধীনতা দেওয়া হবে, কোথায় সে থামবে এবং কোন সিদ্ধান্তে মানুষের অনুমতি অবশ্যই লাগবে—এই প্রশ্নগুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমার মতে, আমাদের এআইকে ভয় পাওয়া উচিত নয়; কিন্তু এআইকে হালকাভাবেও নেওয়া উচিত নয়।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় ভুল হবে ভয় পেয়ে এআই থেকে দূরে থাকা। তাহলে অন্য দেশ যখন এআই দিয়ে তাদের মানুষের উৎপাদনশীলতা বাড়াবে, আমরা পিছিয়ে পড়ব। তাই আমাদের তরুণদের শুধু ‘এআই কীভাবে ব্যবহার করতে হয়’ শেখালে হবে না। তাঁদের এটাও শেখাতে হবে, কখন এআইয়ের কথা বিশ্বাস করতে হবে, কখন যাচাই করতে হবে, কোন কাজ এআইকে দেওয়া যাবে এবং কোন সিদ্ধান্ত মানুষের হাতেই রাখতে হবে।
তাহলে এআই ও এজেন্টিক এআইয়ের যুগে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাও কি আমূল বদলাতে হবে?
সানি মো. আশরাফ খান: অবশ্যই। আমাদের প্রচলিত শিক্ষা এখনো অনেকাংশে পরীক্ষা করে আপনি কী জানেন বা কতটা মনে রাখতে পেরেছেন। ভবিষ্যতের শিক্ষা পরীক্ষা করবে আপনি কী করতে পারেন, কী তৈরি করতে পারেন এবং কোন সমস্যার সমাধান করতে পারেন। এআইয়ের যুগে তথ্যের অভাব নেই। কয়েক সেকেন্ডেই তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। তাই শুধু তথ্য মনে রাখার মূল্য কমবে; তথ্যকে কাজে লাগানোর সক্ষমতার মূল্য বাড়বে। শিক্ষাব্যবস্থাকে তাই ‘ডিগ্রি আগে, দক্ষতা পরে’, এই ধারণা থেকে বের হতে হবে। ভবিষ্যতের শিক্ষা হবে ব্যক্তিকেন্দ্রিকও। একই ক্লাসে ৫০ জনকে একইভাবে শেখানোর পরিবর্তে এআই একজন শিক্ষার্থীর ভাষা, সক্ষমতা ও শেখার গতির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারবে।
কিন্তু ভবিষ্যতের এমন শিক্ষা মডেল বাংলাদেশ থেকেই কেন তৈরি হবে? উন্নত দেশগুলো তো প্রযুক্তিতে অনেক এগিয়ে।
সানি মো. আশরাফ খান: কারণ, আমাদের প্রয়োজনটা অনেক বেশি। আমাদের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী আছে, সীমিত সম্পদ আছে এবং দ্রুত কর্মসংস্থান তৈরির প্রয়োজন আছে। এই সীমাবদ্ধতাই আমাদের উদ্ভাবনে বাধ্য করবে। যখন লাখ লাখ মানুষকে কম খরচে, মুঠোফোনে, বিভিন্ন ভাষায় এবং সীমিত ইন্টারনেট সংযোগের মধ্যেও শেখাতে হবে, তখন এমন একটি শিক্ষা মডেল তৈরি করতে হবে, যা হবে সহজ, সাশ্রয়ী, প্রযুক্তিনির্ভর এবং ফলাফলমুখী। আমরা এরই মধ্যে বড় পরিসরে ডিজিটাল দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি। এখন সেই অভিজ্ঞতার সঙ্গে এআই যুক্ত করার সময় এসেছে। আমি বিশ্বাস করি, ভবিষ্যতের শিক্ষার একটি কার্যকর মডেল বাংলাদেশে তৈরি হয়ে একদিন অন্য দেশেও রপ্তানি হতে পারে।

যাঁরা প্রচলিত শিক্ষায় পিছিয়ে পড়েছেন, স্কুল থেকে ঝরে পড়া কিংবা তুলনামূলক কম দক্ষ তরুণ, এআই কি তাঁদের আরও পিছিয়ে দেবে?
সানি মো. আশরাফ খান: আমি বরং এখানেই এআইয়ের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা দেখি। আগে একটি অ্যাপ বানাতে হলে প্রোগ্রামিং জানতে হতো। এখন একজন মানুষ তাঁর প্রয়োজনটি সাধারণ ভাষায় ব্যাখ্যা করেও এআইয়ের সাহায্যে একটি অ্যাপ তৈরির অনেকটা কাজ করতে পারেন। যিনি ডিজাইনার নন, তিনিও ডিজাইন করতে পারছেন। মার্কেটিং না পড়েও একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এআইয়ের সহায়তায় ডিজিটাল প্রচারণা চালাতে পারছেন। অর্থাৎ এআই দক্ষতা অর্জনের প্রবেশদ্বারটাকে অনেক নিচে নামিয়ে দিচ্ছে। সঠিক প্রশিক্ষণ ও দিকনির্দেশনা দিতে পারলে প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় পিছিয়ে থাকা একজন তরুণও এআই ব্যবহার করে উৎপাদনশীল মানুষ হয়ে উঠতে পারেন। আমার কাছে এটাই এআইয়ের সবচেয়ে বড় সামাজিক সম্ভাবনাগুলোর একটি।
কিন্তু রোবট ও অটোমেশনের কারণে কারখানায় যদি মানুষের প্রয়োজন কমে যায়, তাহলে নতুন কর্মসংস্থান আসবে কোথা থেকে?
সানি মো. আশরাফ খান: পুনরাবৃত্তিমূলক কিছু কাজে মানুষের প্রয়োজন অবশ্যই কমবে। কিন্তু একই সঙ্গে এমন মানুষের চাহিদা বাড়বে, যাঁরা মেশিন চালাতে, রক্ষণাবেক্ষণ করতে, প্রোগ্রাম করতে, উন্নত করতে এবং নতুন পণ্য ডিজাইন করতে পারবেন। ভবিষ্যতে একটি বাড়িও ছোট একটি অর্থনৈতিক ইউনিট হতে পারে। আমার কাছে ভবিষ্যতের শিল্পায়ন শুধু বড় কারখানা নয়, প্রযুক্তির মাধ্যমে উৎপাদনক্ষম মানুষের সংখ্যা বাড়ানো।
আপনার সাম্প্রতিক গবেষণায় ‘ভার্চ্যুয়াল রেমিট্যান্স’ ধারণাটি এসেছে। বিষয়টি কী?
সানি মো. আশরাফ খান: আমরা রেমিট্যান্স বলতে সাধারণত বুঝি, একজন মানুষ দেশ ছেড়ে বিদেশে যাবেন, সেখানে কাজ করবেন, তারপর দেশে টাকা পাঠাবেন। ভার্চ্যুয়াল রেমিট্যান্স হলো, মানুষটি বাংলাদেশেই থাকবেন, কিন্তু তাঁর আয় আসবে বিদেশ থেকে। ডিজিটাল দক্ষতায় প্রশিক্ষিত ১ হাজার ৬০০ তরুণকে নিয়ে আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে, ৮৫ শতাংশ ঘরে বসে কাজ করছেন, ৯০ শতাংশের বেশি কাজের জন্য শহরে স্থানান্তর এড়াতে পেরেছেন এবং প্রায় ৩৫ শতাংশ ইতোমধ্যে বিদেশি ক্লায়েন্টের কাজ করছেন।
রাজশাহীর একজন তরুণ যদি ইউরোপের প্রতিষ্ঠানের ডিজাইন করেন কিংবা বরিশালে বসে কেউ উত্তর আমেরিকার প্রতিষ্ঠানের ডিজিটাল মার্কেটিং করেন, সেটিও তো বৈদেশিক আয়।
পার্থক্য হলো, তাঁকে দেশ ছাড়তে হচ্ছে না, পরিবার ছাড়তে হচ্ছে না। আমরা যদি বিদেশে কর্মী পাঠানোর মতোই পরিকল্পিতভাবে ডিজিটাল কর্মী তৈরির জাতীয় ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারি, তাহলে ডিজিটাল বা ভার্চ্যুয়াল রেমিট্যান্স একসময় বাংলাদেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হয়ে উঠতে পারে।
আপনি প্রতিটি পরিবারকে ডিজিটাল অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করার কথা বলেন। এটি কি বাস্তবে সম্ভব?
সানি মো. আশরাফ খান: আমার লক্ষ্য খুব সহজ, বাংলাদেশের প্রতিটি পরিবারে অন্তত একজন মানুষ যেন ডিজিটাল অর্থনীতি থেকে আয় করেন। একটি পরিবারের একজন সদস্য যখন অনলাইনে আয় করেন, তখন পুরো পরিবারের প্রযুক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বদলে যায়। পরবর্তী প্রজন্ম তখন প্রযুক্তিকে শুধু বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে দেখে না; আয় ও কর্মসংস্থানের মাধ্যম হিসেবেও দেখে। এটি করতে হলে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট, সহজ আন্তর্জাতিক পেমেন্ট ব্যবস্থা, স্থানীয় ডিজিটাল হাব ও ইনকিউবেটর এবং গ্রামীণ ডিজিটাল উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ অর্থায়ন প্রয়োজন। একসময় রাস্তা সেতু অর্থনীতির অবকাঠামো ছিল; এখন ইন্টারনেট, ডিজিটাল পেমেন্ট ও দক্ষতাও অর্থনীতির অবকাঠামো।
তাহলে সরকার, শিল্প খাত ও বিশ্ববিদ্যালয়ের এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ কী?
সানি মো. আশরাফ খান: তিন পক্ষকে একই লক্ষ্যে কাজ করতে হবে। সরকারকে এআই-সক্ষম মানবসম্পদ ও ডিজিটাল রেমিট্যান্সকে জাতীয় অর্থনৈতিক সক্ষমতা হিসেবে দেখতে হবে। প্রশিক্ষণের সাফল্য শুধু কতজন প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, তা দিয়ে নয়; কতজন আয় বা কর্মসংস্থানে যুক্ত হয়েছেন, সেটি দিয়ে পরিমাপ করতে হবে। শিল্প খাতকে প্রশিক্ষণের নকশায় সরাসরি যুক্ত করতে হবে। কারণ, আগামী তিন বা পাঁচ বছরে কোন দক্ষতার প্রয়োজন হবে, সেটি বাজারই সবচেয়ে ভালো বলতে পারে। আর বিশ্ববিদ্যালয়কে এমন স্নাতক তৈরি করতে হবে, যিনি শুধু কোনো বিষয় ব্যাখ্যা করতে পারবেন না, বাস্তবে কিছু তৈরি করতে পারবেন। সরকার, শিল্প ও শিক্ষা—এই তিন জায়গা একসঙ্গে পরিবর্তিত হলে এআইয়ের অভিঘাতকে বাংলাদেশ বড় অর্থনৈতিক সুযোগে রূপান্তর করতে পারে।
এআই যুগের বাংলাদেশ নিয়ে আপনার স্বপ্ন এক বাক্যে কী?
সানি মো. আশরাফ খান: আমরা যেন শুধু ভবিষ্যৎ আমদানি না করি, ভবিষ্যৎ তৈরিও করি, এমন একটি এআই–সক্ষম প্রজন্ম গড়ে তুলি। যেখানে প্রতিটি পরিবার থেকে অন্তত একজন ডিজিটাল অর্থনীতিতে আয় করবেন এবং বাংলাদেশ দেখাবে, একটি উন্নয়নশীল দেশও ভবিষ্যতের জন্য মানুষ তৈরিতে বিশ্বকে পথ দেখাতে পারে।
আপনাকে ধন্যবাদ।
সানি মো. আশরাফ খান: আপনাকেও ধন্যবাদ।
শরীয়তপুরের কাজীরহাট এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মাস্টার মোস্তফা কাজীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, প্রভাব খাটানো ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হন মোস্তফা কাজী। এরপর থেকে এলাকায় বিভিন্ন জমি দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৬ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে কাজীরহাট বাজারের দোকানপ্রতি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা কাজী। এছাড়া কয়েক মাস আগে কাজীরহাটে একটি দোকান ক্রয়ের সময় ব্যবসায়ী সুমন তপাদারের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী আরও জানান, বি. কে. নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলামের কাছ থেকেও ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন মানুষকে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় ফেলে হয়রানি করার অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন মোস্তফা কাজী। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির ব্যানারে তার কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন অনেকে। এছাড়া বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি নিজ ভগ্নিপতি সিদ্দিক দেওয়ানের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোস্তফা কাজীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সচেতন মহল বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
ইউরোপের রাজধানী ব্রাসেলসে আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা জোরালো করা। এই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত আছেন। গত বছরের শুরু থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের কারণে সারা ইউরোপ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ইউরোপীয় নেতারা এখন যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরিতে কাজ করছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, “আমরা যুদ্ধের মানবিক সংকট বুঝতে পারি এবং এখন আমাদের দায়িত্ব এটি দ্রুত শেষ করার পথ খোঁজা। আমাদের প্রত্যেকের জন্যই শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।” এই বৈঠকে অস্ত্রবিরতি চুক্তি, যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলো যুদ্ধ সমাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এগুলো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ক্রমবর্ধমান পরীক্ষার চাপ এবং পরিবারের পাশাপাশি সমাজের অযৌক্তিক প্রত্যাশা। এ দুটি কারণ মিলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বেড়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা। ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করা যেন শিক্ষার্থীর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ—সব জায়গা থেকেই উচ্চ ফলাফলের প্রত্যাশা তৈরি করছে মানসিক চাপের একটি অব্যক্ত বলয়। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইহান কবির বলেন, “পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে মনে হয়, শুধু আমি না, আমার পুরো পরিবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এটা সহ্য করা খুব কঠিন।” শুধু রাইহান নয়, দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা একই অভিজ্ঞতার কথা বলছে। সামাজিক চাপ ও তুলনার সংস্কৃতি পরিস্থিতি করছে আরও জটিল পরীক্ষার নম্বর নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এখন তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া গর্ব বা অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কোন কলেজে ভর্তি হলো, কে কতো পেল—এসব তুলনার চাপে পড়াশোনার আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা তাবাসসুম বলেন, “প্রত্যাশা থাকা ভালো, কিন্তু তা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায় এবং একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব সক্ষমতা উপেক্ষা করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়। এ থেকেই জন্ম নেয় আত্মগ্লানি, হতাশা এবং মাঝে মাঝে আত্মহননের চিন্তা।” জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ নিয়মিত মানসিক চাপে থাকে। এর মধ্যে ১২ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগে এবং বড় একটি অংশ কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই দিন পার করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে ক্ষতিকর। সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, এবং পরিবারের ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ এই সমস্যার নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম হয়, সেখানে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাকে কেবল ফলাফলের সীমায় না এনে একটি মানবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা চাপ নয়, ভালোবাসা থেকে শিখবে, এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ প্রজন্ম।
বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কৃষিখাতকে চরমভাবে আঘাত করছে। অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘদিন খরা এবং হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ফসল উৎপাদনে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে। চলতি মৌসুমেই অনেক জেলায় ধান, গম, ভুট্টা এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, একদিকে যেমন আবহাওয়ার আচরণ বুঝে ওঠা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সারের দাম, কীটনাশক ও বীজের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পোকার আক্রমণ ও রোগবালাইয়ের হারও বেড়ে গেছে। এই চাপে পড়ে অনেক কৃষকই ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা। তাদের পক্ষে বারবার ক্ষতির ধাক্কা সামলে উঠে আবার নতুনভাবে চাষাবাদ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো অঞ্চলে দেখা গেছে, কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী ফসল বাদ দিয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ ও লাভজনক অন্য চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমানেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। একইসঙ্গে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে এমন জাত ও পদ্ধতি উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে যা কঠিন জলবায়ু পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কৃষি খাতকে সচল রাখা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে এখনই পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
কলম্বোর সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাব ময়দানে চলমান দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে ব্যাট হাতে আবারও ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের। টস জিতে ব্যাট করতে নেমে প্রথম ইনিংসে টাইগাররা সংগ্রহ করে মাত্র ২২০ রান, যেখানে ব্যতিক্রম ছিলেন কেবল শোয়াড ইসলাম (৪৬), মুশফিকুর রহিম (৩৫) ও লিটন দাস (৩৪)। শ্রীলঙ্কার বোলাররা শুরু থেকেই চাপ সৃষ্টি করে রাখে। ডেবিউ করা স্পিনার সোনাল দিনুষা ৩ উইকেট নিয়ে আলো ছড়ান, আর আসিথা ফার্নান্দো ও বিষ্ণু ফার্নান্দো নেন ২টি করে উইকেট। প্রথম ইনিংসের জবাবে দ্বিতীয় দিন সকালে শ্রীলঙ্কা উদ্বোধনী জুটি থেকে ভালো সূচনা পায়। ১৩.১ ওভারে কোন উইকেট না হারিয়ে সংগ্রহ করেছে ৬২ রান। ওপেনার পাথুম নিসান্কা ৩৩ এবং লাহিরু উদারা ২৮ রানে অপরাজিত রয়েছেন। বাংলাদেশের হয়ে তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ বোলিং শুরু করলেও এখনও পর্যন্ত সাফল্যের দেখা মেলেনি। শ্রীলঙ্কা এখনো বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস থেকে ১৫৮ রানে পিছিয়ে আছে, হাতে রয়েছে সকল উইকেট। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে প্রভাব এই টেস্টটি ২০২৩-২৫ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ হওয়ায় দুই দলের জন্যই পয়েন্টের লড়াই গুরুত্বপূর্ণ। সিরিজের প্রথম টেস্টে পরাজিত হওয়ায় বাংলাদেশ সিরিজে টিকে থাকতে হলে এই ম্যাচ জিততেই হবে। পরবর্তী চ্যালেঞ্জ স্লো পিচে বাংলাদেশ বোলারদের আরও পরিকল্পিত বোলিং করতে হবে। দ্রুত উইকেট তুলে না নিতে পারলে শ্রীলঙ্কা বড় লিড নিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে দেবে টাইগারদের। ফিল্ডিংয়ে মনোযোগ এবং টাইট বোলিংয়ের মাধ্যমেই দ্বিতীয় ইনিংসে নিজেদের ফিরে পাওয়ার আশায় বাংলাদেশ। সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড (দিন ২, প্রথম সেশন পর্যন্ত): বাংলাদেশ (১ম ইনিংস): ২২০/১০ শ্রীলঙ্কা (১ম ইনিংস): ৬২/০ (১৩.১ ওভার) নিসান্কা: ৩৩*, উদারা: ২৮* বাংলাদেশ বোলার: তাইজুল, মিরাজ – উইকেটহীন
এই শহরে অতীতকে জাদুঘর নয়, দেখা যায় নানাভাবে। এ শহর নিজেই গল্পকথক। বলে চলে এক রাজার গল্প। এক সাম্রাজ্যের গল্প। এক সভ্যতার গল্প। আর সারা বিশ্ব সেটাই শোনে সবিস্ময়ে।রাত গভীর। রাজপ্রাসাদের চারপাশে নিস্তব্ধতা। দূরে কোথাও প্রহরীর পায়ের শব্দ। বিশাল কক্ষের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন চীনের প্রথম সম্রাট কিন শি হুয়াং। পাশে তাঁর রানি। সম্রাটের কাঁধে আলতোভাবে হাত ছুঁয়ে রানি জানতে চাইলেন— —ঘুম আসছে না, সম্রাট? —ভাবছি, আমি চলে গেলে আমার সাম্রাজ্যের কী হবে। —সাম্রাজ্য কি কখনো চিরকাল থাকে? —সাম্রাজ্য হয়তো থাকবে না। কিন্তু আমি থাকব। —কীভাবে! —আমার সেনাবাহিনী থাকবে আমার সাথে। —মৃত্যুর পর! —হ্যাঁ। আমার সৈন্য থাকবে। হাজার হাজার সৈন্য। ঘোড়া থাকবে, রথ থাকবে, অস্ত্র থাকবে। ওরা মৃত্যুর পরও আমাকে পাহারা দেবে। —আর যদি কেউ ওদের অস্তিত্ব জানতে পারে? —তাহলে ওরা জানবে একদিন এক সম্রাট ছিল, যে মৃত্যুকেও সাম্রাজ্যের শেষ বলে মানেনি।ইতিহাসে এমন কোনো কথোপকথনের উল্লেখ নেই। তবু কয়েক হাজার বছর পর শিয়ানের মাটির নিচে দাঁড়িয়ে থাকা টেরাকোটা আর্মির দিকে তাকিয়ে মনে হলো, সম্রাটের এই কথোপকথন হয়তো সময়ের ভেতর কোথাও জমে আছে। ওই রাতে সম্রাট হয়তো জানতেন না একদিন তাঁর সাম্রাজ্য থাকবে না, প্রাসাদ থাকবে না; কিন্তু তাঁর মাটির সৈন্যরা পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে মানুষকে টেনে আনবে তাঁর হারিয়ে যাওয়া রাজধানী চাংআনে। ওই একই টানে আমারও আগমন চীনের শিয়ানে।এভাবে আজও আছে কিন শি হুয়াং আর্মিরাটেরাকোটা আর্মি এক অপার বিস্ময়এই শহরে অতীতকে শুধু জাদুঘরের কাচের ভেতর দেখতে হয় না; হাঁটতে হাঁটতে, খেতে খেতে, ঘণ্টাধ্বনি শুনতে শুনতে তাকে অনুভব করা যায়। বহু রাজবংশের রাজধানী ছিল এই শহর। বিশেষ করে হান ও তাং আমলে চাংআন ছিল চীনা সভ্যতার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র এবং সিল্ক রোডের পূর্ব প্রান্তের এক গুরুত্বপূর্ণ নগর।বিশাল হলঘরে প্রবেশমাত্রই চোখে পড়ে মাটিরঙা এক বিস্তৃত সমুদ্র। একটু পর বোঝা যায় ওগুলো সৈন্য। সারি সারি সৈন্য। হাজার হাজার। কারও হাতে অস্ত্র, কেউ অশ্বারোহী, কোথাও রথের অবশিষ্টাংশ। ওরা যেন সামনে তাকিয়ে আছে যুদ্ধের নির্দেশের অপেক্ষায়। কারও মুখে কঠোরতা, কারও মুখে অদ্ভুত স্থিরতা। আশ্চর্যের বিষয়, এত সৈন্যের মধ্যে প্রায় প্রত্যেকের মুখের গড়ন আলাদা।এত বছর ধরে থেকে গেছে মাটির নিচেটেরাকোটা আর্মির একাংশখ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকে কিন শি হুয়াং চীনের বিচ্ছিন্ন রাজ্যগুলোকে একত্র করে প্রথম ঐক্যবদ্ধ সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর মৃত্যুর পরও যেন সাম্রাজ্যের নিরাপত্তা অক্ষুণ্ন থাকে, এই বিশ্বাস থেকেই তাঁর সম্ভাব্য সমাধিস্থলকে ঘিরে তৈরি হয়েছিল বিশাল এক ভূগর্ভস্থ জগৎ। টেরাকোটা আর্মি ছিল ওই জগতের সামরিক বাহিনী।অথচ এই বাহিনী যে একদিন আবার পৃথিবীর আলো দেখবে, তা হয়তো কেউ ভাবেনি। ভূগর্ভস্থ এত বড় একটি সেনাবাহিনী কয়েক শতাব্দী নয়, দুই হাজার বছর ধরে চাপা পড়ে ছিল। ১৯৭৪ সালে স্থানীয় কৃষকেরা কূপ খনন করতে গিয়ে মাটির নিচে একটি টেরাকোটা মাথা খুঁজে পান। সেই একটি মাথা ভাঙিয়ে দিল সৈন্যদের হাজার বছরের ঘুম। সৈন্যগুলোর দিকে তাকিয়ে মনে হলো রানি যদি আজ এখানে আসতেন, তিনি হয়তো একটু হেসেই সম্রাটকে বলতেন, ‘দেখেছ? তোমার স্বপ্ন সত্যি হয়েছে। তোমার সৈন্যরা সত্যিই রয়ে গেছে।’রাজা, রাজ্যপাট নেই বটে, তবু আছে তার প্রহরীরাআজ সম্রাট নেই। সাম্রাজ্য নেই। সেই পৃথিবীও নেই। শুধু সময়ের পাহারায় দাঁড়িয়ে আছে সম্রাটের মাটির সেনাবাহিনী। সম্রাট হয়তো মৃত্যুর পরে তাঁর সাম্রাজ্যকে সঙ্গে নিতে পারেননি। কিন্তু তাঁর মাটির সৈন্যরা তাঁকে বাঁচিয়ে রেখেছে। তাঁর তৈরি সৈন্যদের সামনে দাঁড়িয়ে আমরা এখনো তাঁকে নিয়ে গল্প করি। এটাই তো অমরত্ব!কোলাহলে মুখর প্রাঙ্গণে টেরাকোটা আর্মির নীরবতা পেছনে ফেলে শহরে ফিরতেই দেখি শিয়ানের অন্য রূপ। চারপাশ ব্যস্ত। গাড়ি ছুটছে, মানুষ হাঁটছে, দোকানপাটে আলো জ্বলছে। এই আধুনিক কোলাহলের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে কয়েক শতাব্দী পুরোনো স্থাপনা; বেল টাওয়ার।মিং রাজবংশের সময় ১৩৮৪ সালে নির্মিত বেল টাওয়ারমিং রাজবংশের সময় ১৩৮৪ সালে নির্মিত বেল টাওয়ার প্রথমে অন্য জায়গায় ছিল। পরে ১৫৮২ সালে বর্তমান অবস্থানে সরিয়ে আনা হয়। একসময় এটি শহরের দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। ভোরে বেল টাওয়ারের ঘণ্টা শুনে হতো দিনের শুরু, আর সন্ধ্যায় ড্রাম টাওয়ারের ঢাক ঘোষণা করত দিনের সমাপ্তি। এখন ওই দায়িত্ব ঘড়ি আর মুঠোফোনের। এই স্থাপনা এখন সময় জানায় না, বরং সময়কে মনে করিয়ে দেয়।এই স্থাপনা শুরুতে অন্য জায়গায় ছিলচারপাশে বেশ ভিড়। অনেকেই চীনা ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে ছবি তুলছে। লম্বা পোশাক, সাজানো চুল, হাতে পাখা। যেন মিং বা তাং রাজবংশের কোনো চরিত্র। একদিকে প্রাচীন স্থাপত্য, অন্যদিকে ঐতিহ্যবাহী পোশাক আর ক্যামেরার ওপাশে দাঁড়িয়ে বর্তমানের একজন পথিক। একই ফ্রেমে তিনটি যুগ!বিকেলের শেষ আলোয় উঠে পড়লাম শিয়ানের প্রাচীন নগরপ্রাচীরে। বর্তমান প্রাচীরটি মিং রাজবংশের আমলে নির্মিত হলেও এর ভেতরে রয়েছে আরও পুরোনো তাং আমলের স্মৃতি। প্রায় ১৩ দশমিক ৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই বিশাল প্রাচীর একসময় শহরকে রক্ষা করত। এই দেয়াল দেখেছে রাজবংশের উত্থান-পতন। একসময় যার কাজ ছিল শহরকে শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করা, আজ সেই একই প্রাচীরের ওপর মানুষ হাঁটে, সাইকেল চালায়, ছবি তোলে, সূর্যাস্ত দেখে।ইতিহাসের সাক্ষী শিয়ানের এই প্রাচীন নগরপ্রাচীরসিটি ওয়ালের ইটের গায়ে জমে আছে অসংখ্য গল্পসূর্য পশ্চিমে ঢলে পড়ছে। পুরোনো ইটের গায়ে দিনের শেষ আলো। সোনালি আভায় প্রাচীরের ইটগুলো আরও পুরোনো দেখায়। এই ইটের গায়ে নিশ্চয়ই অনেক গল্প জমে আছে। সম্রাট, সৈন্য, ব্যবসায়ী, পথিক, যুদ্ধ আর শান্তির গল্প। প্রাচীরের ওপর থেকে পুরোনো ও নতুন শিয়ান পাশাপাশি দেখা যায়। নিচে আধুনিক রাস্তা, গাড়ির স্রোত, উঁচু ভবন; আর আমি দাঁড়িয়ে কয়েক শতাব্দী পুরোনো ইটের ওপর।রাত নামতেই চলে গেলাম মুসলিম কোয়ার্টারে। সরু রাস্তা। দুই পাশে অসংখ্য খাবারের দোকান। মানুষের ভিড়। দোকানের আলো। গ্রিলের ধোঁয়া। আর বাতাসে ভেসে বেড়ানো জিরা, মরিচ আর মাংসের গন্ধ। কোথাও কাঠিতে গেঁথে আগুনের ওপর সেঁকা হচ্ছে মাংস। কোথাও চওড়া ‘বিয়াং-বিয়াং’ নুডলস তৈরি হচ্ছে, কোথাও গোল রুটির ভেতর মাংসের পুর। দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে খাবারের গন্ধ নিতে নিতে মনে হয় সিল্ক রোড শুধু রেশম আর মসলা বহন করেনি; বহন করেছে মানুষের স্বাদ, ভাষা আর সংস্কৃতিও।শিয়ানের মুসলিমদের ইতিহাস বেশ পুরনোশিয়ানের মুসলিম সম্প্রদায়ের ইতিহাস সিল্ক রোডের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। তাং যুগ থেকেই মধ্য এশিয়া, পারস্য ও পশ্চিম এশিয়া থেকে ব্যবসায়ী ও ভ্রমণকারীরা চাংআনে আসতেন। তাঁদের অনেকেই এখানে বসতি গড়েন। সেই দীর্ঘ সাংস্কৃতিক বিনিময়ের জীবন্ত উত্তরাধিকার আজকের মুসলিম কোয়ার্টার। সভ্যতা কখনো একা তৈরি হয় না। মানুষ আসে। মানুষ মেশে। সংস্কৃতি বদলায়। এরপর তৈরি হয় একটি শহর। এখানে ইতিহাস হাঁটে, কথা বলে, রান্না করে, খাবারের গন্ধ ছড়ায়। এখানে ইতিহাসকে পড়তে হয় না, খেতে হয়।খাওয়া শেষে রাস্তায় বেরিয়ে দেখি, রাত আরও গভীর। কিন্তু শিয়ান ঘুমায়নি। বরং অন্য এক জীবন শুরু হয়েছে। দূরে ঝলমলে বেল টাওয়ার। চারপাশে রাতের শহর। আর কোথাও অচেনা সুরে গান। কয়েক হাজার বছরের পুরোনো এই শহর যেন নিজের বর্তমানটাকে আমার সামনে মেলে ধরেছে। ইতিহাস মৃত কোনো বিষয় নয়। সে বেঁচে থাকে। কখনো মাটির সৈন্যের চোখে। কখনো প্রাচীন ইটের গায়ে। কখনো বেল টাওয়ারের ছায়ায়। কখনো মসলার গন্ধে ভরা কোনো সরু গলিতে। আবার কখনো অচেনা সুরের কোনো গানে।ঘুমায় না শিয়ানহোস্টেলে ফেরার পথে আবার সম্রাটের কথা মনে পড়ল। তাঁর ইচ্ছা পূরণ হয়েছে। তবে তাঁর কল্পনার মতো করে নয়। তাঁর সৈন্যরা এখন আর কোনো সম্রাটকে পাহারা দেয় না। এরা দুই হাজার দুইশ বছর ধরে পাহারা দেয় একটি গল্পকে। একটি সাম্রাজ্যের গল্প। একটি সভ্যতার গল্প। আর আমাদের মতো পথিকদের মনে জমে থাকা বিস্ময়ের গল্প।আর শিয়ান? শিয়ান যেন এক অতন্দ্র প্রহরী; যে এক হাতে ধরে রেখেছে অতীত, অন্য হাতে বর্তমান। আজ আমি আসলে একটি শহর দেখিনি। আমি হেঁটেছি কয়েক হাজার বছরের ভেতর দিয়ে। এক দিনে; মাত্র এক দিনে।ছবি: লেখক
প্রথম আলো ট্রাস্টের একটি আয়োজন বিনা মূল্যে মাদকবিরোধী পরামর্শ সহায়তা সভা। এ আয়োজনের আওতায় ৩০ আগস্ট ২০২৬ তারিখে প্রথম আলোর কার্যালয় কারওয়ান বাজারে ১৮০ তম অনলাইন পরামর্শ সহায়তা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় উপস্থিত থেকে পরামর্শ প্রদান করেন জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ডা. জোবায়ের মিয়া। এইবারের বিষয়টি ছিল—‘সন্তানের মন বোঝার উপায়।’ অনুষ্ঠানটি সাক্ষাৎকার আকারে তুলে ধরা হলো। উক্ত অনুষ্ঠানের আলোচনা থেকে একটি পরামর্শ তুলে ধরা হলো।অভিভাবকেরা কখন বুঝবেন যে ঘরের চেষ্টার বাইরে একজন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সহায়তা প্রয়োজন?এমন প্রশ্নের উত্তরে ডা. জোবায়ের মিয়া বলেন, ‘যখন দেখা যাবে যে সব ধরনের বন্ধুত্বপূর্ণ চেষ্টা সত্ত্বেও ৬ মাস বা ১ বছর ধরে সন্তানের রেজাল্ট ক্রমাগত খারাপ হচ্ছে, আচরণে তীব্র পরিবর্তন এসেছে, বা মারাত্মক ডিভাইস আসক্তি / মাদকাসক্তির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, তখন কোনো দ্বিধা না করে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে। অভিভাবকদের বুঝতে হবে, রোগের চিকিৎসা এবং আচরণগত কাউন্সেলিং সময়মতো শুরু করলে সন্তানকে স্বাভাবিক ও সুন্দর জীবনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।’
এক ছুটির বিকেলে অনলাইনে পডকাস্ট শুনতে শুনতে হুট করেই বিশ্বসাহিত্যের বিখ্যাত লেখক ফ্রানৎস কাফকার কালজয়ী উপন্যাস ‘দ্য ট্রায়াল’-এর সঙ্গে পরিচয়। ভেবেছিলাম শতবর্ষ পুরোনো কোনো সাধারণ সাহিত্যের গল্প শুনব। কিন্তু গল্পটি যত সামনে গড়িয়েছে, তত বেশি স্তব্ধ হয়ে গিয়েছি। মনে হয়েছে, এটি কেবল শত বছর আগের কোনো কাল্পনিক চরিত্রের গল্প নয়; বরং আজকের ব্যস্ত করপোরেট জীবন ও জটিল ব্যবস্থার জালে আটকে থাকা আমাদেরই এক অচেনা আয়না।উপন্যাসের শুরু বেশ নাটকীয়ভাবে। প্রধান চরিত্র জোসেফ কে একটি ব্যাংকের উচ্চপদস্থ ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তা। তাঁর ৩০তম জন্মদিনের সকালে হঠাৎ দুজন অচেনা লোক এসে জানায়, তিনি গ্রেপ্তার হয়েছেন। কিন্তু তাঁর অপরাধ কী বা কোন আইনে তিনি অভিযুক্ত, তা কেউ বলতে পারে না। তাঁকে কোনো কারাগারেও পাঠানো হয় না, বলা হয় তিনি যেন প্রতিদিনের মতো ব্যাংকের কাজ চালিয়ে যান। কিন্তু এই দেখানোর স্বাধীনতার আড়ালে শুরু হয় এক রহস্যময় আমলাতান্ত্রিক আদালতের তাড়া ও মনস্তাত্ত্বিক উৎপাত।গল্পের এই জায়গায় এসেই কাফকা জীবনের এক নিষ্ঠুর সত্যকে উন্মোচিত করেছেন। যে প্রতিষ্ঠানের জন্য একজন মানুষ নিজের মেধা ও সময় উজাড় করে দেয়, কোনো অদৃশ্য চক্রান্ত বা ব্যবস্থার শিকার হলে সেই মানুষটি কতটা অসহায় হয়ে পড়ে, তা জোসেফের প্রতিটি পদে পদে ফুটে ওঠে। প্রতিদিন অফিসে গিয়ে সাধারণ কাজ করা আর ভেতরে–ভেতরে নিজেকে ‘নির্দোষ’ প্রমাণের আকুল চেষ্টা—এ দুই মানসিক চাপে কীভাবে মানুষের কর্মক্ষমতা, স্বাধীনতা ও শান্তি বিষাক্ত হয়ে যায়, তা লেখক নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।‘আরুশি ও একটি মিছরিদানা আংটি’: গল্প শেষ, রেশ কি শেষজোসেফ কে ভেবেছিলেন, সততা আর যুক্তি দিয়ে তিনি এই অদৃশ্য উৎপাত থেকে বেঁচে যাবেন। কিন্তু ক্ষমতা ও অন্ধ বিচারব্যবস্থা যখন যুক্তিহীন হয়ে পড়ে, তখন সাধারণ মানুষের মেধা ও সততা সেখানে ধূলিসাৎ হয়ে যায়। বিপদের দিনে আশপাশের পরিচিত অনেকে উপদেশ দিলেও মূল চক্রান্তের বিরুদ্ধে জোসেফকে একাই লড়তে হয়েছিল।‘দ্য ট্রায়াল’ নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে। জীবনের এমন কঠিন পরিস্থিতিতে অন্ধভাবে কোনো ব্যবস্থার ওপর ভরসা না করে নিজের মানসিক স্বাস্থ্য, আত্মসম্মান ও স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করাটা যে কতটা জরুরি, তা এই উপন্যাস চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। সহজ উপস্থাপনা ও গভীর জীবনবোধের কারণে কাফকার এই সৃষ্টি আজও সমান প্রাসঙ্গিক। জীবনের বাস্তব রূপ আর নিজের অস্তিত্বকে নতুন করে আবিষ্কার করতে চাইলে বইটি পড়া বা শোনার অভিজ্ঞতা সত্যি অনন্য হতে পারে।বন্ধু, রায়গঞ্জ বন্ধুসভা