অর্হ অপরাজিতা রাসয়াত নিউইয়র্ক পাবলিক লাইব্রেরির সামার রাইটিং প্রোগ্রামে নন ফিকশন ক্যাটাগরিতে পুরস্কার পেয়েছে। পুরস্কারের নাম দ্য হার্টস অব হোম অ্যাওয়ার্ড। এই খবর নিউইয়র্ক পাবলিক লাইব্রেরি তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করেছে। সঙ্গে তার লেখাটিও ছাপা হয়েছে। লেখাটি অর্হ লিখেছে ইংরেজিতে। বাংলা অনুবাদ থাকল কিশোর আলোর পাঠকের জন্য।
ঝক ঝক ঝক ট্রেন চলেছে
রাতদুপুরে ওই।
ট্রেন চলেছে, ট্রেন চলেছে—
ট্রেনের বাড়ি কই?
আমি যখন খুব ছোট ছিলাম, শামসুর রাহমানের এই ট্রেনের কবিতাটি আমার খুব প্রিয় ছিল। কবিতাটি শুনলেই আমি কল্পনা করতাম, ট্রেনে চড়ে মাঠ পেরিয়ে বনের ভেতর দিয়ে ছুটে যাচ্ছি। পুলের ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় ট্রেনের চাকায় ঝনঝন করে বাজনা বাজছে। আমি দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়াচ্ছি, আমার ঘোরার যেন কোনো শেষ নেই। ট্রেনটি হয়তো একটু থামবে, তারপর আমাকে নিয়ে আবার ছুটে যাবে নতুন কোনো জায়গায়।
তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় একদিন আমি ক্লাসের সবার সামনে দাঁড়িয়ে সেই কবিতাটিই আবৃত্তি করছিলাম। সেদিন আমাদের ক্লাসে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করা হচ্ছিল। আমার মা আর আমার বন্ধু জোয়ার মা মিলে এই আয়োজন করেছিলেন। আমরা ঠিক করেছিলাম, নিউইয়র্কে আমাদের স্কুলে আমরা নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি আর সঙ্গে করে নিয়ে আসা গল্পগুলো সবাইকে বলব।
মা আর আমি মিলিয়ে লাল-সবুজ শাড়ি পরেছিলাম। সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলাম সন্দেশ। শাড়ি পরে সবার সামনে দাঁড়িয়ে কবিতা বলতে আমার একটু লজ্জা লাগছিল। আবার ভেতরে–ভেতরে বেশ আনন্দও হচ্ছিল।
আমার ক্লাসের বেশির ভাগ বন্ধুর মতো আমি নিউইয়র্কে জন্মাইনি। ২০২৩ সালে, মাত্র তিন বছর আগে, আমি বাংলাদেশ থেকে এখানে এসেছিলাম। তখন সবে প্রথম শ্রেণি শেষ করেছি। আমার মা নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতায় স্নাতকোত্তর পড়তে এসেছিলেন। আমার বন্ধুরা সবাই দ্বিতীয় শ্রেণিতে উঠল। আর আমি আমার ছোট্ট জীবনটাকে দুটি স্যুটকেসে ভরে নিউইয়র্কে চলে এলাম।
আমি ভেবেছিলাম, নিউইয়র্কে থাকার অভিজ্ঞতা খুবই দারুণ হবে। কিন্তু এখানে এসেই বুঝলাম, শহরটি যতই দারুণ হোক, এটি আমার বাড়ি নয়। মাঝেমধ্যে মনে হতো, আমার সেই দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়ানো ট্রেনটি হঠাৎ থেমে গেছে।
এখানে সবকিছুই আমার কাছে অচেনা। কোনো কিছুর সঙ্গেই আমার পরিচিত জীবনের মিল ছিল না। বাংলাদেশে আমার প্রথম শ্রেণি থেকে দ্বিতীয় শ্রেণিতে ওঠার কথা ছিল। কিন্তু নিউইয়র্কে কেউ ‘ক্লাসে’ পড়ে না, সবাই ‘গ্রেডে’ পড়ে। আমার বয়স তখন আট বছর। তাই আমাকে বলা হলো, দ্বিতীয় নয়, তৃতীয় গ্রেডে যেতে হবে। নিউইয়র্কে আমার বয়সী সবাই তৃতীয় গ্রেডেই পড়ে। আমাকেও সেই নিয়ম মেনে নিতে হলো।
ক্লাসের পড়াশোনা খুব একটা কঠিন ছিল না। ইংরেজি বা গণিত আমাকে খুব বেশি ভোগায়নি। কিন্তু নিউইয়র্কের আদবকায়দা আর কোনো কথা কীভাবে বলতে হয়, সেগুলো শিখতে গিয়ে আমি সত্যিই হিমশিম খাচ্ছিলাম! প্রতিটি দিনই যেন ছিল নতুন এক লড়াই। আমি যতই ঠিকভাবে কিছু করার চেষ্টা করতাম, কীভাবে যেন কোনো না কোনো ঝামেলা হয়ে যেত।

একদিন আমাদের ক্লাসে একজন অতিথি এলেন। তাঁকে দেখতে আমার কাছে একেবারে মোমের পুতুলের মতো মনে হলো। আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘তুমি কি চীনা?’ আমার কথা শুনে পুরো ক্লাস হো হো করে হেসে উঠল।
পরে আমার মায়ের কাছে অভিযোগ গেল যে আমি কারও জাতিগত পরিচয় নিয়ে মজা করেছি। নিউইয়র্কে এভাবে কারও পরিচয় নিয়ে কথা বলা অন্যায় হতে পারে। কিন্তু আমি তখন সেটি কীভাবে জানব? আমার জন্য তো সবকিছুই নতুন ছিল!
সবচেয়ে নতুন ব্যাপার ছিল, এই শহরে সারা পৃথিবীর মানুষ একসঙ্গে থাকে। প্রত্যেকের চেহারা, ভাষা, পোশাক, খাবার আর সংস্কৃতি আলাদা। আমার মনে অনেক প্রশ্ন জাগত। আমি কৌতূহল থেকে জানতে চাইতাম, কে পৃথিবীর কোন জায়গা থেকে এসেছে।
বাংলাদেশে আমার চারপাশের বেশির ভাগ মানুষকে দেখতে মোটামুটি একই রকম মনে হতো। তাই একই শহরে এত রকমের মানুষ দেখে তাদের সম্পর্কে জানতে চাওয়া আমার কাছে খুব স্বাভাবিক ছিল। পরে বুঝেছি, কাউকে শুধু চেহারা দেখে তার পরিচয় জিজ্ঞাসা করলে সে অস্বস্তি পেতে পারে। কারণ, এই শহরে মানুষের চেহারা ও জাতিগত পরিচয়ের জন্য তাদের সঙ্গে অন্যায় করার অনেক পুরোনো ইতিহাস আছে।
আমার মা শিক্ষকদের বোঝালেন যে আমি কাউকে নিয়ে মজা করতে চাইনি। আমি শুধু কৌতূহলী ছিলাম। শিক্ষকেরা বিষয়টি বুঝতে পারলেন। কিন্তু আমার অনেক সহপাঠী তখনো আমার মনের কথাটি বুঝতে পারেনি।
আমাদের স্কুলে দক্ষিণ এশিয়ার শিশুও ছিল হাতে গোনা মাত্র দুই-তিনজন। মাঝেমধ্যে মনে হতো, আমরা যেন সেখানে থেকেও চোখে পড়ি না। আমাদের ভাষা, খাবার বা গল্পের কথা কেউ জানে না।
তারপর নিউইয়র্কে শীত এল।
আমি সব সময় ভাবতাম, আকাশ থেকে তুষার পড়া বুঝি খুব জাদুকরি একটি ব্যাপার। প্রথম কয়েক দিন সত্যিই তা-ই মনে হয়েছিল। কিন্তু তীব্র ঠান্ডায় যখন আমার হাড় পর্যন্ত কেঁপে উঠত, তখন আর তুষারকে তেমন জাদুকরি লাগত না।
নিউইয়র্ক আমার বাড়ি নয়—এই অনুভূতি আরও বেড়ে গেল। আমি বাংলাদেশকে খুব মিস করতাম। নানু, বাবা, খালা, ফুপি—সবাইকে মনে পড়ত। আর সবচেয়ে বেশি মিস করতাম চারপাশে বাংলা কথা শুনতে। প্রায় প্রতি রাতেই আমার মন খারাপ হতো। আমি বাড়ি ফিরে যেতে চাইতাম।
টেইলর সুইফটের একটি গানে বলা হয়েছে, নিউইয়র্ক নাকি সবার জন্য অপেক্ষা করে। আমার কাছে কথাটা একেবারেই ভুল মনে হতো। আমার মনে হতো, নিউইয়র্ক কারও জন্য অপেক্ষা করে না। শহরটি এত দ্রুত ছুটছে যে আমি তার সঙ্গে তালই মেলাতে পারছি না। এই শহর কখনো আমার বাড়ি হবে না।
সে সময় আমরা ম্যানহাটনের হারলেমে থাকতাম। হারলেম আফ্রিকান আমেরিকানদের ইতিহাস ও সংস্কৃতির জন্য বিখ্যাত। এখানকার মানুষ গান, কবিতা, গল্প, শিল্প আর আন্দোলনের মাধ্যমে আমেরিকায় নিজেদের পরিচয় তৈরি করেছেন। নাগরিক অধিকার আন্দোলনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিও ছড়িয়ে আছে এই এলাকায়।
আমাদের বাড়ির চারপাশেই ছিল ঐতিহাসিক সব জায়গা। ব্যাপারটা এমন যে মা আর আমি কাঁচাবাজার করতে বেরিয়েও কোনো ঐতিহাসিক জায়গা দেখে বাড়ি ফিরতাম।

আমরা লাইব্রেরি থেকে হারলেমের ইতিহাস নিয়ে বই আনতাম। পড়ে বোঝার চেষ্টা করতাম, এখানকার মানুষ কীভাবে নিজেদের গল্প বলে আমেরিকার বুকে নিজেদের জায়গা তৈরি করেছেন।
এক রাতে মন খারাপ করে আমরা একটা বই পড়ছিলাম। হঠাৎ মা বইটা বন্ধ করে বললেন, ‘অর্হ, শুধু অন্যদের গল্পের ভেতর নিজেদের খুঁজলে হবে না। আমাদের নিজেদের গল্পও বলতে শিখতে হবে।’
সেই রাতেই মা আমার বন্ধু জোয়ার মা আমেনাকে ফোন করলেন। জোয়া আমেরিকায় জন্মেছে, কিন্তু তার পরিবার পাকিস্তানি। সে ছিল আমাদের স্কুলের মাত্র তিনজন দক্ষিণ এশীয় শিশুর একজন।
মা আর জোয়ার মা কথা বলে ঠিক করলেন, আমরা স্কুলে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করব।
আমাদের স্কুলের শিশুরা হয়তো জানত না, ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলায় কথা বলার অধিকার রক্ষার জন্য সালাম, রফিক, জব্বারসহ আরও অনেকে জীবন দিয়েছিলেন। কিন্তু তারা নিশ্চয়ই বুঝতে পারবে, নিজের মাতৃভাষা প্রত্যেক মানুষের কাছেই কতটা প্রিয়। তারা আরও জানতে পারবে, এই ঘটনার সম্মানে ইউনেসকো ১৯৯৯ সালে ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করেছে।
ভাষাশহীদেরা শুধু আমাদের বাংলায় কথা বলার অধিকার রক্ষা করেননি। তাঁরা পৃথিবীকে দেখিয়েছেন, নিজের ভাষা ও পরিচয় রক্ষা করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। একজন বাংলাদেশি হিসেবে নিউইয়র্কে থেকেও নিজের ভাষা ও সংস্কৃতিকে উদ্যাপন করার একটা তাগিদ আমরাও অনুভব করলাম।
আমাদের ক্লাস শিক্ষক ভ্যালরি ও ফ্রান এই প্রস্তাব শুনেই খুব খুশি হলেন। তারপর অবশেষে সেই অপেক্ষার দিনটি এল।
ফেব্রুয়ারি নিউইয়র্কের সবচেয়ে ঠান্ডা মাসগুলোর একটি। বাইরে তখন চারদিকে তুষার। কিন্তু আমাদের ক্লাসরুমটি নানা রং, খাবারের গন্ধ আর ভালোবাসায় উষ্ণ হয়ে উঠেছিল।
মা-বাবারা নিজেদের দেশের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে এসেছিলেন। সবাই বাড়ি থেকে নিজের দেশের কোনো না কোনো খাবার নিয়ে এসেছিল। একে একে প্রতিটি পরিবার এমন কিছু সবার সামনে তুলে ধরল, যা তাদের পরিচয় ও সংস্কৃতির অংশ।
প্রথমে আমার বন্ধু বেনজিরের মা আমাদের ইতালির একটি গল্প শোনালেন—লা চিকালা এ লা ফোরমিকা। এটি ঈশপের পিঁপড়া আর ঘাসফড়িংয়ের গল্পের ইতালীয় রূপ।
বন্ধু বেনজিরের মা বললেন, ‘আমি পিঁপড়ার চেয়ে ঘাসফড়িংকেই বেশি পছন্দ করি। আমার মনে হয় না, জীবন মানে শুধু সব সময় জিনিস জমিয়ে রাখা। স্বাধীনভাবে বাঁচা, সুন্দর কিছু তৈরি করা, আনন্দ ভাগ করে নেওয়া এবং পৃথিবীতে গান, গল্প আর দয়া রেখে যাওয়াও জীবনের অংশ।’
আমার আরেক বন্ধু রেইনের মা আমাদের একটি পুরোনো আইরিশ আশীর্বাদ শোনালেন—
‘বাতাস যেন সব সময় তোমাকে সামনে এগিয়ে দেয়।
সূর্যের আলো যেন তোমার মুখ উষ্ণ রাখে।
বৃষ্টি যেন তোমার মাঠে নরম হয়ে ঝরে।
আর আমাদের আবার দেখা না হওয়া পর্যন্ত
ঈশ্বর যেন তোমাকে তাঁর হাতের তালুতে রাখেন।’
গডউইন আর তার মা মিলে একটি সুন্দর মেক্সিকান গান গাইল।
আমার সহপাঠী শৌজোর মা জাপানি ভাষায় একটি বিখ্যাত গল্প শোনালেন—নাসেবা নারু। গল্পটা সামুরাই ইয়োজান উয়েসুগির নামে প্রচলিত।
শৌজোর মা বুঝিয়ে বললেন, ‘চেষ্টা করলে তুমি পারবে। কোনো কাজ কেন সম্ভব নয়, তা নিয়ে শুধু ভাববে না। কীভাবে কাজটি করা যায়, সেটি ভাবো। তারপর চেষ্টা শুরু করো।’
সবশেষে এল আমাদের পালা।
মা আর আমি ক্লাসের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। তারপর আমরা বাংলায় ট্রেনের কবিতাটি আবৃত্তি করলাম। আমি সেটাকে আবার ইংরেজিতে অনুবাদ করে বললাম। কবিতা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমার সহপাঠীরা হাততালি দিল। সেই প্রথম আমার মনে হলো, ওরা আমাকে বিচার করছে না। ওরা সত্যিই আমার গল্প শুনছে।
অনুষ্ঠানের শেষে সবাই মিলে নানা দেশের খাবার ভাগ করে খেলাম। পুরো ক্লাসরুমে যেন সারা পৃথিবীর গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছিল। বাংলাদেশের সন্দেশ, জাপানের মোচি, ইতালির ক্যানোলি, মেক্সিকোর ওরেহাসহ আরও কত মজার খাবার!
খাবার আর গল্প ভাগাভাগি করতে করতে আমি একটি কথা বুঝতে পারলাম— ক্লাসে আমিই একমাত্র মানুষ নই, যার মনের ভেতর দুটি বাড়ি আছে।
আমার অনেক সহপাঠীও নিজের নিজের যাত্রার মধ্যে ছিল। কেউ অন্য দেশ থেকে এসেছে। কারও মা-বাবা বা দাদা-দাদি, নানা-নানি অন্য দেশ থেকে এসেছেন। আমার প্রিয় কবিতার ট্রেনটির মতো আমরাও সবাই কোথাও না কোথাও থেকে যাত্রা শুরু করেছি। কারও যাত্রা অনেক লম্বা। কারও যাত্রা একটু বেশি কঠিন। কিন্তু কীভাবে যেন আমাদের সবার ট্রেন এসে একই ক্লাসরুমে থেমেছে।
সেদিন বিকেলে আমি অবশেষে কবিতাটির মানে নিজের মতো করে বুঝতে পারলাম। হয়তো ট্রেনের শুধু একটিই বাড়ি থাকে না। হয়তো সে যেখানে যায়, নিজের বাড়িটাকেও সঙ্গে নিয়ে যায়। আমিও তো তা-ই করেছি।
বাংলাদেশে আমার যাত্রা শুরু হয়েছিল। আর নিউইয়র্কে সেই যাত্রা এগিয়ে চলেছে। আমাকে এই দুটি জায়গার মধ্যে শুধু একটিকে বেছে নিতে হবে না। ট্রেনের মতো আমিও একটি বাড়িকে মনের ভেতর নিয়ে আরেকটি বাড়ি খুঁজে নিতে পারি।
সেদিনই প্রথম নিউইয়র্ককে আমার নিজের বাড়ি বলে মনে হলো।
শরীয়তপুরের কাজীরহাট এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মাস্টার মোস্তফা কাজীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, প্রভাব খাটানো ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হন মোস্তফা কাজী। এরপর থেকে এলাকায় বিভিন্ন জমি দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৬ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে কাজীরহাট বাজারের দোকানপ্রতি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা কাজী। এছাড়া কয়েক মাস আগে কাজীরহাটে একটি দোকান ক্রয়ের সময় ব্যবসায়ী সুমন তপাদারের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী আরও জানান, বি. কে. নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলামের কাছ থেকেও ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন মানুষকে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় ফেলে হয়রানি করার অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন মোস্তফা কাজী। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির ব্যানারে তার কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন অনেকে। এছাড়া বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি নিজ ভগ্নিপতি সিদ্দিক দেওয়ানের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোস্তফা কাজীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সচেতন মহল বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
ইউরোপের রাজধানী ব্রাসেলসে আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা জোরালো করা। এই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত আছেন। গত বছরের শুরু থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের কারণে সারা ইউরোপ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ইউরোপীয় নেতারা এখন যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরিতে কাজ করছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, “আমরা যুদ্ধের মানবিক সংকট বুঝতে পারি এবং এখন আমাদের দায়িত্ব এটি দ্রুত শেষ করার পথ খোঁজা। আমাদের প্রত্যেকের জন্যই শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।” এই বৈঠকে অস্ত্রবিরতি চুক্তি, যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলো যুদ্ধ সমাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এগুলো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ক্রমবর্ধমান পরীক্ষার চাপ এবং পরিবারের পাশাপাশি সমাজের অযৌক্তিক প্রত্যাশা। এ দুটি কারণ মিলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বেড়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা। ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করা যেন শিক্ষার্থীর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ—সব জায়গা থেকেই উচ্চ ফলাফলের প্রত্যাশা তৈরি করছে মানসিক চাপের একটি অব্যক্ত বলয়। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইহান কবির বলেন, “পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে মনে হয়, শুধু আমি না, আমার পুরো পরিবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এটা সহ্য করা খুব কঠিন।” শুধু রাইহান নয়, দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা একই অভিজ্ঞতার কথা বলছে। সামাজিক চাপ ও তুলনার সংস্কৃতি পরিস্থিতি করছে আরও জটিল পরীক্ষার নম্বর নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এখন তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া গর্ব বা অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কোন কলেজে ভর্তি হলো, কে কতো পেল—এসব তুলনার চাপে পড়াশোনার আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা তাবাসসুম বলেন, “প্রত্যাশা থাকা ভালো, কিন্তু তা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায় এবং একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব সক্ষমতা উপেক্ষা করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়। এ থেকেই জন্ম নেয় আত্মগ্লানি, হতাশা এবং মাঝে মাঝে আত্মহননের চিন্তা।” জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ নিয়মিত মানসিক চাপে থাকে। এর মধ্যে ১২ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগে এবং বড় একটি অংশ কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই দিন পার করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে ক্ষতিকর। সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, এবং পরিবারের ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ এই সমস্যার নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম হয়, সেখানে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাকে কেবল ফলাফলের সীমায় না এনে একটি মানবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা চাপ নয়, ভালোবাসা থেকে শিখবে, এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ প্রজন্ম।
বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কৃষিখাতকে চরমভাবে আঘাত করছে। অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘদিন খরা এবং হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ফসল উৎপাদনে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে। চলতি মৌসুমেই অনেক জেলায় ধান, গম, ভুট্টা এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, একদিকে যেমন আবহাওয়ার আচরণ বুঝে ওঠা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সারের দাম, কীটনাশক ও বীজের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পোকার আক্রমণ ও রোগবালাইয়ের হারও বেড়ে গেছে। এই চাপে পড়ে অনেক কৃষকই ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা। তাদের পক্ষে বারবার ক্ষতির ধাক্কা সামলে উঠে আবার নতুনভাবে চাষাবাদ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো অঞ্চলে দেখা গেছে, কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী ফসল বাদ দিয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ ও লাভজনক অন্য চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমানেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। একইসঙ্গে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে এমন জাত ও পদ্ধতি উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে যা কঠিন জলবায়ু পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কৃষি খাতকে সচল রাখা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে এখনই পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
কলম্বোর সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাব ময়দানে চলমান দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে ব্যাট হাতে আবারও ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের। টস জিতে ব্যাট করতে নেমে প্রথম ইনিংসে টাইগাররা সংগ্রহ করে মাত্র ২২০ রান, যেখানে ব্যতিক্রম ছিলেন কেবল শোয়াড ইসলাম (৪৬), মুশফিকুর রহিম (৩৫) ও লিটন দাস (৩৪)। শ্রীলঙ্কার বোলাররা শুরু থেকেই চাপ সৃষ্টি করে রাখে। ডেবিউ করা স্পিনার সোনাল দিনুষা ৩ উইকেট নিয়ে আলো ছড়ান, আর আসিথা ফার্নান্দো ও বিষ্ণু ফার্নান্দো নেন ২টি করে উইকেট। প্রথম ইনিংসের জবাবে দ্বিতীয় দিন সকালে শ্রীলঙ্কা উদ্বোধনী জুটি থেকে ভালো সূচনা পায়। ১৩.১ ওভারে কোন উইকেট না হারিয়ে সংগ্রহ করেছে ৬২ রান। ওপেনার পাথুম নিসান্কা ৩৩ এবং লাহিরু উদারা ২৮ রানে অপরাজিত রয়েছেন। বাংলাদেশের হয়ে তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ বোলিং শুরু করলেও এখনও পর্যন্ত সাফল্যের দেখা মেলেনি। শ্রীলঙ্কা এখনো বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস থেকে ১৫৮ রানে পিছিয়ে আছে, হাতে রয়েছে সকল উইকেট। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে প্রভাব এই টেস্টটি ২০২৩-২৫ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ হওয়ায় দুই দলের জন্যই পয়েন্টের লড়াই গুরুত্বপূর্ণ। সিরিজের প্রথম টেস্টে পরাজিত হওয়ায় বাংলাদেশ সিরিজে টিকে থাকতে হলে এই ম্যাচ জিততেই হবে। পরবর্তী চ্যালেঞ্জ স্লো পিচে বাংলাদেশ বোলারদের আরও পরিকল্পিত বোলিং করতে হবে। দ্রুত উইকেট তুলে না নিতে পারলে শ্রীলঙ্কা বড় লিড নিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে দেবে টাইগারদের। ফিল্ডিংয়ে মনোযোগ এবং টাইট বোলিংয়ের মাধ্যমেই দ্বিতীয় ইনিংসে নিজেদের ফিরে পাওয়ার আশায় বাংলাদেশ। সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড (দিন ২, প্রথম সেশন পর্যন্ত): বাংলাদেশ (১ম ইনিংস): ২২০/১০ শ্রীলঙ্কা (১ম ইনিংস): ৬২/০ (১৩.১ ওভার) নিসান্কা: ৩৩*, উদারা: ২৮* বাংলাদেশ বোলার: তাইজুল, মিরাজ – উইকেটহীন
তাল পাকানোর মৌসুম চলছে। এই সময় পাকা তালের মিষ্টি ঘ্রাণে ভরে ওঠে চারপাশ। তাল দিয়ে পায়েস, বড়া, পিঠাসহ তৈরি করা যায় নানা ধরনের সুস্বাদু পদ। তবে চেনা এসব আয়োজনের বাইরে এবার বানিয়ে দেখতে পারেন তালের ভাপা পুলি পিঠা। কম উপকরণে, খুব সহজেই তৈরি করা যায় মজার এই পিঠা। পাকা তালের মিষ্টি স্বাদ আর পুলির নরম আবরণ-দুইয়ে মিলে তৈরি হয় দারুণ এক ঘরোয়া স্বাদ। নাশতা কিংবা বিকেলের আড্ডায় যেমন মানিয়ে যাবে, তেমনি পরিবারের ছোট-বড় সবার কাছেই হতে পারে পছন্দের খাবার। তালের মৌসুমে ঘরেই সহজে বানিয়ে নিতে পারেন এই সুস্বাদু ভাপা পুলি পিঠা। আসুন জেনে নেওয়া যাক কীভাবে ভাপা পুলি পিঠা তৈরি করবেন- উপকরণ পাকা তালের রস ১ কাপ চালের গুঁড়া ২ কাপ নারিকেল কোরা ১.৫ কাপ খেজুরের গুড় বা চিনি ১ কাপ (স্বাদমতো) লবণ সামান্য পানি পরিমাণমতো প্রস্তুত প্রণালি প্রথমে কড়াইতে সামান্য ঘি গরম করে নিন। এতে কুড়ানো নারিকেল ও গুড় বা চিনি দিয়ে ভালোভাবে কষিয়ে নিন। নারিকেল আঠালো হয়ে ভাজা ভাজা ভাব এলে চুলা থেকে নামিয়ে ঠান্ডা করে রাখুন। অন্যদিকে একটি পাত্রে পানি ও সামান্য লবণ দিয়ে ফুটিয়ে নিন। পানি ফুটে উঠলে এতে তালের রস মিশিয়ে দিন। এবার অল্প অল্প করে চালের গুঁড়ো দিয়ে নেড়ে শক্ত খামির তৈরি করুন। খামির কিছুটা ঠান্ডা হলে ভালোভাবে মথে নিন, যাতে পিঠার আবরণ নরম ও মসৃণ হয়। এবার খামির থেকে ছোট ছোট লেচি কেটে নিন। প্রতিটি লেচি রুটির মতো বেলে নিন অথবা হাতের তালুতে চেপে একটু পাতলা করে নিন। মাঝখানে পরিমাণমতো নারিকেলের পুর দিয়ে চারপাশ থেকে মুখ বন্ধ করে পুলির আকার দিন। ইচ্ছা করলে হাতের সাহায্যে পিঠার গায়ে নকশা করে নিতে পারেন। চাইলে পিঠার ছাঁচ ব্যবহার করেও সুন্দর আকৃতি দেওয়া যায়। সব পিঠা তৈরি হয়ে গেলে কুকার, স্টিমার কিংবা ছিদ্রযুক্ত চালনিতে সাজিয়ে ভাপে বসিয়ে দিন। ঢেকে ১০ থেকে ১২ মিনিট ভাপ দিলেই তৈরি হয়ে যাবে নরম, তুলতুলে ও সুস্বাদু তালের ভাপা পুলি পিঠা। ভাপানো হয়ে গেলে কিছুক্ষণ রেখে পিঠাগুলো পরিবেশন করুন। গরম গরম পরিবেশন করলে তালের মিষ্টি স্বাদ আর নারিকেলের পুরের ঘ্রাণে জমে উঠবে নাশতার আয়োজন। এসএকেওয়াই
ডিজিএফআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক (ডিজি) লেফটেন্যান্ট জেনারেল শেখ মামুন খালেদ (অব.), তার স্ত্রী নিগার সুলতানা ও শ্যালক শেখ আমিনুর রহমানের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে পৃথক তিনটি মামলা করার অনুমোদন দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) দুদক প্রধান কার্যালয়ে সংস্থাটির সচিব মো. সাইদুর রহমান খান সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান। দুদকের অভিযোগে বলা হয়, শেখ মামুন খালেদের নামে ৪ কোটি ৫৩ লাখ ৮৬ হাজার ৮৩৭ টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ পাওয়া গেছে। এর বিপরীতে তার গ্রহণযোগ্য আয় ৩ কোটি ৩৪ লাখ ৮৩ হাজার ৫৬৩ টাকা। পারিবারিক ও অন্যান্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৭৬ লাখ ৯৩ হাজার ৮২১ টাকা। সব মিলিয়ে তার অর্জিত সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় ৫ কোটি ৩০ লাখ ৮০ হাজার ৬৫৮ টাকা। এতে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ পাওয়া গেছে ১ কোটি ৯৫ লাখ ৯৭ হাজার ৯৫ টাকা। এ ঘটনায় দুদক আইন, ২০০৪-এর ২৭(১) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা করার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বলে জানান সচিব। অনুমোদিত অপর একটি মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, নিগার সুলতানার নামে ১ কোটি ৮ লাখ ৪৭ হাজার ৭৫১ টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ পাওয়া গেছে। তার গ্রহণযোগ্য আয় ১ কোটি ২৩ লাখ ৮৬ হাজার ৯১১ টাকা। পারিবারিক ও অন্যান্য ব্যয় ৭৪ লাখ ১৩ হাজার ৯৬৯ টাকা। ফলে সম্পদ অর্জনের জন্য তার সঞ্চয় দাঁড়ায় ৪৯ লাখ ৭২ হাজার ৯৪২ টাকা। এর তুলনায় তার নামে ৫৮ লাখ ৭৪ হাজার ৮০৯ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ পাওয়া গেছে। আরও পড়ুন সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী রুহুল হক ও তার ছেলের বিরুদ্ধে ২ মামলা হচ্ছে দুদকের অনুসন্ধানে নিগার সুলতানার আয়কর নথিতে মৎস্য চাষ থেকে দেখানো ৪০ লাখ ৫৯ হাজার ৯৩০ টাকা আয় গ্রহণযোগ্য হয়নি। দুদকের বরিশাল সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের রেকর্ডপত্র যাচাই ও পরিদর্শন প্রতিবেদনে ওই আয়কে ভিত্তিহীন বলা হয়েছে। এছাড়া ২০২৩-২৪ করবর্ষে দেখানো ১৭ লাখ ৮২ হাজার ৩৮২ টাকার আয়েরও বৈধ উৎস পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে শেখ আমিনুর রহমানের নামে ১০ কোটি ৪২ লাখ ৯ হাজার ১২৩ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। তার গ্রহণযোগ্য আয় ৫ কোটি ৭৭ লাখ ৩৭ হাজার ৪৭৮ টাকা। পারিবারিক ও অন্যান্য ব্যয় ২ কোটি ৪২ লাখ ৪ হাজার ৬১৬ টাকা। ব্যয়সহ তার মোট অর্জিত সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় ১১ কোটি ২৭ লাখ ২৫ হাজার ৩৩৩ টাকা। এর বিপরীতে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ পাওয়া গেছে ৫ কোটি ৪৯ লাখ ৮৭ হাজার ৮৫৫ টাকা। আমিনুর রহমানের আয়কর নথিতে মৎস্য চাষ থেকে ৬ কোটি ৮ লাখ ১৪ হাজার ৮৮৪ টাকা আয় দেখানো হয়েছিল। দুদকের অনুসন্ধানে ওই আয়ও ভিত্তিহীন বলে প্রমাণিত হয়েছে। এছাড়া পূর্ববর্তী সঞ্চয় হিসেবে দেখানো ১ কোটি ৩ লাখ ৮৮ হাজার ৩৯০ টাকারও কোনো রেকর্ডপত্র পাওয়া যায়নি। দুদক সচিব বলেন, শেখ মামুন খালেদ, নিগার সুলতানা ও শেখ আমিনুর রহমানের বিরুদ্ধে পৃথক তিনটি মামলা দায়েরের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। চলতি বছরের ২৫ মার্চ রাতে মিরপুর ডিওএইচএসের বাসা থেকে গ্রেফতার হন শেখ মামুন খালেদ। পরে তাকে গুম-সংক্রান্ত মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। তিনি বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। এসএম/একিউএফ
দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে অবৈধ চায়না দুয়ারি জাল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক পেজ, আইডি ও চ্যানেল থেকে এই জাল বিক্রি করা হচ্ছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে দোকানেও এগুলো কিনতে পাওয়া যায়।মৎস্য অধিদপ্তরের একটি প্রচারপত্রে বলা হয়েছে, দেশি প্রজাতির মাছ ও জলজ জীববৈচিত্র্য দেশের অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদ, যা খাদ্যনিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। অবৈধ চায়না দুয়ারি জাল ব্যবহারে মাছ, পোনা ও অন্যান্য জলজ প্রাণী নির্বিচার ধ্বংস হচ্ছে।চায়না দুয়ারি জাল মাছ ধরার বিশেষ ফাঁদ। এর দুই পাশে দুয়ার বা প্রবেশপথ রয়েছে। যেখান দিয়ে মাছসহ অন্যান্য জলজ প্রাণী প্রবেশ করে, কিন্তু বের হতে পারে না। এটি চায়না রিং জাল নামেও পরিচিত। কয়েক হাত থেকে শত হাত লম্বা এই জালে একটু পরপর রিং বসানো থাকে।মৎস্য সুরক্ষা ও সংরক্ষণ আইনে ‘চায়না দুয়ারি জাল’ শব্দবন্ধের উল্লেখ নেই। তবে আইনে বলা আছে, ‘ফিক্সড ইঞ্জিন’ স্থাপন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ বা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। আইন অনুযায়ী ‘ফিক্সড ইঞ্জিন’ হলো মাছ ধরার জন্য মাটিতে গেঁথে বা অন্য কোনো উপায়ে স্থিরীকৃত কোনো জাল, খাঁচা, ফাঁদ বা অন্য কোনো কৌশল।চায়না দুয়ারি জাল ফিক্সড ইঞ্জিনের আওতায় পড়ে এবং এটি অবৈধ বলে জানান মৎস্য অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ মৎস্য বিভাগের পরিচালক মোতালেব হোসেন। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, এভাবে চলতে থাকলে খাল–বিল, নদী–নালা, হাওর–বাঁওড়ে একসময় মাছ পাওয়া যাবে না। মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণী রক্ষায় এই জাল অবৈধ করা হয়েছে।বিক্রি হয় দোকানে, ফেসবুক–ইউটিউবেফেসবুক ও ইউটিউবে বিজ্ঞাপন দিয়ে চায়না দুয়ারি জাল বিক্রি করা হয়ে থাকে। কিছু ভিডিও বিজ্ঞাপনে রিং লাগিয়ে মাছ ধরার উপযোগী চায়না দুয়ারি জাল দেখানো হয়। আবার কিছু ভিডিও বিজ্ঞাপনে জাল তৈরির কারখানা দেখানো হয়। তবে কারখানা কোথায়, তা ভিডিওতে উল্লেখ করা হয় না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কারখানার মালিক নিজের মুখ দেখান না। এসব ভিডিওতে ফোন নম্বর, হোয়াটসঅ্যাপ ও ইমো নম্বর দেওয়া থাকে। কেউ এসব নম্বরে যোগাযোগ করলে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে তারা এই জাল সরবরাহ করে থাকে। টাকার লেনদেন বিকাশ কিংবা রকেটের মাধ্যমে হয়।‘চাইনা রিং জাল পাকাড়ি বাজার’ নামের একটি ফেসবুক পেজে চায়না দুয়ারি জাল বিক্রির বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে। চলতি বছরের জুলাই থেকে আগস্ট পর্যন্ত ১৪টি ছবি, ভিডিও পোস্ট করা হয়েছে। কারখানার ঠিকানা পেজে পাওয়া যায় না।বিভিন্ন পোস্টে ২৫ হাত থেকে ১০২ হাত লম্বা চায়না দুয়ারি জালের দাম ১ হাজার ১০০ টাকা থেকে ৩ হাজার ২০০ টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে।‘চায়না রিং জাল’ নামেই অনেকগুলো পেজ রয়েছে। এ ছাড়া বিডি ফিশিং গিয়ার্স, চায়না রিং জাল কালেকশন, চায়না রিং জাল বিক্রয় বাজার, চায়না রিং জাল বাজার, চায়না রিং জাল অনলাইন শপ, চায়না রিং জাল পাইকারি বাজার, চায়না রিং জাল হাউজ, চায়না রিং জাল পাইকারি সেল বাজার নামেও পেজ আছে।ইউটিউবেও এই জাল বিক্রি করা হচ্ছে। চায়না রিং জাল নামে একটি ইউটিউব চ্যানেলে বেশ কয়েকটি ভিডিও পোস্ট করা হয়েছে। এসব ভিডিওতে দেখা যায়, কারখানায় চায়না দুয়ারি জাল প্রস্তুত করা হচ্ছে। হোয়াটসঅ্যাপ, ইমো ও ফোন নম্বর দেওয়া হচ্ছে। দামও উল্লেখ করা আছে।ঢাকার বাজারেও এই জাল পাওয়া যায়। ৫ সেপ্টেম্বর পুরান ঢাকার চকবাজারে একজন দোকানদার জানান, তাঁর কাছে চায়না দুয়ারি জাল আছে। তিনি কেরানীগঞ্জের জিঞ্জিরা থেকে জাল এনে বিক্রি করেন বলে জানান।অবৈধ এই জালের বিক্রি ও ব্যবহার ঠেকাতে মৎস্য অধিদপ্তর কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। জানতে চাইলে অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. খালেদ কনক প্রথম আলোকে বলেন, চায়না জাল তৈরির উপকরণ (জাল ও রিং) সহজলভ্য। তা ছাড়া অধিদপ্তরের জনবলসংকট রয়েছে। তাঁদের একার পক্ষে এটা নিয়ন্ত্রণ করা কষ্টকর। পুলিশ প্রশাসনের সহায়তায় প্রতিদিন অভিযান চলছে।মৎস্য অধিদপ্তর গত ১৩ এপ্রিল দেশের সব বিভাগের মৎস্য অধিদপ্তরের পরিচালকদের চিঠি দিয়ে অভিযান বা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা বাড়িয়ে অবৈধ চায়না দুয়ারি জালের উৎপাদন ও ব্যবহার বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছে। এরপর কিংবা চলতি বছর অধিদপ্তর কত অভিযান বা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেছে, তার তথ্য নেই অধিদপ্তরে। অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ মৎস্য বিভাগের পরিচালক মোতালেব হোসেন অবশ্য দাবি করেন, তাঁরা ব্যাপকভাবে চায়না দুয়ারি জাল জব্দ করছেন। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে কয়েকটি কারখানার বিদ্যুৎ–সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছেন।২০২০–২১ সাল থেকে দেশে এই প্রযুক্তি ব্যাপকভাবে ব্যবহার হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ টেকনোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মো. শহীদ রেজা। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, মাছ থেকে শুরু করে সাপ, ব্যাঙসহ সব ধরনের জলজ প্রাণী আটকে পড়ে চায়না দুয়ারি জালে। এ কারণে সরকার বাধ্য হয়ে এই জাল নিষিদ্ধ করে। এটি কার্যকর করতে অভিযান আরও জোরদার করতে হবে। প্রয়োজনে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি এর বিরুদ্ধে প্রচারও চালাতে হবে।