ভোরের আলো ছড়িয়ে পড়ছে লাল শাপলার পাপড়িতে। টলটলে পানির ওপর সারি সারি লাল শাপলা উঁকি দিচ্ছে সূর্যের দিকে। তার ফাঁক দিয়ে ধীরে এগিয়ে যায় ছোট ছোট পর্যটকবাহী নৌকা। বইঠার প্রতিটি টানে দুলছে ফুল, পানিতে তৈরি হচ্ছে ছোট ছোট ঢেউ। পাখির কিচিরমিচির, কোথাও মাছের খোঁজে পানকৌড়ির ডুব, আবার কোথাও মাছরাঙার সতর্ক দৃষ্টি। ৬ সেপ্টেম্বর সাতলার বিলের এমন দৃশ্য বিমোহিত করেছে পর্যটকদের।
বরিশাল শহর থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার উত্তরে উজিরপুর উপজেলার সাতলা ইউনিয়নে সাতলা বিল। লাল শাপলার স্বর্গরাজ্য হিসেবে পরিচিত সাতলা বিলের প্রকৃত আয়তন প্রায় ২০০ একর। তবে বর্ষার মৌসুমে আশপাশের গ্রাম, প্লাবনভূমিসহ প্রায় ১০ হাজার একর বিস্তীর্ণ জলাভূমি শাপলার চাদরে ঢেকে যায়।
সারা বছরই সাতলার বিলে পানি থাকে। তবে বর্ষায় যেন তার প্রাণ ফিরে আসে। আর শরতে সেই প্রাণের সৌন্দর্য বিকশিত হয় লাল শাপলার সাম্রাজ্যে। ছোট ছোট নৌকায় পর্যটকেরা ঘুরে ঘুরে মুগ্ধ হয়ে উপভোগ করেন এই সৌন্দর্য। কিন্তু একই বিলের আরেকটি গল্প আছে। সেই গল্প জীবিকার। মানুষের টিকে থাকার লড়াইয়ের।
নৌকার বইঠা হাতে যিনি পর্যটকদের ঘুরিয়ে দেখাচ্ছেন, তাঁর কাছে এটি মৌসুমি আয়ের উৎস। বিলের পানিতে নেমে শাপলা সংগ্রহ করা নারীটির কাছে এই ফুল সংসারের বাজার খরচের টাকা। বিলের পাশের খাবারের দোকানির কাছে পর্যটক মানে বাড়তি বিক্রি। আর অটোরিকশাচালকদের কাছে বাড়তি যাত্রী। ফলে লাল শাপলার বিলে সৌন্দর্যের পাশাপাশি বদলে গেছে সাতলা গ্রামের অর্থনীতি।
বিস্তীর্ণ জলাভূমিতে শাপলা
সাতলা বিল মূলত সন্ধ্যা নদীর প্লাবনভূমি। বর্ষায় পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জুলাই থেকে ফুটতে শুরু করে লাল শাপলা। নভেম্বর পর্যন্ত বিস্তীর্ণ জলাভূমিতে দেখা যায় শাপলার আধিপত্য। লালের পাশাপাশি রয়েছে সাদা ও বেগুনি শাপলাও। তবে তা সংখ্যায় সীমিত। বিলের মাঝখানে থাকা বসতিগুলোর মানুষের জীবনও এই জলাভূমির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। বর্ষায় চারপাশে পানি বাড়লে নৌকাই হয়ে ওঠে তাঁদের যাতায়াতের বাহন।
সাতলার এই বিস্তৃত জলাভূমি প্রাণ ও জীববৈচিত্র্যেরও অনন্য আধার। বক, পানকৌড়ি, মাছরাঙা, ফিঙে, শালিক, দোয়েল, চড়ুই, কাঠঠোকরাসহ বিভিন্ন পাখি ঘুরে বেড়ায় বিলের জলে ও আশপাশে। এই প্রাকৃতিক পরিবেশই এখন পর্যটনের মূল আকর্ষণ। ঢাকা থেকে সাতলা বিলের সৌন্দর্য দেখতে এসেছেন ব্যাংক কর্মকর্তা রিয়াদ হাসান। তিনি বলেন, ‘অনেক দিন ধরেই সাতলা বিলের শাপলার সৌন্দর্যের কথা শুনছি, ছবিও দেখেছি; কিন্তু সময়-সুযোগের অভাবে আসা হয়নি। এবার এসে দেখলাম, ছবিতে যতটা সুন্দর মনে হয়েছিল, বাস্তবে তার চেয়ে অনেক বেশি সুন্দর।’

শাপলা ফোটার মৌসুমে সাতলায় পর্যটকের আনাগোনা বাড়তে থাকে। স্থানীয় নৌকার মাঝিদের হিসাবে, প্রতিদিন দেড় থেকে দুই হাজার মানুষ বিল দেখতে আসেন। শুক্র ও শনিবার এই সংখ্যা পাঁচ হাজার ছাড়িয়ে যায়। চারটি স্পটে পর্যটকদের নিয়ে চলে অর্ধশতাধিক নৌকা।
চয়ন হাওলাদার (৩৫) নৌকায় করে পর্যটকদের বিল ঘুরিয়ে দেখান। তিনি বলেন, শাপলা ফোটার সময় প্রতিদিনই অনেক মানুষ আসেন। পর্যটক বাড়লে নৌকা চালানো, খাবারের দোকান ও স্থানীয় পণ্য বিক্রির ব্যবসাও বাড়ে। স্থানীয় মাঝিদের হিসাবে, এসব নৌকা থেকে প্রতিদিন সম্মিলিতভাবে ৫০ হাজার থেকে ৭৫ হাজার টাকা আয় হয়; অর্থাৎ যে বিল একসময় স্থানীয় মানুষের কাছে ছিল মূলত জলাভূমি ও জীবিকার জায়গা, সেখানে এখন পর্যটনের কারণে তৈরি হয়েছে আলাদা অর্থনৈতিক কর্মচাঞ্চল্য। স্থানীয় মাঝি ইদ্রিস আলী ব্যাপারী, নাসির উদ্দিন, সবুজ ঘরামী ও লিয়াকত আলীও পর্যটন মৌসুমকে বাড়তি আয়ের সময় হিসেবে দেখছেন।
বিলের জলে জীবিকা
সাতলার অর্থনীতির সবচেয়ে নীরব অংশটি নৌকা থেকে দেখা যায় না। ৬ সেপ্টেম্বর বিকেলে বিলের পানিতে নামেন গীতা রানী দাস ও তাঁর মেয়ে শর্মিলা দাস। পানির গভীরতা কখনো বুক ছাড়িয়ে যায়। তবু শাপলা তুলতে তাঁদের নামতে হয়। কারণ, তাঁদের কাছে শাপলা সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, বরং এটি সংসারের উপার্জনের অবলম্বন।
গীতা রানী দাস বলেন, মা-মেয়ে মিলে বিকেলে বিলের পানিতে নেমে শাপলা তোলেন। পাইকারদের কাছে প্রতি মুঠো পাঁচ টাকা দরে শাপলা বিক্রি করে প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা আয় হয়। বর্ষার তিন-চার মাস শাপলা বিক্রি করেই তাঁদের সংসার চলে।
শাপলা সংগ্রহের সঙ্গে যুক্ত স্থানীয় শতাধিক পরিবার। দিনভর বিল থেকে সংগ্রহ করা শাপলা চলে যায় পাইকারদের কাছে। এরপর উজিরপুর, আগৈলঝাড়া, গৌরনদী, বানারীপাড়া, বাবুগঞ্জ ও বরিশাল শহরের বিভিন্ন বাজারে বিক্রি হয়। গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া—এমনকি রাজধানীর বাজারেও পৌঁছে যায় সাতলার শাপলা। পাইকারি শাপলা বিক্রেতা দীনেশ ঠাকুর বলেন, তাঁরা বিলের শাপলা সংগ্রহকারীদের কাছ থেকে সরাসরি শাপলা কিনে বিভিন্ন হাটবাজারে নিয়ে বিক্রি করেন।
প্লাস্টিক নিয়ে উদ্বেগ
স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা আবদুর রহিমের অভিযোগ, পর্যটক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও তৈরি করতে আসা মানুষের ফেলে যাওয়া প্লাস্টিকসহ নানা অপচনশীল বর্জ্য ইতিমধ্যে বিলের পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। পরিবেশের ক্ষতি না করে কীভাবে বিলটি গুছিয়ে তোলা যায়, সেটি ভাবার সময় এখনই।
পরিবেশবাদীরাও একই ধরনের সতর্কতার কথা বলছেন। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) বরিশাল বিভাগীয় সমন্বয়কারী লিঙ্কন বায়েন বলেন, সাতলার শাপলা বিলকে মানসম্মত ও পূর্ণাঙ্গ পর্যটনকেন্দ্রে রূপ দিতে সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন। তবে পর্যটকদের নিরাপত্তার পাশাপাশি বিলে প্লাস্টিক, পলিথিন ও অন্যান্য বর্জ্য যাতে না ফেলা হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

বাড়ছে পর্যটনের সম্ভাবনা
শাপলার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নন, এমন মানুষেরাও পর্যটন থেকে আয় করছেন। বিলের আশপাশে খাবারের দোকান, রেস্তোরাঁ, অটোরিকশা ও মোটরসাইকেল চলাচল পর্যটন মৌসুমে বেড়ে যায়। একজন স্থানীয় রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী বলেন, পর্যটকের ভিড় বাড়লে তাঁদের খাবারের বিক্রিও বাড়ে। বিশেষ করে ছুটির দিনে দূরদূরান্ত থেকে অসংখ্য মানুষ আসেন। এতে স্থানীয় কয়েকজন মানুষের সাময়িক কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হয়।
স্থানীয় প্রবীণ আবদুল মান্নান ব্যাপারী বলেন, ছোটবেলা থেকেই তিনি এই বিলে শাপলা ফুটতে দেখছেন। তখন মানুষ তেমন আসতেন না। এখন শাপলা ফোটার মৌসুমে দূরদূরান্ত থেকে পর্যটকেরা আসেন।
সাতলার পরিবর্তনটা এখানেই। আগে বিল ছিল জীবিকার জায়গা। এখন সেই জীবিকার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পর্যটন। পর্যটকের সংখ্যা বাড়ায় সাতলা বিলকে আরও আকর্ষণীয় ও পর্যটকবান্ধব করে তুলতে উদ্যোগ নিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।
গত বছর ১৫ লাখ টাকা এবং চলতি বছর আরও ৫ লাখ টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। পটিবাড়ি ও মুড়িবাড়িতে দুটি ‘ভিউ পয়েন্ট’ (পর্যটকদের বসার ও ছবি তোলার জায়গা) তৈরি করা হচ্ছে। প্রথম পর্যায়ে প্রবেশপথ, ভিউ পয়েন্ট ও ঘাটলা নির্মাণ করা হচ্ছে।
উজিরপুর উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ১৫ লাখ টাকা এবং চলতি বছর আরও ৫ লাখ টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। পটিবাড়ি ও মুড়িবাড়িতে দুটি ‘ভিউ পয়েন্ট’ (পর্যটকদের বসার ও ছবি তোলার জায়গা) তৈরি করা হচ্ছে। প্রথম পর্যায়ে প্রবেশপথ, ভিউ পয়েন্ট ও ঘাটলা নির্মাণ করা হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে পর্যটকদের বসার স্থান, নিরাপদ নৌযান চলাচল, স্যানিটেশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যবস্থাও করার পরিকল্পনা রয়েছে।
উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আলী সুজা বলেন, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অক্ষুণ্ন রেখেই সাতলার শাপলা বিলকে পর্যটকবান্ধব করে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি পর্যটকদের নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্যের বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্লাস্টিকের বর্জ্য যাতে বিলের পানিতে না ফেলা হয়, সে জন্য প্রতিটি নৌকায় একটি করে বর্জ্য ফেলার ঝুড়ি দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পর্যটকদের নিরাপত্তায় উপজেলা প্রশাসনের একাধিক মনিটরিং টিম কাজ করছে।
শরীয়তপুরের কাজীরহাট এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মাস্টার মোস্তফা কাজীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, প্রভাব খাটানো ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হন মোস্তফা কাজী। এরপর থেকে এলাকায় বিভিন্ন জমি দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৬ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে কাজীরহাট বাজারের দোকানপ্রতি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা কাজী। এছাড়া কয়েক মাস আগে কাজীরহাটে একটি দোকান ক্রয়ের সময় ব্যবসায়ী সুমন তপাদারের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী আরও জানান, বি. কে. নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলামের কাছ থেকেও ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন মানুষকে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় ফেলে হয়রানি করার অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন মোস্তফা কাজী। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির ব্যানারে তার কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন অনেকে। এছাড়া বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি নিজ ভগ্নিপতি সিদ্দিক দেওয়ানের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোস্তফা কাজীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সচেতন মহল বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
ইউরোপের রাজধানী ব্রাসেলসে আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা জোরালো করা। এই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত আছেন। গত বছরের শুরু থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের কারণে সারা ইউরোপ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ইউরোপীয় নেতারা এখন যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরিতে কাজ করছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, “আমরা যুদ্ধের মানবিক সংকট বুঝতে পারি এবং এখন আমাদের দায়িত্ব এটি দ্রুত শেষ করার পথ খোঁজা। আমাদের প্রত্যেকের জন্যই শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।” এই বৈঠকে অস্ত্রবিরতি চুক্তি, যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলো যুদ্ধ সমাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এগুলো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ক্রমবর্ধমান পরীক্ষার চাপ এবং পরিবারের পাশাপাশি সমাজের অযৌক্তিক প্রত্যাশা। এ দুটি কারণ মিলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বেড়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা। ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করা যেন শিক্ষার্থীর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ—সব জায়গা থেকেই উচ্চ ফলাফলের প্রত্যাশা তৈরি করছে মানসিক চাপের একটি অব্যক্ত বলয়। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইহান কবির বলেন, “পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে মনে হয়, শুধু আমি না, আমার পুরো পরিবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এটা সহ্য করা খুব কঠিন।” শুধু রাইহান নয়, দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা একই অভিজ্ঞতার কথা বলছে। সামাজিক চাপ ও তুলনার সংস্কৃতি পরিস্থিতি করছে আরও জটিল পরীক্ষার নম্বর নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এখন তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া গর্ব বা অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কোন কলেজে ভর্তি হলো, কে কতো পেল—এসব তুলনার চাপে পড়াশোনার আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা তাবাসসুম বলেন, “প্রত্যাশা থাকা ভালো, কিন্তু তা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায় এবং একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব সক্ষমতা উপেক্ষা করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়। এ থেকেই জন্ম নেয় আত্মগ্লানি, হতাশা এবং মাঝে মাঝে আত্মহননের চিন্তা।” জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ নিয়মিত মানসিক চাপে থাকে। এর মধ্যে ১২ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগে এবং বড় একটি অংশ কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই দিন পার করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে ক্ষতিকর। সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, এবং পরিবারের ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ এই সমস্যার নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম হয়, সেখানে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাকে কেবল ফলাফলের সীমায় না এনে একটি মানবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা চাপ নয়, ভালোবাসা থেকে শিখবে, এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ প্রজন্ম।
বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কৃষিখাতকে চরমভাবে আঘাত করছে। অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘদিন খরা এবং হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ফসল উৎপাদনে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে। চলতি মৌসুমেই অনেক জেলায় ধান, গম, ভুট্টা এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, একদিকে যেমন আবহাওয়ার আচরণ বুঝে ওঠা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সারের দাম, কীটনাশক ও বীজের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পোকার আক্রমণ ও রোগবালাইয়ের হারও বেড়ে গেছে। এই চাপে পড়ে অনেক কৃষকই ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা। তাদের পক্ষে বারবার ক্ষতির ধাক্কা সামলে উঠে আবার নতুনভাবে চাষাবাদ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো অঞ্চলে দেখা গেছে, কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী ফসল বাদ দিয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ ও লাভজনক অন্য চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমানেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। একইসঙ্গে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে এমন জাত ও পদ্ধতি উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে যা কঠিন জলবায়ু পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কৃষি খাতকে সচল রাখা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে এখনই পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
কলম্বোর সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাব ময়দানে চলমান দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে ব্যাট হাতে আবারও ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের। টস জিতে ব্যাট করতে নেমে প্রথম ইনিংসে টাইগাররা সংগ্রহ করে মাত্র ২২০ রান, যেখানে ব্যতিক্রম ছিলেন কেবল শোয়াড ইসলাম (৪৬), মুশফিকুর রহিম (৩৫) ও লিটন দাস (৩৪)। শ্রীলঙ্কার বোলাররা শুরু থেকেই চাপ সৃষ্টি করে রাখে। ডেবিউ করা স্পিনার সোনাল দিনুষা ৩ উইকেট নিয়ে আলো ছড়ান, আর আসিথা ফার্নান্দো ও বিষ্ণু ফার্নান্দো নেন ২টি করে উইকেট। প্রথম ইনিংসের জবাবে দ্বিতীয় দিন সকালে শ্রীলঙ্কা উদ্বোধনী জুটি থেকে ভালো সূচনা পায়। ১৩.১ ওভারে কোন উইকেট না হারিয়ে সংগ্রহ করেছে ৬২ রান। ওপেনার পাথুম নিসান্কা ৩৩ এবং লাহিরু উদারা ২৮ রানে অপরাজিত রয়েছেন। বাংলাদেশের হয়ে তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ বোলিং শুরু করলেও এখনও পর্যন্ত সাফল্যের দেখা মেলেনি। শ্রীলঙ্কা এখনো বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস থেকে ১৫৮ রানে পিছিয়ে আছে, হাতে রয়েছে সকল উইকেট। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে প্রভাব এই টেস্টটি ২০২৩-২৫ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ হওয়ায় দুই দলের জন্যই পয়েন্টের লড়াই গুরুত্বপূর্ণ। সিরিজের প্রথম টেস্টে পরাজিত হওয়ায় বাংলাদেশ সিরিজে টিকে থাকতে হলে এই ম্যাচ জিততেই হবে। পরবর্তী চ্যালেঞ্জ স্লো পিচে বাংলাদেশ বোলারদের আরও পরিকল্পিত বোলিং করতে হবে। দ্রুত উইকেট তুলে না নিতে পারলে শ্রীলঙ্কা বড় লিড নিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে দেবে টাইগারদের। ফিল্ডিংয়ে মনোযোগ এবং টাইট বোলিংয়ের মাধ্যমেই দ্বিতীয় ইনিংসে নিজেদের ফিরে পাওয়ার আশায় বাংলাদেশ। সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড (দিন ২, প্রথম সেশন পর্যন্ত): বাংলাদেশ (১ম ইনিংস): ২২০/১০ শ্রীলঙ্কা (১ম ইনিংস): ৬২/০ (১৩.১ ওভার) নিসান্কা: ৩৩*, উদারা: ২৮* বাংলাদেশ বোলার: তাইজুল, মিরাজ – উইকেটহীন
বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসংকটের চরম বাস্তবতায় যখন সারা দেশে লোডশেডিং এবং বিলের বাড়তি বোঝা জনজীবনকে বিপর্যস্ত করছে, ঠিক তখন সবুজ জ্বালানি বা নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে সরকার ক্রমাগত উৎসাহিত করে যাচ্ছে। তবে নীতি আর নির্দেশনার বাইরে এসে কীভাবে বাস্তব ক্ষেত্রে এই রূপান্তর ঘটানো সম্ভব, তার এক অনন্য ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের জোরারগঞ্জ বৌদ্ধ উচ্চবিদ্যালয় (জেবি স্কুল)। সরকারের আহ্বানে সাড়া দিয়ে স্বপ্রণোদিত উদ্যোগ যে কত বড় সুফল বয়ে আনতে পারে, এই প্রতিষ্ঠান আজ তার এক বাস্তব প্রমাণ।বিদ্যালয়টির তিনটি ভবনের দুটির ছাদে ১২ কিলোওয়াট ক্ষমতার সৌর প্যানেল বসিয়ে চালানো হচ্ছে শতাধিক ফ্যান, বাতি, কম্পিউটার এমনকি প্রধান শিক্ষকের কক্ষের শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্রও (এসি)। তিন বছর আগে প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব অর্থায়নে গৃহীত এই পদক্ষেপ তাদের বিদ্যুৎ বিলের খরচ মাসে ৩০ হাজার টাকা থেকে কমিয়ে চার-পাঁচ হাজার টাকায় নামিয়ে এনেছে। বর্তমান বাজারদর বিবেচনায় যেখানে মাসে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা বিল গুনতে হতো, সেখানে কেবল সৌরবিদ্যুতের সুবাদে প্রতি মাসে প্রতিষ্ঠানের এক বিশাল অঙ্ক সাশ্রয় হচ্ছে।কিন্তু জেবি স্কুলের এই সাফল্যের গল্প কেবল আর্থিক সাশ্রয়েই সীমাবদ্ধ নয়; এর সামাজিক ও শিক্ষাসংক্রান্ত প্রভাব আরও গভীর। উপকূলীয় বা গ্রামীণ এলাকায় বিদ্যুৎ–বিভ্রাটের কারণে শ্রেণিকক্ষে যে তীব্র গরম ও অস্বস্তি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনাকে বিঘ্নিত করে, সৌরশক্তি তা স্থায়ীভাবে নিরসন করেছে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের সুবিধায় শিক্ষার্থীরা গরমে স্বস্তিতে ক্লাস করতে পারছে, যার প্রত্যক্ষ ইতিবাচক প্রতিফলন দেখা গেছে তাদের সাম্প্রতিক ফলাফলে—চলতি বছর মাধ্যমিক পরীক্ষায় মিরসরাই উপজেলায় সেরা হয়েছে এই জেবি স্কুল।জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা এবং বৈশ্বিক জ্বালানিসংকট কাটাতে সৌরবিদ্যুতের মতো পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই। উপজেলা প্রশাসন যেমনটি উল্লেখ করেছে, সরকার বর্তমানে নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসারে নানা প্রণোদনা দিচ্ছে। তবে সরকারি সুবিধার প্রতি মুখাপেক্ষী না হয়ে একটি বেসরকারি বা স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যদি নিজস্ব উদ্যোগে ২৪ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে বিদ্যুতে স্বাবলম্বী হতে পারে, তবে দেশের অন্য সরকারি-বেসরকারি বিদ্যালয়, কলেজ, হাসপাতাল ও সরকারি দপ্তরগুলো কেন নয়?দেশের হাজার হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি-বেসরকারি ভবন যদি জেবি স্কুলের এই ‘সবুজ মডেল’ অনুসরণ করে নিজেদের ছাদগুলোকে সৌরশক্তি উৎপাদনের কেন্দ্রে রূপান্তর করে, তবে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ যেমন অভাবনীয়ভাবে কমবে, তেমনি পরিবেশবান্ধব এক টেকসই বাংলাদেশ গড়ার পথও মসৃণ হবে। জেবি স্কুলের এই উদ্যোগ দেশের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের জন্য এক অনুকরণীয় দিকনির্দেশনা। আমরা জেবি স্কুল কর্তৃপক্ষের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই।
করপোরেট দুনিয়ায় টিকে থাকতে এবং ক্যারিয়ারে সফল হতে এখন আর্থিক জ্ঞান বা ফিন্যান্সিয়াল লিটারেসির কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু যাঁদের অ্যাকাউন্টিং বা হিসাববিজ্ঞানের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাকগ্রাউন্ড নেই, তাঁরা প্রায়ই ব্যবসার হিসাব-নিকাশ বুঝতে এবং কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েন। এই বাস্তব সমস্যা সমাধানে দেশের শীর্ষস্থানীয় বিজনেস স্কুল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (আইবিএ) চালু করেছে একটি বিশেষ সার্টিফিকেট কোর্স। কোর্সটির শিরোনাম ‘অ্যাকাউন্টিং ফর নন-অ্যাকাউন্ট্যান্টস’ বা সংক্ষেপে এএফএনএ। পরিবর্তনশীল অর্থনৈতিক ও ব্যবসায়িক গতিশীলতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে ম্যানেজারদের ব্যবস্থাপনা দক্ষতা আরও শাণিত করতেই আইবিএর ম্যানেজমেন্ট ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের আওতায় এই ছয় সপ্তাহের কোর্স ডিজাইন করা হয়েছে।কেন প্রয়োজনযাঁদের হিসাববিজ্ঞানে সামান্য বা কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই, অথচ ব্যবসায়িক লেনদেন রেকর্ড, সারাংশ ও করপোরেট সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য সেগুলো বোঝা জরুরি, মূলত তাঁদের জন্যই এই কোর্স সাজানো হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএর অধ্যাপক ড. মহিউদ্দিন বলেন, ছয় সপ্তাহব্যাপী এই কোর্সের সিলেবাস বেশ বিস্তৃত ও আধুনিক। এতে ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্টিংয়ের পাশাপাশি কস্ট ও ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্টিংয়ের মূল বিষয়গুলো খুব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। অংশগ্রহণকারীরা অ্যাকাউন্টিং সিস্টেম, আর্থিক বিবরণী (ফিন্যান্সিয়াল স্টেটমেন্ট), বার্ষিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ, আর্থিক কর্মক্ষমতা মূল্যায়ন, খরচ হিসাব করার পদ্ধতি, বাজেট প্রণয়নপ্রক্রিয়া, ভ্যারিয়েন্স অ্যানালাইসিস এবং ইনক্রিমেন্টাল অ্যানালাইসিসের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো শিখতে পারবেন। এর ফলে একজন ম্যানেজার তাঁর দৈনন্দিন ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের দক্ষতা বহুগুণ বাড়িয়ে নিতে সক্ষম হবেন।অস্ট্রেলিয়ায় বিদেশি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পরিবার আনার সুযোগ বন্ধের প্রস্তাবকোর্সের তথ্যকোর্সটির ক্লাস পরিচালনার জন্য সময় নির্ধারণ করা হয়েছে বেশ সুবিধাজনক। প্রতি শুক্রবার সকাল সাড়ে ৯টা এবং বেলা ২টা ১৫ মিনিটে আইবিএতে ক্লাসগুলো অনুষ্ঠিত হবে। এই কোর্সে আবেদন করার জন্য কিছু নির্দিষ্ট যোগ্যতা প্রয়োজন। প্রার্থীকে যেকোনো বিষয়ে ব্যাচেলর ডিগ্রিধারী হতে হবে এবং কোনো খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠানে অন্তত দুই বছরের কাজের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।আবেদনপ্রক্রিয়াঅনলাইনে আবেদনের শেষ তারিখ আগামী ৬ অক্টোবর। এরপর বাছাইকৃত প্রার্থীদের রোলিং ভিত্তিতে ইন্টারভিউর জন্য ডাকা হবে এবং চূড়ান্ত নির্বাচনের পর নির্বাচিতদের মোট ৩২,০০০ টাকা কোর্স ফি পরিশোধ করতে হবে। আগামী ৬ নভেম্বর থেকে এই কোর্সের ক্লাস আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে।বিনা মূল্যে এআই প্রশিক্ষণ, দিনে ভাতা ২০০, যাঁরা আবেদনের যোগ্য যোগাযোগআইবিএ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং দেশের অন্যান্য নামী বিজনেস স্কুলের অভিজ্ঞ শিক্ষক ছাড়াও শিল্প খাতের শীর্ষস্থানীয় পেশাজীবীরা রিসোর্স পারসন হিসেবে এই কোর্সে ক্লাস নেবেন। তত্ত্বীয় জ্ঞানের পাশাপাশি কেস স্টাডি, ব্যক্তিগত ও দলগত অ্যাসাইনমেন্ট এবং পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করা হবে। কোর্স সফলভাবে শেষ করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ থেকে সার্টিফিকেট প্রদান করা হবে, যা অংশগ্রহণকারীদের পেশাগত জীবনে বড় ধরনের ভ্যালু যোগ করবে। বিস্তারিত তথ্য বা আবেদনের জন্য আগ্রহীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএর চতুর্থ তলার (রুম নং-৪০২) ম্যানেজমেন্ট ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামে যোগাযোগ করতে পারেন অথবা ০১৭৬৬-৯৯৩৩৯০ ও ০১৭২৬-৮৮৫৩২৯ নম্বরে ফোন করতে কিংবা mdp@iba-du.edu মেইলে যোগাযোগ করতে পারেন।জার্মানি থেকে মালয়েশিয়া—কম খরচে পড়াশোনার ১০ দেশ
গাইবান্ধা সদর উপজেলার উত্তর ফলিয়া গ্রামে ছোট্ট একটি টিনের ঘরের মেঝেতে বসে রঙিন কাগজ মেপে মেপে কাটছেন শরিফুল ইসলাম। কাগজে আঠা লাগিয়ে ভেতরে কলমের শিষ ঢুকিয়ে পেঁচিয়ে তৈরি করছেন কলম। গত মঙ্গলবার সকালে সেখানে গিয়ে এমন দৃশ্যই দেখা যায়। জন্মগত দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শরিফুল (২৯)। দশম শ্রেণি পর্যন্ত ব্রেইল পদ্ধতিতে পড়েছেন। এরপর অডিও শুনে ও শ্রুতলেখকের সহযোগিতায় এসএসসি থেকে স্নাতকোত্তর পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। অর্থসংকটে পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলে খাতা ও পরে কাগজের কলম বানানো শুরু করেন। সেগুলো বিক্রি করে পাওয়া আয়েই নিজের পড়াশোনার খরচ চালিয়েছেন তিনি। ২০১৫ সালে গাইবান্ধা ইসলামিয়া উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ২০১৭ সালে গাইবান্ধা সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন শরিফুল। ২০১৮ সালে ভর্তি হন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগে। ২০২১ সালে স্নাতক (সম্মান) ও ২০২৫ সালে স্নাতকোত্তর পাস করেন।শরিফুলের বাবা রফিকুল ইসলাম (৭৬) মুদিদোকানি। মা মনোয়ারা বেগম গৃহিণী। পাঁচ ভাই–বোনের মধ্যে শরিফুল চতুর্থ। দুই বোন রাশেদা ও ফরিদার বিয়ে হয়েছে। দুই ভাই শহিদুল ও মোস্তফা ঢাকায় পোশাকশ্রমিকের কাজ করেন। ২০২২ সালে গাইবান্ধা শহরের ব্রিজ রোড এলাকার তানিয়া আকতারের সঙ্গে শরিফুলের বিয়ে হয়।শরিফুল ইসলাম, উদ্যোক্তা‘কাগজের কলম ব্যবহারের পর ফেলে দিলে শুধু শিষ ও নিব ছাড়া বাকি অংশ সহজেই পচে যায়। প্লাস্টিকের অন্যান্য কলমের চেয়ে এতে পরিবেশের ক্ষতি কম হয়।’ ২০২৩ সালের মার্চ মাসে শরিফুল খাতা তৈরির কাজ শুরু করেন। কাগজ কিনে খাতা তৈরি করে বিক্রি করতেন। মাসিক আয় হতো প্রায় এক হাজার টাকা। ওই বছরের অক্টোবরে রংপুরের এক বন্ধুর কাছ থেকে তিনি কাগজ দিয়ে কলম তৈরির কথা জানতে পারেন। স্থানীয় এক বন্ধুর মাধ্যমে ফেসবুকে যশোরের এক নারী উদ্যোক্তার খোঁজ পান। তিনি কাগজ দিয়ে কলম তৈরি করতেন। তাঁর সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করে ১০০টি কলম কিনে নেন শরিফুল। একই সঙ্গে কলম তৈরির পদ্ধতিও শিখে নেন। এরপর নভেম্বর মাসে তিনি নিজেই কলম বানানো শুরু করেন।কাগজের তৈরি কলম। গত মঙ্গলবার সকালে গাইবান্ধা সদর উপজেলার উত্তর ফলিয়া গ্রামেশরিফুল তাঁর কলমের নাম দিয়েছেন ‘গ্রিন ইকোনমি’। তাঁর মতে, এই কলম অনেকটাই পরিবেশবান্ধব। তিনি বলেন, ‘কাগজের কলম ব্যবহারের পর ফেলে দিলে শুধু শিষ ও নিব ছাড়া বাকি অংশ সহজেই পচে যায়। প্লাস্টিকের অন্যান্য কলমের চেয়ে পরিবেশের ক্ষতি কম হয়। ভবিষ্যতে বড় পরিসরে এই কাজ করতে চাই; কিন্তু মূলধনের অভাবে চাহিদা অনুযায়ী কলম ও খাতা তৈরি করতে পারছি না।’একটি কলম তৈরিতে শরিফুলের খরচ হয় ৬ টাকা, বিক্রি করেন ১০ টাকায়। বর্তমানে দিনে প্রায় ৫০টি কলম তৈরি করতে পারেন। পাশাপাশি দিনে প্রায় ১০০টি খাতা তৈরি করেন। প্রতিটি খাতা তৈরিতে খরচ ১৫ টাকা, বিক্রি করেন ২০ টাকায়। এসব কাজে সহযোগিতা করেন তাঁর স্ত্রী তানিয়া আকতার। বাড়িতে তৈরি এসব কলম ও খাতা বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও দোকানে পাইকারি বিক্রি করেন শরিফুল।নিজের তৈরি কলম দেখাচ্ছেন শরিফুল। গত মঙ্গলবার সকালে গাইবান্ধা সদর উপজেলার উত্তর ফলিয়া গ্রামেমা–বাবা ও স্ত্রীকে নিয়ে একই পরিবারে থাকেন শরিফুল। সদর উপজেলার পুলবন্দি বাজারে তাঁর ‘শরিফুল পেপার হাউস’ নামের একটি ছোট দোকান আছে। দোকানের ভাড়া মাসে ৫০০ টাকা। প্রতি মাসে ৯ থেকে ১০ হাজার টাকার খাতা–কলম বিক্রি করেন তিনি। খরচ বাদ দিয়ে মাসে তিন থেকে চার হাজার টাকা আয় হয় তাঁর। তবে এ আয়ে সংসার চলে না। বাবা রফিকুল ইসলামের মুদিদোকানের আয়ে সংসারের বেশির ভাগ খরচ চলে।তানিয়া আকতার বলেন, ‘স্বামী দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হলেও তাঁকে নিয়ে আমি গর্বিত। সব সময় তাঁকে উৎসাহ দিই।’নিজের দোকানে বসে আছেন শরিফুল। গত মঙ্গলবার সকালে গাইবান্ধা সদর উপজেলার পুলবন্দি বাজারেশরিফুল সমাজের বোঝা হয়ে থাকেননি উল্লেখ করে পুলবন্দি গ্রামের স্কুলশিক্ষক জাহিদুল ইসলাম বলেন, নিজের মেধা ও ইচ্ছাশক্তি কাজে লাগিয়ে তিনি নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছেন। তাঁর এই উদ্যোগ অন্যদের জন্যও দৃষ্টান্ত।২৪ সেপ্টেম্বর থেকে গাইবান্ধায় বাণিজ্যমেলা শুরু হবে। মেলায় কলম ও খাতা বিক্রির জন্য একটি স্টল বরাদ্দ পেয়েছেন শরিফুল। আয়োজক গাইবান্ধা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি সামিউল হুদা জানান, মেলায় প্রায় ৭০টি স্টল থাকবে। এর মধ্যে প্রতিবন্ধী ও নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ১০ টাকায় স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।