ইউটিউবে আট-নয় বছর বয়সেই আলোড়ন তুলেছিল ছেলেটি। বলে এত দারুণ নিয়ন্ত্রণ, ড্রিবলিং করে প্রতিপক্ষকে পেছনে ফেলার দক্ষতাও চোখধাঁধানো। ছেলেটির খেলার ভিডিও দেখে লিওনেল মেসির শৈশবকে মনে পড়েছিল অনেকেরই। তাতে নতুন একটি তকমাও লেপটে যায় ছেলেটির গায়ে, ‘কিড মেসি’ বা ‘খুদে মেসি।’
সেই ছেলেটির নাম জে জে গ্যাব্রিয়েল। চেলসি, আর্সেনাল, ওয়েস্ট হামের একাডেমি ঘুরে গ্যাব্রিয়েল ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের একাডেমিতে যোগ দেয় ২০২২ সালে। তার পর থেকে সবকিছু মোটামুটি ঠিকঠাকই চলছিল। অন্তত বাইরে থেকে দেখে এমনটাই মনে হওয়ার কথা সবার। ইউনাইটেডও তাঁকে নিয়ে স্বপ্নের জাল বুনছিল। কারণ, গ্যাব্রিয়েলের প্রতিভা। বয়সে বড়রাও তাঁকে আটকাতে হিমশিম খান। এরই মধ্যে গত বছর এপ্রিলে ইউনাইটেডের অনূর্ধ্ব-১৮ দলে সর্বকনিষ্ঠ হিসেবে অভিষেক হয় গ্যাব্রিয়েলের।
ইউনাইটেডের অনূর্ধ্ব-১৮ দলে গত মৌসুমে ২৬ ম্যাচে ২৯ গোল করে প্রতিভার ছটা ভালোমতো বুঝিয়ে দেন গ্যাব্রিয়েল। ক্লাবও তাঁকে তুলে এনেছিল মূল দলের অনুশীলনে। প্রাক্–মৌসুমে মাইকেল ক্যারিকের দলের হয়ে মাঠে নামেন। কয়েক দিন আগে উয়েফা ইয়ুথ লিগে সাবাহর বিপক্ষে হ্যাটট্রিকও করেন। সব মিলিয়ে গ্যাব্রিয়েলকে ভবিষ্যৎ ভেবেই তাঁকে ধীরে ধীরে তৈরি করছিল ইউনাইটেড। কিন্তু হঠাৎই ছন্দপতন। গ্যাব্রিয়েল এখন ইউনাইটেড ছাড়তে মরিয়া। ১৫ বছর বয়সী এই উইঙ্গার তাঁর নিবন্ধন বাতিল করার অনুরোধ করেছেন ক্লাবের কাছে। ফ্রি এজেন্ট হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে আনুষ্ঠানিক নোটিশও পাঠিয়েছেন।
গ্যাব্রিয়েলের সিদ্ধান্ত জেনে ইউনাইটেড রীতিমতো হতভম্ব। তবে ওল্ড ট্রাফোর্ডের ক্লাবটি এখনো এই খুদে প্রতিভার আবেদন মঞ্জুর করেনি। গ্যাব্রিয়েলের এমন সিদ্ধান্তের নেপথ্যে কী রয়েছে, তা নিয়ে ধোঁয়াশায় আছে ইউনাইটেড। ক্লাবটির বিশ্বাস, গ্যাব্রিয়েলকে মূল দলে খেলার সুযোগ নিশ্চিত করতে তারা সম্ভাব্য সব চেষ্টাই করছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’ জানিয়েছে, কারাবাও কাপের তৃতীয় রাউন্ডে ব্রাইটনের বিপক্ষে ম্যাচের একদিন আগে ক্লাব ছাড়ার ইচ্ছার কথা জানান গ্যাব্রিয়েল। গতকাল রাতে ইউনাইটেডের হেরে বিদায় নেওয়া সেই ম্যাচে ক্লাবটির ইতিহাসে কনিষ্ঠতম খেলোয়াড় হতে পারতেন আগামী মাসে ১৬ বছরে পা রাখতে যাওয়া গ্যাব্রিয়েল।

বিবিসি জানিয়েছে, গ্যাব্রিয়েল ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে পেশাদারি ও ক্যারিয়ার নিয়ে এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণে ব্যাপক সমালোচনার ঝড় উঠেছে। তবে খেলোয়াড়টির ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলোর বিশ্বাস, এ সমালোচনা অনুচিত এবং এতে গ্যাব্রিয়েলের পরিশ্রম ও নিবেদনকে অস্বীকার করা হচ্ছে।
সূত্রগুলোর মতে, গত গ্রীষ্মে ক্লাবের শীর্ষ কর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে গ্যাব্রিয়েল যখন স্বল্প মেয়াদে ক্লাবে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তখন তাঁর ক্যারিয়ারের ভবিষ্যৎ নিয়ে ক্লাবের পক্ষ থেকে কিছু প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল যেগুলো রক্ষা করা হয়নি।
শুরুতে কোচ রুবেন আমোরিম এবং পরে মাইকেল ক্যারিকের অধীন গ্যাব্রিয়েল সিনিয়র দলের অনুশীলনে অংশ নিলেও মূল দলে অভিষেক নিয়ে গত মৌসুম থেকেই গুঞ্জন শুরু হয়। আশা করা হয়েছিল, ইউনাইটেডের প্রাক্-মৌসুম প্রস্তুতি সফরে গ্যাব্রিয়েল খেলবেন।
গত ১৮ জুলাই রেক্সহামের বিপক্ষে খেলতে হেলসিঙ্কি সফরে গ্যাব্রিয়েলের না থাকার কারণ হিসেবে প্রাক্-মৌসুম অনুশীলনে দেরিতে যোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। পরে সে সফরে ইউনাইটেডের প্রতিটি স্কোয়াডেই ছিলেন, তবে স্টকহোমে আতলেতিকো মাদ্রিদের বিপক্ষে শুধু ৮ মিনিটের জন্য মাঠে নামেন।
প্রত্যাশানুযায়ী সুযোগ না পাওয়াতেই কি ক্ষোভের জন্ম হয়েছে গ্যাব্রিয়েলের মনে? গত ২৪ জুলাই রোজেনবার্গের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচের জন্য গ্যাব্রিয়েল ট্রনহেইমে গিয়েছিলেন। সেদিন ইউনাইটেড কোচ ক্যারিক ১১ জন বদলি খেলোয়াড় ব্যবহার করলেও মাঠে নামতে না পারা দুজন খেলোয়াড়ের একজন ছিলেন গ্যাব্রিয়েল।
ক্রোক পার্কে লিডসের বিপক্ষে ম্যাচের উদাহরণ টানা যায়। টটেনহাম থেকে যাওয়ার ৩ সপ্তাহ পর ১৮ বছর বয়সী উইঙ্গার টিনান টম্পসনকে সেই ম্যাচে মূল খেলানো হয়। কিন্তু গ্যাব্রিয়েল দলের সঙ্গে গিয়েও ম্যাচটি খেলার সুযোগ পাননি। এরপরও সবার ধারণা ছিল কারাবাও কাপে হয়তো ইউনাইটেডের মূল দলে অভিষেক হবে গ্যাব্রিয়েলের।
এ মৌসুমে এখন পর্যন্ত ইউনাইটেডের সম্ভাব্য সবচেয়ে সহজ লড়াই ছিল চ্যাম্পিয়নস লিগে আজারবাইজানের দল সাবাহ এফকের বিপক্ষে ম্যাচ। প্রথমার্ধেই ইউনাইটেড ৩-০ গোলে এগিয়ে যায় এবং ৭২ মিনিটের মধ্যেই দলটির কোচ ক্যারিক পাঁচজন বদলি খেলোয়াড়কে ব্যবহার করেন। কিন্তু সেই বদলি তালিকায়ও গ্যাব্রিয়েলের জায়গা হয়নি। বয়স ১৫ বছর হওয়ায় উয়েফার নিবন্ধন বিধি অনুযায়ী ইউনাইটেডের ‘এ’ ক্যাটাগরির খেলোয়াড়দের তালিকায় গ্যাব্রিয়েলকে রাখা হলে তিনি খেলতে পারতেন।
ইউনাইটেডের কোচরা এর আগে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, সিনিয়র খেলোয়াড় হওয়ার মতো শারীরিক সক্ষমতা এখনো গ্যাব্রিয়েলের হয়নি। তবে খেলোয়াড়ের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো দাবিটি জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যান করে। আর্সেনাল যেভাবে ১৫ বছর বয়সী ম্যাক্স ডাউম্যানকে সুযোগ দিয়েছে, বায়ার্ন মিউনিখও ১৭ বছর বয়সী লেনার্ট কার্লকে অভিষেক করিয়েছে—এসব উদাহরণ টেনে ইউনাইটেড কেন গ্যাব্রিয়েলের ক্ষেত্রে এমনটা করল না, তা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছে তাঁর পরিবার।

ম্যানচেস্টার ইভিনিং নিউজ জানিয়েছে, ফ্রি এজেন্ট হওয়ার অনুরোধ জানানোর পর গ্যাব্রিয়েল দলবদলের কোনো ফাঁকফোকর ব্যবহার করে ওল্ড ট্রাফোর্ড ছেড়ে চলে যেতে পারেন—এমন আশঙ্কা করছে ইউনাইটেড। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ক্লাবটি তাঁর চুক্তি বাতিল করতে রাজি না হলে এই তরুণ চলতি মৌসুম শেষ হওয়ার আগে ইংল্যান্ডের শীর্ষ লিগে অন্য কোনো ক্লাবে যোগ দিতে পারবেন না। তবে ইংল্যান্ডের বাইরে অন্য কোনো ক্লাবে যোগ দেওয়ার কথা ভাবতে পারেন গ্যাব্রিয়েল।
গ্যাব্রিয়েল আয়ারল্যান্ডের পাসপোর্টধারী হলে আগামী ৬ অক্টোবর ১৬ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার পর তিনি ইউরোপের অন্য কোনো ক্লাবে যোগ দেওয়ার যোগ্য হবেন। তাঁর বাবা ও সাবেক ডিফেন্ডার জো ও’সিয়ারুইল আয়ারল্যান্ড জাতীয় দলে খেলেছেন।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য মিরর’ জানিয়েছে, ইউনাইটেড খতিয়ে দেখছে গ্যাব্রিয়েলের বিদেশ চলে যাওয়া তারা আটকাতে পারে কি না। তবে যেকোনো দলবদলেই ফিফার অনুমোদনের প্রয়োজন হবে। প্রিমিয়ার লিগের নিয়ম অনুযায়ী ১৭ বছরের কম বয়সী খেলোয়াড়দের পেশাদার চুক্তিতে সই করার ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, অন্যদিকে স্কলারশিপ চুক্তিতে সম্মত হওয়ার আগে একজন একাডেমি খেলোয়াড়ের বয়স অন্তত ১৬ বছর হতে হবে।
তবে গ্যাব্রিয়েলের সঙ্গে এই সমস্যার সমাধানে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে ইউনাইটেড। খবর রয়েছে, চ্যাম্পিয়ন লিগের স্কোয়াডের জন্য ইউনাইটেডের ‘এ’ তালিকায় এই শীর্ষ প্রতিভাবান খেলোয়াড়কে রাখা না হওয়ার কারণে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যার ফলে গত সপ্তাহে সাবাহর বিপক্ষে জয়ী ম্যাচে তিনি খেলতে পারেননি।
গ্যাব্রিয়েলের এ সমস্যার সমাধানে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে ইউনাইটেড। খবর রয়েছে, চ্যাম্পিয়ন লিগের স্কোয়াডের জন্য ইউনাইটেডের ‘এ’ ক্যাটাগরির খেলোয়াড় তালিকায় তাঁকে রাখার কারণে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
মিরর জানিয়েছে, গ্যাব্রিয়েল ইউনাইটেডের সঙ্গে চুক্তি বাতিলের অনুরোধ জানানোর পর চারটি বড় ক্লাবের নজরে পড়েছেন। ইউনাইটেড তাঁর অনুরোধ এখনো মেনে না নিলেও সম্ভাব্য গন্তব্যের পথ খোলা আছে বেশ কয়েকটি।
‘দ্য অ্যাথলেটিক’ জানিয়েছে, গ্যাব্রিয়েলকে দলে ভেড়ানোর আগ্রহ প্রকাশ করেছে রিয়াল মাদ্রিদ, বার্সেলোনা, পিএসজি ও বায়ার্ন মিউনিখ। রিয়াল গ্যাব্রিয়েলকে দীর্ঘদিন পর্যবেক্ষণ করে আসছে। ইউনাইটেড চাইলে গ্যাব্রিয়েলের ক্লাব ছাড়ার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করতে পারে কিংবা এ নিয়ে লড়াই চালিয়ে যেতে পারে। তবে গ্যাব্রিয়েল ইংল্যান্ডের বাইরে যেতে পারবেন কি না, তা নিয়ে ধোঁয়াশা আছে।
প্রিমিয়ার লিগের নিয়মে বলা হয়েছে, ‘কোনো খেলোয়াড়ের নিবন্ধনের মেয়াদ চলাকালীন কেবল তখনই তার রেজিস্ট্রেশন বাতিল করা সম্ভব, যদি সংশ্লিষ্ট সবাই (ক্লাব, খেলোয়াড় এবং তার অভিভাবক) এতে সম্মত হন।’ নিয়মে আরও বলা হয়েছে, ‘পক্ষগুলো যদি একমত না হয়, তবে যেকোনো পক্ষই লিখিত আবেদন করার মাধ্যমে চুক্তি বাতিলের অনুরোধ নিয়ে প্রিমিয়ার লিগের কাছে একটি বাধ্যতামূলক সিদ্ধান্তের দাবি জানাতে পারে, যেখানে অনুরোধের সম্পূর্ণ কারণ বিস্তারিত উল্লেখ থাকতে হবে।’
গ্যাব্রিয়েলের জন্ম ২০১০ সালে ইংল্যান্ডের এনফিল্ডে। তাঁর বাবা জো ও’সিয়ারুইলের জন্মও ইংল্যান্ডে। কিন্তু মায়ের আইরিশ জাতীয়তার সুবাদে আয়ারল্যান্ড জাতীয় দলে খেলেছেন জো ও’সিয়ারুইল। গ্যাব্রিয়েলের মা গ্রিক-সাইপ্রিয়ট বংশোদ্ভূত। লন্ডনে বেড়ে উঠেছেন গ্যাব্রিয়েল। তাঁর পারিবারিক শেকড় বেশ বৈচিত্র্যময়। বাবার দিক থেকে আইরিশ ও ত্রিনিদাদীয় এবং মায়ের দিক থেকে সাইপ্রাসীয় বংশোদ্ভূত হওয়ায় গ্যাব্রিয়েল আন্তর্জাতিক ফুটবলে ইংল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড, সাইপ্রাস এবং ত্রিনিদাদ ও টোবাগোর হয়ে খেলার যোগ্যতা রাখেন।
শরীয়তপুরের কাজীরহাট এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মাস্টার মোস্তফা কাজীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, প্রভাব খাটানো ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হন মোস্তফা কাজী। এরপর থেকে এলাকায় বিভিন্ন জমি দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৬ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে কাজীরহাট বাজারের দোকানপ্রতি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা কাজী। এছাড়া কয়েক মাস আগে কাজীরহাটে একটি দোকান ক্রয়ের সময় ব্যবসায়ী সুমন তপাদারের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী আরও জানান, বি. কে. নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলামের কাছ থেকেও ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন মানুষকে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় ফেলে হয়রানি করার অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন মোস্তফা কাজী। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির ব্যানারে তার কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন অনেকে। এছাড়া বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি নিজ ভগ্নিপতি সিদ্দিক দেওয়ানের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোস্তফা কাজীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সচেতন মহল বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
ইউরোপের রাজধানী ব্রাসেলসে আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা জোরালো করা। এই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত আছেন। গত বছরের শুরু থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের কারণে সারা ইউরোপ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ইউরোপীয় নেতারা এখন যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরিতে কাজ করছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, “আমরা যুদ্ধের মানবিক সংকট বুঝতে পারি এবং এখন আমাদের দায়িত্ব এটি দ্রুত শেষ করার পথ খোঁজা। আমাদের প্রত্যেকের জন্যই শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।” এই বৈঠকে অস্ত্রবিরতি চুক্তি, যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলো যুদ্ধ সমাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এগুলো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ক্রমবর্ধমান পরীক্ষার চাপ এবং পরিবারের পাশাপাশি সমাজের অযৌক্তিক প্রত্যাশা। এ দুটি কারণ মিলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বেড়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা। ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করা যেন শিক্ষার্থীর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ—সব জায়গা থেকেই উচ্চ ফলাফলের প্রত্যাশা তৈরি করছে মানসিক চাপের একটি অব্যক্ত বলয়। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইহান কবির বলেন, “পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে মনে হয়, শুধু আমি না, আমার পুরো পরিবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এটা সহ্য করা খুব কঠিন।” শুধু রাইহান নয়, দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা একই অভিজ্ঞতার কথা বলছে। সামাজিক চাপ ও তুলনার সংস্কৃতি পরিস্থিতি করছে আরও জটিল পরীক্ষার নম্বর নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এখন তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া গর্ব বা অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কোন কলেজে ভর্তি হলো, কে কতো পেল—এসব তুলনার চাপে পড়াশোনার আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা তাবাসসুম বলেন, “প্রত্যাশা থাকা ভালো, কিন্তু তা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায় এবং একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব সক্ষমতা উপেক্ষা করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়। এ থেকেই জন্ম নেয় আত্মগ্লানি, হতাশা এবং মাঝে মাঝে আত্মহননের চিন্তা।” জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ নিয়মিত মানসিক চাপে থাকে। এর মধ্যে ১২ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগে এবং বড় একটি অংশ কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই দিন পার করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে ক্ষতিকর। সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, এবং পরিবারের ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ এই সমস্যার নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম হয়, সেখানে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাকে কেবল ফলাফলের সীমায় না এনে একটি মানবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা চাপ নয়, ভালোবাসা থেকে শিখবে, এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ প্রজন্ম।
বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কৃষিখাতকে চরমভাবে আঘাত করছে। অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘদিন খরা এবং হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ফসল উৎপাদনে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে। চলতি মৌসুমেই অনেক জেলায় ধান, গম, ভুট্টা এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, একদিকে যেমন আবহাওয়ার আচরণ বুঝে ওঠা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সারের দাম, কীটনাশক ও বীজের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পোকার আক্রমণ ও রোগবালাইয়ের হারও বেড়ে গেছে। এই চাপে পড়ে অনেক কৃষকই ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা। তাদের পক্ষে বারবার ক্ষতির ধাক্কা সামলে উঠে আবার নতুনভাবে চাষাবাদ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো অঞ্চলে দেখা গেছে, কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী ফসল বাদ দিয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ ও লাভজনক অন্য চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমানেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। একইসঙ্গে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে এমন জাত ও পদ্ধতি উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে যা কঠিন জলবায়ু পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কৃষি খাতকে সচল রাখা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে এখনই পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
কলম্বোর সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাব ময়দানে চলমান দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে ব্যাট হাতে আবারও ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের। টস জিতে ব্যাট করতে নেমে প্রথম ইনিংসে টাইগাররা সংগ্রহ করে মাত্র ২২০ রান, যেখানে ব্যতিক্রম ছিলেন কেবল শোয়াড ইসলাম (৪৬), মুশফিকুর রহিম (৩৫) ও লিটন দাস (৩৪)। শ্রীলঙ্কার বোলাররা শুরু থেকেই চাপ সৃষ্টি করে রাখে। ডেবিউ করা স্পিনার সোনাল দিনুষা ৩ উইকেট নিয়ে আলো ছড়ান, আর আসিথা ফার্নান্দো ও বিষ্ণু ফার্নান্দো নেন ২টি করে উইকেট। প্রথম ইনিংসের জবাবে দ্বিতীয় দিন সকালে শ্রীলঙ্কা উদ্বোধনী জুটি থেকে ভালো সূচনা পায়। ১৩.১ ওভারে কোন উইকেট না হারিয়ে সংগ্রহ করেছে ৬২ রান। ওপেনার পাথুম নিসান্কা ৩৩ এবং লাহিরু উদারা ২৮ রানে অপরাজিত রয়েছেন। বাংলাদেশের হয়ে তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ বোলিং শুরু করলেও এখনও পর্যন্ত সাফল্যের দেখা মেলেনি। শ্রীলঙ্কা এখনো বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস থেকে ১৫৮ রানে পিছিয়ে আছে, হাতে রয়েছে সকল উইকেট। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে প্রভাব এই টেস্টটি ২০২৩-২৫ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ হওয়ায় দুই দলের জন্যই পয়েন্টের লড়াই গুরুত্বপূর্ণ। সিরিজের প্রথম টেস্টে পরাজিত হওয়ায় বাংলাদেশ সিরিজে টিকে থাকতে হলে এই ম্যাচ জিততেই হবে। পরবর্তী চ্যালেঞ্জ স্লো পিচে বাংলাদেশ বোলারদের আরও পরিকল্পিত বোলিং করতে হবে। দ্রুত উইকেট তুলে না নিতে পারলে শ্রীলঙ্কা বড় লিড নিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে দেবে টাইগারদের। ফিল্ডিংয়ে মনোযোগ এবং টাইট বোলিংয়ের মাধ্যমেই দ্বিতীয় ইনিংসে নিজেদের ফিরে পাওয়ার আশায় বাংলাদেশ। সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড (দিন ২, প্রথম সেশন পর্যন্ত): বাংলাদেশ (১ম ইনিংস): ২২০/১০ শ্রীলঙ্কা (১ম ইনিংস): ৬২/০ (১৩.১ ওভার) নিসান্কা: ৩৩*, উদারা: ২৮* বাংলাদেশ বোলার: তাইজুল, মিরাজ – উইকেটহীন
প্রথম দেখায় বোঝার উপায় নেই এগুলো মাটির তৈরি। নকশা করা থালা, বাটি, কাপ-পিরিচ, মগ, ফুলদানি ও ফুলের টব সাজানো রয়েছে কারখানাজুড়ে। সামনের খোলা উঠানে কিছু পণ্য শুকানো হচ্ছে, আবার কিছু নেওয়া হচ্ছে পাশের চুল্লিতে পোড়ানোর জন্য। ঘরের ভেতরে চলছে মেশিনের শব্দ, কারিগরদের কাজ আর পণ্যে রঙের প্রলেপ দেওয়ার ব্যস্ততা।গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে সাতক্ষীরার তালা উপজেলার মাঝিয়াড়া গ্রামের একটি কারখানায় গিয়ে দেখা গেল এমন দৃশ্য। আধুনিক যন্ত্র ও ছাঁচের সাহায্যে তৈরি এসব মাটির পণ্যের গড়নও বেশ সুন্দর। উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান উন্নয়ন প্রচেষ্টার প্রযুক্তিগত সহায়তায় এখানে তৈরি হচ্ছে থালা, বাটি, কাপ-পিরিচ, মগ, জগ, বোতল, ফুলদানি, ফুলের টব, টেরাকোটাসহ নানা পণ্য।একসময় মাটির তৈজসপত্র তৈরি ছিল পাল সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী পেশা। কম দাম ও বাজারের পরিবর্তনের কারণে অনেকে এ পেশা ছেড়ে অন্য কাজে চলে যান। মাঝিয়াড়ায় এখন আধুনিক পদ্ধতিতে সেই পেশাতেই ফিরছেন কেউ কেউ।কারখানার ভেতরে মেশিনের সাহায্যে মাটি প্রস্তুত করে ঘুরন্ত চাকের মতো একটি যন্ত্রে থালার আকৃতি দিচ্ছিলেন কারুশিল্পী কামরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘এই ঘুরতে থাকা যন্ত্রকে জিগার মেশিন বলে। এখানে ছয়টা জিগার মেশিন আছে। আমি তিন বছর ধরে এখানে কাজ করি। এখন সব কাজ শিখে গেছি।’মাটির তৈরি থালায় রঙের প্রলেপ দিচ্ছেন এক নারী শ্রমিক। গতকাল সকালে তালা উপজেলার মাঝিয়াড়া গ্রামেকারিগরদের ভাষ্য, খালবিল থেকে মাটি সংগ্রহ করে মেশিনে তা ছেঁকে ছোট ছোট দলায় পরিণত করা হয়। এরপর ছাঁচে বসিয়ে জিগার মেশিনে ঘুরিয়ে তৈরি করা হয় নির্দিষ্ট আকৃতির পাত্র। পাত্রগুলো শুকানোর পর দেওয়া হয় রঙের প্রলেপ। সবশেষে সেগুলো পোড়ানো হয় চুল্লিতে।শুকনো মাটির থালায় রঙের প্রলেপ দিচ্ছিলেন অর্চনা পাল। একে একে থালাগুলো তরল মিশ্রণে ডুবিয়ে তুলছিলেন তিনি। অর্চনা বলেন, ‘কাজ আমি দেখে দেখে শিখেছি। মিশ্রণে খয়ের, সোডা, রংমাটি আর পানি আছে।’মৃৎশিল্পী নমিতা পাল বলেন, ‘আগে হাত-পা দিয়ে মাটি প্রস্তুত করতাম। এখন মেশিনে করছি। বিভিন্ন ডিজাইনের ছাঁচে পণ্য উৎপাদনে সময় কম লাগে। পরিশ্রমও কম। সবচেয়ে বড় কথা, পণ্যের ফিনিশিং ভালো হচ্ছে। দামও ভালো পাচ্ছি।’খোলা চত্বরে তৈরি পণ্য শুকানোর কাজে ব্যস্ত ছিলেন ললিতা পাল। তিনি বলেন, ‘আমরা আবার আমাদের পাল সম্প্রদায়ের পুরোনো পেশা ফিরে পেয়েছি। আমার ঠাকুরদা মাটির জিনিসপত্র বানাতেন। তাঁর মৃত্যুর পর বাড়ির আর কেউ এই পেশায় ছিলেন না। এখন আমি আবার এখানে এসে মাটির জিনিসপত্র বানাচ্ছি।’জিগার মেশিনে ঘুরিয়ে মাটির পাত্রের আকৃতি দিচ্ছেন এক মৃৎশিল্পী। গতকাল তালা উপজেলার মাঝিয়াড়া গ্রামেকথা হয় ওই কারখানার মাঠে ঘাস কাটতে আসা স্থানীয় বাসিন্দা আবুল কাশেম সরদারের সঙ্গে। কথার ফাঁকে তিনি বলেন, ‘মাটির থালা-বাটি বানাতেও যে মেশিন হয়, এটা কল্পনাও করিনি। পাল বংশের লোকজন আগে হাতে তৈরি করত। এখন মেশিনে আরও সুন্দর হচ্ছে।’পণ্য পোড়ানোর জন্য কারখানার চত্বরে রয়েছে মাটি ও ইট দিয়ে তৈরি বড় গোলাকার চুল্লি। সেখানে থাকা একজন কর্মী বলেন, শুকনো পণ্য চুল্লিতে সাজানোর পর পরদিন সকালে হালকা আগুন দেওয়া হয়। কারিগরদের ভাষায় প্রাথমিক এই আগুনকে ‘তাওনা’ বলা হয়। পরে ধীরে ধীরে তাপ বাড়ানো হয়। সব মিলিয়ে পণ্য পোড়াতে সময় লাগে ৯ থেকে ১২ ঘণ্টা।কারখানার এক নারী শ্রমিক বলেন, তাঁদের অনেকে মাসে প্রায় ছয় হাজার টাকা মজুরি পান। এই আয় দিয়ে তাঁরা সংসারের খরচ মেটাতে সহায়তা করেন।সাতক্ষীরা শহর থেকে কারখানায় পণ্য দেখতে এসেছিলেন আহসান রাজীব। তিনি বলেন, ‘শুনেছি দেশভাগের আগে কলকাতার বাজারে সাতক্ষীরার মাটির পণ্যের পরিচিতি ছিল। পরে সেই বাজার হারিয়ে যায়। এখন মানুষের আগ্রহ আবার বাড়ছে। মাটির এসব পণ্য ঘর সাজানো ও উপহার দেওয়ার জন্যও সুন্দর। মাটির জিনিসপত্রের প্রতি আমার আলাদা আকর্ষণ আছে, এখান থেকেই কিনে নিই।’কারখানার চত্বরে শুকানোর জন্য রাখা হয়েছে তৈরি করা মাটির পণ্য। গতকাল তালার মাঝিয়াড়া গ্রামেউদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান উন্নয়ন প্রচেষ্টার হয়ে কারখানাটির সার্বিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে আছেন চন্দ্র শেখর দাশ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আধুনিক বাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে উৎপাদন ও বিপণন করতে না পারায় পাল সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী পেশাটি হারিয়ে যাচ্ছিল। এখন আধুনিক মেশিন ও ছাঁচে নানা ধরনের পণ্য তৈরি হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় এসব পণ্য যাচ্ছে, ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় অনেক সময় অর্ডার অনুযায়ী পণ্য সরবরাহ করাও সম্ভব হচ্ছে না।’সাতক্ষীরা, খুলনা ও যশোরের একাংশের প্রায় ৬০০ পালকে সংগঠিত করে আধুনিক পদ্ধতিতে মাটির পণ্য তৈরির প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে বলে জানান উন্নয়ন প্রচেষ্টার পরিচালক শেখ ইয়াকুব আলী। তিনি আরও বলেন, ২০২১ সালে বিশ্বব্যাংকের একটি প্রকল্পের সহায়তায় কাজ শুরু হয়। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলেও কার্যক্রম চলছে। এখন পাল সম্প্রদায়ের পাশাপাশি অন্য সম্প্রদায়ের মানুষও যুক্ত হয়েছেন। পণ্য বিক্রি করে যে আয় ও লভ্যাংশ হচ্ছে, সেখান থেকেই শ্রমিকদের মজুরি দেওয়া হচ্ছে।এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক কাউসার আজিজ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি নিজে তালার মাঝিয়াড়া গ্রামে গিয়ে মৃৎশিল্পীদের কারখানা ও কাজ দেখে এসেছি। হারিয়ে যেতে বসা এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। কাদামাটিকে নানা রূপ দিয়ে সেখানে নান্দনিক সব মাটির তৈজসপত্র তৈরি করা হচ্ছে। এই শিল্প টিকিয়ে রাখতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে যেকোনো সহযোগিতার প্রয়োজন হলে আমরা অবশ্যই তাঁদের পাশে দাঁড়াব।’
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কালজয়ী উপন্যাস ‘চোখের বালি’ নিয়ে পাঠচক্র করেছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধুসভা। ১৫ সেপ্টেম্বর দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে এটি অনুষ্ঠিত হয়।পাঠচক্রে বন্ধুরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘চোখের বালি’ উপন্যাসের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন। বিশেষ করে চরিত্র, সম্পর্কের টানাপোড়েন, নারীর অবস্থান, সামাজিক মূল্যবোধ এবং তৎকালীন সমাজব্যবস্থায় ব্যক্তিমানুষের আকাঙ্ক্ষা ও দ্বন্দ্ব নিয়ে আলোচনা করা হয়।বক্তারা বলেন, ‘চোখের বালি’ শুধু একটি প্রেম ও সম্পর্কের গল্প নয়; এর মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথ তৎকালীন সমাজ, নারী-পুরুষের সম্পর্ক, বিধবা নারীর জীবন এবং মানুষের মনস্তাত্ত্বিক জটিলতাকে গভীরভাবে তুলে ধরেছেন। সময়ের পরিবর্তনের পরও উপন্যাসটির চরিত্র ও বিষয়বস্তু পাঠকের কাছে প্রাসঙ্গিক হয়ে আছে।পাঠচক্রে অংশ নেওয়া বন্ধুসভার সদস্যরা উপন্যাসটির বিভিন্ন চরিত্র ও ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে নিজেদের পাঠ ও অনুভূতি তুলে ধরেন। আলোচনার মাধ্যমে সাহিত্যের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের আরও নিবিড়ভাবে যুক্ত হওয়া এবং নিয়মিত বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।পাঠচক্রে উপস্থিত ছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধুসভার সভাপতি নুসরাত জাহান, সাধারণ সম্পাদক তারেক হাসান, সহসভাপতি নাহিন জামান সিদ্দিকীসহ অন্যান্য বন্ধুরা।সাধারণ সম্পাদক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধুসভা
শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে নারী-পুরুষের সমতার চিত্র ইতিবাচক হলেও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে নারীর প্রতিনিধিত্ব কমে যাওয়ায় বৈশ্বিক সূচকে পিছিয়েছে বাংলাদেশ। নারী-পুরুষ বৈষম্য কমানোর বৈশ্বিক সূচকে এক বছরে পিছিয়েছে ৫৫ ধাপ। ২০২৫ সালে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ২৪তম। এবার ১৪৫টি দেশের মধ্যে অবস্থান হয়েছে ৭৯তম। রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন ও অর্থনৈতিক অংশগ্রহণে বড় পতনের পরও দক্ষিণ এশিয়ায় এখনো শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ।বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) ‘গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট-২০২৬’ বা ‘বৈশ্বিক লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য প্রতিবেদন ২০২৬’-এ এ তথ্য উঠে এসেছে।প্রতিবেদনের সব তথ্য একই বছরের নয়। সূচকভেদে সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য নেওয়া হয়েছে। অর্থনীতি ও শিক্ষার তথ্য মূলত ২০২৩-২৫ সালের এবং স্বাস্থ্যের তথ্য ২০২১-২৪ সালের। সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্বের হিসাব ১ জুন ২০২৬ এবং মন্ত্রিসভার হিসাব ১ জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত। নারী সরকারপ্রধানের হিসাব নেওয়া হয়েছে ১৫ জুন ১৯৭৬ থেকে ১৫ জুন ২০২৬ পর্যন্ত। এ সময়ে বিভিন্ন সরকার দায়িত্বে ছিল। এর মধ্যে বর্তমান বিএনপি সরকারের বয়স প্রায় ৭ মাস। ফাহমিদা খাতুন, সম্মাননীয় ফেলো, সিপিডিপ্রতিবেদনে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবনতির চিত্র আছে। অন্যদিকে শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ কিছুটা চোখে পড়লেও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের পদে বা ব্যবস্থাপনায় নারী দেখাই যায় না। আছে কাঠামোগত সমস্যা। এসব কারণে বাংলাদেশের স্কোর কমেছে, পেছনে চলে গেছে। ডব্লিউইএফ প্রতিবছর এ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ ও সুযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন—এই চার ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের সমতার ব্যবধান মাপা হয়। একটি দেশ এই ব্যবধান কতটা কমাতে পেরেছে, সূচকটি মূলত সেটিই দেখায়; নারীর সামগ্রিক জীবনমান নয়।এবার বাংলাদেশের সামগ্রিক স্কোর ৭১ দশমিক ২ শতাংশ। গত বছর ছিল ৭৭ দশমিক ৫ শতাংশ। এক বছরে স্কোর কমেছে ৬ দশমিক ২ শতাংশ পয়েন্ট। প্রতিবেদনে এটিকে বিশ্বের অন্যতম বড় পতন বলা হয়েছে। তবে ২০০৬ সালের তুলনায় বাংলাদেশের স্কোর এখনো ৮ দশমিক ৫ শতাংশ পয়েন্ট বেশি।সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ফাহমিদা খাতুন এ নিয়ে প্রথম আলোকে বলেন, প্রতিবেদনে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবনতির চিত্র আছে। অন্যদিকে শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ কিছুটা চোখে পড়লেও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের পদে বা ব্যবস্থাপনায় নারী দেখাই যায় না। আছে কাঠামোগত সমস্যা। এসব কারণে বাংলাদেশের স্কোর কমেছে, পেছনে চলে গেছে। তবে প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থান ভালো।এবার বাংলাদেশের সামগ্রিক স্কোর ৭১ দশমিক ২ শতাংশ। গত বছর ছিল ৭৭ দশমিক ৫ শতাংশ। এক বছরে স্কোর কমেছে ৬ দশমিক ২ শতাংশ পয়েন্ট। প্রতিবেদনে এটিকে বিশ্বের অন্যতম বড় পতন বলা হয়েছে। তবে ২০০৬ সালের তুলনায় বাংলাদেশের স্কোর এখনো ৮ দশমিক ৫ শতাংশ পয়েন্ট বেশি।বড় পতন রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে বাংলাদেশের পিছিয়ে পড়ার প্রধান কারণ রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের স্কোরের বড় পতন। এ ক্ষেত্রে স্কোর ৭২ দশমিক ১ থেকে কমে ৫০ দশমিক ৯ শতাংশ হয়েছে। অবস্থান তৃতীয় থেকে নেমে হয়েছে ১২তম।প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে সংসদ ভেঙে যাওয়ার পর গঠিত নতুন সংসদে নারীরা মাত্র ২ দশমিক ৪ শতাংশ আসন পেয়েছেন। সংসদে নারী প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে এটি বাংলাদেশের এযাবৎকালের সর্বনিম্ন সমতার স্কোর। এ সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩৯তম।মন্ত্রিসভায় নারীর প্রতিনিধিত্ব ১৯ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ। তবে দুই দশকে মন্ত্রিসভায় নারী-পুরুষ সমতার স্কোর ৯ দশমিক ১ থেকে বেড়ে ২৩ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে।রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে বড় পতনের পরও বাংলাদেশের অবস্থান তুলনামূলক ভালো। এর কারণ নারী সরকারপ্রধান থাকার দীর্ঘ ইতিহাস। এ সূচকে বাংলাদেশ ২০১৯ সাল থেকে পূর্ণ সমতার স্কোর ধরে রেখেছে এবং যৌথভাবে প্রথম অবস্থানে রয়েছে।নারীর আনুমানিক বার্ষিক আয় ৪ হাজার ৬৭০ ডলার। পুরুষের আয় ১২ হাজার ৪৪০ ডলার। জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও ব্যবস্থাপকদের মধ্যে নারী মাত্র ৬ দশমিক ১৬ শতাংশ। পেশাজীবী ও কারিগরি কর্মীদের মধ্যে নারীর অংশ ২০ দশমিক ৭৫ শতাংশ।অর্থনৈতিক অংশগ্রহণে প্রায় তলানিতে বাংলাদেশের সবচেয়ে দুর্বল ক্ষেত্র অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ ও সুযোগ। এ ক্ষেত্রে স্কোর ৪৫ দশমিক ৭ থেকে কমে ৪১ দশমিক ৯ শতাংশ হয়েছে। ১৪৫ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪২তম। গত বছর ছিল ১৪১তম।এক বছরে আনুমানিক আয়ের সমতার স্কোর ১৫ শতাংশ পয়েন্ট কমেছে। শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের সমতার স্কোর কমেছে ৫ দশমিক ৭ এবং জ্যেষ্ঠ পদে প্রতিনিধিত্বের স্কোর কমেছে ১ দশমিক ৩ শতাংশ পয়েন্ট।নারীর প্রতি বৈষম্য রোধে এত আইন, তবু কেন বৈষম্যনারীর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার ৩৮ দশমিক ৪১ শতাংশ। পুরুষের ক্ষেত্রে তা ৭৯ দশমিক ৯৬ শতাংশ। ২০০৬ সালে শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের সমতার স্কোর ছিল ৬১ দশমিক ১ শতাংশ। এবার তা কমে ৪৮ শতাংশ হয়েছে।নারীর আনুমানিক বার্ষিক আয় ৪ হাজার ৬৭০ ডলার। পুরুষের আয় ১২ হাজার ৪৪০ ডলার। জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও ব্যবস্থাপকদের মধ্যে নারী মাত্র ৬ দশমিক ১৬ শতাংশ। পেশাজীবী ও কারিগরি কর্মীদের মধ্যে নারীর অংশ ২০ দশমিক ৭৫ শতাংশ।এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. ফজলুল হক অর্থনীতিতে নারীদের জন্য সুযোগ আগের মতোই আছে বা বেড়েছে, তবে তাঁদের অংশগ্রহণ কমেছে। তৈরি পোশাক খাতে মালিকেরা সব সময় নারী শ্রমিকদের বেশি অগ্রাধিকার দেন। কারণ, তাঁরা তুলনামূলক দায়িত্বশীল, কাজে বেশি মনোযোগী এবং কর্মপরিবেশে ঝামেলা কম করেন। তাই সুযোগের কোনো ঘাটতি রয়েছে বলে আমি মনে করি না।নারীদের বড় অংশ অনানুষ্ঠানিক ও খণ্ডকালীন কাজে যুক্ত। নারী কর্মীদের ৯৫ দশমিক ৯৭ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন। পুরুষের ক্ষেত্রে এ হার ৭৮ দশমিক ১৩ শতাংশ। কর্মজীবী নারীদের ৫৪ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ খণ্ডকালীন কাজ করেন; পুরুষের ক্ষেত্রে তা ৭ দশমিক ৮৯ শতাংশ।এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. ফজলুল হক এ বিষয়ে প্রথম আলোকে বলেন, ‘অর্থনীতিতে নারীদের জন্য সুযোগ আগের মতোই আছে বা বেড়েছে, তবে তাঁদের অংশগ্রহণ কমেছে। তৈরি পোশাক খাতে মালিকেরা সব সময় নারী শ্রমিকদের বেশি অগ্রাধিকার দেন। কারণ, তাঁরা তুলনামূলক দায়িত্বশীল, কাজে বেশি মনোযোগী এবং কর্মপরিবেশে ঝামেলা কম করেন। তাই সুযোগের কোনো ঘাটতি রয়েছে বলে আমি মনে করি না।’নারীদের এই অংশগ্রহণ কমে যাওয়ার পেছনে কিছু কারণ অনুমান করেন ফজলুল হক। তিনি বলেন, দেশে কাজের প্রধান কেন্দ্রগুলো এখনো শহরকেন্দ্রিক। বর্তমানে শহরে জীবনযাত্রার ব্যয় প্রচণ্ড বেড়েছে। আগে নারীরা যেভাবে দলবদ্ধ হয়ে মেস বা ঘর ভাড়া নিয়ে থাকতে পারতেন, এখন সেই ব্যয় বহন করা অনেকের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া পরিবার ছেড়ে শহরে আসার ক্ষেত্রে বাড়তি সামাজিক ঝুঁকি, শারীরিক সুরক্ষা ও মানসিক চাপ নেওয়ার প্রবণতাও আগের চেয়ে কমেছে। আরেকটি চিত্রও আছে। এখন গ্রামে কৃষি বা অন্যান্য অনানুষ্ঠানিক খাতে নারীদের সম্পৃক্ততা বেড়েছে। অনেকে ঘরে বসে ছোটখাটো অর্থনৈতিক কাজ করছেন। অনানুষ্ঠানিক খাতের এই নারীরা অনেক সময় আনুষ্ঠানিক হিসাবের মধ্যে সঠিকভাবে উঠে আসে না।নারীদের বড় অংশ অনানুষ্ঠানিক ও খণ্ডকালীন কাজে যুক্ত। নারী কর্মীদের ৯৫ দশমিক ৯৭ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন। পুরুষের ক্ষেত্রে এ হার ৭৮ দশমিক ১৩ শতাংশ। কর্মজীবী নারীদের ৫৪ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ খণ্ডকালীন কাজ করেন; পুরুষের ক্ষেত্রে তা ৭ দশমিক ৮৯ শতাংশ।শিক্ষায় সর্বোচ্চ স্কোর শিক্ষায় বাংলাদেশের অগ্রগতি অব্যাহত রয়েছে। এবার এ ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ সমতার স্কোর হয়েছে ৯৬ দশমিক ১ শতাংশ, যা বাংলাদেশের এযাবৎকালের সর্বোচ্চ। ২০০৬ সালের তুলনায় স্কোর বেড়েছে ৯ দশমিক ৩ শতাংশ পয়েন্ট।প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় বাংলাদেশ পূর্ণ সমতা অর্জন করেছে। তবে উচ্চশিক্ষায় ব্যবধান রয়ে গেছে। উচ্চশিক্ষায় নারীর ভর্তির হার ২০ দশমিক ৭৯ এবং পুরুষের ২৬ দশমিক ৯৫ শতাংশ। নারীর সাক্ষরতার হার ৭৬ দশমিক ৫৪ শতাংশ। পুরুষের ক্ষেত্রে তা ৮১ দশমিক ৩৯ শতাংশ।জেন্ডার বাজেট: বরাদ্দ বাড়লেও নারীর প্রতি বৈষম্য হ্রাসে অবদান রাখা নিয়ে প্রশ্নস্বাস্থ্যসূচক প্রায় অপরিবর্তিত স্বাস্থ্য ও টিকে থাকার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্কোর ৯৬ শতাংশ। গত বছরের তুলনায় স্কোর অপরিবর্তিত থাকলেও অবস্থান ১২৩তম থেকে ১২০তম হয়েছে।জন্মের সময় নারী-পুরুষের অনুপাতের সূচকে বাংলাদেশ পূর্ণ সমতার মান অর্জন করেছে। তবে ২০১৪ সালের পর থেকে সুস্থভাবে বেঁচে থাকার প্রত্যাশিত আয়ুতে সমতা সামান্য কমেছে। নারীর সুস্থভাবে বেঁচে থাকার প্রত্যাশিত আয়ু ৬২ দশমিক ৯৮ বছর এবং পুরুষের ৬৩ দশমিক ১৪ বছর।প্রতিবেদনের প্রাসঙ্গিক সূচক অনুযায়ী, বাংলাদেশের ৩৮ দশমিক ৯ শতাংশ নারীর বাল্যবিবাহ হয়। জীবদ্দশায় লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার শিকার হন ৪৮ দশমিক ৮ শতাংশ নারী। দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর উপস্থিতিতে সন্তান প্রসবের হার ৫৯ শতাংশ। প্রতি ১ লাখ জীবিত জন্মে মাতৃমৃত্যু ১১৫। পরিবার পরিকল্পনার চাহিদা পূরণ হচ্ছে না ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী ১০ শতাংশ নারীর।নারীদের জন্য বেতনসহ অভিভাবকত্বকালীন ছুটি ১১২ দিন। পুরুষদের জন্য এমন ছুটি নেই। প্রতিবেদনে নারীর বিবাহবিচ্ছেদের অধিকারকে অসম এবং প্রজননস্বাধীনতাকে সীমিত বলা হয়েছে।দক্ষিণ এশিয়ায় এখনো প্রথম বাংলাদেশ সামগ্রিক অবস্থানে বড় পতনের পরও দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ প্রথম। মালদ্বীপ ১১৯তম, নেপাল ১২০তম, ভুটান ১২১তম, শ্রীলঙ্কা ১২৯তম, ভারত ১৩১তম এবং পাকিস্তান ১৪৩তম।আটটি অঞ্চলের মধ্যে এর অবস্থান সপ্তম। বর্তমান গতিতে এ অঞ্চলের নারী-পুরুষ ব্যবধান পুরোপুরি দূর হতে আরও ১৪৯ বছর লাগবে বলে ডব্লিউইএফের পূর্বাভাস।সূচকে বিশ্বের সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে আইসল্যান্ড। দেশটি নারী-পুরুষের ব্যবধানের ৯৩ শতাংশ দূর করেছে। এরপর রয়েছে ফিনল্যান্ড, নরওয়ে, নামিবিয়া ও যুক্তরাজ্য। তাদের স্কোর যথাক্রমে ৮৭ দশমিক ২, ৮৫ দশমিক ৭, ৮৪ দশমিক ৫ ও ৮৪ দশমিক ২ শতাংশ।শীর্ষে আইসল্যান্ড, সবার নিচে চাদ সূচকে বিশ্বের সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে আইসল্যান্ড। দেশটি নারী-পুরুষের ব্যবধানের ৯৩ শতাংশ দূর করেছে। এরপর রয়েছে ফিনল্যান্ড, নরওয়ে, নামিবিয়া ও যুক্তরাজ্য। তাদের স্কোর যথাক্রমে ৮৭ দশমিক ২, ৮৫ দশমিক ৭, ৮৪ দশমিক ৫ ও ৮৪ দশমিক ২ শতাংশ।সবচেয়ে নিচে রয়েছে চাদ। দেশটি নারী-পুরুষের ব্যবধানের ৫৭ দশমিক ৮ শতাংশ দূর করতে পেরেছে। এর ঠিক ওপরে রয়েছে ইরান ও পাকিস্তান। তাদের স্কোর যথাক্রমে ৫৮ দশমিক ৫ ও ৫৯ দশমিক ৫ শতাংশ।সবশেষে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বে নারী-পুরুষের ব্যবধান এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে কম। এ ব্যবধানের ৬৯ দশমিক ২ শতাংশ দূর হয়েছে। তবে বর্তমান গতিতে পুরো সমতা অর্জন করতে আরও ১২০ বছর লাগবে। অর্থাৎ এখন বেঁচে থাকা নারীরা তাঁদের জীবদ্দশায় পূর্ণ নারী-পুরুষ সমতা দেখে যেতে পারবেন না। এমনকি তাঁদের নাতি-নাতনি বা পরবর্তী প্রজন্ম পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে।নারী শ্রমিকের প্রতি বৈষম্য আর কত দিন