ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা মোখা বন্দর দখল করেছে এবং এখন বাব আল–মানদেব প্রণালির মূল নৌপথ নিয়ন্ত্রণের হুমকি দিচ্ছে। তারা সৌদি আরবের বেশ কয়েকটি শহরেও হামলা চালিয়েছে, যার ফলে নারী–শিশুসহ প্রায় ৭০ জন আহত হয়েছে। সৌদি আরবের জ্বালানি, বেসামরিক ও প্রতিরক্ষা স্থাপনায় ধারাবাহিক হামলার পাশাপাশি ইরান ও তার ইয়েমেনি সহযোগী হুতিদের সামুদ্রিক অবরোধের কারণে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘মক্কা চুক্তি’ সচল হওয়ার বিষয়টি সরাসরি সামনে চলে এসেছে।
সৌদি আরবে হুতিদের হামলা পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিকে সক্রিয় করতে পারে। আর যদি তা হয়, তাহলে পাকিস্তান ও তুরস্কের পদক্ষেপ বা হস্তক্ষেপ ঠিক কেমন হতে পারে? এ প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট জানা প্রয়োজন।
উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রধান নিরাপত্তা অংশীদার যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই ইঙ্গিত দিয়ে আসছে যে তারা চায় আঞ্চলিক দেশগুলো তাদের নিজস্ব প্রতিরক্ষা ও প্রতিরোধের মূল দায়িত্ব নিজেরাই নিক; সে ক্ষেত্রে মার্কিন সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা থাকবে সীমিত। মাঠপর্যায়ে ইতিমধ্যে সে অবস্থানের প্রভাব দেখা যাচ্ছে। ইরানে মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র তার আঞ্চলিক অংশীদারদের জন্য সর্বাত্মক প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করতে পারেনি।
মার্কিন উপস্থিতি কমে যাওয়া এবং ওয়াশিংটনের আঞ্চলিক বোঝা ভাগ করে নেওয়ার তাগিদের কারণে উপসাগরীয় দেশগুলোকে একটি নতুন প্রতিরক্ষাকাঠামোর দিকে নজর দিতে হয়েছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরব ও পাকিস্তান তাদের প্রথম পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করে। চলতি বছরের আগস্টে তুরস্ক যুক্ত হওয়ার পর এটি বিস্তৃত হয়ে ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ রূপ নেয়।
তিনটি দেশ ইতিমধ্যে রিয়াাদে তাদের যৌথ সচিবালয় স্থাপন করেছে, যার প্রথম তিন বছরের মেয়াদে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পেয়েছে পাকিস্তান। তবে চুক্তিটি এখনো এর প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। কোনো সদস্যরাষ্ট্র কখন সরাসরি সামরিক অভিযানে যাবে, সেটির নির্দিষ্ট মাত্রা বা পরিস্থিতি এখনো প্রকাশ্যে চিহ্নিত করা হয়নি। যৌথ আলোচনা, সম্মিলিত প্রতিরক্ষা, প্রতিরোধের নিয়মাবলি বা নীতিসহ এর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তুত হওয়া বাকি।
এখন প্রশ্ন হলো, কোনো সদস্যরাষ্ট্র আক্রান্ত হলে এ চুক্তি বাস্তবে কীভাবে কার্যকর হবে?
বর্তমানে ইয়েমেনের ভেতরে পাকিস্তানি বাহিনীর সরাসরি সামরিক অভিযান চালানোর সম্ভাবনা কম। যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে আফগান যুদ্ধে অংশ নেওয়ার ফলে যে দীর্ঘমেয়াদি ও মারাত্মক প্রভাব পাকিস্তানের ওপর পড়েছিল, সেই ইতিহাসের কারণে ইরান ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে নতুন কোনো যুদ্ধে জড়াতে পাকিস্তান অত্যন্ত সতর্ক থাকবে।
চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ বলেছেন, সৌদি আরবের ওপর অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো আগ্রাসন বা ইয়েমেন সংঘাতের আঁচ সৌদি ভূখণ্ডে পৌঁছালে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হবে। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, এ নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। তবে এ চুক্তি প্রয়োগের রূপরেখা কেমন হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো বিবরণ তিনি দেননি। গত মাসে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান স্পষ্ট করেছিলেন, মক্কা চুক্তি ন্যাটোর মতোই কাজ করবে—কোনো সদস্যরাষ্ট্র আক্রান্ত হলে সেটিকে সক্রিয়ভাবে সহায়তা চাইতে হবে এবং ঠিক কী ধরনের সাহায্য প্রয়োজন, তা নির্দিষ্ট করে দিতে হবে।
ন্যাটোর অনুচ্ছেদ ৪ কোনো সদস্যরাষ্ট্রকে পরামর্শ ও তথ্য বিনিময়ের সুযোগ দেয়। আর অনুচ্ছেদ ৫ মিত্রদের পারস্পরিক সহায়তার কথা বলে; তবে সহায়তার ধরন কেমন হবে, তা ঠিক করার এখতিয়ার প্রতিটি সদস্যরাষ্ট্রের নিজস্ব। ২০১২ সালে সিরিয়া একটি তুর্কি যুদ্ধবিমান গুলি করে ভূপাতিত করার পর আঙ্কারা পরামর্শের জন্য অনুচ্ছেদ ৪ প্রয়োগ করে এবং নির্দিষ্ট প্রতিরক্ষা সহায়তা চায়। সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের দাবি না জানিয়ে তুর্কি সরকার প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থার অনুরোধ করেছিল। ন্যাটো সে অনুরোধ অনুমোদন করে তুর্কি আকাশসীমা রক্ষায় ব্যবস্থাটি মোতায়েন করে।
এ প্রেক্ষাপটে মক্কা চুক্তি কার্যকর করতে হলে সৌদি আরবকেই ঠিক করতে হবে তারা ঠিক কী ধরনের সামরিক সহায়তা বা অংশগ্রহণ চায়। উদাহরণস্বরূপ রিয়াদ যদি বস্তুগত ও গোয়েন্দা সহায়তার বাইরে গিয়ে পাকিস্তানের কাছে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানায়, তবে ইসলামাবাদ তা মানতে বাধ্য থাকবে। তবে সে অনুরোধ ও প্রতিক্রিয়ার পরিধি সমন্বয় সভার মাধ্যমেই নির্ধারিত হতে হবে। এখন পর্যন্ত এর কোনোটিই পরীক্ষা করে দেখা হয়নি। কারণ, রিয়াাদ পাকিস্তান বা তুরস্ক কারও কাছেই চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর করার আবেদন জানায়নি।
ইতিমধ্যে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার হয়েছে। ইসলামাবাদ প্রকাশ্যে ইরানকে আহ্বান জানিয়েছে যেন তারা হুতিদের সৌদি আরবে হামলা চালানো এবং বাব আল–মানদেবে হুমকি সৃষ্টি করা থেকে বিরত রাখে। একই সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে রিয়াদের সুরক্ষায় পাকিস্তানের অঙ্গীকারের কথা তেহরানকে মনে করিয়ে দিয়েছে। আঙ্কারাও হুতি ও ইরানকে কূটনৈতিকভাবে সংযত রাখতে নিজস্ব ভূমিকা পালন করছে।
কূটনীতি ব্যর্থ হলে এবং সৌদি আরব বা বাব আল–মানদেবে হুতি হামলা অব্যাহত থাকলে তুরস্ক ও পাকিস্তান সম্ভবত তাদের বিদ্যমান বিমান ও প্রযুক্তিগত সহায়তা আরও বৃদ্ধি করবে। সৌদি আরবে পাকিস্তানের ইতিমধ্যে ১৬টি জেএফ-১৭ থান্ডার বহুমুখী যুদ্ধবিমান, প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও হাজার হাজার সেনা মোতায়েন রয়েছে।
তবে বর্তমানে ইয়েমেনের ভেতরে পাকিস্তানি বাহিনীর সরাসরি সামরিক অভিযান চালানোর সম্ভাবনা কম। যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে আফগান যুদ্ধে অংশ নেওয়ার ফলে যে দীর্ঘমেয়াদি ও মারাত্মক প্রভাব পাকিস্তানের ওপর পড়েছিল, সেই ইতিহাসের কারণে ইরান ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে নতুন কোনো যুদ্ধে জড়াতে পাকিস্তান অত্যন্ত সতর্ক থাকবে।
কারণ, এতে তাদের পশ্চিম সীমান্ত এলাকার অর্থনীতি, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, শিয়া-সুন্নি সংবেদনশীলতা ও সামাজিক শান্তিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। ফলে হুতিদের ওপর সরাসরি হামলা বা ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়ানোর বিষয়ে পাকিস্তানি নেতাদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তুলতে বেশ কাঠখড় পোড়াতে হবে।
সবচেয়ে সম্ভাব্য দৃশ্যপট হলো—পাকিস্তান হুতিদের দমাতে ইরানের ওপর যৌথ কূটনৈতিক চাপ বাড়াবে, সৌদির সুরক্ষায় সমর্থন জোরদার করবে এবং বাব আল–মানদেব প্রণালি নিরাপদ রাখতে একটি বহুজাতিক নৌ জোট গঠনের জন্য তাগিদ দেবে। এই সংযম বজায় রেখেও মক্কা চুক্তির মূল নির্যাস অক্ষুণ্ন রাখা সম্ভব, যা আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রশমনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
রিয়াজ খোকার ইসলামাবাদভিত্তিক ইনস্টিটিউট অব রিজিওনাল স্টাডিজের (আইআরএস) একজন গবেষণা কর্মকর্তা
আল–জাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত
শরীয়তপুরের কাজীরহাট এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মাস্টার মোস্তফা কাজীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, প্রভাব খাটানো ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হন মোস্তফা কাজী। এরপর থেকে এলাকায় বিভিন্ন জমি দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৬ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে কাজীরহাট বাজারের দোকানপ্রতি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা কাজী। এছাড়া কয়েক মাস আগে কাজীরহাটে একটি দোকান ক্রয়ের সময় ব্যবসায়ী সুমন তপাদারের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী আরও জানান, বি. কে. নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলামের কাছ থেকেও ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন মানুষকে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় ফেলে হয়রানি করার অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন মোস্তফা কাজী। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির ব্যানারে তার কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন অনেকে। এছাড়া বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি নিজ ভগ্নিপতি সিদ্দিক দেওয়ানের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোস্তফা কাজীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সচেতন মহল বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
ইউরোপের রাজধানী ব্রাসেলসে আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা জোরালো করা। এই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত আছেন। গত বছরের শুরু থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের কারণে সারা ইউরোপ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ইউরোপীয় নেতারা এখন যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরিতে কাজ করছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, “আমরা যুদ্ধের মানবিক সংকট বুঝতে পারি এবং এখন আমাদের দায়িত্ব এটি দ্রুত শেষ করার পথ খোঁজা। আমাদের প্রত্যেকের জন্যই শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।” এই বৈঠকে অস্ত্রবিরতি চুক্তি, যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলো যুদ্ধ সমাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এগুলো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ক্রমবর্ধমান পরীক্ষার চাপ এবং পরিবারের পাশাপাশি সমাজের অযৌক্তিক প্রত্যাশা। এ দুটি কারণ মিলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বেড়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা। ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করা যেন শিক্ষার্থীর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ—সব জায়গা থেকেই উচ্চ ফলাফলের প্রত্যাশা তৈরি করছে মানসিক চাপের একটি অব্যক্ত বলয়। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইহান কবির বলেন, “পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে মনে হয়, শুধু আমি না, আমার পুরো পরিবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এটা সহ্য করা খুব কঠিন।” শুধু রাইহান নয়, দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা একই অভিজ্ঞতার কথা বলছে। সামাজিক চাপ ও তুলনার সংস্কৃতি পরিস্থিতি করছে আরও জটিল পরীক্ষার নম্বর নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এখন তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া গর্ব বা অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কোন কলেজে ভর্তি হলো, কে কতো পেল—এসব তুলনার চাপে পড়াশোনার আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা তাবাসসুম বলেন, “প্রত্যাশা থাকা ভালো, কিন্তু তা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায় এবং একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব সক্ষমতা উপেক্ষা করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়। এ থেকেই জন্ম নেয় আত্মগ্লানি, হতাশা এবং মাঝে মাঝে আত্মহননের চিন্তা।” জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ নিয়মিত মানসিক চাপে থাকে। এর মধ্যে ১২ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগে এবং বড় একটি অংশ কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই দিন পার করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে ক্ষতিকর। সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, এবং পরিবারের ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ এই সমস্যার নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম হয়, সেখানে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাকে কেবল ফলাফলের সীমায় না এনে একটি মানবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা চাপ নয়, ভালোবাসা থেকে শিখবে, এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ প্রজন্ম।
বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কৃষিখাতকে চরমভাবে আঘাত করছে। অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘদিন খরা এবং হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ফসল উৎপাদনে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে। চলতি মৌসুমেই অনেক জেলায় ধান, গম, ভুট্টা এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, একদিকে যেমন আবহাওয়ার আচরণ বুঝে ওঠা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সারের দাম, কীটনাশক ও বীজের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পোকার আক্রমণ ও রোগবালাইয়ের হারও বেড়ে গেছে। এই চাপে পড়ে অনেক কৃষকই ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা। তাদের পক্ষে বারবার ক্ষতির ধাক্কা সামলে উঠে আবার নতুনভাবে চাষাবাদ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো অঞ্চলে দেখা গেছে, কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী ফসল বাদ দিয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ ও লাভজনক অন্য চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমানেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। একইসঙ্গে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে এমন জাত ও পদ্ধতি উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে যা কঠিন জলবায়ু পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কৃষি খাতকে সচল রাখা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে এখনই পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
কলম্বোর সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাব ময়দানে চলমান দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে ব্যাট হাতে আবারও ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের। টস জিতে ব্যাট করতে নেমে প্রথম ইনিংসে টাইগাররা সংগ্রহ করে মাত্র ২২০ রান, যেখানে ব্যতিক্রম ছিলেন কেবল শোয়াড ইসলাম (৪৬), মুশফিকুর রহিম (৩৫) ও লিটন দাস (৩৪)। শ্রীলঙ্কার বোলাররা শুরু থেকেই চাপ সৃষ্টি করে রাখে। ডেবিউ করা স্পিনার সোনাল দিনুষা ৩ উইকেট নিয়ে আলো ছড়ান, আর আসিথা ফার্নান্দো ও বিষ্ণু ফার্নান্দো নেন ২টি করে উইকেট। প্রথম ইনিংসের জবাবে দ্বিতীয় দিন সকালে শ্রীলঙ্কা উদ্বোধনী জুটি থেকে ভালো সূচনা পায়। ১৩.১ ওভারে কোন উইকেট না হারিয়ে সংগ্রহ করেছে ৬২ রান। ওপেনার পাথুম নিসান্কা ৩৩ এবং লাহিরু উদারা ২৮ রানে অপরাজিত রয়েছেন। বাংলাদেশের হয়ে তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ বোলিং শুরু করলেও এখনও পর্যন্ত সাফল্যের দেখা মেলেনি। শ্রীলঙ্কা এখনো বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস থেকে ১৫৮ রানে পিছিয়ে আছে, হাতে রয়েছে সকল উইকেট। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে প্রভাব এই টেস্টটি ২০২৩-২৫ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ হওয়ায় দুই দলের জন্যই পয়েন্টের লড়াই গুরুত্বপূর্ণ। সিরিজের প্রথম টেস্টে পরাজিত হওয়ায় বাংলাদেশ সিরিজে টিকে থাকতে হলে এই ম্যাচ জিততেই হবে। পরবর্তী চ্যালেঞ্জ স্লো পিচে বাংলাদেশ বোলারদের আরও পরিকল্পিত বোলিং করতে হবে। দ্রুত উইকেট তুলে না নিতে পারলে শ্রীলঙ্কা বড় লিড নিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে দেবে টাইগারদের। ফিল্ডিংয়ে মনোযোগ এবং টাইট বোলিংয়ের মাধ্যমেই দ্বিতীয় ইনিংসে নিজেদের ফিরে পাওয়ার আশায় বাংলাদেশ। সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড (দিন ২, প্রথম সেশন পর্যন্ত): বাংলাদেশ (১ম ইনিংস): ২২০/১০ শ্রীলঙ্কা (১ম ইনিংস): ৬২/০ (১৩.১ ওভার) নিসান্কা: ৩৩*, উদারা: ২৮* বাংলাদেশ বোলার: তাইজুল, মিরাজ – উইকেটহীন
ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের একের পর এক হামলায় সৌদি আরবে ১৩ জন বেসামরিক নাগরিক আহত হয়েছেন। হামলায় সাতটি বাড়ি ও দুটি যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) সৌদি আরবের খামিস মুশাইত, আবহা ও তাইফের বেসামরিক এলাকায় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে এসব হামলা চালানো হয়। মঙ্গলবার ভোরে এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানান ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুরকি আল-মালকি। আরও পড়ুন তেলের পথে যুদ্ধের আগুন, সবার নজর সৌদি আরবে আহত ১৩ জনের মধ্যে কয়েকজনের আঘাত সামান্য থেকে মাঝারি মাত্রার বলে জানানো হয়েছে। জেদ্দাসহ বিভিন্ন শহরে সতর্কতা হুথিদের হামলার পর সৌদি আরবের বেসামরিক প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ পশ্চিম ও দক্ষিণাঞ্চলের কয়েকটি শহরে সতর্কতা জারি করেছে। এর মধ্যে রয়েছে আবহা, জেদ্দা, জাজান, তাইফ, ইয়ানবু ও আল-উলা। বাসিন্দাদের সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে সতর্ক থাকতে এবং কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুসরণ করতে বলা হয়েছে। আরও পড়ুন হুথিদের সঙ্গে সংঘাত / সামরিক শক্তিতে এগিয়ে থেকেও কেন বিপাকে সৌদি আরব? বেসামরিক স্থাপনায় হামলার অভিযোগ সৌদি জোটের বিবৃতিতে হুথিদের বিরুদ্ধে বেসামরিক মানুষ ও স্থাপনা লক্ষ্য করে পরিকল্পিত হামলা চালানোর অভিযোগ করা হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, এ ধরনের ধারাবাহিক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হামলা হুথিদের ‘উগ্রপন্থি মতাদর্শ ও উত্তেজনা বাড়ানোর নীতি’কে প্রকাশ করে। হামলা মোকাবিলায় সৌদি আরবের সার্বভৌমত্ব এবং বেসামরিক নাগরিক ও স্থাপনা সুরক্ষায় জোটের যৌথ বাহিনী দায়িত্বশীল ও কঠোর পদক্ষেপ নেবে বলেও জানানো হয়েছে। আরও পড়ুন ড্রোন হামলায় বন্ধ সৌদির পাইপলাইন, তেল বাণিজ্যে শঙ্কার ছায়া আগের হামলায় আহত ৭০ জনের বেশি এর আগে, গত সপ্তাহে হুথিদের হামলায় সৌদি আরবের বিভিন্ন শহর ও এলাকায় ৭০ জনের বেশি মানুষ আহত হন। আহতদের মধ্যে নারী ও শিশুও ছিল। শুক্রবার রিয়াদ ও মদিনা অঞ্চলে কয়েক দফা ড্রোন হামলার পর সৌদি আরব সাময়িকভাবে দেশটির পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইন বন্ধ করে দেয়। উপসাগরীয় ও মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন সংগঠন ওই হামলার নিন্দা জানিয়েছে। একই সঙ্গে সৌদি আরবের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছে তারা। সূত্র: আরব নিউজকেএএ/
ক্রিকেট দ্বিতীয় টি-টোয়েন্টি ভারত-আফগানিস্তানরাত ৮টাসনি স্পোর্টস ৫ প্রথম টি-টোয়েন্টি ইংল্যান্ড-শ্রীলঙ্কারাত ১১টা ৩০ মিনিট সনি স্পোর্টস ১ ফুটবল লা লিগা ভায়েকানো-এসপানিওলরাত ১১টা টি স্পোর্টস ও ট্যাপম্যাড এলচে-রিয়াল মাদ্রিদরাত ১টা ৩০ মিনিট টি স্পোর্টস ও ট্যাপম্যাড কারাবাও কাপ ইপসউইচ-আর্সেনালরাত ১টাফ্যানকোড লিভারপুল-টটেনহামরাত ১টাফ্যানকোড আইএন
মানুষের শরীরেরও একটা ভাষা আছে, যা বলে দেয় মানুষটি ঘুমিয়ে আছেন, পড়ে আছেন নাকি মারা গেছেন। কিন্তু গোপাল চন্দ্র দাসকে দেখে কিছুই বোঝার উপায় ছিল না। ভাদ্রের ভ্যাপসা গরমে টানা রোদের মধ্যে সড়কের পাশে আধশোয়া হয়ে ঘুমাচ্ছিলেন তিনি। পায়ের কাছে কয়েক জোড়া ছেঁড়া স্যান্ডেল। পাশে জুতা পলিশের কালির কৌটা, ছোট-বড় কয়েকটি ব্রাশ। মাথার ওপর ছায়ার জন্য টাঙানো পলিথিনটিও বাতাসে উড়ে সরে গেছে। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজশাহী নগরের কুমারপাড়া এলাকায় এমন অবস্থায় গোপালকে (৪৫) দেখা যায়। ঘণ্টাখানেক পরেও তাঁকে একই অবস্থায় দেখা যায়। সন্ধ্যার পর আবার সেখানে গিয়ে দেখা গেল, গোপাল নেই। তবে তাঁর জুতা মেরামত ও পলিশের সরঞ্জামগুলো আগের মতোই পড়ে আছে। পাশের চা–দোকানি মাজিদুল জানালেন, গোপাল সারা দিন ছেঁড়া জুতা মেরামত ও পলিশ করেন। এরপর মেরামত করা জুতা নিয়ে বের হন বিক্রির জন্য। সেদিনও এক জোড়া জুতা মেরামত করে বিক্রির জন্য বেরিয়েছিলেন।মাজিদুলের কাছে জানা গেল, পৈতৃক সূত্রেই চর্মকার গোপাল। রাজশাহী নগরের কুমারপাড়া মোড়ে আগে তাঁর (গোপালের) মামা বসতেন। মামা মারা যাওয়ার পর গোপাল সেখানে বসতেন। পরে তাঁকে সেখান থেকে তুলে দেওয়া হয়। এর পর থেকে তাঁর এক জায়গায় স্থির হয়ে বসার সুযোগ নেই। কখনো এখানে, কখনো সেখানে বসে কাজ করেন।প্রায় দুই মাস ধরে মাজিদুলের চায়ের দোকানের পাশে বসছেন গোপাল। মাজিদুল বললেন, ‘কাজকাম সে রকম হয় না। খুব কষ্টে আছে।’ নিজের দোকানের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কাজকাম সবারই মন্দা। বাজার চড়া। দিনকাল ভালো যাচ্ছে না।’এর মধ্যেই এক জোড়া জুতা হাতে গোপাল ফিরে এলেন। বোঝা গেল, জুতা বিক্রি করতে পারেননি। কথা বলতে এগিয়ে যেতেই তিনি এক জোড়া স্যান্ডেল এগিয়ে দিলেন, যেভাবে বিকল্প স্যান্ডেল পরিয়ে পায়ের জুতাজোড়া খুলে নিয়ে মেরামত বা পলিশ করে দেন। চটিজোড়া খুলে দিতেই ব্রাশ দিয়ে ঘষে পরিষ্কার করতে শুরু করলেন তিনি। কাজ করতে করতে নিজের জীবনের গল্প বলতে শুরু করলেন গোপাল।গোপাল চন্দ্র দাস, চর্মকারও দুঃখের ঘুম। খুব দুঃখ স্যার। দোকানডা লিয়্যা ভাইসে বেড়াচ্ছি। বাক্সের মধ্যে সব জিনিস তালা দিয়্যা থুইয়ে যাই। মাস দুয়েক আগে দোকানের সব মালামাল চুরি হয়্যা গেল। আবার কিনতে হলো। এখন সারা দিনে বাজার করার পয়সাডাও হয়নি।গোপালের বাবাও একই কাজ করতেন। বাবার হাত ধরেই ছোটবেলায় এই পেশায় আসেন তিনি। তাঁর মা–বাবা দুজনই অনেক বছর আগে মারা গেছেন। কাজের সূত্রে তাঁর বাবা কবে রাজশাহী শহরে এসেছিলেন, গোপালের তা মনে নেই। তাঁদের গ্রামের বাড়ি নওগাঁর মান্দা উপজেলায়।রাজশাহী নগরের লক্ষ্মীপুর এলাকায় স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে ভাড়া বাসায় থাকেন গোপাল। মাসে বাড়িভাড়া দিতে হয় পাঁচ হাজার টাকা। দুই মেয়েই সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। তাদের পড়াশোনার খরচও তাঁকেই জোগাতে হয়।দুপুরের রোদে ওভাবে পড়ে থেকে ঘুমাচ্ছিলেন কেন—জানতে চাইলে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে গোপাল বললেন, ‘ও দুঃখের ঘুম। খুব দুঃখ স্যার। দোকানডা লিয়্যা ভাইসে বেড়াচ্ছি। বাক্সের মধ্যে সব জিনিস তালা দিয়্যা থুইয়ে যাই। মাস দুয়েক আগে দোকানের সব মালামাল চুরি হয়্যা গেল। আবার কিনতে হলো। এখন সারা দিনে বাজার করার পয়সাডাও হয়নি। কী করব স্যার?’ বলতে বলতে পকেট থেকে দিনের রোজগার বের করে দেখালেন। ২০০ টাকার দুটি নোট, সঙ্গে কয়েকটি খুচরা টাকা। দুই হাত মেলে ধরলেন। হাত কাঁপছিল। চোখ ছলছল করছিল। বললেন, ‘এই দিয়্যা আজকের দিনে বাজার হয় স্যার!’এরই মধ্যে চটিজোড়া পলিশের কাজ প্রায় শেষ। চারপাশের বাড়তি কালিটুকু ন্যাকড়া দিয়ে মুছে দেওয়ার কাজ বাকি। গোপাল নিজের পরনের পরিষ্কার লুঙ্গির একাংশ দিয়ে খুব যত্নে চটির চারপাশ মুছতে শুরু করলেন। ন্যাকড়া নেই? পরিষ্কার লুঙ্গি দিয়ে মুছছেন কেন—জিজ্ঞেস করতেই গোপালের সরল উত্তর, ‘ন্যাকড়া ময়লা হইচে।’ গোপালের উত্তর শুনে মনে হলো, পেশাটা তাঁর জীবনের সঙ্গেই মিশে গেছে। বেঁচে থাকার জন্য যা দরকার, তিনি তা–ই করছেন।