সকাল সাড়ে ৬টা। রাজধানীর রাস্তা প্রায় ফাঁকা। তবে রমনা পার্কের প্রবেশমুখে অনেকগুলো গাড়ি। ভেতরে হাঁটছিলেন শ দেড়েক মানুষ। তার মধ্যে জনাপঞ্চাশেক নারী। পোশাক দেখলেই বোঝা যায়, তাঁরা মধ্যবিত্ত অথবা উচ্চবিত্ত।

রমনা পার্ক পরিচ্ছন্ন। রাস্তাগুলো মসৃণ। অবকাঠামো ভালো। লেকের পানি বেশ পরিষ্কার। চিপসের প্যাকেট বা আবর্জনা খুব একটা দেখা গেল না। শৌচাগারের ব্যবস্থাও ভালো। সেখানে হাঁটার জন্য নিয়মিত যান কয়েক শ মানুষ; আর দর্শনার্থী থাকেন হাজার হাজার।

ঠিক উল্টো দিকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। রমনায় ঘণ্টা দুয়েক ঘোরার পর গেলাম সেখানে। দেখা গেল, পার্কটি ময়লা-আবর্জনায় ভরা। অনেক জায়গায় দুর্গন্ধ। হাঁটার পথ অনেক জায়গায় ভাঙাচোরা। ভবঘুরেদের দেখা গেল, মাদক কেনাবেচা ও সেবন করতে দেখা গেল। নিরাপত্তার অভাবটাও বোঝা গেল।
রমনা পার্ক পরিচ্ছন্ন। রাস্তাগুলো মসৃণ। অবকাঠামো ভালো। লেকের পানি বেশ পরিষ্কার। চিপসের প্যাকেট বা আবর্জনা খুব একটা দেখা গেল না। শৌচাগারের ব্যবস্থাও ভালো। সেখানে হাঁটার জন্য নিয়মিত যান কয়েক শ মানুষ; আর দর্শনার্থী থাকেন হাজার হাজার।
সব মিলিয়ে পাশাপাশি দুই পার্কের চিত্র দুই রকম। দুটি পার্কেই সরকার যথেষ্ট টাকা খরচ করেছে; কিন্তু ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে জোর দেওয়া হয়েছে রমনার ওপর। কারণ, সেখানে সরকারের আমলা ও সচ্ছল মানুষেরা হাঁটতে যান। অন্যদিকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ‘মাদকের আখড়া’ই রয়ে গেছে।


রমনা পার্কে গত ২৭ আগস্ট গিয়ে পাওয়া যায় সাবেক যুগ্ম সচিব মিজানুর রহমানকে। পরনে হাঁটার পোশাক। পায়ে কেডস। জানতে চাইলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, শরীর ঠিক রাখতে তিনি নিয়মিতই ভোরে রমনা পার্কে হাটেন। পার্কটির পরিবেশ ভালো ও নিরাপদ। তাই রমনায় স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যান কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘দু-একবার গিয়েছি। তবে পরিবেশ ভালো না।’
ঠিক উল্টো দিকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। রমনায় ঘণ্টা দুয়েক ঘোরার পর গেলাম সেখানে। দেখা গেল, পার্কটি ময়লা-আবর্জনায় ভরা। অনেক জায়গায় দুর্গন্ধ। হাঁটার পথ অনেক জায়গায় ভাঙাচোরা। ভবঘুরেদের দেখা গেল, মাদক কেনাবেচা ও সেবন করতে দেখা গেল। নিরাপত্তার অভাবটাও বোঝা গেল।

রমনা ও সোহরাওয়ার্দীর ইতিহাস কাছাকাছি। মুনতাসীর মামুনের ঢাকা সমগ্র বইয়ে লেখা আছে, রমনা ফারসি শব্দ। মানে ল’ন। মোগলরা এই নাম দিয়েছিল। মোগল আমলে রমনা বলতে মূলত এখনকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান এলাকাটিকে বোঝানো হতো। যেটি ছিল সবুজ ঘাসে ঢাকা চত্বর। রমনার (এখনকার সোহরাওয়ার্দী) উত্তরে ছিল জঙ্গল। ভেতরে ছিল কয়েকটি খাল।
মুনতাসীর মামুনের লেখা অনুযায়ী, মোগলরা বিদায় নেওয়ার পর ঢাকার জনসংখ্যা কমে যায়। বহু এলাকা পরিত্যক্ত হয়। রমনাও তখন পরিণত হয় জঙ্গলে।
১৯২৫ সালে ঢাকার ম্যাজিস্ট্রেট চার্লস ড’স জেলের কয়েদিদের দিয়ে জঙ্গল কেটে বৃহত্তর রমনা এলাকা পরিষ্কার করেন। তৈরি করেন ঘোড়দৌড়ের মাঠ। পাকিস্তান আমলে শাহবাগ থেকে ইডেন বিল্ডিং (বর্তমান সচিবালয়) পর্যন্ত নতুন একটি রাস্তা করা হয় এবং এই রাস্তার পূর্ব দিকের অংশ হয় বর্তমান রমনা পার্ক। অন্য পাশের মাঠটি আগে থেকে ‘রেসকোর্স’ নামে পরিচিত ছিল।
১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রমনা রেসকোর্স ময়দানের মহাসমাবেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। ১৯৭২ সালে রেসকোর্স ময়দানের নাম পরিবর্তন করে ‘সোহরাওয়ার্দী উদ্যান’ রাখা হয়।

রমনা পার্কের আয়তন ৬৮ দশমিক ৫ একর এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের আয়তন ৬৮ একর। রমনা পার্কের একদিকে মন্ত্রিপাড়া, রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনা, ঢাকা ক্লাব, হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালসহ বিভিন্ন স্থাপনা। অন্যদিকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পাশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলা একাডেমি, জাতীয় জাদুঘর, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ইত্যাদি স্থাপনা রয়েছে।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্বাধীনতা স্তম্ভ নির্মাণ প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ের কাজ শুরু হয়েছিল ১৯৯৮ সালে। প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ে ব্যয় ছিল ২৬৩ কোটি টাকা। সর্বশেষ তৃতীয় পর্যায়ের কাজ শুরু হয় ২০১৮ সালে। ব্যয় ৩৯৭ কোটি টাকা।
ব্যয়ের দিক দিয়ে এগিয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। সেখানে স্বাধীনতা স্তম্ভ নির্মাণ প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ের কাজ শুরু হয়েছিল ১৯৯৮ সালে। প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ে ব্যয় ছিল ২৬৩ কোটি টাকা। সর্বশেষ তৃতীয় পর্যায়ের কাজ শুরু হয় ২০১৮ সালে। ব্যয় ৩৯৭ কোটি টাকা।
প্রকল্পের আওতায় উদ্যানজুড়ে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থান সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। থিম পার্ক, গাড়ি রাখার ভূগর্ভস্থ পার্কিং, লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো, ফোয়ারাসহ ১০টি স্থাপনা নির্মাণের কাজ ঢিমেতালে চলছে। একাধিকবার মেয়াদ বাড়ানোর পর প্রকল্পটির সময়সীমা সর্বশেষ ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় উদ্যানের মধ্যে অবস্থিত স্বাধীনতা জাদুঘরে হামলা চালানো হয়। তারপর থেকে সেটি বন্ধ।
রমনা পার্কের সৌন্দর্যবর্ধনে ২০১৮ সালে ৪৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। ওই অর্থে হাঁটার জন্য আধুনিক ওয়াকওয়ে, লেকের পাশে কাঠের হাঁটার পথ, টয়লেট এবং শরীরচর্চার উপকরণ স্থাপনসহ পার্কে দর্শনার্থীবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা হয়।
অন্যদিকে গণপূর্ত অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, রমনা পার্কের সৌন্দর্যবর্ধনে ২০১৮ সালে ৪৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। ওই অর্থে হাঁটার জন্য আধুনিক ওয়াকওয়ে, লেকের পাশে কাঠের হাঁটার পথ, টয়লেট এবং শরীরচর্চার উপকরণ স্থাপনসহ পার্কে দর্শনার্থীবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা হয়।
নগর–পরিকল্পনাবিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান প্রথম আলোকে বলেন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যেসব স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে, সেগুলো পার্কের চরিত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এসব স্থাপনা করে উদ্যানের চরিত্র নষ্ট করা হয়েছে, এটি এখন অনেকটা কংক্রিটে পরিণত হয়েছে। তিনি বলেন, রমনায় অপ্রয়োজনীয় স্থাপনা না থাকায় এখনো পার্কের চরিত্রটি টিকে আছে।
আদিল মুহাম্মদ খানের মতে, বিনিয়োগের পাশাপাশি যথাযথ তদারকির কারণে রমনা পার্ক পরিচ্ছন্ন ও সুশৃঙ্খল রয়েছে। শুধু বিনিয়োগ করলেই যে পার্ক ভালো রাখা যায় না, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান তার উদাহরণ।
সরেজমিনে গত ২৫ ও ২৭ আগস্ট এবং ২ ও ৩ সেপ্টেম্বর দুটি পার্কের পরিস্থিতি দেখেছি।
দেখা যায়, রমনা পার্কের প্রবেশ ফটকে জনসাধারণের জন্য ১৫টি নির্দেশনা-সংবলিত ব্যানার টানানো রয়েছে। সেখানে হকার প্রবেশ, সভা-সমাবেশ ও গণজমায়েত, মাদক বহন, গ্রহণ, কেনাবেচা এবং স্কুল-কলেজের পোশাক পরে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পার্কটি সিসিটিভি (ক্লোজড সার্কিট) ক্যামেরার আওতাভুক্ত বলেও সতর্কবার্তা রয়েছে।
সরেজমিনে গত ২৭ আগস্ট দেখা যায়, এক ব্যক্তি ধূমপান করতে করতে পার্কে ঢোকার চেষ্টা করলে তাঁকে বাধা দেন আনসার সদস্যরা। কোথাও কাউকে ময়লা ফেলতে বা যত্রতত্র মূত্রত্যাগ করতে দেখা গেল না।
নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় দায়িত্বরত আনসার সদস্য কামরুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, পার্কে যেসব বিধিনিষেধ রয়েছে, সেগুলো কঠোরভাবে পালনের নির্দেশনা আছে।
রমনা পার্ক সকাল ৬টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত খোলা থাকে। এর মোট ৮টি ফটকের মধ্যে ৫টি দিয়ে মানুষ প্রবেশ করতে পারে। এসব ফটকে পাহারার জন্য ৩৫ জন আনসার সদস্য রয়েছেন। পরিচ্ছন্নতার কাজে রয়েছেন ২২ জন কর্মী। পাঁচটি আধুনিক শৌচাগার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ১২ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মী আছেন। বাগান পরিচর্যা ও ঘাস কাটার জন্য মালির ব্যবস্থাও রয়েছে।
নগর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল কালাম আজাদ প্রথম আলোকে বলেন, রমনা পার্কের স্টেকহোল্ডার (অংশীজন) শুধু গণপূর্ত বিভাগ; কিন্তু সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের স্টেকহোল্ডার গণপূর্ত, সিটি করপোরেশন ও মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়। রমনার দায়িত্ব একটি সংস্থার কাছে থাকার কারণে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়। তিনি বলেন, পার্ক দুটির অবস্থানের বাস্তবতাও একটি ব্যাপার। রমনা পার্কের পাশে মন্ত্রিপাড়া। এখানে সচিব ও আমলাদের যাতায়াত। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পাশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্থপনা। স্বাভাবিকভাবে চাইলেও এটা যথাযথভাবে মেইনটেইন (রক্ষণাবেক্ষণ) করা সম্ভব হয় না।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রবেশের নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। এর ৭টি ফটকে ৪০ জন আনসার সদস্য দায়িত্ব পালন করেন। অবশ্য ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। কারণ, কাউকে আটকাতে দেখা যায়নি। সেখানে পরিচ্ছন্নতার কাজে রয়েছেন সাত কর্মী। উদ্যানে পরিচ্ছন্ন শৌচাগার নেই, মালি নেই, বিভিন্ন স্থানে পড়ে থাকে ময়লা-আবর্জনা।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তাঁদের বাজেট থেকে রমনা পার্কে প্রয়োজন অনুযায়ী সংস্কারকাজ করা হয়। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রকল্পের কাজ চলায় সেখানে আলাদা করে রক্ষণাবেক্ষণের বরাদ্দ নেই।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মাদকের কারবার, মারামারি, ছিনতাই ও অসামাজিক কার্যকলাপের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এমনকি উদ্যানের ভেতরে হত্যাকাণ্ডও ঘটে। গত বছরের ১৩ মে রাতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ভেতরে ছুরিকাঘাতে নিহত হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও জাতীয়বাদীবাদী ছাত্রদলের নেতা এস এম শাহরিয়ার আলম।
উদ্যানটিতে গত ২৫ আগস্ট সন্ধ্যা ছয়টার দিকে গিয়ে দেখা যায়, চার তরুণ গাঁজা বিক্রি করছেন। বিভিন্ন বয়সী মানুষ তাঁদের কাছ থেকে গাঁজা কিনছেন। মোটরসাইকেলে এসেও কয়েকজনকে গাঁজা কিনতে দেখা যায়।
গাঁজা বিক্রি করা তরুণদের একজনের নাম রায়হান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘মাঝেমধ্যে পুলিশ ঝামেলা করে। পরে বড় ভাইয়েরা পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করলে আর সমস্যা হয় না।’
পুলিশ বলছে, তারা মাদক বন্ধে অভিযান চালায়। তবে নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়েছে। শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ‘৭ মাসে ১ হাজার ৭০০ জনের মতো আসামি গ্রেপ্তার করেছি। মাদক কারবারিরা আসলে আমাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে এগুলো করে।’
দিনশেষে চিত্রটি একই থাকে। রমনা নিরাপদ ও পরিচ্ছন্ন। সোহরাওয়ার্দী অনিরাপদ ও অপরিচ্ছন্ন।
দিনশেষে চিত্রটি একই থাকে। রমনা নিরাপদ ও পরিচ্ছন্ন। সোহরাওয়ার্দী অনিরাপদ ও অপরিচ্ছন্ন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীন মনে করেন, রাষ্ট্রের সেবা শ্রেণিকেন্দ্রিক। সে কারণে পার্ক দুটি পাশিপাশি হলেও অবস্থা দুই রকমের। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, রমনা পার্ক যেহেতু মন্ত্রিপাড়ার কাছে, সেখানে সরকারি আমলা বা অভিজাত শ্রেণির আনাগোনা বেশি থাকে। তাই সেদিকে আলাদা মনোযোগ আছে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সাধারণ ও ছিন্নমূল মানুষের যাতায়াত বেশি। তাঁদের অভিযোগ জানানোর সক্ষমতা বা সুযোগ কম। তাই মনোযোগ কম।
শরীয়তপুরের কাজীরহাট এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মাস্টার মোস্তফা কাজীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, প্রভাব খাটানো ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হন মোস্তফা কাজী। এরপর থেকে এলাকায় বিভিন্ন জমি দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৬ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে কাজীরহাট বাজারের দোকানপ্রতি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা কাজী। এছাড়া কয়েক মাস আগে কাজীরহাটে একটি দোকান ক্রয়ের সময় ব্যবসায়ী সুমন তপাদারের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী আরও জানান, বি. কে. নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলামের কাছ থেকেও ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন মানুষকে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় ফেলে হয়রানি করার অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন মোস্তফা কাজী। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির ব্যানারে তার কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন অনেকে। এছাড়া বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি নিজ ভগ্নিপতি সিদ্দিক দেওয়ানের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোস্তফা কাজীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সচেতন মহল বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
ইউরোপের রাজধানী ব্রাসেলসে আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা জোরালো করা। এই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত আছেন। গত বছরের শুরু থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের কারণে সারা ইউরোপ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ইউরোপীয় নেতারা এখন যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরিতে কাজ করছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, “আমরা যুদ্ধের মানবিক সংকট বুঝতে পারি এবং এখন আমাদের দায়িত্ব এটি দ্রুত শেষ করার পথ খোঁজা। আমাদের প্রত্যেকের জন্যই শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।” এই বৈঠকে অস্ত্রবিরতি চুক্তি, যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলো যুদ্ধ সমাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এগুলো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ক্রমবর্ধমান পরীক্ষার চাপ এবং পরিবারের পাশাপাশি সমাজের অযৌক্তিক প্রত্যাশা। এ দুটি কারণ মিলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বেড়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা। ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করা যেন শিক্ষার্থীর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ—সব জায়গা থেকেই উচ্চ ফলাফলের প্রত্যাশা তৈরি করছে মানসিক চাপের একটি অব্যক্ত বলয়। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইহান কবির বলেন, “পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে মনে হয়, শুধু আমি না, আমার পুরো পরিবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এটা সহ্য করা খুব কঠিন।” শুধু রাইহান নয়, দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা একই অভিজ্ঞতার কথা বলছে। সামাজিক চাপ ও তুলনার সংস্কৃতি পরিস্থিতি করছে আরও জটিল পরীক্ষার নম্বর নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এখন তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া গর্ব বা অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কোন কলেজে ভর্তি হলো, কে কতো পেল—এসব তুলনার চাপে পড়াশোনার আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা তাবাসসুম বলেন, “প্রত্যাশা থাকা ভালো, কিন্তু তা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায় এবং একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব সক্ষমতা উপেক্ষা করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়। এ থেকেই জন্ম নেয় আত্মগ্লানি, হতাশা এবং মাঝে মাঝে আত্মহননের চিন্তা।” জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ নিয়মিত মানসিক চাপে থাকে। এর মধ্যে ১২ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগে এবং বড় একটি অংশ কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই দিন পার করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে ক্ষতিকর। সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, এবং পরিবারের ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ এই সমস্যার নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম হয়, সেখানে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাকে কেবল ফলাফলের সীমায় না এনে একটি মানবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা চাপ নয়, ভালোবাসা থেকে শিখবে, এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ প্রজন্ম।
বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কৃষিখাতকে চরমভাবে আঘাত করছে। অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘদিন খরা এবং হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ফসল উৎপাদনে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে। চলতি মৌসুমেই অনেক জেলায় ধান, গম, ভুট্টা এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, একদিকে যেমন আবহাওয়ার আচরণ বুঝে ওঠা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সারের দাম, কীটনাশক ও বীজের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পোকার আক্রমণ ও রোগবালাইয়ের হারও বেড়ে গেছে। এই চাপে পড়ে অনেক কৃষকই ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা। তাদের পক্ষে বারবার ক্ষতির ধাক্কা সামলে উঠে আবার নতুনভাবে চাষাবাদ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো অঞ্চলে দেখা গেছে, কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী ফসল বাদ দিয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ ও লাভজনক অন্য চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমানেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। একইসঙ্গে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে এমন জাত ও পদ্ধতি উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে যা কঠিন জলবায়ু পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কৃষি খাতকে সচল রাখা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে এখনই পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
কলম্বোর সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাব ময়দানে চলমান দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে ব্যাট হাতে আবারও ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের। টস জিতে ব্যাট করতে নেমে প্রথম ইনিংসে টাইগাররা সংগ্রহ করে মাত্র ২২০ রান, যেখানে ব্যতিক্রম ছিলেন কেবল শোয়াড ইসলাম (৪৬), মুশফিকুর রহিম (৩৫) ও লিটন দাস (৩৪)। শ্রীলঙ্কার বোলাররা শুরু থেকেই চাপ সৃষ্টি করে রাখে। ডেবিউ করা স্পিনার সোনাল দিনুষা ৩ উইকেট নিয়ে আলো ছড়ান, আর আসিথা ফার্নান্দো ও বিষ্ণু ফার্নান্দো নেন ২টি করে উইকেট। প্রথম ইনিংসের জবাবে দ্বিতীয় দিন সকালে শ্রীলঙ্কা উদ্বোধনী জুটি থেকে ভালো সূচনা পায়। ১৩.১ ওভারে কোন উইকেট না হারিয়ে সংগ্রহ করেছে ৬২ রান। ওপেনার পাথুম নিসান্কা ৩৩ এবং লাহিরু উদারা ২৮ রানে অপরাজিত রয়েছেন। বাংলাদেশের হয়ে তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ বোলিং শুরু করলেও এখনও পর্যন্ত সাফল্যের দেখা মেলেনি। শ্রীলঙ্কা এখনো বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস থেকে ১৫৮ রানে পিছিয়ে আছে, হাতে রয়েছে সকল উইকেট। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে প্রভাব এই টেস্টটি ২০২৩-২৫ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ হওয়ায় দুই দলের জন্যই পয়েন্টের লড়াই গুরুত্বপূর্ণ। সিরিজের প্রথম টেস্টে পরাজিত হওয়ায় বাংলাদেশ সিরিজে টিকে থাকতে হলে এই ম্যাচ জিততেই হবে। পরবর্তী চ্যালেঞ্জ স্লো পিচে বাংলাদেশ বোলারদের আরও পরিকল্পিত বোলিং করতে হবে। দ্রুত উইকেট তুলে না নিতে পারলে শ্রীলঙ্কা বড় লিড নিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে দেবে টাইগারদের। ফিল্ডিংয়ে মনোযোগ এবং টাইট বোলিংয়ের মাধ্যমেই দ্বিতীয় ইনিংসে নিজেদের ফিরে পাওয়ার আশায় বাংলাদেশ। সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড (দিন ২, প্রথম সেশন পর্যন্ত): বাংলাদেশ (১ম ইনিংস): ২২০/১০ শ্রীলঙ্কা (১ম ইনিংস): ৬২/০ (১৩.১ ওভার) নিসান্কা: ৩৩*, উদারা: ২৮* বাংলাদেশ বোলার: তাইজুল, মিরাজ – উইকেটহীন
পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সুচিকিৎসা ও মানবিক অধিকার নিশ্চিত করতে অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে চিঠি দিয়েছেন দেশটির ৭ সাবেক ক্রিকেট অধিনায়ক। বিস্তারিত ভিডিওতে…
সড়কের পাশে বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে যুবকের দুই হাত বাঁধা। তাঁর পিঠের ওপর তুলে দেওয়া হয়েছে ছয়–সাতটি ইট। ইটের ভারে কাত হয়ে আছেন তিনি। এর মধ্যেই চলছে পিটুনি। কেউ চুল টানছেন, কেউ মুখে ঘুষি মারছেন। নির্যাতনে তাঁর মুখে ফেনা চলে এলেও পিটুনি থামেনি। একপর্যায়ে মৃত্যু হয় তাঁর। আর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এ দৃশ্য দেখছিলেন ১৫ থেকে ২০ জন মানুষ। কক্সবাজারের মহেশখালীর বড় মহেশখালী ইউনিয়নের পূর্ব ফকিরাঘোনা এলাকায় আজ মঙ্গলবার সকালে এ ঘটনা ঘটে। চোর সন্দেহে মো. ফয়সাল (২৬) নামের ওই যুবককে বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে বেঁধে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনার কয়েকটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ঘটনায় জড়িত সন্দেহে মোহাম্মদ রিফাত নামের এক যুবককে আটক করেছে পুলিশ।আজ সকাল ৯টার দিকে উপজেলার বড় মহেশখালী ইউনিয়নের পূর্ব ফকিরাঘোনা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। নিহত ফয়সাল ওই এলাকার বাদশাহ মিয়ার ছেলে।প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মঙ্গলবার ভোররাতে পূর্ব ফকিরাঘোনা এলাকার বাসিন্দা কেফায়ত উল্লাহর বাড়িতে ফয়সালকে চোর সন্দেহে আটক করা হয়। পরে সকালে রাস্তার পাশে তাঁকে বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে বেঁধে মারধর করা হয়। এ সময় আশপাশের লোকজনও তাঁকে মারধর করেন। একপর্যায়ে তাঁর পিঠের ওপর ইট রেখে পেটানো হয়। এতে তিনি গুরুতর আহত হন।ঘটনার কিছু ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। সকাল নয়টার দিকে স্থানীয় লোকজন ফয়সালকে উদ্ধার করে মহেশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।বড় মহেশখালী ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আলী আকবর বলেন, মঙ্গলবার ভোররাতে চুরি করতে গিয়ে ফয়সাল ধরা পড়েন। পরে গণপিটুনিতে তাঁর মৃত্যু হয়। তবে চুরির অভিযোগ থাকলেও এভাবে নির্যাতন করে কাউকে হত্যা করা ঠিক হয়নি।তবে ফয়সালের বাবা বাদশাহ মিয়া বলেন, তাঁর ছেলে দিনমজুরের কাজ করতেন। কোনো কারণ ছাড়াই চোর সন্দেহে তাঁকে প্রকাশ্যে বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে বেঁধে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের দাবি জানান তিনি।খবর পেয়ে বেলা ১১টার দিকে পুলিশ মহেশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে ফয়সালের লাশ উদ্ধার করে। সুরতহাল শেষে দুপুরে লাশটি ময়নাতদন্তের জন্য কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। এ সময় ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে হাসপাতাল থেকে মোহাম্মদ রিফাতকে আটক করা হয়।মহেশখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আবদুস সুলতান বলেন, চোর সন্দেহে আটক এক যুবককে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় একজনকে আটক করা হয়েছে। ঘটনায় জড়িত অন্য ব্যক্তিদের ধরতে পুলিশ চেষ্টা করছে।ওসি আরও বলেন, ফয়সালকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওটি তদন্তে সহায়ক হবে। ভিডিও দেখে ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে। এ ঘটনায় মামলার প্রস্তুতি চলছে।
নানা জটিলতার পর বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে সহযোগী অধ্যাপক থেকে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পেয়েছেন ২৩ জন শিক্ষক। রোববার তাঁরা অধ্যাপক পদে যোগদানও করেছেন। তবে একই সঙ্গে পদোন্নতিপ্রত্যাশী মার্কেটিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আবদুল কাইয়ুমকে পদোন্নতি না দিয়ে বিষয়টি আরও খতিয়ে দেখার সুপারিশ করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট। বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সূত্র জানায়, আবদুল কাইয়ুমকে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের ‘দোসর’ আখ্যায়িত করে পদোন্নতির তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের ১৯ অক্টোবর থেকে অধ্যাপক পদে পদোন্নতির জন্য বোর্ড বসা শুরু হয়। পরে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) আপত্তির কারণে এ প্রক্রিয়া আটকে যায়। গত ২৯ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায় ২৪ শিক্ষকের অধ্যাপক পদে পদোন্নতির বিষয়টি উপস্থাপন করা হলে তাঁদের মধ্য থেকে ২৩ শিক্ষককে পদোন্নতি দেওয়ার বিষয়টি চূড়ান্ত করা হয়। ওই সভায় শিক্ষক আবদুল কাইয়ুমের বিষয়টি আরও খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত হয় বলে সিন্ডিকেটের দুজন সদস্য জানিয়েছেন।অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পাওয়া ২৩ শিক্ষক হলেন কোস্টাল স্টাডিজ অ্যান্ড ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট বিভাগের হাফিজ আশরাফুল হক, ইতিহাস বিভাগের আবদুল বাতেন চৌধুরী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগের তারেক মাহমুদ আবির, রসায়ন বিভাগের হালিমা বেগম, নাজমুল কায়েস, মাসুদ পারভেজ ও গাজী জহিরুল ইসলাম, হিসাববিজ্ঞান বিভাগের প্রবীর কুমার ভৌমিক, মৃত্তিকা ও পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের জামাল উদ্দিন, গণিত বিভাগের শাখাওয়াত হোসেন, বিজন কৃষ্ণ সাহা, হেনা রানী বিশ্বাস ও শফিউল আলম, কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের রাহাত হোসাইন ফয়সাল, লোকপ্রশাসন বিভাগের ইশরাত জাহান লিজা, ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের ধীমান কুমার রায়, উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের সুব্রত কুমার দাস, ব্যবস্থাপনা বিভাগের শাখাওয়াত হোসেন, আবদুল্লাহ আল মাসুদ, তাজিজুর রহমান ও সোহেল চৌধুরী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সাদিকুর রহমান এবং ব্যবস্থাপনা বিভাগের আলমগীর মোল্লা।পদোন্নতি আটকে যাওয়া শিক্ষক আবদুল কাইয়ুম সোমবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘কেন আমাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়নি, সেটা বুঝতে পারছি না। তবে আমার পদোন্নতির সব শর্ত পূরণ হয়েছে বহু আগেই। তারপরও কেন, কী কারণে এটা হয়নি, আমি জানি না। তবে এটা আমার প্রতি অন্যায় করা হয়েছে।’নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিন্ডিকেটের একজন সদস্য প্রথম আলোকে বলেন, ‘এর আগে সর্বশেষ সিন্ডিকেট সভায় আমাদের মতামত ছিল, যাঁরা আগে অধ্যাপক হওয়ার জন্য আবেদন করেছিলেন, তাঁদের অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হোক। তবে সভায় একজন সদস্য মত দিয়েছিলেন, যাঁরা ফ্যাসিস্ট সরকারের সঙ্গে জড়িত, তাঁদের পদোন্নতি দেওয়া ঠিক হবে না। এরপর কী হয়েছে, তা বলতে পারব না।’ তিনি জানান, এ বিষয়ে পরবর্তী সভায় আলোচনা করবেন।আবদুল কাইয়ুম, পদোন্নতি আটকে যাওয়া শিক্ষক কেন আমাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়নি, সেটা বুঝতে পারছি না। তবে আমার পদোন্নতির সব শর্ত পূরণ হয়েছে বহু আগেই। তারপরও কেন, কী কারণে এটা হয়নি, আমি জানি না। তবে এটা আমার প্রতি অন্যায় করা হয়েছে।এদিকে একজন শিক্ষককে ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ আখ্যা দিয়ে পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত করার ঘটনায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ফেসবুকের ‘লিংকার্স ইন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়’ গ্রুপে শিক্ষার্থীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে নানা মন্তব্য করছেন।নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনজন শিক্ষক প্রথম আলোকে বলেন, আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকায় শিক্ষক-কর্মকর্তাদের সরকারের নানা কর্মসূচিতে যোগ দিতে হয়েছে। এটা সবাই করেছেন। এ জন্য একজন যোগ্য শিক্ষককে ‘ফ্যাসিস্ট’ তকমা দিয়ে পদোন্নতি আটকে দেওয়া অন্যায়।বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের পদোন্নতির জটিলতা নিরসনের দাবিতে কমপ্লিট শাটডাউনমামুন অর রশিদ, উপাচার্য সিন্ডিকেট মনে করেছে তাঁর (কাউয়ুম) বিষয়টি অধিকতর পর্যালোচনা করা দরকার। তাই তাঁর পদোন্নতি হয়নি।এ বিষয়ে উপাচার্য মামুন অর রশিদ প্রথম আলোকে বলেন, সিন্ডিকেট মনে করেছে তাঁর (কাউয়ুম) বিষয়টি অধিকতর পর্যালোচনা করা দরকার। তাই তাঁর পদোন্নতি হয়নি। ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ হওয়ায় পদোন্নতি না হওয়ার অভিযোগের বিষয়ে উপাচার্য বলেন, ‘না, এমন কোনো বিষয় নেই।’বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬০ শিক্ষকের পদোন্নতির দাবিতে গত ২১ এপ্রিল আন্দোলন শুরু করেন শিক্ষকেরা। একপর্যায়ে তাঁরা তৎকালীন উপাচার্য মোহাম্মদ তৌফিক আলমকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেন। ২৮ এপ্রিল অসহযোগ আন্দোলনের ঘোষণা দেন শিক্ষকেরা। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম কার্যত অচল হয়ে পড়ে। পরে মোহাম্মদ তৌফিক আলমকে অব্যাহতি দিয়ে মামুন অর রশিদকে নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপর শিক্ষকেরা আন্দোলন স্থগিত করেন।শিক্ষকদের আন্দোলনে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় অচলাবস্থা, সেশনজটের শঙ্কায় শিক্ষার্থীরা