বিস্তীর্ণ আরব উপত্যকার একেবারে দক্ষিণ–পশ্চিম কোণের দেশ ইয়েমেন। আয়তনে বাংলাদেশের তুলনায় কয়েক গুণ বড়। পাহাড় আর মরুভূমি ঘেরা। দেশটিতে চার কোটির কিছু বেশি মানুষের বসবাস। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটির রাজধানী সানা।
ইয়েমেনের ভৌগোলিক অবস্থান আলাদা করে ব্যাখ্যার দাবি রাখে। দেশটির দুদিকে স্থলভাগ, দুদিকে সাগর। আরও নির্দিষ্ট করে বললে, উত্তরে সৌদি আরবের সঙ্গে দেশটির বিশাল সীমানা। পূর্বে ওমান। পশ্চিমে লোহিত সাগর। দক্ষিণে এডেন উপসাগর ও আরব সাগর হয়ে ভারত মহাসাগরের সুনীল জলরাশি।
লোহিত সাগর আর এডেন উপসাগর হয়ে আরব সাগরে চলাচলের জন্য ইয়েমেন ঘেঁষে সরু একটি করিডর রয়েছে। এ জলপথকে বাব আল–মানদেব প্রণালি নামে ডাকা হয়। প্রণালির এক পাশে ইয়েমেন, অন্য পাশে আফ্রিকার জিবুতি। এই সরু জলপথ দিয়ে লোহিত সাগর হয়ে সুয়েজ খালের দিকে জাহাজ চলাচল করে।
লোহিত সাগর থেকে পণ্য ও জ্বালানি পরিবহন করা বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর জন্য বাব আল–মানদেব প্রণালির গুরুত্ব অপরিসীম। আর এমন বাণিজ্যিক গুরুত্ব ইয়েমেনের ভূরাজনৈতিক আবেদন বহু গুণ বাড়িয়ে তুলেছে। ভৌগোলিক নৈকট্যের কারণে আফ্রিকা ও আরবের (বৃহত্তর এশিয়ার) অন্যতম সংযোগস্থল বলা হয় ইয়েমেনকে।
ইয়েমেনের ইতিহাস ও ঐতিহ্য বেশ সমৃদ্ধ, হাজারো বছরের পুরোনো। অর্থনৈতিকভাবে সম্পদশালী ভূখণ্ড ছিল ইয়েমেন। প্রাচীনকালে এ অঞ্চলে সাবা, মাইন ও হিময়ারের মতো রাজ্য গড়ে উঠেছিল। ভারত মহাসাগর, পূর্ব আফ্রিকা ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের মধ্যকার বাণিজ্যপথে অবস্থানের কারণে ইয়েমেন সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। ধূপ, সুগন্ধি দ্রব্য ও মসলার বাণিজ্য ছিল এ সমৃদ্ধির বড় উৎস।
সপ্তম শতাব্দীতে ইয়েমেন মুসলিম শাসনের অধীনে আসে। পরবর্তী শতাব্দীগুলোয় বিভিন্ন স্থানীয় রাজবংশ ও ধর্মীয় নেতা দেশটির বিভিন্ন অংশ শাসন করেন। নবম শতাব্দীর শেষ দিকে উত্তর ইয়েমেনে ‘জায়দি’ শিয়া ইমামদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমান হুতি আন্দোলনের সামাজিক ও ধর্মীয় ভিত্তি বুঝতে এই জায়দি ইতিহাস গুরুত্বপূর্ণ।
প্রাচীন গ্রিসের খ্যাতিমান ভূগোলবিদ টলেমি একসময় ইয়েমেনকে ‘সুখী আরব’ বলেছিলেন। রোমানরাও ইয়েমেনকে ‘সুখী অঞ্চল’ বলেই চিনত। সমৃদ্ধ ঐতিহ্য, সম্পদশালী অর্থনীতি, সামুদ্রিক বাণিজ্যকেন্দ্র ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের কারণে ইয়েমেনিরা বরাবরই বিশ্ববাসীর মনোযোগ কেড়েছে।
যদিও আধুনিক ইয়েমেন অনেকটা আলাদা। দেশটির সমৃদ্ধির ইতিহাস ফিকে হয়ে এসেছে। এখন ইয়েমেন বলতে বিশ্বের মানুষ বোঝে, গৃহযুদ্ধে জর্জরিত ও সংঘাতকবলিত এক ভূখণ্ড; যেখানে অর্থের বদলে অস্ত্রের ঝনঝনানি এখন নিত্যদিনের ঘটনা।

ইয়েমেনকে ঘিরে বিদেশি শক্তিগুলোর আগ্রহের ইতিহাস কয়েক শ বছরের পুরোনো। ষোড়শ শতকের দিকে তখন অটোমান সাম্রাজ্যের জয়জয়কার। ইয়েমেনের একটি অংশে সাম্রাজ্য বিস্তার করে তুর্কিরা; কিন্তু স্থায়ী হয়নি। মোটামুটি এক শতাব্দীর মধ্যে ইয়েমেন থেকে অটোমানরা বিদায় নিতে বাধ্য হয়।
লোহিত সাগরে এরপর অনেক জল গড়িয়েছে। ইউরোপীয় শক্তিগুলো একে একে আফ্রিকা ও এশিয়ায় ছড়িয়েছে। ইয়েমেনের এডেন (বিখ্যাত বন্দর) ১৮৩৯ সালে ব্রিটিশ শাসনের অধীন আসে। ১৮৬৯ সালে সুয়েজ খাল চালু হয়। তখন এডেন গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহকেন্দ্র বা রিফুয়েলিং বন্দর হয়ে ওঠে। এর আগে ১৮৪৯ সালে ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চল আবার নিয়ন্ত্রণে নেয় অটোমানরা। আর দক্ষিণাঞ্চল থাকে ব্রিটিশদের হাতে।
নব্বইয়ের দশকে ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলে ‘জায়দি’ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণের অংশ হিসেবে হুতি আন্দোলনের সূচনা। প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন বদরুদ্দিন আল-হুতি। তিনি সালেহ সরকারের বিভিন্ন নীতি এবং যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের প্রভাবের সমালোচনা করতেন। তখন থেকেই হুতিদের সমর্থন জোগায় ইরান।
বিংশ শতকের শুরুর দিক। রক্তক্ষয়ী প্রথম বিশ্বযুদ্ধের স্মৃতি তখনো দগদগে। ১৯১৮ সালে ইয়েমেন থেকে অটোমান সাম্রাজ্য বিদায় নেয় (এ সাম্রাজ্যের আনুষ্ঠানিক বিলুপ্তি ঘটে ১৯২২ সালে)। স্বাধীন হয় উত্তর ইয়েমেন। শাসনভার যায় ইমাম ইয়াহিয়া মুহাম্মদ হামিদ এদ্দিনের হাতে। তাঁকে মুতাওয়াক্কিলি রাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়। তিন দশক দেশ শাসন করেন তিনি। তখন সামন্ততান্ত্রিক শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ দানা বাঁধে ইয়েমেনে।
১৯৪৮ সালে আততায়ীর হাতে নিহত হন ইমাম ইয়াহিয়া। বিদ্রোহীদের দমন করে উত্তরসূরি হন তাঁর বড় ছেলে আহমদ বিন ইয়াহিয়া। তিনি বেশি দিন ক্ষমতায় থাকতে পারেননি। ১৯৬২ সালে মারা যান। ক্ষমতায় বসেন তাঁর ছেলে মুহাম্মদ আল-বদর। অভিষেকের পরপর সেনা বিদ্রোহের সম্মুখীন হয়ে তাঁকে ক্ষমতা হারাতে হয়।
অবসান ঘটে ইয়েমেনি রাজতন্ত্রের। সেনা কর্মকর্তাদের হাত ধরে ইয়েমেনে আরব প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। শুরু হয় গৃহযুদ্ধ। এতে সৌদি আরব রাজতন্ত্রপন্থীদের ও মিসর প্রজাতন্ত্রপন্থীদের প্রকাশ্যে সমর্থন দেয়।

গত শতকের ষাটের দশকে পুরো ইয়েমেন অঞ্চল ছিল বেশ উত্তাল। সশস্ত্র আন্দোলনের মুখে ১৯৬৭ সালে ব্রিটিশরা দক্ষিণ ইয়েমেন ছেড়ে চলে যায়। ব্রিটিশশাসিত অঞ্চলগুলো এক ছাতার নিচে এনে নতুন নাম রাখা হয় ‘পিপলস রিপাবলিক অব ইয়েমেন’। সেটাও বেশি দিন টেকেনি। দুই বছরের মাথায় (১৯৬৯ সালে) সফল কমিউনিস্ট বিদ্রোহ হলে এটির নতুন নাম রাখা হয় ‘পিপলস ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব ইয়েমেন’।
নতুন এ দেশ স্পষ্টতই সোভিয়েত প্রভাব বলয়ে ছিল, যা ওই সময় আরব বিশ্বের একমাত্র সমাজতান্ত্রিক দেশ হিসেবে ছিল পরিচিত। অন্যদিকে উত্তরাঞ্চলে তখনো রক্ষণশীল প্রজাতান্ত্রিক ব্যবস্থা। দুই অংশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাও আলাদা। চলছিল সীমান্তবিরোধ। এর মধ্যেই দুই অংশকে এক করার একটি প্রচেষ্টা চালু ছিল।
১৯৭৮ সাল। উত্তর ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট হন আলী আবদুল্লাহ সালেহ। পরের বছরই উত্তর ও দক্ষিণ ইয়েমেন সংঘর্ষে জড়ায়। আশির দশকের মাঝামাঝি দক্ষিণ ইয়েমেনে ক্ষমতার লড়াইয়ে হাজারো মানুষ নিহত হন। ফলে দেশটির প্রথম প্রজন্মের নেতাদের বড় অংশ ক্ষমতা থেকে সরে যেতে বাধ্য হন।
এমন উত্তাল পরিস্থিতিতে দুই ইয়েমেনকে এক করার প্রচেষ্টা জোরেশোরে শুরু হয়। সেটা আরও জোরালো হয় সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের সময়ে। সফলতা আসে ১৯৯০ সালে। ওই বছরের ২২ মে দুই ইয়েমেন এক হয়। নতুন রাষ্ট্রের নাম রাখা হয় ‘রিপাবলিক অব ইয়েমেন’। প্রেসিডেন্ট হন আলী আবদুল্লাহ সালেহ।
একীভূত হলেও দুই অংশের মধ্যে বিরোধ আর উত্তেজনা রয়ে যায়। ১৯৯৪ সালের মাঝামাঝি প্রেসিডেন্ট সালেহ জরুরি অবস্থা জারি করেন। ভাইস প্রেসিডেন্ট আলী সালেম আল-বেইদসহ দক্ষিণের কয়েকজন কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করেন তিনি। জবাবে তাঁরা দক্ষিণে নতুন রাষ্ট্র গঠনের ঘোষণা দেন। তবে সালেহর বাহিনী তাঁদের পরাস্ত করে। দেশটি আবার ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা পায়।
সৌদি আরব হুতিদের উত্থানকে নিজেদের দক্ষিণ সীমান্তের জন্য হুমকি ও ইয়েমেনে ইরানের প্রভাব বিস্তার হিসেবে দেখে থাকে। ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের বিমান হামলা ও স্থলযুদ্ধের মধ্যেও হুতিরা সানা আর উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে। সৌদি আরবের ভেতরেও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় হুতিরা।
প্রেসিডেন্ট সালেহ দক্ষিণ ইয়েমেনের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু অনেক মানুষের মধ্যে রাজনৈতিক বঞ্চনা, জমি ও সম্পদ হারানো এবং সরকারি চাকরি থেকে ছাঁটাইয়ের ক্ষোভ রয়ে যায়। এসবই পরে অঞ্চলটিতে বিচ্ছিন্নতাবাদ ছড়ানোর পেছনে ব্যাপক ভূমিকা রাখে।
আলী আবদুল্লাহ সালেহ প্রথমে উত্তর ইয়েমেনের শাসক, পরে দুই ইয়েমেন এক হলে প্রেসিডেন্ট হন। সব মিলিয়ে ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিন দশকের বেশি ক্ষমতায় ছিলেন। তাঁর শাসনব্যবস্থা দাঁড়িয়েছিল সেনাবাহিনী, উপজাতীয় নেতা, রাজনৈতিক মিত্র ও পৃষ্ঠপোষকতার জটিল সম্পর্কের ওপর।
সালেহ বিভিন্ন সময় বিভিন্ন গোষ্ঠীকে মিত্র বানিয়েছেন। আবার প্রয়োজন ফুরালে তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। এ কৌশল তাঁকে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় রাখে। কিন্তু দেশটিতে কার্যকর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। দুর্নীতি, বেকারত্ব, দারিদ্র্য, পানি ও সম্পদের সংকট এবং আঞ্চলিক বৈষম্য বাড়তে থাকে। সঙ্গে বাড়তে থাকে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের প্রভাব।
নব্বইয়ের দশকে ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলে ‘জায়দি’ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণের অংশ হিসেবে হুতি আন্দোলনের সূচনা হয়। প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন বদরুদ্দিন আল-হুতি। তিনি সালেহ সরকারের বিভিন্ন নীতি এবং যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের প্রভাবের সমালোচনা করতেন। তখন থেকেই হুতিদের সমর্থন জোগায় ইরান।
একবিংশ শতকের শুরুতে ইয়েমেনে ব্যাপক রক্তপাত দেখা দেয়। ২০০০ সালে এডেন বন্দরে মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজে প্রাণঘাতী হামলা চালায় আল–কায়েদা। পরের বছর নির্বাচন ঘিরে দেশটিতে বড় ধরনের সহিংসতা হয়। ২০০২ সালে আল–কায়েদার বিরুদ্ধে বেশ বড়সড় অভিযানে নামে ইয়েমেন সরকার। আল–কায়েদার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে দেশটি থেকে কয়েক শ ইসলামিক স্কলারকে বহিষ্কার করা হয়।
উত্তরাঞ্চলে ২০০৪ সালের জুন–আগস্টে হুতিদের নেতৃত্বাধীন শিয়া বিদ্রোহীদের সঙ্গে সরকারি বাহিনীর সংঘর্ষে শত শত মানুষ নিহত হন। নিহত হন হুসেইন আল-হুতিও। ২০০৫ সালের শুরুর দিকে হুসেইন আল-হুতির সমর্থকদের সঙ্গে সরকারি বাহিনীর নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হয়। এতে ২০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন।
২০০৭ সালের জানুয়ারি–মার্চ মাসে ইয়েমেনের উত্তরে নিরাপত্তা বাহিনী ও হুতিদের সংঘর্ষে বহু মানুষ হতাহত হন। গ্রীষ্মে বিদ্রোহী নেতা আবদুল মালিক আল-হুতি যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হন। ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে সানায় মার্কিন দূতাবাসে আল-কায়েদার হামলায় হামলাকারীসহ ১৬ জন নিহত হন।
২০০৯–১০ সালজুড়েও ইয়েমেনে পাল্টাপাল্টি হামলা দেখা যায়। ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে মার্কিন বাহিনীর হামলায় দেশটিতে আল–কায়েদার নেতা আনোয়ার আল–আওলাকি নিহত হন। এত কিছুর পরও ইয়েমেনে আল–কায়েদা ও হুতি, কারও প্রভাব কমেনি।

আরব বিশ্ব ২০১১ সালে এক অভূতপূর্ব ঘটনার সাক্ষী হয়। তিউনিসিয়া থেকে শুরু হওয়া আরব বসন্ত একে একে আরব দেশগুলোয় ছড়িয়ে পড়ে। বাদ যায়নি ইয়েমেনও। ওই বছর দেশটিতে ব্যাপক সরকারবিরোধী বিক্ষোভ শুরু হয়। বিক্ষোভকারীরা সালেহর পদত্যাগ, দুর্নীতির অবসান ও রাজনৈতিক সংস্কারের দাবি জানান।
দীর্ঘ আন্দোলন ও আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতার পর সালেহ ক্ষমতা ছাড়তে রাজি হন। ২০১২ সালে আবেদরাব্বো মানসুর হাদি ইয়েমেনের অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হন। তাঁর নেতৃত্বে একটি জাতীয় সংলাপ শুরু হয়। লক্ষ্য ছিল, নতুন সংবিধান তৈরি, রাষ্ট্রের কাঠামো সংস্কার এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক পক্ষকে ক্ষমতায় যুক্ত করা।
রূপান্তরের এ প্রক্রিয়া প্রত্যাশিত ফল দেয়নি। সরকার অর্থনৈতিক সংকট, দুর্নীতি, নিরাপত্তাহীনতা ও বিভিন্ন গোষ্ঠীর বিরোধ সামাল দিতে ব্যর্থ হয়। নতুন রাষ্ট্রকাঠামো ও ক্ষমতা বণ্টনের প্রস্তাবেও ঐকমত্য হয়নি। এতে হুতিরা অভিযোগ করে, প্রস্তাবিত ব্যবস্থা তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চলকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল করবে।
এ পরিস্থিতিতে হুতিরা উত্তরাঞ্চল থেকে অগ্রসর হতে থাকে। একসময় পুরোনো শত্রু সালেহ ও তাঁর অনুগত সেনাসদস্যদের সঙ্গে হুতিদের সমঝোতা হয়। ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে রাজধানী সানা দখল করে নেয় হুতিরা। ২০১৫ সালের শুরুতে প্রেসিডেন্ট হাদি সানা ছেড়ে এডেনে চলে যান। এডেনকে অস্থায়ী রাজধানী ঘোষণা করা হয়। পরে প্রেসিডেন্ট হাদি সৌদি আরবে আশ্রয় নেন।
আরব বসন্তের পর থেকে ইয়েমেন টালমাটাল ছিল। এর মধ্যেই প্রেসিডেন্ট হাদি সৌদি আরবে পালিয়ে যান। হুতিরাও একের পর এক এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে শুরু করে। এ অবস্থায় ২০১৫ সালে নতুন করে গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে ইয়েমেনে।
হুতিরা এডেনের দিকে অগ্রসর হলে ২০১৫ সালের মার্চে সৌদি আরবের নেতৃত্বে একটি সামরিক জোট ইয়েমেনে অভিযান শুরু করে। জোটের ঘোষিত লক্ষ্য ছিল, হাদি সরকারকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা এবং হুতিদের অগ্রযাত্রা থামানো। যুক্তরাষ্ট্র জোটকে গোয়েন্দা ও কারিগরি সহায়তা দেয়।
সৌদিরা হুতিদের উত্থানকে নিজেদের দক্ষিণ সীমান্তের জন্য হুমকি এবং ইয়েমেনে ইরানের প্রভাব বিস্তার হিসেবে দেখে থাকে। সৌদি জোটের বিমান হামলা ও স্থলযুদ্ধের মধ্যেও হুতিরা সানা আর উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে। সৌদি আরবের ভেতরেও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় হুতিরা। পরে যুদ্ধ ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে আসে।
২০১৭ সালে হুতি আর সালেহপন্থীদের জোট ভেঙে যায়। সালেহ হুতিদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার পর সংঘর্ষে নিহত হন। এরপরও তাঁর অনুগত বিভিন্ন সামরিক ও রাজনৈতিক গোষ্ঠী ইয়েমেনের সংঘাতে সক্রিয় থাকে।

ইয়েমেনে সংঘাত শুধু হুতি ও সরকারপন্থী বাহিনীর মধ্যে ঘটছে, তা নয়। দক্ষিণাঞ্চলে স্বাধীন রাষ্ট্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল (এসটিসি) গড়ে উঠেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত এসটিসিকে সমর্থন জোগায়। অন্যদিকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে সমর্থন দেয় সৌদি আরব।
২০১৯ সালে এসটিসি এডেনের নিয়ন্ত্রণ নেয়। পরে সৌদি আরবের মধ্যস্থতায় সরকার ও এসটিসির মধ্যে একটি চুক্তি হয়। এরপরও বাহিনীগুলো একীভূত করা ও ক্ষমতা ভাগাভাগির অনেক শর্ত কার্যকর হয়নি। চলতে থাকে সংঘাত। জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় ২০২২ সালে দুই মাসের অস্ত্রবিরতি কার্যকর হয়। পরে এর মেয়াদ কয়েক দফায় বৃদ্ধি করা হয়।
একই বছরের এপ্রিলে প্রেসিডেন্ট হাদি প্রেসিডেনশিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের (পিএলসি) কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। হুতিবিরোধী বিভিন্ন গোষ্ঠীকে একটি কাঠামোর মধ্যে আনার চেষ্টা থেকে পিএলসি গঠন করা হয়। কিন্তু কাউন্সিলের সদস্য ও সমর্থক শক্তিগুলোর মধ্যেও মতপার্থক্য দূর হয়নি। ফলে কাঙ্ক্ষিত শান্তিও আসেনি।
হুতিরা বাব আল-মানদেব প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে। ইরান যুদ্ধের জেরে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল আগে থেকেই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এখন হুতিরা বাব আল-মানদেব পুরোপুরি বন্ধ করে দিলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে পুরো বিশ্বে জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
২০২৩ সালে গাজায় যুদ্ধ শুরু করে ইসরায়েল। হুতিরা অসহায় গাজাবাসীর পক্ষে দাঁড়ায়। ইসরায়েলি ভূখণ্ডে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাতে শুরু করে। সেই সঙ্গে ইসরায়েলের ওপর চাপ প্রয়োগের অংশ হিসেবে লোহিত সাগর ও আব আল–মানদেব প্রণালিতে একের পর এক বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালায়।
বসে থাকেনি ইসরায়েল ও এর পশ্চিমা মিত্ররা। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নৌপথের সুরক্ষা নিশ্চিত করার কথা বলে ইয়েমেনে হুতিদের ওপর ব্যাপকভাবে হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল।
ইতিমধ্যে ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হয় ইরান যুদ্ধ। ওই দিন ইরানে আকস্মিক হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। জবাবে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন ঘাঁটি ও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনায় ব্যাপক হামলা চালায় ইরান। স্বাভাবিকভাবে ইরান–সমর্থিত হুতিরা যুদ্ধের বাইরে থাকতে পারেনি। তেহরানের পক্ষে রণাঙ্গনে নেমেছে তারাও।
গত জুলাই থেকে ইয়েমেনে সামরিক উত্তেজনা আবার বাড়তে শুরু করে। হুতিদের লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা এবং উপকূলীয় এলাকায় অগ্রযাত্রা নতুন সংকট তৈরি করে। লোহিত সাগর ও বাব আল–মানদেব প্রণালি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমানবাহী রণতরিগুলোর অবাধ চলাচল ব্যাহত করাই তাদের প্রধান উদ্দেশ্য হয়ে ওঠে।

জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, অত্যাধুনিক ড্রোন ও বিস্ফোরকবোঝাই স্পিডবোটের সাহায্যে বড় আকারের নৌযানের জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করার সক্ষমতা হুতিদের রয়েছে। তা ছাড়া সাগরের বুকে মাইন পেতে রেখে বাব আল–মানদেব প্রণালির স্বাভাবিক নৌ চলাচলকে তারা প্রবলভাবে বিঘ্নিত করতে পারে।
হুতিদের এসব সক্ষমতা ইরান যুদ্ধে মোতায়েন মার্কিন যুদ্ধজাহাজ চলাচলের পথকে রীতিমতো কণ্টকাকীর্ণ ও সময়সাপেক্ষ করে তুলতে পারে। মার্কিন রণতরিগুলো চাইলে অবশ্য সৌদি আরবের উপকূল ঘেঁষে লোহিত সাগরের উত্তরাঞ্চল থেকে নিজেদের অভিযান চালাতে পারে।
তবে হুতিদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ওই এলাকা পর্যন্ত গিয়েও অনায়াসে আঘাত হানতে সক্ষম। পাশাপাশি সৌদি উপকূল থেকে হরমুজ প্রণালির এক হাজার কিলোমিটারের বেশি দূরত্ব মার্কিন বাহিনীর জন্য আরেক বড় বাধা। এরই মধ্যে গত বৃহস্পতিবার হুতিরা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মোখা বন্দর দখল করে নিয়েছে। এত দিন বন্দরটি ইয়েমেনে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের অনুগত বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ছিল।
জবাবে সৌদি আরব মোখায় বিমান হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে হুতিরাও বাব আল–মানদেব প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে। ইরান যুদ্ধের জেরে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল আগে থেকেই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এখন হুতিরা বাব আল–মানদেব পুরোপুরি বন্ধ করে দিলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে পুরো বিশ্বে জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জাতিসংঘ সতর্ক করেছে, সংঘাতের বিস্তার ইয়েমেনকে আবার বড় ধরনের যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে। সেই সঙ্গে দেশটিকে মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর সংঘাতের আরও গভীরে নিয়ে যেতে পারে।
দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অচলাবস্থা, সংঘাত ও গৃহযুদ্ধে ইয়েমেনের অবস্থা শোচনীয়। লাখো মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে দেশে–বিদেশে ছড়িয়ে পড়েছেন। অর্থনীতির অবস্থা তথৈবচ। নিত্যপণ্যের তীব্র সংকট। ভেঙে পড়েছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও প্রশাসনব্যবস্থা। খাদ্যসংকটে দেখা দিয়েছে তীব্র মানবিক সংকট।
অপুষ্টি–দুর্ভিক্ষ–মহামারিতে ইয়েমেনে আরও অনেক মানুষের প্রাণহানির আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও ত্রাণ সরবরাহে বাধা পাচ্ছে। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো ইয়েমেনে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের আশঙ্কার কথা জানিয়ে রেখেছে।
এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি মূল্য চোকাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। এখন যদি গৃহযুদ্ধ ও আঞ্চলিক সংঘাত আরও দীর্ঘ সময় ধরে চলে, তবে ইয়েমেন সংকট এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভাগ্য কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, সেটা ভেবে উদ্বিগ্ন হতেই হয়।
তথ্যসূত্র: বিবিসি, টাইম, দ্য গার্ডিয়ান, এপি, কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস, আরব সেন্টার ও ব্রিটানিকা
শরীয়তপুরের কাজীরহাট এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মাস্টার মোস্তফা কাজীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, প্রভাব খাটানো ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হন মোস্তফা কাজী। এরপর থেকে এলাকায় বিভিন্ন জমি দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৬ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে কাজীরহাট বাজারের দোকানপ্রতি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা কাজী। এছাড়া কয়েক মাস আগে কাজীরহাটে একটি দোকান ক্রয়ের সময় ব্যবসায়ী সুমন তপাদারের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী আরও জানান, বি. কে. নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলামের কাছ থেকেও ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন মানুষকে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় ফেলে হয়রানি করার অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন মোস্তফা কাজী। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির ব্যানারে তার কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন অনেকে। এছাড়া বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি নিজ ভগ্নিপতি সিদ্দিক দেওয়ানের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোস্তফা কাজীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সচেতন মহল বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
ইউরোপের রাজধানী ব্রাসেলসে আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা জোরালো করা। এই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত আছেন। গত বছরের শুরু থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের কারণে সারা ইউরোপ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ইউরোপীয় নেতারা এখন যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরিতে কাজ করছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, “আমরা যুদ্ধের মানবিক সংকট বুঝতে পারি এবং এখন আমাদের দায়িত্ব এটি দ্রুত শেষ করার পথ খোঁজা। আমাদের প্রত্যেকের জন্যই শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।” এই বৈঠকে অস্ত্রবিরতি চুক্তি, যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলো যুদ্ধ সমাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এগুলো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ক্রমবর্ধমান পরীক্ষার চাপ এবং পরিবারের পাশাপাশি সমাজের অযৌক্তিক প্রত্যাশা। এ দুটি কারণ মিলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বেড়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা। ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করা যেন শিক্ষার্থীর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ—সব জায়গা থেকেই উচ্চ ফলাফলের প্রত্যাশা তৈরি করছে মানসিক চাপের একটি অব্যক্ত বলয়। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইহান কবির বলেন, “পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে মনে হয়, শুধু আমি না, আমার পুরো পরিবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এটা সহ্য করা খুব কঠিন।” শুধু রাইহান নয়, দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা একই অভিজ্ঞতার কথা বলছে। সামাজিক চাপ ও তুলনার সংস্কৃতি পরিস্থিতি করছে আরও জটিল পরীক্ষার নম্বর নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এখন তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া গর্ব বা অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কোন কলেজে ভর্তি হলো, কে কতো পেল—এসব তুলনার চাপে পড়াশোনার আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা তাবাসসুম বলেন, “প্রত্যাশা থাকা ভালো, কিন্তু তা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায় এবং একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব সক্ষমতা উপেক্ষা করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়। এ থেকেই জন্ম নেয় আত্মগ্লানি, হতাশা এবং মাঝে মাঝে আত্মহননের চিন্তা।” জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ নিয়মিত মানসিক চাপে থাকে। এর মধ্যে ১২ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগে এবং বড় একটি অংশ কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই দিন পার করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে ক্ষতিকর। সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, এবং পরিবারের ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ এই সমস্যার নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম হয়, সেখানে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাকে কেবল ফলাফলের সীমায় না এনে একটি মানবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা চাপ নয়, ভালোবাসা থেকে শিখবে, এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ প্রজন্ম।
বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কৃষিখাতকে চরমভাবে আঘাত করছে। অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘদিন খরা এবং হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ফসল উৎপাদনে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে। চলতি মৌসুমেই অনেক জেলায় ধান, গম, ভুট্টা এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, একদিকে যেমন আবহাওয়ার আচরণ বুঝে ওঠা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সারের দাম, কীটনাশক ও বীজের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পোকার আক্রমণ ও রোগবালাইয়ের হারও বেড়ে গেছে। এই চাপে পড়ে অনেক কৃষকই ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা। তাদের পক্ষে বারবার ক্ষতির ধাক্কা সামলে উঠে আবার নতুনভাবে চাষাবাদ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো অঞ্চলে দেখা গেছে, কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী ফসল বাদ দিয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ ও লাভজনক অন্য চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমানেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। একইসঙ্গে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে এমন জাত ও পদ্ধতি উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে যা কঠিন জলবায়ু পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কৃষি খাতকে সচল রাখা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে এখনই পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
কলম্বোর সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাব ময়দানে চলমান দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে ব্যাট হাতে আবারও ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের। টস জিতে ব্যাট করতে নেমে প্রথম ইনিংসে টাইগাররা সংগ্রহ করে মাত্র ২২০ রান, যেখানে ব্যতিক্রম ছিলেন কেবল শোয়াড ইসলাম (৪৬), মুশফিকুর রহিম (৩৫) ও লিটন দাস (৩৪)। শ্রীলঙ্কার বোলাররা শুরু থেকেই চাপ সৃষ্টি করে রাখে। ডেবিউ করা স্পিনার সোনাল দিনুষা ৩ উইকেট নিয়ে আলো ছড়ান, আর আসিথা ফার্নান্দো ও বিষ্ণু ফার্নান্দো নেন ২টি করে উইকেট। প্রথম ইনিংসের জবাবে দ্বিতীয় দিন সকালে শ্রীলঙ্কা উদ্বোধনী জুটি থেকে ভালো সূচনা পায়। ১৩.১ ওভারে কোন উইকেট না হারিয়ে সংগ্রহ করেছে ৬২ রান। ওপেনার পাথুম নিসান্কা ৩৩ এবং লাহিরু উদারা ২৮ রানে অপরাজিত রয়েছেন। বাংলাদেশের হয়ে তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ বোলিং শুরু করলেও এখনও পর্যন্ত সাফল্যের দেখা মেলেনি। শ্রীলঙ্কা এখনো বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস থেকে ১৫৮ রানে পিছিয়ে আছে, হাতে রয়েছে সকল উইকেট। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে প্রভাব এই টেস্টটি ২০২৩-২৫ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ হওয়ায় দুই দলের জন্যই পয়েন্টের লড়াই গুরুত্বপূর্ণ। সিরিজের প্রথম টেস্টে পরাজিত হওয়ায় বাংলাদেশ সিরিজে টিকে থাকতে হলে এই ম্যাচ জিততেই হবে। পরবর্তী চ্যালেঞ্জ স্লো পিচে বাংলাদেশ বোলারদের আরও পরিকল্পিত বোলিং করতে হবে। দ্রুত উইকেট তুলে না নিতে পারলে শ্রীলঙ্কা বড় লিড নিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে দেবে টাইগারদের। ফিল্ডিংয়ে মনোযোগ এবং টাইট বোলিংয়ের মাধ্যমেই দ্বিতীয় ইনিংসে নিজেদের ফিরে পাওয়ার আশায় বাংলাদেশ। সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড (দিন ২, প্রথম সেশন পর্যন্ত): বাংলাদেশ (১ম ইনিংস): ২২০/১০ শ্রীলঙ্কা (১ম ইনিংস): ৬২/০ (১৩.১ ওভার) নিসান্কা: ৩৩*, উদারা: ২৮* বাংলাদেশ বোলার: তাইজুল, মিরাজ – উইকেটহীন
পশ্চিমবঙ্গের প্রযোজনা সংস্থা সুরিন্দর ফিল্মসের একটি পোস্টার গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে ফেসবুকে শেয়ার করেছেন নির্মাতা কৌশিক গাঙ্গুলী। তাঁর পরিচালিত সর্বশেষ সিনেমা ‘আজও আর্ধাঙ্গিণী’র পোস্টার। গত ১০ জুলাই মুক্তির পর টানা ৭৫ দিন প্রদর্শনীর মাইলফলক পূর্ণ করেছে সিনেমাটি। প্রযোজনা সংস্থাটি যাকে বলেছে ‘ব্লকবাস্টার হিট’। কৌশিকের পোস্টের নিচে অনেক দর্শক সিনেমাটির প্রশংসা করেছেন। অরিন্দম চ্যাটার্জি নামের এক দর্শক লিখেছেন, ‘কোনো সিনেমার পার্ট টু যে এত ভালো হতে পারে, আমার জীবনে সেটা প্রথমবার অভিজ্ঞতা হলো। অসাধারণ সিনেমা, প্রত্যেকেরই দেখা উচিত।’ কেবল তিনিই নন, মুক্তির পর থেকেই সিনেমাটির প্রশংসা করেছেন দর্শক-সমালোচকেরা। ২০২৩ সালে মুক্তি পাওয়া কৌশিক গাঙ্গুলীর ‘অর্ধাঙ্গিণী’ বাণিজ্যিক সাফল্য পেয়েছিল, এটি তারই সিক্যুয়েল। আগের কিস্তির মতো সিনেমাটিতে প্রধান চরিত্রগুলোয় অভিনয় করেছেন চূর্ণী গঙ্গোপাধ্যায়, জয়া আহসান, কৌশিক সেন, অম্বরীশ ভট্টাচার্য। সিনেমাটিতে মেঘনা চরিত্রে অভিনয় করেছেন জয়া। নিজের অভিনীত চরিত্রটি নিয়ে প্রথম আলোকে তিনি বলেছিলেন, ‘মেঘনা চরিত্রটা তো আগে থেকেই তৈরি ছিল। তারপর সময় কিছুটা কেটে গেছে। শহরটা মেঘনার অনেকখানি হয়ে গেছে। ও পরিবারের একটি অংশ হয়ে গেছে। পরিবারে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। বাচ্চাটা বড় হয়েছে। মেঘনার জীবনে নতুন নতুন আরও চরিত্র এসেছে। যেমন করে সিনেমাতে নতুন চরিত্রগুলো আসে। ও আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছে। কিন্তু সংসারে এবারও নানা রকমের টানাপোড়েন তৈরি হয়, অদ্ভুত পরিস্থিতিতে পড়তে হয় মেঘনাকে। নতুন সিনেমায় সেটাই উঠে এসেছে।’কী বললেন জয়া‘অর্ধাঙ্গিণী’র পর ‘আজও অর্ধাঙ্গিণী’র সাফল্যে উচ্ছ্বসিত জয়া আহসান। গতকাল তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘সত্যি বলতে, আমার মনে হয় সিক্যুয়েল ভাগ্যটাই আমার বোধ হয় ভালো। কারণ “বিজয়া”, “বিসর্জন”-এর পর “অর্ধাঙ্গিণী”থেকে “আজও অর্ধাঙ্গিণী”...মজা করে বললাম আর কী। সত্যি বলতে ভালো গল্প হলে, ভালো কনটেন্ট হলে দর্শক দেখতে আসেন। আমরা যে বলি দর্শক হলে যায় না, সেটা কি ঠিক? প্রমাণ হচ্ছে “আজও অর্ধাঙ্গিণী”। যে প্রত্যেকটা লাইনে, প্রত্যেকটা সংলাপে মানুষ হাততালি দিচ্ছে, নিজেকে রিলেট করতে পারছে, আবেগপ্রবণ হচ্ছে...এটা দেখে আমি সত্যিই খুশি।’সিনেমাটির সাফল্য নিয়ে অভিনেত্রী আরও বলেন, ‘আমি খুবই খুশি। কারণ, এমন একটি কাজ করতে পেরেছি, যেটা আসলে সমাজের মানুষের দৈনন্দিন সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলেছে। মানুষ এখনো সিনেমাটি দেখছে, কথা বলছে; এটাই তো সবচেয়ে বড় পাওয়া, তাই না?’‘আজও অর্ধাঙ্গিনী’র পোস্টার। প্রযোজনা সংস্থার ফেসবুক থেকে যা বলেছিলেন সমালোচকেরামুক্তির পর পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন গণমাধ্যম বাংলাদেশি অভিনেত্রীর প্রশংসাও করেছিল। সংবাদ প্রতিদিন তাদের রিভিউয়ে জয়ার অভিনয় সম্পর্কে লিখেছিল, ‘মেঘনার চরিত্রে জয়া একেবারে পারফেক্ট। জয়ার মধ্যে এমন তোলপাড়, কূলছাপানো লিকুইডিটি, তারল্য আছে, যা চোখে দেখার, অনুভবের এবং আমার মতো কিছু পুরুষের রোমান্টিক টানের। কৌশিকের কল্পনা, তাঁর রোমান্টিক স্বপ্ন এই তারল্যে সাঁতারু হতে পেরেছে। সমস্ত ছবিটাকে আচ্ছন্ন করে আছে জয়া আহসানের তারল্য, মেঘনা নদীর এপার-ওপার ছলাৎ ও বহতা।’অনলাইন গণমাধ্যম দ্য ওয়াল লিখেছিল, ‘মেঘনা চরিত্রে জয়া আহসান অনেক সংযত। সংলাপ কম, কিন্তু উপস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী। অপরাধবোধ, দ্বিধা, ভালোবাসা আর অনিশ্চয়তার মাঝখানে আটকে থাকা এক নারীর ভাঙন। বিশেষ করে চূর্ণীর সঙ্গে তাঁর মুখোমুখি দৃশ্যগুলো ছবির আবেগকে আরও গভীর করেছে। দুজনের রসায়নই ছবির অন্যতম বড় সম্পদ।’এবার একটু ‘হালকা’ হতে চান জয়াদ্য টেলিগ্রাফ লিখেছিল, ‘মেঘনা চরিত্রে জয়া আহসানও দারুণভাবে সঙ্গ দিয়েছেন। যদিও প্রথম ছবির তুলনায় এই পর্বে চরিত্রটি আবেগ প্রকাশের তেমন বেশি সুযোগ পায় না, তবু অপরাধবোধ, ভালোবাসা ও অনিশ্চয়তার টানাপোড়েনে আটকে থাকা এক নারীর ভঙ্গুর মানসিক অবস্থাকে জয়া তাঁর সংযত ও বিশ্বাসযোগ্য অভিনয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন।’এবার ওটিটিতেপ্রেক্ষাগৃহে দারুণ সাফল্যের পর আজ শুক্রবার থেকে ঘরে বসেই দেখা যাবে ‘আজও অর্ধাঙ্গিণী’। সিনেমা মুক্তি পেয়েছে ওটিটি প্ল্যাটফর্ম হইচইয়ে। বাংলাদেশের দর্শকেরাও দেখতে পারবেন জয়া আহসান অভিনীত সিনেমাটি।
পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বন ও অন্যান্য অপরাধের কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬৪ শিক্ষার্থীকে বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। শাস্তি হিসেবে সংশ্লিষ্ট পরীক্ষা বাতিলের পাশাপাশি পরবর্তী এক থেকে তিনটি পরীক্ষায় অংশগ্রহণে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। গত ৩১ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায় শিক্ষার্থীদের শাস্তির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম।৭ সেপ্টেম্বর ভারপ্রাপ্ত পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক হিমাদ্রি শেখর চক্রবর্তী স্বাক্ষরিত এক আদেশে বলা হয়, ২০ আগস্ট অনুষ্ঠিত শৃঙ্খলা পরিষদের সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিভিন্ন পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বন ও অন্যান্য অপরাধের দায়ে ৬৪ শিক্ষার্থীকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে।শাস্তিপ্রাপ্তদের মধ্যে আরবি বিভাগ থেকে সর্বোচ্চ সাতজন শাস্তি পাওয়া ৬৪ শিক্ষার্থীর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ, ইনস্টিটিউট ও অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে আরবি বিভাগ থেকে সর্বোচ্চ সাতজন শিক্ষার্থী শাস্তি পেয়েছেন।এ ছাড়া পোস্ট বেসিক বিএসসি ইন নার্সিং, এমবিবিএস, পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়ন বিভাগ থেকে পাঁচজন করে এবং উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ ও হেলথ টেকনোলজি (ল্যাবরেটরি) থেকে চারজন করে শিক্ষার্থী শাস্তির আওতায় এসেছেন।এ ছাড়া ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ভালনারেবিলিটি স্টাডিজ ইনস্টিটিউট, অর্গানাইজেশন স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড লিডারশিপ, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা এবং আইন বিভাগ থেকে তিনজন করে শিক্ষার্থী শাস্তি পেয়েছেন। ভূগোল ও পরিবেশ, ইংরেজি ও দর্শন বিভাগ থেকে দুজন করে শিক্ষার্থী শাস্তির আওতায় এসেছেন।অন্যদিকে রোবোটিকস অ্যান্ড মেকাট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং, বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি, অ্যাপ্লায়েড কেমিস্ট্রি অ্যান্ড কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, ফার্মেসি, সংস্কৃত, ইসলামিক স্টাডিজ, সমাজকর্ম, পরিসংখ্যান, ইতিহাস, বেসিক বিএসসি ইন নার্সিং এবং মাস্টার অব সায়েন্স ইন নার্সিং প্রতিটি বিভাগ বা প্রোগ্রাম থেকে একজন করে শিক্ষার্থী শাস্তির আওতায় এসেছেন।অপরাধের জন্য অনুতপ্ত হয়ে প্রক্টর অফিসের মাধ্যমে উপাচার্যের কাছে ক্ষমা চেয়ে শাস্তি কমানোর আবেদন করার সুযোগ রয়েছে। ১৯৮৯ সালের সিন্ডিকেটের দেওয়া ক্ষমতার বলে উপাচার্য সর্বোচ্চ এক বছর পর্যন্ত শাস্তি কমাতে পারেন। ১৫ সেপ্টেম্বর শিক্ষার্থীদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ১৪ জন শিক্ষার্থীর এক বছরের শাস্তি মওকুফ করেছেন উপাচার্য।পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অফিসের সেকশন অফিসার মির্জা ইশতিয়াক আলম এ বিষয়ে বলেন, এখন পর্যন্ত ১৪ জন শিক্ষার্থীর শাস্তি এক বছর করে মওকুফ করা হয়েছে। শাস্তি পাওয়া শিক্ষার্থীদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
মেট্রোরেল প্রকল্পে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার অভাবে ব্যয় বেড়েছে বলে মনে করছে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)। সংস্থাটি বলেছে, মেট্রোরেলের পাশাপাশি বাস, বিআরটি, কমিউটার রেল, পথচারীবান্ধব ব্যবস্থা ও অন্যান্য গণপরিবহনে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। প্রকল্প অনুমোদনের আগে উপযোগিতা, লাভ-ক্ষতি ও বিকল্প পরিবহনব্যবস্থার সম্ভাবনা যথাযথভাবে বিশ্লেষণেরও দাবি জানিয়েছে তারা। শুক্রবার ‘মেট্রোরেলের ব্যয় বৃদ্ধি ও পরিকল্পনায় ন্যায্যতা’ শীর্ষক এক অনলাইন আলোচনা সভায় এ কথা বলা হয়। আইপিডির আয়োজনে অনুষ্ঠানে পরিবহন পরিকল্পনাবিদ, নগর–পরিকল্পনাবিদ ও প্রকৌশলীরা অংশ নেন।অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আইপিডির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান। তিনি বলেন, মেট্রোরেলের প্রতি অতিরিক্ত আগ্রহের কারণে যোগাযোগব্যবস্থার অন্যান্য সম্ভাবনা পিছিয়ে পড়েছে। ২০০৫ সালের কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় (এসটিপি) বাস, বিআরটি ও পথচারীবান্ধব ব্যবস্থায় গুরুত্ব দেওয়ার কথা থাকলেও সেসব ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ হয়নি। বরং প্রাথমিক পরিকল্পনায় তিনটি মেট্রোরেলের প্রায় ৬০ কিলোমিটার নেটওয়ার্কের কথা থাকলেও সংশোধিত পরিকল্পনায় ছয়টি মেট্রোরেলের ১৪০ কিলোমিটারের বেশি নেটওয়ার্কের প্রস্তাব করা হয়েছে।আইপিডির তথ্য অনুযায়ী, এমআরটি লাইন-৫ (দক্ষিণ) নির্মাণে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৬৪৫ কোটি টাকা। বিপরীতে এমআরটি লাইন-১-এ ৩ হাজার ৬৬১ কোটি এবং এমআরটি লাইন-৫ (উত্তর)-এ ৪ হাজার ৪৯২ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। সংস্থাটি বলেছে, প্রকল্পগুলোর ব্যয়ের এই পার্থক্য প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।পরিবহন পরিকল্পনাবিশেষজ্ঞ মুনতাসীর মামুন বলেন, মেট্রোর পাশাপাশি কার্যকর বাস নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা জরুরি। বর্তমানে প্রায় ১ শতাংশ ট্রিপ মেট্রোর মাধ্যমে হচ্ছে। ভবিষ্যতে সব পরিকল্পিত মেট্রোরেল বাস্তবায়িত হলেও সর্বোচ্চ ১০ থেকে ১৫ শতাংশ ট্রিপ বহন করা সম্ভব হতে পারে। ফলে বাকি যাত্রীদের জন্য কার্যকর পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সভাপতি মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বড় প্রকল্পে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন। প্রকল্পের অনুমোদিত ব্যয় যৌক্তিক ও ন্যায্য কি না, তা স্বাধীনভাবে যাচাইয়ের কথাও বলেন তিনি।এ ছাড়া আলোচকেরা কমলাপুর-এয়ারপোর্ট-জয়দেবপুর রেলপথকে কমিউটার ট্রেনের জন্য ব্যবহার, বিআরটি ও বাস রুট রেশনালাইজেশন, মেট্রোর সঙ্গে পথচারী ও অন্যান্য গণপরিবহনের সমন্বয় এবং প্রকল্পের জীবনচক্র ব্যয় প্রকাশের ওপর গুরুত্ব দেন।আইপিডি মেট্রোরেল প্রকল্পে উন্মুক্ত দরপত্র, স্বাধীনভাবে ব্যয় যাচাই, ২০-৩০ বছরের পরিচালন ব্যয় ও ঋণের কিস্তির হিসাব প্রকাশ এবং প্রকল্পের প্রতিটি প্যাকেজের দরপত্র ও ব্যয়ের তথ্য উন্মুক্ত করার সুপারিশ করেছে।