শিক্ষকদের মূল্যায়নের জন্য ডাকসু যে ওয়েবসাইট তৈরি করেছে, তা নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে প্রতিক্রিয়া হয়েছে। শিক্ষকদের বেশির ভাগ ডাকসুর এই উদ্যোগে ক্ষুব্ধ। তাঁরা মনে করছেন, উদ্যোগটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নেওয়া উচিত ছিল, ডাকসুর নয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ১০ সেপ্টেম্বর ওয়েবসাইটটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করে। এরপর গতকাল রোববার বিকেল চারটা পর্যন্ত ৬ হাজার ৪৮৯ জন শিক্ষার্থী শিক্ষকদের মূল্যায়ন করেছেন। কোন শিক্ষক কত নম্বর পেয়েছেন, তা ওয়েবসাইটটি থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে অনেক শিক্ষক ব্যঙ্গ ও কটূক্তির (ট্রল) শিকার হচ্ছেন।
শিক্ষকেরা বলছেন, এখতিয়ারের বাইরে শিক্ষকদের মূল্যায়নের উদ্যোগ অগ্রহণযোগ্য। তার চেয়েও অগ্রহণযোগ্য প্রাপ্ত নম্বর গোপন রাখতে না পারা। পড়াতে না পারলে শিক্ষককে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া যেতে পারে। তবে হেয় করার সুযোগ নেই।
ডাকসু যেভাবে মূল্যায়নের ব্যবস্থা করেছে, তার প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন অনেকে। এদিকে সমালোচনার মুখে গতকাল মূল্যায়নে শিক্ষকদের প্রাপ্ত নম্বর দেখার সুযোগ বন্ধ করে দেয় ডাকসু। কিন্তু এর আগেই নম্বর ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক তারিক মনজুর প্রথম আলোকে বলেন, শিক্ষক মূল্যায়নের কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে সতর্কতার সঙ্গে করা দরকার। এর মধ্যে কিছু বিষয় গোপনীয় রাখতেই হবে, নইলে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হতে পারে। তিনি বলেন, শিক্ষকদের কাজ শুধু ক্লাস নেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁরা গবেষণা ও অন্যান্য কাজের সঙ্গেও যুক্ত থাকেন। এ ধরনের জরিপ তাই শিক্ষক সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারণা দেয় না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০০০ সালে বিভাগের সংখ্যা ছিল ৪৭। এখন ৮৪টি। দুই দশকে ৯টি থেকে বেড়ে ইনস্টিটিউট হয়েছে ১২টি। সাড়ে ২২ হাজার থেকে নিয়মিত শিক্ষার্থী বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৭ হাজারের বেশি। শিক্ষকসংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজারে (২ হাজার ১৫ জন)।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শিক্ষক রাজনীতিতে দল ভারী করতে একের পর এক বিভাগ খোলা ও শিক্ষক নিয়োগের অভিযোগ রয়েছে। শিক্ষকদের অনেকের বিরুদ্ধে নিজেরা পড়াশোনা না করা, গবেষণায় ফাঁকি দেওয়া এবং শ্রেণিকক্ষে পাঠদানে অদক্ষতার অভিযোগ রয়েছে। আবার কোনো কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে অপছন্দের শিক্ষার্থীদের নম্বর কম দেওয়া, পছন্দের শিক্ষার্থীকে বেশি দেওয়া এবং হয়রানির অভিযোগ রয়েছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ জানানোর সুযোগ কম। এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষকদের মূল্যায়নের দাবিও ছিল।
২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত ডাকসু নির্বাচনের আগে ছাত্রশিবির-সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোটের ইশতেহারে শিক্ষক মূল্যায়ন পদ্ধতিকে আরও কার্যকর করার প্রতিশ্রুতি ছিল। মেয়াদ শেষের চার দিন আগে শিক্ষক মূল্যায়নের একটি ওয়েবসাইট চালু করে ডাকসু। নাম ‘ডিইউ ইভাল্যুয়েশন’।
ওয়েবসাইটটি চালুর ক্ষেত্রে সক্রিয় ছিলেন ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য উম্মে উসওয়াতুন রাফিয়া। তিনি স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচন করেছিলেন। ওয়েবসাইট চালুর অনুষ্ঠানে ডাকসুর সহসভাপতি (ভিপি) সাদিক কায়েমসহ শিবির-সমর্থিত প্যানেলের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। ছিলেন না ডাকসুর সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম।
উম্মে উসওয়াতুন রাফিয়া গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ওয়েবসাইটটি চালুর জন্য তিনি বিগত এক বছর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে গিয়েছেন; কিন্তু পর্যাপ্ত সহায়তা পাননি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আপত্তি থাকলেও ওয়েবসাইটটি চলবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

ডাকসু জানিয়েছে, তিন মাসের মূল্যায়ন ও মতামতের ভিত্তিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব বিভাগের শিক্ষকদের নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করা হবে। সেই প্রতিবেদন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে দেওয়া হবে।
ডাকসুর নির্ধারিত এক বছরের মেয়াদ আজ সোমবার শেষ। গঠনতন্ত্র বলছে, নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন না হলে মেয়াদ তিন মাস বাড়বে।
শিক্ষকেরা কতটা স্পষ্টভাবে পড়ান, প্রশ্ন ও আলোচনায় শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করেন কি না, তাঁদের সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করেন কি না এবং নিয়মিত ও সময়মতো ক্লাস নেন কি না—এসব বিষয়েও মতামত দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
ডাকসুর তৈরি ওয়েবসাইটে ঘুরে দেখা গেছে, শিক্ষকদের মূল্যায়নের জন্য সেখানে বেশ কয়েকটি নির্দিষ্ট বিষয় রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কোর্সের কাঠামো ও পাঠ্যসূচি, শিক্ষাদান পদ্ধতি, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ ও সহযোগিতা, পরীক্ষা ও মূল্যায়ন, পেশাদারি এবং সার্বিক সন্তুষ্টি।
শিক্ষকেরা কতটা স্পষ্টভাবে পড়ান, প্রশ্ন ও আলোচনায় শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করেন কি না, তাঁদের সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করেন কি না এবং নিয়মিত ও সময়মতো ক্লাস নেন কি না—এসব বিষয়েও মতামত দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরবর্তী সব ব্যাচের শিক্ষার্থীরা এই ওয়েবসাইটে শিক্ষকদের মূল্যায়ন করতে পারছেন। মূল্যায়ন করতে হলে শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ই-মেইল দিয়ে নিবন্ধন করতে হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা শুধু নিজ বিভাগের শিক্ষকদের মূল্যায়ন করতে পারছেন।
ডাকসুর সদস্যরা জানিয়েছেন, মূল্যায়নকারীর পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন রাখা হচ্ছে। শিক্ষকদের পরিচয় ও নাম জানার সুযোগ ছিল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সাড়ে ৬ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী ১১ হাজারের বেশি মূল্যায়ন দিয়েছেন। একজন শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে একাধিক শিক্ষককে মূল্যায়নের সুযোগ রয়েছে।
ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) এস এম ফরহাদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘ওয়েবসাইটের কোনো মূল্যায়ন চূড়ান্ত নয়। আমরা আগেই ঘোষণা দিয়েছি যে এটি এখনো উন্নয়ন ও পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে।’ তিনি বলেন, তাঁরা এ উদ্যোগ নিতে বাধ্য হয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয় নিজস্ব শিক্ষক মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু করলে তাঁরা বন্ধ করে দেবেন।
যেসব শিক্ষক ট্রলের শিকার হচ্ছেন, তাঁদের একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শেহরীন আমিন ভূঁইয়া মোনামি। গত শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত তাঁর রেটিং নম্বর ছিল ৫-এর মধ্যে ১ দশমিক ৪৯। এই নম্বর ছড়িয়ে পড়েছে অনলাইনে। পরে আরেকটি ফটোকার্ড ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে তাঁর নম্বর ১ দশমিক ৮৩।
শেহরীন আমিন এ বিষয়ে শনিবার ফেসবুকে দীর্ঘ একটি পোস্ট দেন। তিনি লিখেছেন, শিক্ষক মূল্যায়ন নিয়ে তাঁর কোনো আপত্তি ছিল না। নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে পড়ানোর সুবাদে তিনি অনেকবার এর মুখোমুখি হয়েছেন। তিনি কয়েকটি প্রশ্ন তোলেন।
ওয়েবসাইটে গতকাল শিক্ষকদের ব্যক্তিগত রেটিং দেখানো বন্ধ করা হলেও সার্বিক একটি চিত্র ছিল। বিকেল চারটা পর্যন্ত পাঁচটির বেশি মূল্যায়ন পাওয়া ৮১৬ জন শিক্ষকের মধ্যে রেটিংয়ে ৪-৫-এর মধ্যে রয়েছেন ৩৪৭ জন শিক্ষক। ৩-৪ রেটিংয়ের মধ্যে রয়েছেন ২০৫ জন শিক্ষক। ২-৩ রেটিংয়ের মধ্যে রয়েছেন ১৫৫ জন। রেটিংয়ে ২-এর নিচে রয়েছেন ১০৯ জন শিক্ষক।
প্রথম প্রশ্ন, যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রন্ধ্রে রন্ধ্রে রাজনীতি, সেখানে নিরপেক্ষ মূল্যায়ন কীভাবে হবে? সব শিক্ষার্থী পক্ষপাতিত্বের ঊর্ধ্বে উঠে মূল্যায়ন করবেন, সেটা কে নিশ্চিত করবে? দ্বিতীয় প্রশ্ন, অনেক শিক্ষার্থী যেখানে মূল্যায়নে অংশ নেননি, সেখানে এই মূল্যায়ন যথাযথ ও প্রতিনিধিত্বশীল কীভাবে হবে?
শেহরীন আমিন আরও লিখেছেন, তারপরও শিবির-সমর্থিত ডাকসু প্যানেলের এই উদ্যোগকে তিনি সাধুবাদ জানান। তবে যথাযথভাবে তৈরি না করে হুট করে ওয়েবসাইট চালু করে দেওয়ার কারণে অনেক ধরনের ‘ইস্যু’ হতে পারে।
ওয়েবসাইটে গতকাল শিক্ষকদের ব্যক্তিগত রেটিং দেখানো বন্ধ করা হলেও সার্বিক একটি চিত্র ছিল। বিকেল চারটা পর্যন্ত পাঁচটির বেশি মূল্যায়ন পাওয়া ৮১৬ জন শিক্ষকের মধ্যে রেটিংয়ে ৪-৫-এর মধ্যে রয়েছেন ৩৪৭ জন শিক্ষক। ৩-৪ রেটিংয়ের মধ্যে রয়েছেন ২০৫ জন শিক্ষক। ২-৩ রেটিংয়ের মধ্যে রয়েছেন ১৫৫ জন। রেটিংয়ে ২-এর নিচে রয়েছেন ১০৯ জন শিক্ষক।
ডাকসু ওয়েবসাইটটি চালুর পরপরই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আপত্তি জানিয়েছিল। শিক্ষকেরাও ক্ষুব্ধ। বিভিন্ন দল ও মতের অনুসারী ১০ জন শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নিজেদের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে তাঁরা আলোচনা করেছেন এবং বেশির ভাগ ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। কেউ কেউ বলছেন, শিক্ষকদের অসম্মান করার জন্য এই ব্যবস্থা করা হয়েছে।
কোন শিক্ষার্থী শিক্ষকদের মূল্যায়ন করছেন, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন শিক্ষকেরা। তাঁদের মতে, ক্লাসে ঠিকমতো উপস্থিত থাকেন না, এমন শিক্ষার্থী যদি একজন শিক্ষককে মূল্যায়ন করেন, সেটা কি যৌক্তিক হবে? একজন শিক্ষার্থী সব শিক্ষকের কোর্স নেন না। ফলে একজনকে বিভাগের সব শিক্ষককে মূল্যায়নের সুযোগ দেওয়া ঠিক নয়।
শিক্ষক মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সারা বিশ্বে একটি ‘স্ট্যান্ডার্ড প্র্যাকটিস’ রয়েছে বলে উল্লেখ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণত শিক্ষক মূল্যায়নের ফল শিক্ষক, ডিন বা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দেখতে পারে; শিক্ষার্থী বা সাধারণ জনগণের জন্য তা উন্মুক্ত থাকে না।
ওয়েবসাইটে গতকাল শিক্ষকদের ব্যক্তিগত রেটিং দেখানো বন্ধ করা হলেও সার্বিক একটি চিত্র ছিল। বিকেল চারটা পর্যন্ত পাঁচটির বেশি মূল্যায়ন পাওয়া ৮১৬ জন শিক্ষকের মধ্যে রেটিংয়ে ৪-৫-এর মধ্যে রয়েছেন ৩৪৭ জন শিক্ষক। ৩-৪ রেটিংয়ের মধ্যে রয়েছেন ২০৫ জন শিক্ষক। ২-৩ রেটিংয়ের মধ্যে রয়েছেন ১৫৫ জন। রেটিংয়ে ২-এর নিচে রয়েছেন ১০৯ জন শিক্ষক।
শিক্ষকেরা জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারনাল কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স সেলের (আইকিউএসি) উদ্যোগেই শিক্ষক মূল্যায়নের জরিপ ফরম তৈরি করা হয়েছে এবং সেই জরিপে শিক্ষার্থীদের বাধ্যতামূলকভাবে অংশগ্রহণের নির্দেশনাও আছে। সরকার পরিবর্তন ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের রদবদলের কারণে কাজটি নতুন করে শুরু করা যায়নি।
২০২২ সালে সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এ এস এম মাকসুদ কামালের নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম শিক্ষক মূল্যায়ন পদ্ধতির নীতিমালা করা হয়। পরে ২০২৪ সালে এ পদ্ধতির অংশ হিসেবে লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (এলএমএস) নামে একটি ওয়েবসাইটও করা হয়েছিল। সেখানে শিক্ষার্থীরা কয়েকটি শর্ত পূরণ করে শিক্ষকদের মূল্যায়ন করতে পারতেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিটি সেলের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শুরুতে অন্তত ১৪টি বিভাগে শিক্ষক মূল্যায়ন চালু হয়েছিল। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ৮৪ বিভাগেই তা একযোগে চালুর কথা ছিল; পরে তা হয়নি।
ডাকসুর উদ্যোগে শিক্ষক মূল্যায়নব্যবস্থা চালুকে একটি রাজনৈতিক ‘স্টান্টবাজি’ হিসেবে দেখছেন শিক্ষক ও গবেষক আসিফ বিন আলী। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এর মাধ্যমে আসলে ছাত্রনেতাদের ক্ষমতা দেখানো হলো, বার্তা দেওয়া হলো যে তাঁরা চাইলেই অনেক কিছু করতে পারেন। তিনি বলেন, মানোন্নয়নের উদ্দেশ্যে মূল্যায়ন করা হলে সেটা যথাযথ প্রক্রিয়ায় হতো। সে ধরনের উদাহরণও আছে। এ ধরনের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে পেশাগত ও তথ্যগত গোপনীয়তা রক্ষা করা হয় এবং সেই মূল্যায়ন শিক্ষকের পেশাগত উন্নয়নে ব্যবহার করা হয়।
আসিফ বিন আলীর মতে, শিক্ষকদের মূল্যায়ন অবশ্যই দরকার। তবে তা একাডেমিক প্রক্রিয়ার ভেতরে যথাযথ সম্মান রেখেই হতে পারে। শিক্ষক মূল্যায়নের গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি রয়েছে এবং তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয়কেই নিতে হবে।
দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক মূল্যায়নব্যবস্থা রয়েছে। যেমন নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে কোর্স শেষে শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষক মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক। তবে কোন শিক্ষক কত নম্বর পেলেন, তা সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানতে পারে।
নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, শিক্ষকদের মূল্যায়নের পদ্ধতি আন্তর্জাতিক অনুশীলনের অংশ এবং এটি উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন সহযোগী হিসেবে কাজ করে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার সান ডিয়েগো ক্যাম্পাসের নিউরোসায়েন্সেস বিভাগে কর্মরত গবেষক নাদিম মাহমুদ প্রথম আলোকে জানান, সেখানে শুরুতে শিক্ষক নিয়োগ করা হয় একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য। মেয়াদ শেষে তাঁর পুনর্নিয়োগের ক্ষেত্রে অন্যান্য বিবেচ্য বিষয়ের একটি শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন। তিনি বলেন, এই মূল্যায়নের আয়োজন ছাত্রসংসদ করে না। মূল্যায়নের ফল প্রকাশ্যে আসে না।
মালয়েশিয়ার ইউনিভার্সিটি অব মালয়ায় কোর্স শেষে শিক্ষার্থীদের লম্বা একটি মূল্যায়ন ফরম পূরণ করতে হয়। সেখানে শিক্ষকদের সম্পর্কে বিভিন্ন বিষয়ে মতামত দেন শিক্ষার্থীরা। বিষয়টি জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টির আইন ও উদীয়মান প্রযুক্তি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মুহাম্মদ এরশাদুল করিম প্রথম আলোকে বলেন, ‘মূল্যায়নে আমি কত পেয়েছি, তা আমার সহকর্মীও জানতে পারবেন না।’
২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর গত দুই বছরে দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া, তদন্ত কমিটি গঠন এবং অভিযুক্ত শিক্ষকদের তালিকা তৈরির ঘটনা বেড়েছে। সর্বশেষ ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরাতে ‘গোপন তৎপরতায়’ জড়িত শিক্ষকদের শনাক্ত করতে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে তদন্ত কমিটি করা হয়েছে।
বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত অভিযোগ অনুযায়ী, এমন তৎপরতায় দেশের ২২টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০৪ জন শিক্ষক যুক্ত বলে দাবি করা হচ্ছে।
দুই বছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্তত ৩২ জন শিক্ষককে একাডেমিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে বিরত রাখাসহ বিভিন্ন ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে। এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন নীল দলের ২৩১ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তুলেছে শিক্ষকদেরই একটি পক্ষ। এ ছাড়া ‘গোপন তৎপরতায় লিপ্ত’ থাকার অভিযোগে শিক্ষকদের বিষয় খতিয়ে দেখতে ১৩ আগস্ট তিন সদস্যের কমিটি করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
২০০৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত ১৫ বছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে কোনো অনিয়ম হয়েছিল কি না, তা পর্যালোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য আরেকটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এসব উদ্যোগ ও তৎপরতা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে পক্ষ–বিপক্ষ রয়েছে। তবে আলাপে শিক্ষকেরা বলছেন, শিক্ষক মূল্যায়নে ডাকসুর ওয়েবসাইট নিয়ে আপত্তি প্রায় সব শিক্ষকেরই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা শিক্ষক মূল্যায়নের পক্ষে; কিন্তু সেই কাজ ডাকসু করবে না। এটা ডাকসুর এখতিয়ারে নেই।’ তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের শৃঙ্খলা রক্ষায়, শিক্ষকের মর্যাদা রক্ষায় আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীরা যেন তাদের মতামত সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে পারে-সেই ব্যবস্থাও আমরা করছি। ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের মূল্যায়ন করতে পারবেন।’
অধ্যাপক আলমোজাদ্দেদী বলেন, ‘ডাকসুর কাজটি শিক্ষকদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। অনেক শিক্ষক আমাদের অভিযোগ জানাচ্ছেন; মৌখিকভাবে জানাচ্ছেন, ফোনে জানাচ্ছেন, আমাদের সঙ্গে দেখা করতে এসে জানাচ্ছেন। শিক্ষকদের সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করার একটা বিশাল সুযোগ এখানে তৈরি করে দেওয়া হয়েছে।’
শরীয়তপুরের কাজীরহাট এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মাস্টার মোস্তফা কাজীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, প্রভাব খাটানো ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হন মোস্তফা কাজী। এরপর থেকে এলাকায় বিভিন্ন জমি দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৬ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে কাজীরহাট বাজারের দোকানপ্রতি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা কাজী। এছাড়া কয়েক মাস আগে কাজীরহাটে একটি দোকান ক্রয়ের সময় ব্যবসায়ী সুমন তপাদারের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী আরও জানান, বি. কে. নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলামের কাছ থেকেও ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন মানুষকে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় ফেলে হয়রানি করার অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন মোস্তফা কাজী। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির ব্যানারে তার কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন অনেকে। এছাড়া বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি নিজ ভগ্নিপতি সিদ্দিক দেওয়ানের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোস্তফা কাজীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সচেতন মহল বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
ইউরোপের রাজধানী ব্রাসেলসে আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা জোরালো করা। এই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত আছেন। গত বছরের শুরু থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের কারণে সারা ইউরোপ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ইউরোপীয় নেতারা এখন যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরিতে কাজ করছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, “আমরা যুদ্ধের মানবিক সংকট বুঝতে পারি এবং এখন আমাদের দায়িত্ব এটি দ্রুত শেষ করার পথ খোঁজা। আমাদের প্রত্যেকের জন্যই শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।” এই বৈঠকে অস্ত্রবিরতি চুক্তি, যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলো যুদ্ধ সমাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এগুলো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ক্রমবর্ধমান পরীক্ষার চাপ এবং পরিবারের পাশাপাশি সমাজের অযৌক্তিক প্রত্যাশা। এ দুটি কারণ মিলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বেড়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা। ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করা যেন শিক্ষার্থীর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ—সব জায়গা থেকেই উচ্চ ফলাফলের প্রত্যাশা তৈরি করছে মানসিক চাপের একটি অব্যক্ত বলয়। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইহান কবির বলেন, “পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে মনে হয়, শুধু আমি না, আমার পুরো পরিবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এটা সহ্য করা খুব কঠিন।” শুধু রাইহান নয়, দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা একই অভিজ্ঞতার কথা বলছে। সামাজিক চাপ ও তুলনার সংস্কৃতি পরিস্থিতি করছে আরও জটিল পরীক্ষার নম্বর নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এখন তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া গর্ব বা অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কোন কলেজে ভর্তি হলো, কে কতো পেল—এসব তুলনার চাপে পড়াশোনার আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা তাবাসসুম বলেন, “প্রত্যাশা থাকা ভালো, কিন্তু তা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায় এবং একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব সক্ষমতা উপেক্ষা করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়। এ থেকেই জন্ম নেয় আত্মগ্লানি, হতাশা এবং মাঝে মাঝে আত্মহননের চিন্তা।” জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ নিয়মিত মানসিক চাপে থাকে। এর মধ্যে ১২ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগে এবং বড় একটি অংশ কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই দিন পার করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে ক্ষতিকর। সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, এবং পরিবারের ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ এই সমস্যার নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম হয়, সেখানে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাকে কেবল ফলাফলের সীমায় না এনে একটি মানবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা চাপ নয়, ভালোবাসা থেকে শিখবে, এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ প্রজন্ম।
বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কৃষিখাতকে চরমভাবে আঘাত করছে। অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘদিন খরা এবং হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ফসল উৎপাদনে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে। চলতি মৌসুমেই অনেক জেলায় ধান, গম, ভুট্টা এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, একদিকে যেমন আবহাওয়ার আচরণ বুঝে ওঠা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সারের দাম, কীটনাশক ও বীজের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পোকার আক্রমণ ও রোগবালাইয়ের হারও বেড়ে গেছে। এই চাপে পড়ে অনেক কৃষকই ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা। তাদের পক্ষে বারবার ক্ষতির ধাক্কা সামলে উঠে আবার নতুনভাবে চাষাবাদ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো অঞ্চলে দেখা গেছে, কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী ফসল বাদ দিয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ ও লাভজনক অন্য চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমানেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। একইসঙ্গে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে এমন জাত ও পদ্ধতি উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে যা কঠিন জলবায়ু পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কৃষি খাতকে সচল রাখা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে এখনই পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
কলম্বোর সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাব ময়দানে চলমান দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে ব্যাট হাতে আবারও ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের। টস জিতে ব্যাট করতে নেমে প্রথম ইনিংসে টাইগাররা সংগ্রহ করে মাত্র ২২০ রান, যেখানে ব্যতিক্রম ছিলেন কেবল শোয়াড ইসলাম (৪৬), মুশফিকুর রহিম (৩৫) ও লিটন দাস (৩৪)। শ্রীলঙ্কার বোলাররা শুরু থেকেই চাপ সৃষ্টি করে রাখে। ডেবিউ করা স্পিনার সোনাল দিনুষা ৩ উইকেট নিয়ে আলো ছড়ান, আর আসিথা ফার্নান্দো ও বিষ্ণু ফার্নান্দো নেন ২টি করে উইকেট। প্রথম ইনিংসের জবাবে দ্বিতীয় দিন সকালে শ্রীলঙ্কা উদ্বোধনী জুটি থেকে ভালো সূচনা পায়। ১৩.১ ওভারে কোন উইকেট না হারিয়ে সংগ্রহ করেছে ৬২ রান। ওপেনার পাথুম নিসান্কা ৩৩ এবং লাহিরু উদারা ২৮ রানে অপরাজিত রয়েছেন। বাংলাদেশের হয়ে তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ বোলিং শুরু করলেও এখনও পর্যন্ত সাফল্যের দেখা মেলেনি। শ্রীলঙ্কা এখনো বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস থেকে ১৫৮ রানে পিছিয়ে আছে, হাতে রয়েছে সকল উইকেট। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে প্রভাব এই টেস্টটি ২০২৩-২৫ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ হওয়ায় দুই দলের জন্যই পয়েন্টের লড়াই গুরুত্বপূর্ণ। সিরিজের প্রথম টেস্টে পরাজিত হওয়ায় বাংলাদেশ সিরিজে টিকে থাকতে হলে এই ম্যাচ জিততেই হবে। পরবর্তী চ্যালেঞ্জ স্লো পিচে বাংলাদেশ বোলারদের আরও পরিকল্পিত বোলিং করতে হবে। দ্রুত উইকেট তুলে না নিতে পারলে শ্রীলঙ্কা বড় লিড নিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে দেবে টাইগারদের। ফিল্ডিংয়ে মনোযোগ এবং টাইট বোলিংয়ের মাধ্যমেই দ্বিতীয় ইনিংসে নিজেদের ফিরে পাওয়ার আশায় বাংলাদেশ। সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড (দিন ২, প্রথম সেশন পর্যন্ত): বাংলাদেশ (১ম ইনিংস): ২২০/১০ শ্রীলঙ্কা (১ম ইনিংস): ৬২/০ (১৩.১ ওভার) নিসান্কা: ৩৩*, উদারা: ২৮* বাংলাদেশ বোলার: তাইজুল, মিরাজ – উইকেটহীন
ব্যবসায়িক ঋণ ও পাওনা পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণার আবেদন করেছিলেন অটোমেটিক রাইস মিল ব্যবসায়ী মো. ওসমান গনি। সেই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে দেউলিয়া ঘোষণা করেছেন আদালত। বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়ীদের কাছে তার প্রায় ২৫২ কোটি ২৪ লাখ টাকা দায় রয়েছে বলে আদালত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) ঢাকার দেউলিয়া বিষয়ক আদালতের বিচারক মো. শহীদুল ইসলাম এ রায় দেন। মামলায় ৭২ জন বিবাদীর পক্ষে আইনজীবী মো. রুহুল আমিন জাগো নিউজকে রায় ঘোষণার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, ওসমান গনি বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ক্ষুদ্র চাল ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ঋণ ও ব্যক্তিগত বিনিয়োগের জন্য অর্থ নিয়েছিলেন। পরে ব্যবসায়িক লোকসানের কারণে সেই অর্থ পরিশোধ করতে না পেরে আদালতে নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণার আবেদন করেন। তবে, আইনজীবী রুহুল আমিনের অভিযোগ, আদালত কোনো তদন্ত না করেই দেউলিয়া ঘোষণার রায় দিয়েছেন। কোনো তদন্ত সংস্থাকেও বিষয়টি তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। তার ভাষ্য, এ রায়ের কারণে বিবাদী ও পাওনাদাররা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। রায় হয়ে যাওয়ায় পাওনাদারদের অর্থ ফেরত পাওয়ার সুযোগও সীমিত হয়ে গেছে বলে দাবি করেন তিনি। রুহুল আমিন বলেন, যেহেতু আদালত তাকে দেউলিয়া ঘোষণা করেছেন, তাই পাওনাদারদের এখন আর কিছু করার নেই। কিছু ব্যবসায়ী আইনের এই সুযোগ নিচ্ছেন। আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করা হবে বলেও জানান তিনি। আদালত সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৩০ জানুয়ারি দেউলিয়া বিষয়ক আইনের ১০ ধারায় ঢাকার দেউলিয়া বিষয়ক আদালতে মামলাটি করেন ওসমান গনি। মামলায় মোট ২৬৭ জনকে বিবাদী করা হয়। বিচার চলাকালে তিনজনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। মামলার আরজিতে ওসমান গনি বলেন, পাওনাদারদের সঙ্গে আর্থিক দাবি-দাওয়া মেটানোর জন্য সমঝোতা কিংবা অন্য কোনো কার্যকর সমাধানের পথ খুঁজেও তিনি সফল হননি। এ অবস্থায় বাধ্য হয়ে নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণার আবেদন করেন। মামলার প্রথম থেকে সপ্তম বিবাদী বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে তিনি ঋণ বা বিনিয়োগ সুবিধা নিয়েছেন বলে মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে, ৮ থেকে ২৬৭ নম্বর বিবাদীর মধ্যে রয়েছেন বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রোপ্রাইটরশিপ প্রতিষ্ঠানের মালিক। তাদের সঙ্গে ওসমান গনির দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক লেনদেন ছিল বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। মামলার নথি অনুযায়ী, বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ ও বিনিয়োগ সুবিধা নিয়ে ওসমান গনি শুরুতে তিনটি অটোমেটিক রাইস মিল পরিচালনা করেন। ব্যবসার শুরুর দিকে নিয়মিত ঋণের কিস্তি ও অন্যান্য পাওনা পরিশোধ করতেন বলেও আরজিতে উল্লেখ করেছেন তিনি। তবে, পরে ওই এলাকায় একাধিক নতুন অটোমেটিক রাইস মিল গড়ে ওঠে। এতে প্রতিযোগিতা বাড়ার পাশাপাশি চালকলের ব্যবসায় মন্দা দেখা দেয় বলে মামলায় দাবি করা হয়েছে। ওসমান গনির দাবি, একপর্যায়ে চাল উৎপাদনে যে ব্যয় হচ্ছিল, তা চাল বিক্রি করে পাওয়া অর্থের চেয়ে বেশি হয়ে যায়। এতে অটোমেটিক রাইস মিল শিল্পে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয় এবং চালকল মালিকরা লোকসানের মুখে পড়েন। এই পরিস্থিতিতে ব্যবসায়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে তিনি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীদের পাওনা পরিশোধ করতে পারেননি বলে মামলার আরজিতে উল্লেখ করা হয়েছে। ওসমান গনির কাছে পাওনা টাকা পরিশোধের দাবিতে ২০২৪ সালে নওগাঁয় মানববন্ধনও করেছিলেন কয়েকজন পাওনাদার। সেখানে তারা তাদের পাওনা অর্থ ফেরত দেওয়ার দাবি জানান। এমডিএএ/এএমএ
গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে রাম বিগ্রহ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়ে আলোচনায় আসা হরিদাস চন্দ্র তরণীকে রাজধানীর উত্তরা পশ্চিম থানায় করা ফ্ল্যাট প্রতারণার মামলায় রিমান্ড শেষে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) দুই দিনের রিমান্ড শেষে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উত্তরা পশ্চিম থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মাসুদ রানা তাকে ঢাকার আদালতে হাজির করেন। একইসঙ্গে তদন্তের স্বার্থে তাকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন জানান তিনি। শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সারাহ্ ফারজানা হক হরিদাসকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। আদালতের সংশ্লিষ্ট প্রসিকিউশন বিভাগের উপ-পরিদর্শক (এসআই) এম আই হেলাল উদ্দিন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এর আগে, গত ১০ সেপ্টেম্বর আদালত হরিদাস চন্দ্র তরণীর দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। ফ্ল্যাট দেওয়ার কথা বলে টাকা নেওয়া এবং পরে ফ্ল্যাট বুঝিয়ে না দেওয়ার অভিযোগে গত ২৪ আগস্ট উত্তরা পশ্চিম থানায় মামলা করেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান। মামলায় হরিদাস চন্দ্র তরণী ও ওবাইদুল ইসলামকে আসামি করা হয়েছে। এজাহারে মাহবুবুর রহমান উল্লেখ করেন, ওবাইদুল ইসলাম তার কলেজজীবনের বন্ধু। তারা দুজনই রাজধানীর উত্তরা ১২ নম্বর এলাকায় বসবাস করেন। ওবাইদুল নিজেকে অনয় ডেভেলপার কোম্পানির মালিক হিসেবে পরিচয় দিতেন এবং খিলক্ষেতের নিকুঞ্জ এলাকায় তার প্রতিষ্ঠানের অফিস রয়েছে বলে মাহবুবকে জানান। মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, এ পরিচয়ের সূত্র ধরে নিকুঞ্জ এলাকায় একটি ফ্ল্যাট কেনার বিষয়ে ওবাইদুলের সঙ্গে মাহবুবের কথা হয়। এক পর্যায়ে তিনি প্রথম দফায় ১০ লাখ ৮৫ হাজার টাকা দেন। পরে ফ্ল্যাটের নির্মাণকাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে জানিয়ে আরও ১৫ লাখ টাকা চাওয়া হলে মাহবুব সেই টাকাও পরিশোধ করেন। কিন্তু, টাকা নেওয়ার পর ফ্ল্যাট বুঝিয়ে না দিয়ে ওবাইদুল নানা অজুহাতে সময়ক্ষেপণ করতে থাকেন বলে অভিযোগ করেন মাহবুব। পরে টাকা ফেরত চাইলেও তা দেওয়া হয়নি বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়, বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে মাহবুব নিকুঞ্জে ওবাইদুলের অফিসে গেলে তাকে জানানো হয়, তার ব্যবসায়িক অংশীদার হরিদাস চন্দ্র তরণী সেখানে আসবেন। পরে হরিদাস ওই অফিসে এসে মাহবুবকে জানান, তার কাছে নগদ টাকা নেই; তবে একটি ফ্ল্যাট রয়েছে এবং তিনি সেটি মাহবুবকে দিতে পারবেন। মামলার এজাহার অনুযায়ী, হরিদাসের ওই আশ্বাসে বিশ্বাস করে মাহবুব আরও ৪৫ লাখ টাকা দেন। সব মিলিয়ে ওবাইদুল ও হরিদাস মিলে তার কাছ থেকে ৭৫ লাখ ৮৬ হাজার টাকা নিয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। তবে এরপরও তাকে ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি বলে মামলায় দাবি করেন মাহবুব। এর আগে, ৯ কোটি ৩৫ লাখ টাকা অর্থপাচারের অভিযোগে গত ১২ জুলাই উত্তরা পশ্চিম থানায় হরিদাস চন্দ্র তরণীর বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা করে সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিট। মামলাটি করেন ইউনিটটির এসআই সাইফুল ইসলাম। মামলার পরদিন হরিদাসকে আদালতে হাজির করা হলে ওই মামলায় তার চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন বিচারক। রিমান্ড শেষে ১৬ জুলাই তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। এর আগে, ১২ জুলাই রাতেই গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার হোসেনপুর ইউনিয়নের মধ্য রামচন্দ্রপুর গ্রামের রাধাগোবিন্দ ও কালীমন্দির এলাকা থেকে গোয়েন্দা পুলিশ হরিদাস চন্দ্র তরণীকে গ্রেফতার করে। এমডিএএ/এএমএ
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ডের পর চারজনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেলেও তাঁদের কেউ পদদলিত হয়ে মারা গেছেন—এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে প্রশাসন। তাঁদের মধ্যে দুজন স্বাভাবিকভাবে মারা গেছেন বলে পরিবার নিশ্চিত করেছে। অপর দুজনের মৃত্যুর কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন ময়মনসিংহ বিভাগীয় কমিশনার এস এম হুমায়ুন কবির।সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় হাসপাতালের নতুন ভবনের অষ্টম তলায় আগুন লাগার পর রোগী ও স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় অনেকে হুড়োহুড়ি করে সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে আহত হন। এরপর পদদলিত হয়ে ছয়জনের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ে।হাসপাতাল পরিদর্শন করে রাত সাড়ে ১২টার দিকে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন বিভাগীয় কমিশনার এস এম হুমায়ুন কবির ও ময়মনসিংহ–৪ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য আবু ওয়াহাব আকন্দ ওয়াহিদ।বিভাগীয় কমিশনার বলেন, ‘পদদলিত হয়ে ছয়জন মারা গেছেন—এমন কোনো তথ্য-প্রমাণ আমরা এখন পর্যন্ত পাইনি। আমরা ফায়ার সার্ভিস, জরুরি বিভাগের চিকিৎসক, নার্স ও অন্য কর্মীদের সঙ্গে কথা বলেছি। তাঁদের রেজিস্টারও যাচাই করেছি। পদদলিত হয়ে মৃত্যুর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।’পাঁচজনের মৃত্যুর একটি তালিকার বিষয়ে বিভাগীয় কমিশনার এস এম হুমায়ুন কবির বলেন, এর মধ্যে একজন এখনো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। বাকি চারজনের মধ্যে দুজন স্বাভাবিকভাবে মারা গেছেন বলে তাঁদের পরিবারের সদস্যরা নিশ্চিত করেছেন। অপর দুজনের মৃত্যুর কারণ চিকিৎসকেরা এখনো স্পষ্টভাবে জানাতে পারেননি। এ বিষয়ে তদন্তের পর বিস্তারিত জানা যাবে।কমিশনার আরও বলেন, ‘এ ঘটনায় কোনো মৃত্যু হয়েছে—এমন তথ্য-প্রমাণ আমরা এখন পর্যন্ত পাইনি। হাসপাতালে স্বাভাবিকভাবে রোগী মারা যেতে পারেন। তবে পদদলিত হয়ে মৃত্যুর তথ্যটি অসত্য।’ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ময়মনসিংহ রেঞ্জের ডিআইজি মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান। সোমবার রাত ১১টার দিকেতবে আগুনের পর হুড়োহুড়িতে কয়েকজন আহত হওয়ার কথা জানান বিভাগীয় কমিশনার। তাঁদের কারও হাত-পা কেটে যাওয়া বা মাথায় আঘাত লাগার মতো ঘটনা ঘটতে পারে বলে জানান তিনি। ধোঁয়ায় কারও মৃত্যু হয়েছে কি না, সে বিষয়েও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কিছু বলা হয়নি।হাসপাতালের দুটি সিঁড়ির একটি বন্ধ থাকার কারণে রোগী ও স্বজনেরা একটি সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে হুড়োহুড়ির মধ্যে পড়েন—এমন অভিযোগের বিষয়ে কমিশনার বলেন, বিষয়টি তাঁরা জেনেছেন। নিরাপত্তার কারণে হাসপাতালের কিছু সিঁড়ি বন্ধ রাখা হয়েছিল বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। হাসপাতালের কোনো অনিয়ম থাকলে তা খতিয়ে দেখা হবে।এর আগে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় সংসদ সদস্য ও হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সহসভাপতি আবু ওয়াহাব আকন্দ বলেন, মৃত ব্যক্তিদের তালিকায় এমন একজনের নাম রয়েছে, যিনি এখনো জীবিত এবং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তিনি সাংবাদিকদের ওই রোগীকে দেখে তালিকার সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানান।সংসদ সদস্য বলেন, ‘জাহানারা নামে যে রোগীর নাম মৃতের তালিকায় দেওয়া হয়েছে, তিনি জীবিত। তিনি এখনো চিকিৎসা নিচ্ছেন। তালিকার সঙ্গে বাস্তবতা মিলিয়ে দেখলেই বিষয়টি পরিষ্কার হবে।’এদিকে হাসপাতালে আগুন লাগার পর আতঙ্কে রোগী ও স্বজনদের মধ্যে দৌড়াদৌড়ির সময় সিঁড়িতে পড়ে দুজনের মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করেছেন দুজনের স্বজন। তাঁরা হলেন তারাকান্দার বালিখা গ্রামের শহিদুল ইসলামের স্ত্রী কুলসুম আক্তার (৩৫) এবং ফুলপুরের রাঙামাটিয়া ইউনিয়নের বিষ্ণুরামপুর গ্রামের শাহাজাহান মনির (৪৫)।সোমবার দিবাগত রাত ১২টার দিকে তারাকান্দার কুলসুম আক্তারের ননদ নাজমা আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, কুলসুম ১২ দিন ধরে তাঁর জন্ডিসে আক্রান্ত ১২ বছর বয়সী ছেলে স্বাধীনকে নিয়ে হাসপাতালের ৩১ নম্বর শিশু ওয়ার্ডে ছিলেন। কুলসুমের সঙ্গে তাঁর ১৮ বছর বয়সী মেয়ে মিমও ছিলেন।ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন বিভাগীয় কমিশনার এস এম হুমায়ুন কবির সরকার। সোমবার রাত পৌনে ১১টার দিকে ঘটনার বর্ণনা দিয়ে নাজমা বলেন, আগুন লাগার পর হাসপাতালের ভেতরে লোকজন ছোটাছুটি শুরু করলে কুলসুম তাঁর ছেলে ও মেয়েকে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামার চেষ্টা করেন। মিম আগে বের হয়ে যান। পরে তিনি ফিরে এসে দেখেন, লোকজন তাঁর ভাই স্বাধীনকে টেনে বের করছেন; কিন্তু মাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।নাজমার ভাষ্য, পরে কুলসুমকে উদ্ধার করে অক্সিজেন দেওয়া হয়। তখনো তাঁর শ্বাস ছিল। খবর পেয়ে নাজমা হাসপাতালে আসার পথে ছিলেন। এর মধ্যেই কুলসুমের মৃত্যু হয়। তিনি বলেন, ‘আমাদের অভিযোগ আছে।’ হাসপাতাল থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে তাঁরা মরদেহ বাড়িতে নিয়ে গেছেন বলেও জানান তিনি।অন্যদিকে শাহাজাহান মনির প্রায় ১০ থেকে ১২ দিন ধরে হাসপাতালের নতুন ভবনের তৃতীয় তলায় যক্ষ্মা রোগের চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। তাঁর ছেলে পলাশ মোল্লা প্রথম আলোকে বলেন, আগুন লাগার সময় তাঁর বাবা, মা হারিসা আক্তার ও খালা জাহানারা আক্তার একসঙ্গে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছিলেন। এ সময় পেছন থেকে লোকজনের ধাক্কায় তাঁরা পড়ে যান। পরে তাঁর মা ও খালাকে আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হয়। দুজনই বর্তমানে হাসপাতালের ১০ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন।ময়মনসিংহ মেডিকেলে অগ্নিকাণ্ডে মৃত্যুর যে তথ্য প্রচার হচ্ছে, তা যাচাই করছি: বিভাগীয় কমিশনারপলাশ বলেন, তিনি তখন হাসপাতালে ছিলেন না। পরে এসে মায়ের কাছে যান। তাঁর বাবার মরদেহ স্বজনেরা বাড়িতে নিয়ে গেছেন। মুঠোফোনে বাবার মরদেহের ছবি দেখেছেন তিনি।ময়মনসিংহ ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক পূর্ণ চন্দ্র মুৎসুদ্দী বলেন, সন্ধ্যা ৫টা ৫৫ মিনিটে আগুন লাগার খবর পান। ১০ মিনিটের মধ্যে ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নেভানোর কাজ শুরু করেন। ১০টি ইউনিট একসঙ্গে ঘটনাস্থলে আসে। সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে আগুন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আসে।পূর্ণ চন্দ্র মুৎসুদ্দী জানান, হাসপাতালের নতুন আটতলা ভবনের একটি লিফটের কন্ট্রোল রুমের কন্ট্রোলার মেশিনের সঙ্গে থাকা বোর্ডে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে অতিরিক্ত উত্তাপের কারণে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে আগুনের প্রকৃত কারণ তদন্তের পর নিশ্চিত হওয়া যাবে।ময়মনসিংহ মেডিকেলে অগ্নিকাণ্ডে মৃত্যুর যে তথ্য প্রচার হচ্ছে, তা যাচাই করছি: বিভাগীয় কমিশনার