শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের আবির্ভাব রবীন্দ্র-প্রতাপের এমন এক সময়ে, যখন বাংলা সাহিত্যের আকাশে রবীন্দ্রনাথের দীপ্তি প্রায় সর্বগ্রাসী। সাহিত্যরুচি, ভাষা, কাব্যবোধ, মনন ও নন্দনতত্ত্ব—সবখানেই রবীন্দ্র-প্রভাবের প্রবল বিস্তার। সেই সময়েই শরৎচন্দ্র এলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক স্বর নিয়ে। তিনি রবীন্দ্রনাথকে অনুসরণ করলেন না, বঙ্কিমচন্দ্রের ঘটনাবহুল আখ্যানের পুনরাবৃত্তিও করলেন না; বরং প্রবেশ করলেন মানুষের একান্ত অন্তঃপুরে—যেখানে প্রেম আছে, অভিমান আছে, দারিদ্র্য আছে, লজ্জা আছে, সামাজিক নিষেধ আছে, পরাজয় আছে, অথচ সবকিছুর গভীরে আছে এক অবিনাশী মানবহৃদয়।
এ কারণেই বাঙালি পাঠক শরৎচন্দ্রকে কেবল একজন ঔপন্যাসিক হিসেবে গ্রহণ করেননি; তাঁকে আপনজনের মতো করে হৃদয়ে ধারণ করেছেন। বাংলা কথাসাহিত্যে এমন পাঠক সম্পৃক্ততা বিরল। তাঁর চরিত্রেরা আমাদের চারপাশের মানুষ—আমাদের ঘরের মানুষ, পাশের বাড়ির মানুষ, গ্রামের মানুষ, শহরের মধ্যবিত্ত মানুষ, সমাজের প্রান্তে পড়ে থাকা মানুষ। তাদের কান্না আমাদের কান্নার মতো, তাদের ব্যর্থতা আমাদের ব্যর্থতার মতো, তাদের প্রেম আমাদের দীর্ঘশ্বাসের মতো। ফলে শরৎচন্দ্রের সাহিত্য পড়া মানে কেবল একটি গল্প পড়া নয়; বরং নিজেরই কোনো বিস্মৃত অনুভূতির মুখোমুখি দাঁড়ানো।
হুমায়ুন আজাদ যথার্থই বলেছিলেন, শরৎচন্দ্র বাঙালির ‘ভাবাবেগের জায়গাটি’ খুলে দিয়েছিলেন। তবে এই ভাবাবেগকে আরও নির্দিষ্ট করে ‘হৃদয়াবেগ’ বলতে চাই। শরৎচন্দ্রের মানুষেরা কেবল আবেগপ্রবণ নয়; তারা হৃদয় দিয়ে পৃথিবীকে বিচার করে। যুক্তি, সামাজিক বিধান, জাতপাত, অর্থনৈতিক স্বার্থ—এসবের ঊর্ধ্বে কখনো কখনো তাদের হৃদয় একটি স্বতন্ত্র নৈতিক বিধান তৈরি করে। সেই বিধানই শরৎসাহিত্যের গভীরতম শক্তি।
শরৎচন্দ্রের ‘বিলাসী’ গল্পের দিকে তাকালেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জাতপাত, বর্ণভেদ ও সামাজিক শ্রেণিবিভাজনে জর্জরিত এক সমাজে সাপুড়ের মেয়ে বিলাসীর অকৃত্রিম ভালোবাসা মৃত্যুঞ্জয়ের জীবনকে আমূল পরিবর্তিত করে। মৃত্যুঞ্জয় শুধু সামাজিক বিধিনিষেধ অতিক্রম করে বিলাসীকে গ্রহণই করে না; তার জীবনযাপন, পরিচয় ও মূল্যবোধেও ঘটে এক গভীর রূপান্তর। এখানে প্রেম কোনো অলংকার নয়, কোনো রোমান্টিক আয়োজনও নয়; প্রেম হয়ে ওঠে সামাজিক প্রথার বিরুদ্ধে এক নীরব অথচ প্রবল মানবিক বিদ্রোহ।
‘মেজদিদি’তে কেষ্টার প্রতি হেমাঙ্গিনীর মমতা একই মানবিক বোধের অন্য রূপ। রক্তের সম্পর্ক যেখানে ব্যর্থ, সেখানে হৃদয়ের সম্পর্ক আশ্রয় দেয়। সমাজের বিধান মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে, কিন্তু মানবিকতা তাকে আবার মানুষের কাছে ফিরিয়ে আনে। শরৎচন্দ্র যেন বারবার দেখাতে চান—মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার জাতিতে নয়, বর্ণে নয়, সম্পদে নয়; তার প্রকৃত পরিচয় হৃদয়ের সক্ষমতায়।
এই মানবিকতার সবচেয়ে মর্মস্পর্শী প্রকাশ ‘মহেশ’-এ। গফুরের নিজের ঘরে অন্ন নেই, নিজের সন্তানের মুখে খাবার নেই; তবু মহেশ তার কাছে নিছক একটি গবাদিপশু নয়। মহেশ হয়ে ওঠে তার সংসারের এক সদস্য, তার দারিদ্র্যের সঙ্গী, তার নিঃসঙ্গতার আশ্রয়। নিজের খাবার থেকে ভাগ দিয়ে, ভাঙা ঘরের ছন ছিঁড়ে খেতে দিয়ে অভাবের মধ্যেও প্রাণীটির প্রতি যে মমতা গফুর দেখায়—তা নিছক পশুপ্রেমের সীমায় আবদ্ধ থাকে না। মহেশ ক্রমে ব্যক্তিসত্তার মর্যাদা পেয়ে যায়।
১০ টাকায় মহেশকে বিক্রি করার পর তাকে যখন রশি ধরে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন গফুরের আকস্মিক উন্মত্ততা পাঠককে শুধু আবেগাপ্লুত করে না; মানুষের অসহায় ভালোবাসার এক নির্মম সত্যের সামনে দাঁড় করায়। যে মানুষটি নিজেই ক্ষুধার্ত, সেই মানুষটির হৃদয়ে অন্য একটি প্রাণীর জন্য এত গভীর মমতা কীভাবে জন্ম নেয়—এই প্রশ্নের মধ্যেই শরৎচন্দ্রের মানবতাবাদ নিহিত।
আধুনিক বস্তুবাদী সভ্যতা মানুষকে ক্রমশ হিসাবি করে তুলছে। সম্পর্কের মধ্যেও লাভ-ক্ষতির অঙ্ক প্রবেশ করেছে। ভালোবাসা কখনো কখনো সুবিধার সমীকরণে পরিণত হচ্ছে। মানুষ তার প্রয়োজনের বাইরে তাকাতে ভুলে যাচ্ছে। অথচ শরৎচন্দ্রের সাহিত্য আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—মানুষ যতই যান্ত্রিক হোক, তার অন্তর্গত হৃদয় সম্পূর্ণ যন্ত্রে পরিণত হয় না। কোথাও না কোথাও মমতার একটি ক্ষীণ প্রদীপ জ্বলে থাকে। সেই প্রদীপই মানুষকে মানুষ করে রাখে।
শরৎচন্দ্রের চরিত্র সৃষ্টির আরেকটি অনন্য দিক তাঁর নারী চরিত্র। বাংলা সাহিত্যে নারীর জীবনকে এত গভীর সহানুভূতি, মমতা ও অন্তর্দৃষ্টির সঙ্গে উপস্থাপনকারী লেখক খুব বেশি নেই। তাঁর নারীরা কেবল প্রেমের উপকরণ নয়, কেবল পুরুষের জীবনের পরিপূরকও নয়; তারা নিজস্ব যন্ত্রণা, আকাঙ্ক্ষা, আত্মমর্যাদা, সিদ্ধান্ত ও স্বপ্ন নিয়ে পূর্ণ মানুষ।
‘বড়দিদি’, ‘দেবদাস’, ‘পরিণীতা’, ‘বিরাজ বৌ’, ‘শুভদা’, ‘দত্তা’, ‘চরিত্রহীন’, ‘গৃহদাহ’, ‘শেষপ্রশ্ন’—প্রতিটি রচনায় নারীজীবনের ভিন্ন ভিন্ন সংকট, সম্ভাবনা ও অন্তর্গত ক্ষতকে তিনি উন্মোচন করেছেন। বিশেষ করে সমাজের তথাকথিত পতিতা বা পতিত চরিত্রগুলোর প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি বিস্ময়করভাবে মানবিক। তিনি তাদের পেশা দিয়ে বিচার করেননি; তাদের মানুষ হিসেবে দেখেছেন। ফলে পাঠকের মনে ঘৃণার পরিবর্তে মায়া জন্ম নেয়, অবজ্ঞার পরিবর্তে সহানুভূতি জাগে। একজন শিল্পীর মানবিকতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা সম্ভবত এখানেই।
শরৎচন্দ্রের এই দৃষ্টিভঙ্গিকে কেউ কেউ পাশ্চাত্য সাহিত্যিকদের প্রভাবের ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। এমিল জোলা, দস্তয়েভস্কি কিংবা ওয়াল্ট হুইটম্যানের প্রভাবের কথাও আলোচনায় এসেছে। কিন্তু শরৎচন্দ্রকে কেবল পাশ্চাত্য প্রভাবের আলোয় বিচার করলে তাঁর সৃষ্টির নিজস্ব মাটির গন্ধটি অনুধাবন করা কঠিন। তাঁর সাহিত্য মূলত বাংলার মাটি, নদী, গ্রাম, মধ্যবিত্ত সংসার, সামাজিক বিধিনিষেধ, পারিবারিক টানাপোড়েন এবং মানুষের সহজাত অনুভূতি থেকে উৎসারিত। তিনি জীবনকে দূর থেকে দেখেননি; জীবনের ভেতরে প্রবেশ করেছিলেন।
তাঁর নিজের ভাষাতেই বলা যায়—জীবনে সঞ্চিত অভিজ্ঞতারই প্রতিফলন তাঁর সাহিত্যে। এই জীবন-অভিজ্ঞতাই তাঁর সাহিত্যের প্রধান পুঁজি। ভবঘুরে জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা, মানুষের সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ এবং সমাজের বিভিন্ন স্তর পর্যবেক্ষণের ক্ষমতা তাঁকে এমন এক বাস্তবতাবোধ দিয়েছিল, যা কেবল কল্পনার আশ্রয়ে অর্জন করা সম্ভব নয়।
‘শ্রীকান্ত’ তার অনন্য প্রমাণ। শ্রীকান্ত যেন এক ব্যক্তিমানুষের আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধান, আর তার ভেতর দিয়ে শরৎচন্দ্র দেখেছেন বিস্তৃত ভারতবর্ষীয় সমাজকে। ইন্দ্রনাথ চরিত্রটি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম স্মরণীয় কিশোর চরিত্র। সাহস, দুরন্তপনা, উদারতা, অসাম্প্রদায়িকতা ও মানবিক দৃঢ়তায় সে অনন্য। রাত্রির অন্ধকারে শ্রীকান্তকে সঙ্গে নিয়ে মাছ চুরি করতে যাওয়া যেমন রোমাঞ্চকর, তেমনি মরদেহকে নৌকায় তুলে নেওয়ার ঘটনায় তার ‘মরার আবার জাত কী রে!’ উচ্চারণটি তার চরিত্রের অন্তর্গত অসাম্প্রদায়িক মানবতাকে একমুহূর্তে উন্মোচিত করে।
এই একটি বাক্যেই যেন শরৎচন্দ্রের বৃহৎ মানবতাবাদী দর্শনের প্রতিধ্বনি শোনা যায়। জীবিত মানুষের জাত নিয়ে যে সমাজ এত বিভক্ত, মৃত্যুর পরও সে মানুষকে জাতের খাঁচায় বন্দী করতে চায়। ইন্দ্রনাথ সেই বিভাজনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বলে, মৃত মানুষের আবার জাত কী? এই প্রশ্ন শুধু একটি চরিত্রের সংলাপ নয়; এটি এক গভীর সামাজিক প্রশ্ন।
‘রাজলক্ষ্মী’ ও ‘শ্রীকান্ত’-এর সম্পর্কেও শরৎচন্দ্র প্রেমকে প্রচলিত সংজ্ঞার বাইরে নিয়ে গেছেন। সেখানে প্রেম শুধু মিলনের আকাঙ্ক্ষা নয়; প্রেম স্মৃতি, দায়িত্ব, অপরাধবোধ, আত্মমর্যাদা, বিচ্ছেদ এবং প্রত্যাবর্তনের এক জটিল মনস্তত্ত্ব। শরৎচন্দ্রের প্রেম তাই নিছক রোমান্টিক নয়; তার সঙ্গে মিশে থাকে জীবনের নির্মম বাস্তবতা।
‘দেবদাস’-এর জনপ্রিয়তার রহস্যও এখানেই। দেবদাস কেবল একজন ব্যর্থ প্রেমিক নয়; সে এক সামাজিক ও মানসিক পরাজয়ের প্রতীক। পার্বতীর সঙ্গে তার সম্পর্ক সামাজিক শ্রেণিবিভাজন, পারিবারিক অহংকার ও ব্যক্তিগত দুর্বলতার কাছে পরাজিত হয়। চন্দ্রমুখীর ভালোবাসা তার সামনে মুক্তির একটি সম্ভাবনা তৈরি করলেও দেবদাস নিজের অন্তর্গত দুর্বলতার কারাগার থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না। ফলে ‘দেবদাস’ কেবল প্রেমের গল্প নয়; এটি আত্মবিনাশী দ্বিধা, সামাজিক সংকোচ এবং অপূর্ণতার এক চিরন্তন আখ্যান।
শরৎচন্দ্রের জনপ্রিয়তার আরেকটি কারণ তাঁর অসাধারণ গল্প বলার ক্ষমতা। তিনি পাঠককে গল্পের বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখেন না; গল্পের ভেতরে টেনে নেন। ‘বড়দিদি’ প্রকাশের পর পাঠকের একাংশের ধারণা হয়েছিল, এটি রবীন্দ্রনাথের লেখা। পরবর্তী সময়ে ‘শ্রীকান্ত’-এর ধারাবাহিক প্রকাশের ক্ষেত্রেও পাঠকের আগ্রহ তাঁকে একাধিক খণ্ড রচনায় উদ্বুদ্ধ করে। এই পাঠক সম্পৃক্ততাই তাঁর সাহিত্যিক জনপ্রিয়তার গভীর ভিত্তি।
তবে জনপ্রিয়তা মানেই শিল্পের সরলীকরণ নয়। শরৎচন্দ্রের সাহিত্যকে কেবল আবেগনির্ভর বা অতিরিক্ত বর্ণনাময় বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়া তাঁর শিল্পসত্তাকে খাটো করা। যে লেখক সাধারণ মানুষের দুঃখকে এমন সর্বজনীন করে তুলতে পারেন, যে লেখক প্রান্তিক মানুষের বেদনা পাঠকের ব্যক্তিগত বেদনায় রূপান্তরিত করতে পারেন, তাঁর শিল্পের ভিত নিছক আবেগের ওপর দাঁড়িয়ে নেই। সেখানে রয়েছে সূক্ষ্ম সমাজবোধ, চরিত্র পর্যবেক্ষণ এবং মানুষের মনস্তত্ত্ব সম্পর্কে গভীর অন্তর্দৃষ্টি।
একালের পাঠক নতুন তত্ত্ব, নতুন দর্শন, নতুন নন্দনতত্ত্বের সঙ্গে পরিচিত। আধুনিকতা, উত্তরাধুনিকতা, নারীবাদ, মার্ক্সবাদ, মনোবিশ্লেষণ, অস্তিত্ববাদ—সাহিত্য পাঠের নানা নতুন দরজা আমাদের সামনে খুলেছে। এসব দৃষ্টিভঙ্গি অবশ্যই প্রয়োজনীয়। কিন্তু নতুন তত্ত্বের আলো হাতে নিয়ে পুরোনো শিল্পকে অন্ধকার বলে ঘোষণা করা কখনোই প্রজ্ঞার লক্ষণ নয়। রবীন্দ্রনাথ বড় না নজরুল বড়—এই প্রশ্ন যেমন অবান্তর, তেমনি শামসুর রাহমান বড় না আল মাহমুদ বড়, বঙ্কিম বড় না শরৎ বড়—এ ধরনের তুলনামূলক শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারণও সাহিত্যের প্রকৃত মূল্যায়ন নয়।
প্রত্যেক মহৎ স্রষ্টার নিজস্ব মহাকাশ আছে। রবীন্দ্রনাথের আকাশ রবীন্দ্রনাথের, নজরুলের আগুন নজরুলের, বঙ্কিমের স্থাপত্য বঙ্কিমের, শরৎচন্দ্রের হৃদয়জগৎ শরৎচন্দ্রের। একজনের আলো দিয়ে অন্যজনের সূর্য মাপা যায় না।
শরৎচন্দ্রের বিরুদ্ধে সবচেয়ে প্রচলিত অভিযোগগুলোর একটি হলো—তিনি সমস্যা চিহ্নিত করেছেন, কিন্তু সমস্যার উত্তরণের পথ দেখাননি। এ অভিযোগের মধ্যেও কিছু সত্য থাকতে পারে, কিন্তু সাহিত্যকে কি সর্বদা সমাধানের নির্দেশিকা হতে হবে? একজন ঔপন্যাসিক সমাজের অসুখ শনাক্ত করবেন, মানুষের যন্ত্রণা দেখাবেন, সংকটের অন্তর্গত কারণ উন্মোচন করবেন—এটিও তো সাহিত্যের বড় কাজ। চিকিৎসক রোগনির্ণয় করেন; প্রত্যেক রোগীর জীবনযাপনের সম্পূর্ণ বিধান তিনি লিখে দেন না। সাহিত্যিকও তেমনি সমাজের আয়না ধরতে পারেন। সেই আয়নায় নিজের মুখ দেখে পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত পাঠকই নেবেন।
‘গৃহদাহ’-এ মহিম, অচলা ও সুরেশের সম্পর্কের মধ্য দিয়ে শরৎচন্দ্র যে নৈতিক ও সামাজিক দ্বন্দ্ব নির্মাণ করেছেন, তার পরিণতি নিয়েও বিতর্ক আছে। কিন্তু বিতর্কই তো সাহিত্যকে জীবন্ত রাখে। একইভাবে ‘চরিত্রহীন’, ‘শেষপ্রশ্ন’ কিংবা ‘পথের দাবী’—প্রতিটি রচনায় তিনি সমাজের প্রচলিত মূল্যবোধকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছেন। কোথাও তিনি অগ্রসর, কোথাও তাঁর সময়ের সীমাবদ্ধতায় আবদ্ধ; কিন্তু তাঁর প্রশ্ন করার সাহসকে অস্বীকার করা যায় না।
এখানেই শরৎচন্দ্রকে পুনরায় পাঠ করার প্রয়োজন। তাঁকে কেবল ‘জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক’ বলে ছোট করা যেমন অন্যায়, তেমনি তাঁকে তাঁর সময়ের বাইরে দাঁড় করিয়ে বিচার করাও অনুচিত। একজন শিল্পীকে বুঝতে হলে তাঁর সময়, সমাজ, মূল্যবোধ ও সীমাবদ্ধতার মধ্যেই তাঁকে দেখতে হয়। শরৎচন্দ্র তাঁর সময়ের সন্তান, কিন্তু তাঁর মানবিকতা সময়ের সীমানা অতিক্রম করেছে।
বঙ্কিমচন্দ্রের শিল্পশক্তি অসামান্য; রবীন্দ্রনাথের মনোজগৎ অনন্ত; কিন্তু শরৎচন্দ্র মানুষের চোখের জল, ঘরের অন্ধকার, অভাবের দীর্ঘশ্বাস, প্রেমের অপমান, নারীর নিঃশব্দ বেদনা, প্রান্তিক মানুষের অবহেলা এবং সাধারণ মানুষের হৃদয়ের গোপন আলোকে এমনভাবে সাহিত্যে ধারণ করেছেন যে তাঁর পাঠ কখনো সম্পূর্ণ পুরোনো হয়ে যায় না।
আজকের পৃথিবীতে মানুষ আগের চেয়ে অনেক বেশি সংযুক্ত, অথচ অনেক বেশি একা। প্রযুক্তি মানুষকে কাছে এনেছে, কিন্তু হৃদয়ের দূরত্বও বাড়িয়েছে। সম্পর্ক দ্রুত তৈরি হয়, দ্রুত ভেঙে যায়। অনুভূতি প্রকাশের ভাষা বেড়েছে, কিন্তু অনুভব করার ক্ষমতা যেন কোথাও ক্ষীণ হয়েছে। এই সময়েই শরৎচন্দ্রের কাছে ফিরে যাওয়া জরুরি।
শরৎচন্দ্র আমাদের শেখান—মানুষকে তার পরিচয়ে নয়, তার হৃদয়ে দেখতে। পতিতাকে কেবল পতিতা হিসেবে নয়, একজন মানুষ হিসেবে দেখতে; দরিদ্রকে করুণার বস্তু না করে তার মর্যাদা বুঝতে; পশুর মধ্যেও স্নেহের অধিকারী এক প্রাণকে চিনতে; নারীকে কেবল সংসারের অলংকার নয়, পূর্ণ মানবসত্তা হিসেবে গ্রহণ করতে; জাতপাতের প্রাচীরের ওপারে গিয়ে মানুষকে মানুষ হিসেবে চিনতে।
শরৎচন্দ্র তাই কেবল গল্পকার নন; তিনি বাঙালির হৃদয়ের এক নিবিড় ভাষ্যকার। তাঁর সাহিত্য আমাদের শেখায়, সভ্যতার সমস্ত বাহ্যিক চাকচিক্য, মতবাদ, দর্শন ও তর্কের শেষে মানুষকে মানুষ করে রাখে তার হৃদয়। যত দিন মানুষের চোখে জল থাকবে, যত দিন ভালোবাসা অসম্পূর্ণ থেকেও মানুষের জীবনকে আলোড়িত করবে, যত দিন সমাজের নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে কোনো একটি কোমল হৃদয় দাঁড়িয়ে যাবে, তত দিন শরৎচন্দ্র পাঠের প্রয়োজন ফুরাবে না।
মানুষই যেখানে শেষ কথা, সেখানে শরৎচন্দ্রের সাহিত্য কখনো অসাড় হতে পারে না। তাঁর কলমের কালি দিয়ে কেবল কাহিনি লেখা হয়নি; সেখানে মিশে আছে বাঙালির দীর্ঘদিনের কান্না, ভালোবাসা, অভিমান, মমতা ও মানবিকতার উষ্ণ রক্তধারা।
এ কারণেই শরৎচন্দ্রকে বারবার পড়তে হয়। নতুন তত্ত্বের চোখে নয় শুধু, নিজের হৃদয়ের চোখেও। তাঁকে পুনর্মূল্যায়ন করার অর্থ অতীতকে আঁকড়ে থাকা নয়; বরং বর্তমানের যান্ত্রিকতার মধ্যে মানুষকে আবার মানুষ হিসেবে আবিষ্কার করা।
শরৎচন্দ্রের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব সম্ভবত এখানেই। তিনি আমাদের ভুলতে দেননি যে মানুষ শেষ পর্যন্ত একটি হৃদয়বান প্রাণী। আর সেই হৃদয়ের ভাষা যত দিন পৃথিবীতে থাকবে, শরৎচন্দ্রও তত দিন বেঁচে থাকবেন পাঠকের অন্তরে।
শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, ঢাকা কলেজ
শরীয়তপুরের কাজীরহাট এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মাস্টার মোস্তফা কাজীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, প্রভাব খাটানো ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হন মোস্তফা কাজী। এরপর থেকে এলাকায় বিভিন্ন জমি দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৬ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে কাজীরহাট বাজারের দোকানপ্রতি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা কাজী। এছাড়া কয়েক মাস আগে কাজীরহাটে একটি দোকান ক্রয়ের সময় ব্যবসায়ী সুমন তপাদারের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী আরও জানান, বি. কে. নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলামের কাছ থেকেও ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন মানুষকে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় ফেলে হয়রানি করার অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন মোস্তফা কাজী। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির ব্যানারে তার কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন অনেকে। এছাড়া বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি নিজ ভগ্নিপতি সিদ্দিক দেওয়ানের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোস্তফা কাজীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সচেতন মহল বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
ইউরোপের রাজধানী ব্রাসেলসে আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা জোরালো করা। এই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত আছেন। গত বছরের শুরু থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের কারণে সারা ইউরোপ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ইউরোপীয় নেতারা এখন যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরিতে কাজ করছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, “আমরা যুদ্ধের মানবিক সংকট বুঝতে পারি এবং এখন আমাদের দায়িত্ব এটি দ্রুত শেষ করার পথ খোঁজা। আমাদের প্রত্যেকের জন্যই শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।” এই বৈঠকে অস্ত্রবিরতি চুক্তি, যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলো যুদ্ধ সমাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এগুলো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ক্রমবর্ধমান পরীক্ষার চাপ এবং পরিবারের পাশাপাশি সমাজের অযৌক্তিক প্রত্যাশা। এ দুটি কারণ মিলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বেড়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা। ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করা যেন শিক্ষার্থীর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ—সব জায়গা থেকেই উচ্চ ফলাফলের প্রত্যাশা তৈরি করছে মানসিক চাপের একটি অব্যক্ত বলয়। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইহান কবির বলেন, “পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে মনে হয়, শুধু আমি না, আমার পুরো পরিবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এটা সহ্য করা খুব কঠিন।” শুধু রাইহান নয়, দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা একই অভিজ্ঞতার কথা বলছে। সামাজিক চাপ ও তুলনার সংস্কৃতি পরিস্থিতি করছে আরও জটিল পরীক্ষার নম্বর নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এখন তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া গর্ব বা অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কোন কলেজে ভর্তি হলো, কে কতো পেল—এসব তুলনার চাপে পড়াশোনার আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা তাবাসসুম বলেন, “প্রত্যাশা থাকা ভালো, কিন্তু তা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায় এবং একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব সক্ষমতা উপেক্ষা করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়। এ থেকেই জন্ম নেয় আত্মগ্লানি, হতাশা এবং মাঝে মাঝে আত্মহননের চিন্তা।” জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ নিয়মিত মানসিক চাপে থাকে। এর মধ্যে ১২ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগে এবং বড় একটি অংশ কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই দিন পার করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে ক্ষতিকর। সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, এবং পরিবারের ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ এই সমস্যার নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম হয়, সেখানে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাকে কেবল ফলাফলের সীমায় না এনে একটি মানবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা চাপ নয়, ভালোবাসা থেকে শিখবে, এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ প্রজন্ম।
বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কৃষিখাতকে চরমভাবে আঘাত করছে। অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘদিন খরা এবং হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ফসল উৎপাদনে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে। চলতি মৌসুমেই অনেক জেলায় ধান, গম, ভুট্টা এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, একদিকে যেমন আবহাওয়ার আচরণ বুঝে ওঠা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সারের দাম, কীটনাশক ও বীজের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পোকার আক্রমণ ও রোগবালাইয়ের হারও বেড়ে গেছে। এই চাপে পড়ে অনেক কৃষকই ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা। তাদের পক্ষে বারবার ক্ষতির ধাক্কা সামলে উঠে আবার নতুনভাবে চাষাবাদ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো অঞ্চলে দেখা গেছে, কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী ফসল বাদ দিয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ ও লাভজনক অন্য চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমানেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। একইসঙ্গে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে এমন জাত ও পদ্ধতি উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে যা কঠিন জলবায়ু পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কৃষি খাতকে সচল রাখা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে এখনই পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
কলম্বোর সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাব ময়দানে চলমান দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে ব্যাট হাতে আবারও ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের। টস জিতে ব্যাট করতে নেমে প্রথম ইনিংসে টাইগাররা সংগ্রহ করে মাত্র ২২০ রান, যেখানে ব্যতিক্রম ছিলেন কেবল শোয়াড ইসলাম (৪৬), মুশফিকুর রহিম (৩৫) ও লিটন দাস (৩৪)। শ্রীলঙ্কার বোলাররা শুরু থেকেই চাপ সৃষ্টি করে রাখে। ডেবিউ করা স্পিনার সোনাল দিনুষা ৩ উইকেট নিয়ে আলো ছড়ান, আর আসিথা ফার্নান্দো ও বিষ্ণু ফার্নান্দো নেন ২টি করে উইকেট। প্রথম ইনিংসের জবাবে দ্বিতীয় দিন সকালে শ্রীলঙ্কা উদ্বোধনী জুটি থেকে ভালো সূচনা পায়। ১৩.১ ওভারে কোন উইকেট না হারিয়ে সংগ্রহ করেছে ৬২ রান। ওপেনার পাথুম নিসান্কা ৩৩ এবং লাহিরু উদারা ২৮ রানে অপরাজিত রয়েছেন। বাংলাদেশের হয়ে তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ বোলিং শুরু করলেও এখনও পর্যন্ত সাফল্যের দেখা মেলেনি। শ্রীলঙ্কা এখনো বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস থেকে ১৫৮ রানে পিছিয়ে আছে, হাতে রয়েছে সকল উইকেট। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে প্রভাব এই টেস্টটি ২০২৩-২৫ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ হওয়ায় দুই দলের জন্যই পয়েন্টের লড়াই গুরুত্বপূর্ণ। সিরিজের প্রথম টেস্টে পরাজিত হওয়ায় বাংলাদেশ সিরিজে টিকে থাকতে হলে এই ম্যাচ জিততেই হবে। পরবর্তী চ্যালেঞ্জ স্লো পিচে বাংলাদেশ বোলারদের আরও পরিকল্পিত বোলিং করতে হবে। দ্রুত উইকেট তুলে না নিতে পারলে শ্রীলঙ্কা বড় লিড নিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে দেবে টাইগারদের। ফিল্ডিংয়ে মনোযোগ এবং টাইট বোলিংয়ের মাধ্যমেই দ্বিতীয় ইনিংসে নিজেদের ফিরে পাওয়ার আশায় বাংলাদেশ। সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড (দিন ২, প্রথম সেশন পর্যন্ত): বাংলাদেশ (১ম ইনিংস): ২২০/১০ শ্রীলঙ্কা (১ম ইনিংস): ৬২/০ (১৩.১ ওভার) নিসান্কা: ৩৩*, উদারা: ২৮* বাংলাদেশ বোলার: তাইজুল, মিরাজ – উইকেটহীন
ঢাকার সাভারের বাইপাইল থেকে আশুলিয়া বাজার পর্যন্ত সড়কের বিভিন্ন অংশ খানাখন্দ ও ভাঙাচোরার কারণে বেহাল হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি ঢাকা–আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের চলমান নির্মাণকাজের কারণে কোথাও কোথাও সড়কটি সংকুচিত হয়ে পড়েছে। কোথাও কোথাও চলছে কার্পেটিং ও ড্রেনের কাজ। এ কারণে ভোগান্তিতে পড়ছেন নিয়মিত চলাচল করা মানুষ। পণ্য পরিবহন থেকে রোগী বহন—সব ক্ষেত্রেই ভোগান্তির কথা বলছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ভাঙাচোরা এ সড়কে হেলেদুলে চলায় প্রায়ই নষ্ট হচ্ছে যানবাহনের যন্ত্রাংশ, ঝাঁকুনিতে যানবাহন থেকে পড়ে যাচ্ছে কাঁচামাল, ভেঙে যাচ্ছে পণ্য। শিল্পকারখানার পণ্য পরিবহনে সময় ও খরচ দুটিই বেড়েছে। এ ছাড়া রোগীরাও সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়ে বিকল্প দীর্ঘ পথ বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। বাইপাইল–আশুলিয়া সড়কটি মূলত সাভার–আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের স্থানীয় বাসিন্দা ও শ্রমজীবী মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি এটি ঢাকার সঙ্গে আশুলিয়া এবং উত্তরাঞ্চলের যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক।এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ বলছে, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে আশুলিয়া থেকে বাইপাইল ও ইপিজেড পর্যন্ত সড়কের এক পাশের দুই লেনের কাজ শেষ হলে ভোগান্তি থাকবে না।সড়ক বেহাল দশাগত সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) দুপুরে বাইপাইল বাসস্ট্যান্ড থেকে আশুলিয়া বাজার এলাকা পর্যন্ত ঘুরে দেখা যায়, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাজের জন্য বাইপাইল মোড়ের কিছু অংশে খোঁড়াখুঁড়ি করা হয়েছে। পাশেই সড়কে জমেছে কাদা। স্থানটিতে সড়ক সংকীর্ণ হওয়ায় কিছুক্ষণ পরপরই যানজট তৈরি হচ্ছে। বাইপাইল মোড় থেকে বগাবাড়ী এলাকা পর্যন্ত রাস্তাটি ইটের সলিং করা। এই অংশের জায়গায় জায়গায় ইট উঠে খানাখন্দের সৃষ্টি হয়েছে। ইউনিক বাসস্ট্যান্ডের ফয়সাল মার্কেট থেকে শিমুলতলা এলাকা পর্যন্ত দুই পাশের নতুন সড়কের কাজ করা হয়েছে। সরকার মার্কেট থেকে নরসিংহপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় কার্পেটিংয়ের কাজ চলছে। নরসিংহপুর এলাকায় নির্মাণকাজের কারণে সড়ক সংকুচিত হয়েছে।এ ছাড়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের পিলার ঘেঁষে সড়কে উঁচু করে ফেলে রাখা বালুর স্তূপের ওপর দিয়ে চলছে যানবাহন। ড্রেনের কাজ চলমান থাকায় সড়কের নিশ্চিন্তপুর অংশটিও সংকুচিত হয়ে গেছে। নিশ্চিন্তপুরে আল মুসলিম অ্যাপারেলস লিমিটেড থেকে ঘোষবাগের বোরাক পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট পর্যন্ত আশুলিয়ামুখী লেনের কাজ করা হয়েছে। বোরাক পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে জিরাব বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত সড়কের বিভিন্ন অংশে উঁচু–নিচু ও ছোট ছোট গর্ত তৈরি হয়েছে। আবার কিছু অংশে কার্পেটিংয়ের কাজ চলছে।নষ্ট হচ্ছে যানবাহন, পণ্য পরিবহনে ভোগান্তিবাইপাইল থেকে আশুলিয়া বাজার এলাকা পর্যন্ত সড়কের বিভিন্ন অংশে খানাখন্দের কারণে যানবাহনগুলো হেলেদুলে চলে। খানাখন্দের কারণে গাড়ির বিভিন্ন যন্ত্রাংশের ক্ষতি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন চালকেরা।সড়কে নিয়মিত চলাচলকারী আলিফ পরিবহনের চালক মো. কামরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘রাস্তা ভাঙাচোরার কারণে মালিকেরা ড্যামারেজ দিয়া গাড়ি চালাইতেছে। রাস্তার কারণে গাড়ির বিভিন্ন যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়। পাতি ভাঙার খরচটা একটু বেশি। ব্রেক নষ্ট হয় প্রায়ই। চাকার ভেতরে ইটের টুকরা ঢুইকা চাকা বাস্ট হয় (ফেটে যায়)।’এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের পিলার ঘেঁষে সড়কে ফেলে রাখা বালুর স্তুপের ওপর দিয়ে চলছে যানবাহন। গত সোমবার দুপুরে নরসিংহপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায়কাভার্ড ভ্যানে করে গাজীপুর থেকে সিরামিকের পণ্য আশুলিয়ার বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যান চালক মো. মামুন মিয়া। ভাঙাচোরা সড়কে ঝাঁকির কারণে মাঝেমধ্যেই গাড়িতে থাকা সিরামিকের দামি দামি বাসনপত্র ভেঙে যায় বলে জানান তিনি। মামুন মিয়া বলেন, ‘এক দিন ভাঙা না পাইলেও অন্য দিন ভাঙেই। দুই-তিন বছর ধইরা চলতাছি, দেখতাছি রাস্তার কাজ চলতেছে।’বাইপাইল আড়ত থেকে খুচরা ব্যবসায়ীরা কাঁচাবাজারসহ অন্যান্য পণ্য নিয়ে আশুলিয়ার বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করেন। ভাঙাচোরা সড়কে ঝাঁকুনিতে অনেক সময় পণ্য সড়কে পড়ে যায় বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। এই সড়কে পণ্য পরিবহনে তাঁদের অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে হচ্ছে। জামগড়া চৌরাস্তায় কাজী মার্কেটের সবজি বিক্রেতা মো. আকাশ বলেন, ‘যে ঝাঁকি খায়, মানুষই পইড়া যায়। আর মাল তো পড়বোই। আগে যে জিনিস ১৫০ টাকা ভাড়া দিয়া আনতাম, এখন লাগে ২৫০ টাকা।’শিল্পকারখানাগুলোও পণ্য পরিবহনে অতিরিক্ত টাকা ব্যয় করতে বাধ্য হচ্ছে। বাইপাইল–সংলগ্ন ফাউন্টেন গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারিং লিমিটেডের জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক (মানবসম্পদ) আশিকুল ইসলাম বলেন, বাইপাইল থেকে আশুলিয়া পর্যন্ত সড়কটি দিয়ে পণ্য পরিবহন করা যাচ্ছে না। বিকল্প পথ হিসেবে নবীনগর ও সাভারের সড়ক ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে খরচ বেড়েছে।ভাঙাচোরা সড়কে সাবধানে চলছে যানবাহন। সোমবার দুপুরে সাভারের আশুলিয়ার জামগড়া এলাকায় শিল্পকারখানাসমৃদ্ধ এলাকা হওয়ায় বাইপাইল থেকে আশুলিয়া বাজার পর্যন্ত সড়কের আশপাশে কয়েক লাখ শ্রমিক বসবাস করেন। সাধারণত এসব মানুষ সড়কের পাশে গড়ে ওঠা বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। সড়ক বেহালের কারণে বাধ্য হয়ে বিকল্প পথ দিয়ে অনেকটা ঘুরে সাভারের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।আশুলিয়ার দুর্গাপুর এলাকার বাসিন্দা মারুফ হোসেন বলেন, বাচ্চাদের অসুখ হলে আগে আশুলিয়ার নারী ও শিশু হাসপাতালে নিয়ে যেতেন। এখন ওই রাস্তা ভালো না। ধুলাবালু ও ভাঙাচোরা। তাই এখন অসুস্থ হলে সাভারে নিয়ে যান।স্বস্তি এসেছে কিছু অংশে২ সেপ্টেম্বর ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের ধউর মোড় থেকে আশুলিয়া পর্যন্ত ৩ দশমিক ৭১ কিলোমিটারের পৃথক দুটি সার্ভিস সেতু যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়। এর ফলে ওই সেতুসংলগ্ন এলাকার শিল্পকারখানাগুলো পণ্য পরিবহনে সুবিধা পাচ্ছে। তবে ওই সেতুর দূরবর্তী স্থান থেকে সড়কের ভাঙাচোরা অংশ পেরিয়ে যথাসময়ে কারখানায় পৌঁছানোসহ নানা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে কারখানার কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শ্রমিকদের।আশুলিয়ার জিরাবোর ঘোষবাগ এলাকায় সড়কের কাজ চলছে। সোমবার দুপুরে সেতুসংলগ্ন পোশাক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ন্যাচারাল গ্রুপের উপমহাব্যবস্থাপক (মানবসম্পদ ও কমপ্লায়েন্স) মো. রাকিবুল আহসান বলেন, ধউর মোড় থেকে আশুলিয়া পর্যন্ত অংশটি খুলে দেওয়ায় কারখানা থেকে পণ্য পরিবহন এখন অনেক সহজ হয়েছে। তবে কারখানার কর্মচারী ও শ্রমিকেরা অন্য এলাকায় বসবাস করায় তাঁরা নানা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন।বর্তমানে সড়কের যেসব স্থানে গর্ত বা খানাখন্দ রয়েছে, সেগুলো ঠিক করা হলেও বৃষ্টির কারণে আবার নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বলে দাবি করেছেন ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের প্রকল্প পরিচালক শফিকুল ইসলাম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে আশুলিয়া থেকে বাইপাইল এবং ইপিজেড পর্যন্ত এক পাশ অর্থাৎ দুই লেন পুরোটার কাজ শেষ হবে। এ ছাড়া যেসব জায়গায় ইতিমধ্যে সড়কের কাজ শেষ হয়েছে, সেগুলো যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হবে।
আমি আকাশ হতে চাই,যেখানে মানুষেরা আসে মেঘ হয়ে—অতিথির মতো, থাকে ক্ষণিক,তবু আকাশ তো থাকে!একান্ত নীল,অচঞ্চল এক অস্তিত্বের রেখায় গাঁথা।আমি আকাশ হতে চাই,যেখানে প্রেম আসে ধূসর ধোঁয়ায়,তবু হারায় না হৃদয়ের স্বচ্ছতা।কারও আসা বা যাওয়ায়আকাশ কি কখনো নিজের রং বদলায়?না, সে থাকে স্থির, শান্ত, সর্বত্র বিস্তৃত।আমি আকাশ হতে চাই,কারণ রাতের নিস্তব্ধতায়একটা চাঁদ জ্বলে, নিঃশব্দে ভালোবাসে,অন্ধকারের বুকে আশার মতোআলোকছায়া ছড়িয়ে দেয় নিরবধি।আমি আকাশ হতে চাই,যখন আমি কাঁদি—সে কান্না হয় বৃষ্টির মতো,যার সুরে মানুষ খুঁজে পায় পরিত্রাণ,শোকের জলেও ভিজে ওঠে প্রাণের ঘ্রাণ।আমি আকাশ হতে চাই,কারণ আকাশের মতো বিস্তৃত মন চাই আমার,যেখানে ক্ষুদ্রতা নেই, নেই হিংসা বা দ্বিধা,যেখানে প্রতিটি হৃদয়ের ব্যথাএক আশ্রয় পায়—বিশ্বাসের ছায়ায়।আমি আকাশ হতে চাই,কারণ আমি পরিবর্তনের সাক্ষী হতে চাই,যেখানে সময় বদলায়, রং বদলায়,তবু আমি থেকে যাই—এক অদৃশ্য গভীরতায়স্থির, কিন্তু সীমাহীন।আমি আকাশ হতে চাই—কারণ আকাশ কখনো কারও হয় না,তবু সে সবার।তেমনি আমি—নির্বাক ভালোবাসা হয়েসব কষ্টের ছায়া হই,তবু নিজেই রয়ে যাই আকাশ হয়ে।
বনের ভেতর সুনসান নীরবতা। হঠাৎ বিপ বিপ করে বেজে উঠল মেটাল ডিটেক্টর। শব্দটা শুনে কান খাড়া করলেন কালে লাপ্পিনেন। জায়গাটা ফিনল্যান্ডের রাজধানী হেলসিংকি থেকে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার উত্তরে, সিসমা শহরের কাছের এক জঙ্গল। কালে হয়তো ভেবেছিলেন, মাটির নিচে পুরোনো কোনো টিনের কৌটা বা লোহালক্কড় মিলবে। কিন্তু ৩ সেপ্টেম্বর মাটি খুঁড়তেই তাঁর চোখ ছানাবড়া! জঙ্গলের পাথুরে মাটির নিচে লুকিয়ে আছে হাজার বছর পুরোনো রুপার বিশাল এক গুপ্তধন!ফিনল্যান্ডের ইতিহাসে এর আগে ভাইকিং যুগের এত বড় রুপার গুপ্তধন আর কখনো পাওয়া যায়নি। চলো, জেনে নিই সেই জঙ্গলের গুপ্তধনে কী কী পাওয়া গেল।১০ পাউন্ডের রুপার খনিএই গুপ্তধনে কী আছে শুনলে তুমিও চমকে যাবে। প্রায় সাড়ে চার কেজি ওজনের রুপার কয়েন আর গয়না পাওয়া গেছে! লাহাটি হিস্টোরিক্যাল মিউজিয়ামের প্রত্নতত্ত্ববিদ এসকো তিক্কালা এই গুপ্তধন খনন করেছেন। তিনি জানান, ‘গুপ্তধনগুলো মূলত দুটি ভাগে ভাগ করে বার্চগাছের ছালের পাত্রে ভরে মাটির নিচে রাখা হয়েছিল। পাত্র দুটি একে অপরের থেকে প্রায় ৩৯ ফুট দূরে এবং মাটির ১৮ ইঞ্চি গভীরে দুটি পাথরের মাঝখানে লুকানো ছিল।’যদিও এগুলো এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার করে গোনা হয়নি, তবে এর মধ্যে কয়েক হাজার কয়েন ও টুকরা আছে। তিক্কালার ভাষায়, ‘কয়েন এত বেশি যে আমি এখনো সব কটি নেড়েচেড়ে দেখার সময় পাইনি!’আবার ফিরছে সিডি ও ক্যাসেট, কারণ কীকোথা থেকে এল এত সম্পদপ্রত্নতত্ত্ববিদদের ধারণা, এই গয়না ও কয়েনগুলো ১০০০ থেকে ১০৫০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যকার। এতে বর্তমান জার্মানি, সুইডেন আর গ্রেট ব্রিটেন এলাকার কয়েন রয়েছে। সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার হলো, এখানে বেশ কিছু দিরহামও মিলেছে। এগুলো ৮০০ থেকে ১০৫০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে ফিনল্যান্ডে আসত।এর পাশাপাশি মিলেছে রুপার ব্রেসলেট এবং হ্যাক সিলভার। হ্যাক সিলভার হলো রুপার এমন টুকরা, যা সেকালে ওজনের ওপর ভিত্তি করে কেটে কেটে দাম মেটানোর কাজে ব্যবহৃত হতো। শুধু এই রুপার ওজন হিসাব করলেই আজকের বাজারে এর দাম দাঁড়াবে প্রায় ১০ হাজার ডলার!ভাইকিং যুগের, কিন্তু ভাইকিংদের নয়!তুমি হয়তো ভাবছ, গুপ্তধন যখন ভাইকিং যুগের, তখন নিশ্চয়ই এটা কোনো দুর্ধর্ষ ভাইকিং জলদস্যুর কাজ! কিন্তু এসকো তিক্কালা বলছেন অন্য কথা। সেকালে ফিনল্যান্ড রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিকভাবে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান ভাইকিংদের অংশ ছিল না। ফিনল্যান্ডের ইতিহাসবিদরা শুধু ওই সময়কাল বোঝাতে ‘ভাইকিং যুগ’ শব্দটা ব্যবহার করেন। তাই এই গুপ্তধন কোনো ভাইকিংয়ের না-ও হতে পারে।ভাইকিংদের গুপ্তধন খুঁজে পেয়েছে ১৩ বছরের কিশোরকেন লুকানো হয়েছিল এই সম্পদমানুষ কেন এভাবে মাটির নিচে সম্পদ লুকিয়ে রাখত, তার সঠিক উত্তর দেওয়া মুশকিল। আশপাশে কোনো কবরের চিহ্নও মেলেনি। তবে রোমান আমলের ১৫ হাজারেরও বেশি গুপ্তধন নিয়ে করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, সেকালে মানুষ মূলত কর বা ট্যাক্স ফাঁকি দিতে, দেবতাদের উদ্দেশে উৎসর্গ করতে কিংবা যুদ্ধের মতো অনিশ্চিত সময়ে সম্পদ নিরাপদে রাখতে মাটির নিচে ধন লুকিয়ে রাখত।একের পর এক গুপ্তধনফিনল্যান্ডে এর আগে ভাইকিং যুগের সবচেয়ে বড় গুপ্তধনটি মিলেছিল ১৮৯৫ সালে নৌসিয়ানেন এলাকায়। তাতে ১ হাজার ৭০০ রুপার কয়েন থাকলেও তার ওজন ছিল এই নতুন গুপ্তধনের ঠিক অর্ধেক। শুধু ফিনল্যান্ড নয়, সম্প্রতি নরওয়েতেও ৪ হাজার ৭০০ কয়েনের এক বিশাল গুপ্তধন মিলেছে। আর ডেনমার্কে তো এক লোক নিজের বাড়ির পেছনের উঠান খুঁড়তে গিয়েই সাড়ে ১৮ কেজি ওজনের ৭০০ রুপার বস্তুর এক বিশাল ভান্ডার পেয়ে গেছেন!সূত্র: লাইভ সায়েন্সআর্লিং হলান্ড কেন নরওয়ের হয়ে খেলেন