সরকারি বরাদ্দে হওয়ার কথা ছিল রাস্তা, মসজিদ-মন্দির ও কবরস্থান উন্নয়ন। তবে গাইবান্ধা সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) কার্যালয়ের এসব প্রকল্পে মিলেছে ভিন্ন চিত্র। কোথাও দুই লাখ টাকার প্রকল্পে মিলেছে মাত্র ৪০ হাজার টাকা, কোথাও ৭২ হাজারের বিপরীতে দেওয়া হয়েছে ৩৫ হাজার। আবার অস্তিত্বহীন রাস্তা ও ব্যক্তিগত স্থাপনার নামেও বরাদ্দ ও অর্থ উত্তোলনের তথ্য পাওয়া গেছে।
তথ্য অধিকার আইনে পাওয়া নথি এবং কয়েকদিনের সরেজমিন অনুসন্ধানে টিআর, কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্পে এমন অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের অভিযোগ, পিআইও কার্যালয়ের কর্মকর্তা, প্রকল্প সভাপতি ও তাদের ঘনিষ্ঠদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এসব অর্থ ভাগ-বাটোয়ারা করা হয়েছে। অভিযোগের তালিকা থেকে বাদ যায়নি মসজিদ, মন্দির ও কবরস্থানও।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কোনো প্রকল্পে শর্তসাপেক্ষে মোট বরাদ্দের এক-পঞ্চমাংশ, কোনো প্রকল্পে অর্ধেক অর্থ দেওয়া হয়েছে। আবার কোনো কোনো প্রকল্প কাগজে-কলমে দেখিয়ে অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন প্রকল্প এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা এবং অর্থবঞ্চিত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টরা। তারা বরাদ্দের অর্থ ফেরত এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
তথ্য অধিকার আইনে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের টিআর প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ে গিদারী ইউনিয়নের ‘কিশামত ফলিয়া ফারাজি পাড়া জামে মসজিদ মেরামত’ প্রকল্পে দুই লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।
‘আমি মসজিদে ৩৫ হাজার টাকা দিয়েছি। বাকি টাকা পিআইও স্যারের। পিআইও কার্যালয় থেকে অর্ধেক অর্থ দেওয়ার শর্তেই প্রকল্পটি দেওয়া হয়েছিল। পিআইওর শর্ত না মানলে প্রকল্প দেবে না। বর্তমান পিআইও রিয়াজুল সাহেব মন্দির-মসজিদ কিছুই মানেন না, কবরস্থানের টাকাও খান’
তবে সরেজমিন অনুসন্ধানে মসজিদটির সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বরাদ্দের বিপরীতে মসজিদে দেওয়া হয়েছে মাত্র ৪০ হাজার টাকা। এমনকি মসজিদের সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমান ছাড়া কমিটির অন্য সদস্যদের অনেকেই এই ৪০ হাজার টাকা দেওয়ার বিষয়টিও জানেন না।
মসজিদের সহ-সভাপতি জাহিদুল ইসলাম বলেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মসজিদের জন্য কোনো সরকারি টাকা পাওয়ার বিষয়ে তিনি জানেন না। কমিটির অন্য সদস্যরাও একই কথা জানান।
প্রকল্পের সভাপতি ও মসজিদের ইমাম তোহা খন্দকার বলেন, প্রকল্প কমিটির সভাপতি হিসেবে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও ব্যাংক হিসাবের চেকে তিনি স্বাক্ষর করেছেন। এর বাইরে প্রকল্পের অর্থ বা কাজের বিষয়ে তিনি তেমন কিছু জানেন না।
তার ভাষ্য, ‘এ সংক্রান্ত প্রকল্পের বিষয়গুলো সারোয়ার ভাই দেখেন। চেকে স্বাক্ষর নেওয়ার পর তিনি ও মসজিদ কমিটি কী করেছেন, বিষয়টি আমার জানা নেই।’
যেসব প্রকল্পের বরাদ্দের টাকা উত্তোলন করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, তাদের কাজ করার জন্য চাপ দেওয়া হয়েছে। পিআইও অফিস সম্পর্কে মনে হয় আপনি নতুন করে জানেন। এখানে সবাই হাত দেয়। আমার পক্ষে এগুলো অনিয়ম-দুর্নীতি রোধ করা সম্ভব কি?- গাইবান্ধা সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) রিয়াজুল ইসলাম।
প্রকল্প পরিচালনাকারী হিসেবে উল্লেখ করা সারোয়ার গিদারী ইউনিয়নের ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক মহিলা সদস্য জরিফুল বেগমের স্বামী। মোবাইল ফোনে তিনি মসজিদ কমিটিকে ৪০ হাজার টাকা দেওয়ার কথা স্বীকার করেন।
সারোয়ার বলেন, ‘মসজিদ কমিটিকে ৪০ হাজার টাকা দেওয়ার শর্তেই প্রকল্প ধরানো হয়েছে।’ বাকি টাকা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সবই তো জানেন? পিআইও অফিসে প্রকল্প কেনাবেচা হয়। আমি এটি কিনে নিয়েছি।’
একই অর্থবছরে লক্ষীপুর ইউনিয়নের ‘বালাআটা উত্তরপাড়া জামে মসজিদ উন্নয়ন’ টিআর প্রকল্পে ৭২ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও মসজিদ কমিটি পেয়েছে মাত্র ৩৫ হাজার টাকা।
মসজিদের সেক্রেটারি আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, প্রকল্পে কত টাকা বরাদ্দ হয়েছে, তা তাদের জানানো হয়নি। ওয়ার্ডের মোস্তফা মেম্বার তিন দফায় ৩৫ হাজার টাকা দিয়েছেন।
প্রকল্প সভাপতি ও আনসার ব্যাটালিয়নের সদস্য স্থানীয় জাকিরুল ইসলাম বলেন, মেম্বার তার কাছ থেকে ফাঁকা চেকে স্বাক্ষর নিয়ে গেছেন।
লক্ষীপুর ইউনিয়নের ইউপি সদস্য গোলাম মোস্তফা বলেন, আমি মসজিদে ৩৫ হাজার টাকা দিয়েছি। বাকি টাকা পিআইও স্যারের। পিআইও কার্যালয় থেকে অর্ধেক অর্থ দেওয়ার শর্তেই প্রকল্পটি দেওয়া হয়েছিল। পিআইওর শর্ত না মানলে প্রকল্প দেবে না।’
নিজে মাত্র তিন হাজার টাকা পেয়েছেন দাবি করে এই ইউপি সদস্য আরও বলেন, ‘বর্তমান পিআইও রিয়াজুল সাহেব মন্দির-মসজিদ কিছুই মানেন না, কবরস্থানের টাকাও খান।’
২০২৩-২৪ অর্থবছরের দ্বিতীয় পর্যায়ে টিআর প্রকল্পের আওতায় বাদিয়াখালী ইউনিয়নের ‘৭ নম্বর ওয়ার্ডের ছাট চকবরুল শ্রী শ্রী রাধা গোবিন্দ মন্দিরের উন্নয়ন’ প্রকল্পে ৫২ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। তবে মন্দির পরিচালনা কমিটির দাবি, তারা পেয়েছে মাত্র ২৬ হাজার টাকা।
মন্দির কমিটির সাধারণ সম্পাদক গোপাল চন্দ্র বর্মণ বলেন, ‘আমাদের প্রথম দফায় ২৬ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু দ্বিতীয় দফায় বাকি টাকার জন্য পিআইও অফিসে গেলে জানানো হয়, ওই টাকা নেই।’
প্রকল্পের সভাপতি ও মন্দিরের পুরোহিত নিকুঞ্জ কুমারশীল (দয়াল)ও একই কথা জানান।
কবরস্থানের বরাদ্দ নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা হারুণ মিয়া বলেন, উত্তরপাড়া কবরস্থানটি অনেক পুরোনো। বরাদ্দের অর্থ পাওয়া গেলে সেখানে প্রাচীর নির্মাণ করা যেত। তিনি বরাদ্দের অর্থ ফেরত দেওয়ার পাশাপাশি আত্মসাতে জড়িতদের শাস্তি দাবি করেন।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাদিয়াখালী ইউনিয়নের হিরু মহুরীর বাড়ি থেকে পশ্চিমে মোস্তফার বাড়িগামী রাস্তা সংস্কারে দুই লাখ ২৩ হাজার ৭৫৬ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু বছর পেরিয়ে গেলেও ওই রাস্তার কাজ শুরু হয়নি।
প্রকল্পটির সভাপতি হিসেবে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাফায়েতুল হকের নাম রয়েছে। তবে তিনি বলেন, ‘আমি নিজেই জানি না ওই কাজের সভাপতি আমি।’
অনুসন্ধানে জানা যায়, ওই প্রকল্পের বরাদ্দ থেকে প্রায় এক লাখ ১৪ হাজার টাকা উত্তোলন করেছেন আনন্দ টিভির সাংবাদিক মিলন খন্দকার।
একই অর্থবছরের কাবিখার তৃতীয় পর্যায়ে ‘আরিফ খাঁ বাসুদেবপুর আউয়ালের বাড়ি হতে নজলার রহমান জামে মসজিদ পর্যন্ত রাস্তা সংস্কার’ প্রকল্পে প্রায় সাড়ে পাঁচ টন গম বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু সরেজমিনে গিয়ে ওই প্রকল্পের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
প্রকল্পে রাস্তা সংস্কারের কথা বলা হলেও স্থানীয়দের ভাষ্য, জায়গাটি কয়েকটি পরিবারের বাড়ির উঠান। স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুস সালাম বলেন, ‘এখানে কোনো রাস্তা নেই, এটা বাড়ির উঠান। এখানে কোনো কাজ করা হয়নি।’ একই কথা জানান ছাইফুল ইসলাম ও মাহফুজার রহমান।
প্রকল্পটির সভাপতি রামচন্দ্রপুর ইউনিয়নের ইউপি সদস্য সাইফুল ইসলাম। মোবাইল ফোনে কথা বলার শুরুতে তিনি ইটের কাজ করার দাবি করলেও এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘অনেকদিন আগের কথা, দেখতে হবে কোন প্রকল্প।’
এ ছাড়া নারী ও শিশু কল্যাণ সংস্থার কফিন ও ঘর নির্মাণের নামে এক লাখ ১৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। প্রকল্পটির সভাপতি করা হয় অ্যাভোকেট আমিনুল ইসলাম ফকুকে। তবে তিনি বরাদ্দের টাকা তোলার বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে জানান।
সরেজমিনে দেখা যায়, রেলের জমি দখল করে নিজের বাড়ির সামনে নারী ও শিশু কল্যাণ সংস্থার অফিসঘর নির্মাণ করছেন যুবলীগ নেতা কায়ছার প্লাবন। সেখানে টিনের একটি ঘর ছাড়া ওই সংস্থার কার্যক্রমের আর কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। জেলা পরিষদের গত অর্থবছরের বরাদ্দ থেকেও ওই সংগঠনের নামে দুই লাখ টাকা উত্তোলনের তথ্য পাওয়া গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কায়ছার প্লাবন করোনার সময় থেকে লাশ দাফনের নামে মানুষের কাছ থেকে সহযোগিতা নেওয়ার ব্যবস্থা শুরু করেন। পরে সেটিকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন সরকারি বরাদ্দ থেকেও অর্থ নেওয়া হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) রিয়াজুল ইসলাম বলেন, যেসব প্রকল্পের বরাদ্দের টাকা উত্তোলন করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, তাদের কাজ করার জন্য চাপ দেওয়া হয়েছে।
পিআইও অফিসের অনিয়মের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পিআইও অফিস সম্পর্কে মনে হয় আপনি নতুন করে জানেন। এখানে সবাই হাত দেয়। আমার পক্ষে এগুলো অনিয়ম-দুর্নীতি রোধ করা সম্ভব কি?
গাইবান্ধা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সবুজ কুমার বসাক বলেন, প্রকল্পগুলো নিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্ত শেষ হলে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা (ডিআরআরও) প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম বলেন, সরকারি অর্থ লুটপাট বা আত্মসাতের সুযোগ নেই। বিষয়টি তদন্তাধীন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিভাগীয় ব্যবস্থার পাশাপাশি আইনগত ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, সরকারি অর্থের এমন অনিয়মের অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রকৃত চিত্র বের করা জরুরি। বিশেষ করে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের অর্থ কোথায় গেল, কারা উত্তোলন করল এবং কীভাবে ব্যয় দেখানো হলো—এসব বিষয় খতিয়ে দেখে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
আনোয়ার আল শামীম/কেএইচকে/এএসএম
শরীয়তপুরের কাজীরহাট এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মাস্টার মোস্তফা কাজীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, প্রভাব খাটানো ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হন মোস্তফা কাজী। এরপর থেকে এলাকায় বিভিন্ন জমি দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৬ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে কাজীরহাট বাজারের দোকানপ্রতি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা কাজী। এছাড়া কয়েক মাস আগে কাজীরহাটে একটি দোকান ক্রয়ের সময় ব্যবসায়ী সুমন তপাদারের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী আরও জানান, বি. কে. নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলামের কাছ থেকেও ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন মানুষকে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় ফেলে হয়রানি করার অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন মোস্তফা কাজী। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির ব্যানারে তার কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন অনেকে। এছাড়া বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি নিজ ভগ্নিপতি সিদ্দিক দেওয়ানের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোস্তফা কাজীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সচেতন মহল বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
ইউরোপের রাজধানী ব্রাসেলসে আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা জোরালো করা। এই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত আছেন। গত বছরের শুরু থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের কারণে সারা ইউরোপ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ইউরোপীয় নেতারা এখন যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরিতে কাজ করছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, “আমরা যুদ্ধের মানবিক সংকট বুঝতে পারি এবং এখন আমাদের দায়িত্ব এটি দ্রুত শেষ করার পথ খোঁজা। আমাদের প্রত্যেকের জন্যই শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।” এই বৈঠকে অস্ত্রবিরতি চুক্তি, যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলো যুদ্ধ সমাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এগুলো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ক্রমবর্ধমান পরীক্ষার চাপ এবং পরিবারের পাশাপাশি সমাজের অযৌক্তিক প্রত্যাশা। এ দুটি কারণ মিলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বেড়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা। ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করা যেন শিক্ষার্থীর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ—সব জায়গা থেকেই উচ্চ ফলাফলের প্রত্যাশা তৈরি করছে মানসিক চাপের একটি অব্যক্ত বলয়। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইহান কবির বলেন, “পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে মনে হয়, শুধু আমি না, আমার পুরো পরিবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এটা সহ্য করা খুব কঠিন।” শুধু রাইহান নয়, দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা একই অভিজ্ঞতার কথা বলছে। সামাজিক চাপ ও তুলনার সংস্কৃতি পরিস্থিতি করছে আরও জটিল পরীক্ষার নম্বর নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এখন তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া গর্ব বা অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কোন কলেজে ভর্তি হলো, কে কতো পেল—এসব তুলনার চাপে পড়াশোনার আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা তাবাসসুম বলেন, “প্রত্যাশা থাকা ভালো, কিন্তু তা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায় এবং একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব সক্ষমতা উপেক্ষা করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়। এ থেকেই জন্ম নেয় আত্মগ্লানি, হতাশা এবং মাঝে মাঝে আত্মহননের চিন্তা।” জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ নিয়মিত মানসিক চাপে থাকে। এর মধ্যে ১২ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগে এবং বড় একটি অংশ কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই দিন পার করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে ক্ষতিকর। সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, এবং পরিবারের ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ এই সমস্যার নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম হয়, সেখানে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাকে কেবল ফলাফলের সীমায় না এনে একটি মানবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা চাপ নয়, ভালোবাসা থেকে শিখবে, এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ প্রজন্ম।
বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কৃষিখাতকে চরমভাবে আঘাত করছে। অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘদিন খরা এবং হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ফসল উৎপাদনে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে। চলতি মৌসুমেই অনেক জেলায় ধান, গম, ভুট্টা এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, একদিকে যেমন আবহাওয়ার আচরণ বুঝে ওঠা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সারের দাম, কীটনাশক ও বীজের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পোকার আক্রমণ ও রোগবালাইয়ের হারও বেড়ে গেছে। এই চাপে পড়ে অনেক কৃষকই ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা। তাদের পক্ষে বারবার ক্ষতির ধাক্কা সামলে উঠে আবার নতুনভাবে চাষাবাদ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো অঞ্চলে দেখা গেছে, কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী ফসল বাদ দিয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ ও লাভজনক অন্য চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমানেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। একইসঙ্গে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে এমন জাত ও পদ্ধতি উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে যা কঠিন জলবায়ু পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কৃষি খাতকে সচল রাখা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে এখনই পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
কলম্বোর সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাব ময়দানে চলমান দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে ব্যাট হাতে আবারও ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের। টস জিতে ব্যাট করতে নেমে প্রথম ইনিংসে টাইগাররা সংগ্রহ করে মাত্র ২২০ রান, যেখানে ব্যতিক্রম ছিলেন কেবল শোয়াড ইসলাম (৪৬), মুশফিকুর রহিম (৩৫) ও লিটন দাস (৩৪)। শ্রীলঙ্কার বোলাররা শুরু থেকেই চাপ সৃষ্টি করে রাখে। ডেবিউ করা স্পিনার সোনাল দিনুষা ৩ উইকেট নিয়ে আলো ছড়ান, আর আসিথা ফার্নান্দো ও বিষ্ণু ফার্নান্দো নেন ২টি করে উইকেট। প্রথম ইনিংসের জবাবে দ্বিতীয় দিন সকালে শ্রীলঙ্কা উদ্বোধনী জুটি থেকে ভালো সূচনা পায়। ১৩.১ ওভারে কোন উইকেট না হারিয়ে সংগ্রহ করেছে ৬২ রান। ওপেনার পাথুম নিসান্কা ৩৩ এবং লাহিরু উদারা ২৮ রানে অপরাজিত রয়েছেন। বাংলাদেশের হয়ে তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ বোলিং শুরু করলেও এখনও পর্যন্ত সাফল্যের দেখা মেলেনি। শ্রীলঙ্কা এখনো বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস থেকে ১৫৮ রানে পিছিয়ে আছে, হাতে রয়েছে সকল উইকেট। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে প্রভাব এই টেস্টটি ২০২৩-২৫ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ হওয়ায় দুই দলের জন্যই পয়েন্টের লড়াই গুরুত্বপূর্ণ। সিরিজের প্রথম টেস্টে পরাজিত হওয়ায় বাংলাদেশ সিরিজে টিকে থাকতে হলে এই ম্যাচ জিততেই হবে। পরবর্তী চ্যালেঞ্জ স্লো পিচে বাংলাদেশ বোলারদের আরও পরিকল্পিত বোলিং করতে হবে। দ্রুত উইকেট তুলে না নিতে পারলে শ্রীলঙ্কা বড় লিড নিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে দেবে টাইগারদের। ফিল্ডিংয়ে মনোযোগ এবং টাইট বোলিংয়ের মাধ্যমেই দ্বিতীয় ইনিংসে নিজেদের ফিরে পাওয়ার আশায় বাংলাদেশ। সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড (দিন ২, প্রথম সেশন পর্যন্ত): বাংলাদেশ (১ম ইনিংস): ২২০/১০ শ্রীলঙ্কা (১ম ইনিংস): ৬২/০ (১৩.১ ওভার) নিসান্কা: ৩৩*, উদারা: ২৮* বাংলাদেশ বোলার: তাইজুল, মিরাজ – উইকেটহীন
রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, মতিঝিল, শাহবাগ ও কামরাঙ্গীরচর এলাকা থেকে এক নারীসহ ৫ ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার ব্যক্তিদের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। পুলিশ ও হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, নিহতদের প্রাথমিক পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি। তাদের বেশিরভাগকেই ভবঘুরে প্রকৃতির বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা। যাত্রাবাড়ী থানার শনির আখড়া ইউটার্ন এলাকা থেকে আনুমানিক ৪৫ বছর বয়সী এক পুরুষের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। যাত্রাবাড়ী থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. আসাদুজ্জামান জুয়েল জানান, স্থানীয়দের ভাষ্যমতে ওই ব্যক্তি এলাকায় ভবঘুরে হিসেবে ঘোরাঘুরি করতেন। ধারণা করা হচ্ছে, অসুস্থতার কারণেই রাস্তায় তার মৃত্যু হয়েছে। বেলা সোয়া ১১টার দিকে মরদেহ ঢামেক হাসপাতালে নেওয়া হয়। এদিকে, মতিঝিলে নটরডেম কলেজের বিপরীত পাশের রাস্তা থেকে প্রায় ৫০ বছর বয়সী এক পুরুষকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করেন নাসির নামে এক ব্যক্তি। উদ্ধার করে ঢামেক হাসপাতালে ভর্তি করা হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বেলা ১১টার দিকে তিনি মারা যান। উদ্ধারকারীর ধারণা, ওই ব্যক্তি দীর্ঘদিনের অসুস্থতা ও অনাহারে মারা গিয়ে থাকতে পারেন। শাহবাগে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পাশ থেকে আনুমানিক ৩০ বছর বয়সী এক নারীকে অসুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করে ঢামেক হাসপাতালে ভর্তি করান স্টাফরা। চিকিৎসাধীন অবস্থায় বেলা সোয়া ১১টার দিকে তিনি মারা যান। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগের ওয়ার্ড মাস্টার আইয়ুব আলী। অন্যদিকে, শাহবাগ থানাধীন জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের মোড়ের ফুটপাত থেকে আনুমানিক ৩০ বছর বয়সী আরেক যুবকের মরদেহ উদ্ধার করেন শাহবাগ থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) বিজয় মন্ডল। তাকেও ভবঘুরে প্রকৃতির বলে ধারণা করছে পুলিশ। কামরাঙ্গীরচরের ঝাউলাহাটি এলাকা থেকে ৬৫ বছর বয়সী এক বৃদ্ধের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। কামরাঙ্গীরচর থানার ডিউটি অফিসার উপ-পরিদর্শক (এসআই) প্রাণেশ্বর দাস জানান, স্থানীয়দের খবরের ভিত্তিতে মরদেহটি উদ্ধার করা হয়। ওই ব্যক্তি এলাকায় ঘোরাঘুরি করতেন এবং ভবঘুরে প্রকৃতির ছিলেন। পুলিশ জানায়, নিহতদের পরিচয় শনাক্তে আইনি প্রক্রিয়া চলছে এবং ময়নাতদন্তের পর মৃত্যুর সঠিক কারণ জানা যাবে। কেএজেডআইএ/এএমএ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি টানানো নিয়ে বিতর্কের তৈরি হয়েছে। গতকাল সোমবার সংগ্রহশালায় থাকা জিন্নাহর তিনটি ছবি ছিঁড়ে প্রতিবাদ জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী। প্রতিবাদ জানিয়েছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নও।জিন্নাহর ছবি ডাকসু সংগ্রহশালায় রাখা হয়েছে—এই খবর জানাজানি হলে রোববার রাত থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা শুরু হয়। অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন।জিন্নাহর ছবি প্রদর্শনের প্রতিবাদে জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির গোলাম আযমকে জুতাপেটা করার একটি ছবি গতকাল বিকেলে ডাকসু সংগ্রহশালায় টানিয়ে দিয়েছে ছাত্র ফেডারেশন।দিনভর প্রতিবাদ ও সমালোচনার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে। এ লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানীকে আহ্বায়ক করে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।উপমহাদেশ ও বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামের বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনার বিরল আলোকচিত্র, পেপার কাটিং এবং গুরুত্বপূর্ণ দলিল ডাকসু সংগ্রহশালায় রক্ষিত আছে। সংগ্রহশালাটি সংস্কারের পর গত রোববার আবার চালু করা হয়। এতে নতুন করে রাখা হয় মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর তিনটি ছবি। এর মধ্যে একটি ছবি ১৯৪৮ সালে ২১ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানের (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এক অনুষ্ঠানের, যেখানে তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘কেবল উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’। আরও স্থান পায় ১৯৪০ সালের মার্চ মাসে লাহোরে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের বার্ষিক সম্মেলনের একটি দলগত ছবি ও ডন পত্রিকার প্রতিবেদনের পেপার কাটিং। আরও রাখা হয় ছাত্রসংঘের সাবেক নেতা আবদুল মালেকের ছবি। বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একক বা গৌরবোজ্জ্বল কোনো ছবি রাখা হয়নি, যা আগে ছিল।ছিঁড়ে ফেলা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবিজিন্নাহর ছবি ভাঙচুরের ঘটনার পর ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক এস এম ফরহাদ সাংবাদিকদের বলেন, জিন্নাহর ছবি রাখার পাশাপাশি ছবির নিচে তাঁর বাংলা ভাষাবিরোধী অবস্থানের বক্তব্যও উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর দাবি, জিন্নাহর ছবি না দিলে বলা হতো, তাঁর (জিন্নাহ) বাংলা ভাষাবিরোধী অবস্থান লুকানো হয়েছে।জিন্নাহর ছবি ছিঁড়ে ফেলার ঘটনা নিয়ে ফরহাদ বলেন, ‘যিনি ছবিটি ছিঁড়েছেন, তিনি উর্দু বিভাগের শিক্ষার্থী। এ কারণে তিনি জিন্নাহর প্রতি আলাদা দরদ থেকে এমনটি করে থাকতে পারেন।’এর আগে গতকাল সোমবার বেলা আড়াইটার দিকে ডাকসু সংগ্রহশালায় গিয়ে জিন্নাহর তিনটি ছবি ছিঁড়ে ফেলে প্রতিবাদ জানান আবু তৈয়ব হাবিলদার নামের এক শিক্ষার্থী। বর্তমানে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্দু বিভাগের শিক্ষার্থী। সর্বশেষ ডাকসু নির্বাচনে তিনি সহসভাপতি (ভিপি) পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন।আবু তৈয়ব সাংবাদিকদের বলেন, ‘যে জিন্নাহ আমাদের মাতৃভাষার বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত দিয়েছিল, যে জিন্নাহ ১৯৪৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে ছাত্রছাত্রীদের গ্রেপ্তার করেছিল, সেই জিন্নাহ ডাকসুতে স্থান পেতে পারে না।’ছাত্রসংগঠনের প্রতিবাদএক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জিন্নাহর বিতর্কিত ছবি প্রদর্শনের প্রতিবাদ জানিয়েছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। ক্ষমতাসীন দল বিএনপির অঙ্গসংগঠনটি অভিযোগ করেছে, ভাষা ও স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিকভাবে ডাকসু সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি প্রদর্শন করা হয়েছে। ছবিটি অপসারণ এবং ডাকসুকে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীর আদর্শ প্রচারের স্থান হিসেবে ব্যবহার বন্ধের দাবি জানিয়েছে ছাত্রদল।মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি স্থাপন এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি অপসারণের প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন। সংগঠনের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, স্বাধীনতাসংগ্রামের নেতা হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি সংগ্রহশালা থেকে সরিয়ে দেওয়া ইতিহাস বিকৃতির শামিল। দ্রুত জিন্নাহর ছবি অপসারণ ও শেখ মুজিবের ছবি পুনর্বহাল না হলে শিক্ষার্থীরা যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।ডাকসু সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি, আর কী যুক্ত হলো, কী বাদ গেলগতকাল বেলা তিনটার দিকে ছাত্র ফেডারেশনের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক অর্ক বড়ুয়ার নেতৃত্বে একদল শিক্ষার্থী গোলাম আযমকে জুতাপেটা করার ছবিটি টানান। জিন্নাহর ছবি যেখানে লাগানো হয়েছিল, তার ওপরে ১৯৮১ সালে বায়তুল মোকাররমে গোলাম আযমকে জুতাপেটা করার ছবিটি টানানো হয়।ডাকসু সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি প্রদর্শন করার প্রতিবাদে জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযমকে জুতাপেটা করার ছবি সাঁটিয়ে দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ফেডারেশনের নেতা–কর্মীরাঅর্ক বড়ুয়া সাংবাদিকদের বলেন, ‘জুমা (ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক বিষয়ক আন্দোলন) বলেছিল, তার ইচ্ছা করেছে তাই জিন্নাহর ছবি লাগিয়েছে। ঠিক তেমনই আমাদের ইচ্ছা করেছে গোলাম আযমের ছবি লাগাতে, তাই লাগিয়েছি।’গতকাল বিকেলে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ-বিসিএল—এই তিন বাম ছাত্রসংগঠন বিক্ষোভ সমাবেশ এবং সংবাদ সম্মেলন করে। রাত আটটায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মল চত্বরে অবস্থিত ‘জুলাই নির্ভীক’ স্মৃতিস্তম্ভ প্রাঙ্গণে এক সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় ছাত্রশক্তির নেতারা ডাকসুর সংগ্রহশালায় জিন্নাহ ও আবদুল মালেকের ছবি টানানো নিয়ে প্রতিবাদ জানান।স্বাধীনতা আন্দোলনের চরিত্রগুলোকে সরিয়ে নতুন ইতিহাস সৃষ্টির চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়: অধ্যাপক তানজীমউদ্দিনব্যবস্থা নেবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনঅধ্যাপক মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানীকে আহ্বায়ক করে করা কমিটি ডাকসু সংগ্রহশালায় জিন্নাহ ও তৎকালীন ছাত্রসংঘের সাবেক নেতা আবদুল মালেকের ছবি রাখার ঘটনা তদন্ত করবে। এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমতি না নিয়ে শিক্ষক মূল্যায়নের ওয়েবসাইট চালু এবং অনুমতি ছাড়া ‘নির্ভীক জুলাই’ ও কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন করার বিষয়েও তদন্ত করবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম এ কথা জানিয়েছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ছবি লাগানো বা ডাকসুর নেওয়া এই কার্যক্রমগুলোর বিষয়ে তিনি আগে থেকে অবগত ছিলেন না। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একটি লিখিত বক্তব্যও দিয়েছে। এ এতে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ যেকোনো সিদ্ধান্ত উপাচার্যের নির্দেশনা সাপেক্ষে গ্রহণ করবে। কিন্তু ডাকসু ‘নির্ভীক জুলাই’ নামে কলাভবন-সংলগ্ন ডাকসু ভবনের পশ্চিম পাশে ও কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে যে স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন করেছে, তা সিন্ডিকেট কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কোনোরূপ অনুমতি বা আলোচনা করে স্থাপন করেনি, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব আইন অনুযায়ী এখতিয়ারবহির্ভূত।বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ডাকসু সংগ্রহশালায় জিন্নাহ এবং ছাত্রসংঘের নেতা আবদুল মালেকের ছবি প্রদর্শনের বিষয়টিও ভাষা আন্দোলন ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রহশালায় এমন ছবি প্রদর্শন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।ডাকসুর পক্ষ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মূল্যায়নের জন্য অনুমোদন ছাড়া ওয়েবসাইট চালু করা হয়েছে, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলেও বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।
উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং–উনের গোপন কোনো ছেলে আছে কি না, তা তদন্ত করে দেখছেন দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দারা। গত বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা সংস্থা ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস (এনআইএস) এ তথ্য জানিয়েছে।২০১১ সালে বাবার মৃত্যুর পর উত্তর কোরিয়ার ক্ষমতায় আসেন কিম। এনআইএসের সর্বশেষ মূল্যায়ন অনুযায়ী, কিমের পর সম্ভবত দেশটির দায়িত্ব নেবেন তাঁর মেয়ে। ধারণা করা হয়, ওই মেয়ের বয়স বর্তমানে প্রায় ১৩ বছর। তাঁর নাম কিম জু এ।বিবৃতিতে এনআইএস বলেছে, কিম জুর কোনো বড় ভাই আছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করছে তারা। তবে কিমের কোনো ছেলেসন্তান থাকলেও, সে হয়তো তাঁর উত্তরসূরি হওয়ার অবস্থায় নেই। এ ছাড়া কিমের আরেকটি ছোট সন্তান রয়েছে। তবে সে ছেলে নাকি মেয়ে, তা নিশ্চিত নয়।কিমের পর তাঁর মেয়ে দেশের দায়িত্ব নেবেন বলে ধারণা করা হয়এর আগে ২০২৩ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার এক আইনপ্রণেতা বলেছিলেন, সংসদীয় কমিটিকে দেওয়া এক ব্রিফিংয়ে এনআইএস জানিয়েছিল, কিম জু এর একজন বড় ভাই আছে। তবে সেবারও পরে গোয়েন্দা সংস্থাটি জানিয়ে দেয়, উত্তর কোরিয়ার নেতার ছেলে আছে—এমন প্রতিবেদন তারা এখনো যাচাই করে দেখছে।কিমের কোনো ছেলে আছে কি না, তা উত্তর কোরিয়ার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে পুরুষতান্ত্রিকতা। ১৯৪৮ সালে উত্তর কোরিয়া প্রতিষ্ঠার পর থেকে দেশটির তিনজন নেতাই কিম পরিবারের পুরুষ সদস্য।সে হিসেবে কিমের উত্তরসূরি তাঁর মেয়ে হতে যাচ্ছেন কি না, তা নিয়ে কিছু বিশেষজ্ঞের সন্দেহ রয়েছে। তাঁদের মতে, উত্তর কোরিয়ার শীর্ষ কর্মকর্তারা একজন নারীর নেতৃত্ব মেনে না–ও নিতে পারেন। এ ছাড়া কিম জু এ যদি শেষ পর্যন্ত ক্ষমতাও পান, তাহলে দেশটির শাসনভার তাঁর পরিবারের হাত থেকে চলে যেতে পারে। কারণ, কিম জু এ যদি বিয়ে করেন এবং তাঁদের সন্তান যদি পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা হন, তাহলে কিম পরিবারের বাইরে ক্ষমতা চলে যাবে।তিন কিমের ৭৮ বছর: যেভাবে টিকে আছে উত্তর কোরিয়া