ম্যাক্স মূলত রাশিয়ার নিজস্ব ‘সুপার অ্যাপ’। এই অ্যাপে বিভিন্ন ধরনের সেবা একটিমাত্র প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করা হয়েছে। যা রাশিয়ার মানুষের দৈনন্দিন জীবনে কাজে লাগে। তবে সম্প্রতি এক গবেষণা বলছে, নজরদারির জন্য ম্যাক্স অ্যাপ হলো সবচেয়ে চতুর এবং ভীতিকর এক মাধ্যম।

রাশিয়ায় গত দেড় বছরে দেশটির কয়েক কোটি মানুষকে তাদের মোবাইল ফোনে একটি নতুন অ্যাপ ইনস্টল করতে বাধ্য করা হয়েছে। রঙিন আইকনযুক্ত বার্তা আদান–প্রদান ও লেনদেনের এই অ্যাপটির নাম ‘ম্যাক্স’। তবে গবেষণা বলছে, এই অ্যাপ আসলে ব্যবহারকারীদের ফোনে নজরদারির ‘গোপন প্রবেশদ্বার’ হিসেবে কাজ করছে। এর মাধ্যমে সরকারের নজরদারি চলছে।
রুশ কর্তৃপক্ষ এই অ্যাপটিকে যোগাযোগের অ্যাপ টেলিগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপের ‘দেশপ্রেমিক বিকল্প’ হিসেবে তুলে ধরেছে। দেশটির নামীদামি তারকারাও তাঁদের র্যাপ ভিডিও এবং কমেডি শোতে এই অ্যাপের প্রচারণা চালিয়েছেন। ফলে চলতি গ্রীষ্মেই এটি রাশিয়ার সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত বার্তা আদান–প্রদানের অ্যাপে পরিণত হয়েছে।
অ্যাপটি তৈরি করেছে রাশিয়ার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানি ‘ভিকোনতাকতে’। এই প্রতিষ্ঠানটি দেশটির সরকারের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত। জানা গেছে, এই অ্যাপে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনেরও পরোক্ষ মালিকানা রয়েছে।
ম্যাক্স মূলত রাশিয়ার নিজস্ব ‘সুপার অ্যাপ’, যেখানে বিভিন্ন ধরনের সেবা একটিমাত্র প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করা হয়েছে। এটি এমন এক অ্যাপ, যার ভেতর একাধিক ‘মিনি অ্যাপ’ রয়েছে—যেগুলো রাশিয়ার মানুষের দৈনন্দিন জীবনে কাজে লাগে। এর মধ্যে রয়েছে ব্যাংকিং সেবা, টেলিগ্রামের বিকল্প হিসেবে মেসেজিং সেবা এবং সরকারের নানা সেবা প্রদানকারী অ্যাপ।
বিশ্বের সবচেয়ে পরিচিত সুপার অ্যাপ হলো চীনের ‘উইচ্যাট’, যা দেশটির সব ধরনের সেবার পাশাপাশি সরকারের সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারির মূল মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। তবে উইচ্যাট যেখানে চীনের ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সঙ্গে বহু দশক ধরে ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে, সেখানে ম্যাক্সকে হঠাৎ করেই এমন এক জনগোষ্ঠীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, যারা একসময় অনেকটাই মুক্ত ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ পেত।
সাম্প্রতিক এক ফরেনসিক গবেষণায় ম্যাক্সের ভয়াবহ নজরদারি ক্ষমতার বিস্তারিত চিত্র সামনে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্সের সহযোগী অধ্যাপক রয়া এনসাফি বলেন, ম্যাক্স অ্যাপের ক্ষমতা মূলত প্রতিটি ব্যবহারকারীর ডিভাইসে থাকা পুরো মিনি অ্যাপ ইকোসিস্টেমে একটি ‘গোপন প্রবেশদ্বারের’ শামিল।
রয়া এনসাফি বলেন, ‘আমরা এক দশক ধরে রাশিয়ার ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণের তীব্রতা বৃদ্ধি নিয়ে গবেষণা করেছি। কর্তৃত্ববাদী সরকারগুলো তাদের নাগরিকদের ওপর নজরদারি চালাতে এযাবৎ যেসব কৌশল নিয়েছে, তার মধ্যে ম্যাক্স হলো সবচেয়ে চতুর এবং ভীতিকর একটি মাধ্যম।’ তিনি বলেন, ডিজিটাল কর্তৃত্ববাদ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ম্যাক্স হলো যেকোনো সরকারের জন্য অনুকরণীয় একটি নীলনকশা বা ব্লুপ্রিন্ট। এটি ইরান, কাজাখস্তান ও ভারতের মতো সরকারগুলো সামনে যা অর্জনের চেষ্টা করতে পারে, তার এক অত্যাধুনিক রূপ প্রদর্শন করছে।
এনসাফির গবেষক দল রাশিয়ায় ব্যবহৃত অ্যাপটির একটি সংস্করণ ডাউনলোড করতে সক্ষম হয়। তাতে দেখা যায়, ব্যবহারকারীদের অজান্তেই তাদের ডিভাইসের স্ক্রিনশট এবং এর মিনি অ্যাপগুলোর তথ্যের ছবি তুলতে পারে ম্যাক্স। এটি এসব মিনি অ্যাপে জমা থাকা সব তথ্য, বার্তা এবং আর্থিক লেনদেনের হিসাবে প্রবেশ করতে সক্ষম। এমনকি ব্যবহারকারী টের পাওয়ার আগেই তার পরিচয় ব্যবহার করে অন্য কাউকে বিভ্রান্তও করতে পারে অ্যাপটি।

এমনকি মিনি অ্যাপগুলোর ভেতর ক্ষতিকর কোড প্রবেশের সুযোগও রয়েছে ম্যাক্স অ্যাপে। এনসাফির মতে, এর অর্থ হলো রাশিয়ার সরকার চাইলে ম্যাক্সকে ব্যবহার করে সাইবার হামলাও চালাতে পারবে।
এই গবেষণা ম্যাক্সের নজরদারি ক্ষমতা নিয়ে চলমান বিতর্কে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। তবে এনসাফি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করে জানান, ব্যবহারকারীদের ফোনে যদি টেলিগ্রাম বা হোয়াটসঅ্যাপ ইনস্টল করা থাকে, তবে অ্যাপটি সরাসরি সেগুলোতে ঢুকতে পারে না। যদিও রাশিয়া ইতিমধ্যে এই দুটি অ্যাপ নিষিদ্ধ করেছে।
রাশিয়ার সরকারি প্রতিষ্ঠান বা এর সংশ্লিষ্ট খাতে কর্মরত বহু নাগরিককে কার্যত ‘ম্যাক্স’ ব্যবহারে বাধ্য করা হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক এমনকি স্কুলের শিক্ষার্থীদেরও তাদের পারস্পরিক যোগাযোগ এই প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসার জন্য চাপের মুখে পড়তে হয়েছে।
ব্যবহারকারীদের অজান্তেই তাদের ডিভাইসের স্ক্রিনশট এবং এর মিনি অ্যাপগুলোর তথ্যের ছবি তুলতে পারে ম্যাক্স। এটি মিনি অ্যাপে জমা থাকা সব তথ্য, বার্তা এবং আর্থিক লেনদেনের হিসাবে প্রবেশ করতে সক্ষম।
মস্কোর একজন স্কুলশিক্ষক জানান, নগর কর্তৃপক্ষের নির্দেশনার পর তাঁদের স্কুলের শিক্ষক-কর্মচারীদের যোগাযোগের সব কাজ ম্যাক্সে স্থানান্তরিত করার আদেশ দেওয়া হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘গত বছরের মার্চে আমাদের স্কুলের প্রধান আমাদের সরাসরি ডেকে বলেন, এখন থেকে সবকিছুই ম্যাক্সে হবে। এর মধ্যে অভিভাবকদের সঙ্গে চ্যাট, হোমওয়ার্ক পাঠানো এবং স্কুলের অন্য সব যোগাযোগও অন্তর্ভুক্ত ছিল।’ তিনি আরও বলেন, ‘এখানে “না” বলার আসলেই কোনো সুযোগ নেই। তাই শেষ পর্যন্ত অ্যাপটি ব্যবহার করতেই হয়।’
সেন্ট পিটার্সবার্গের এক বিশ্ববিদ্যালয়শিক্ষার্থী দানিল। তিনি বলেন, শিক্ষাবর্ষ শুরু হওয়ার কিছুদিন আগে ম্যাক্স অ্যাপটি ডাউনলোড করতে বাধ্য হন। তাঁকে জানানো হয়েছিল, এই অ্যাপের মাধ্যমে তৈরি কিউআর কোড ছাড়া শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবন বা হলে প্রবেশ করতে পারবে না।
দানিল জানান, অ্যাপটির নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা নিয়ে তাঁর মনে সংশয় ছিল। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাতায়াতে এর বাইরে কোনো বিকল্প ছিল না বললেই চলে।
কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ও শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ীর মতে, রাশিয়ার অভিজাত শ্রেণির কাছে ম্যাক্স অ্যাপটির ব্যবহার কেবল লোকদেখানো। দৈনন্দিন যোগাযোগের জন্য তাঁরা এখনো টেলিগ্রাম ও সিগন্যাল অ্যাপ ব্যাপকভাবে ব্যবহার করছেন।
ক্রেমলিনের ঘনিষ্ঠ এক ব্যক্তি জানান, তিনি ও তাঁর কয়েকজন বন্ধু শুধু ম্যাক্স ব্যবহার করার জন্যই আলাদা ফোন কিনেছেন। আর আগের মতোই তাঁদের প্রধান ফোন এবং পছন্দের মেসেজিং অ্যাপগুলো দৈনন্দিন কাজে ব্যবহার করে যাচ্ছেন। ‘এসবই লোকদেখানো। রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত কেউ সত্যি সত্যি এটা ব্যবহার করে না’, নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন ওই ব্যক্তি।
খবরের প্রধান উৎস হিসেবে রাশিয়ার মানুষের কাছে টেলিগ্রাম অ্যাপের জায়গা এখনো দখল করতে পারেনি ম্যাক্স। গণমাধ্যম, ব্লগার এবং সরকারি কর্মকর্তারা বিপুলসংখ্যক মানুষের কাছে সংবাদ ও মতামত পৌঁছে দিতে যে পাবলিক চ্যানেলগুলো ব্যবহার করেন, সেগুলো ম্যাক্সে এখনো তেমন উন্নত নয়।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে কয়েকজন ‘ম্যাক্স’ ব্যবহারকারী জানান, অ্যাপটির ডিজাইন এবং কাজের ধরন রাশিয়ার দীর্ঘদিনের সবচেয়ে জনপ্রিয় বার্তা আদান–প্রদানের প্ল্যাটফর্ম টেলিগ্রামের মতোই। তবে এর গোপনীয়তা এবং সম্ভাব্য নজরদারি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর উদ্বেগ রয়েছে।
মিনি-অ্যাপগুলোর মধ্যে ক্ষতিকর কোড প্রবেশের সুযোগও রয়েছে ম্যাক্স অ্যাপে। এনসাফির মতে, এর অর্থ হলো রাশিয়ার সরকার চাইলে ম্যাক্সকে ব্যবহার করে সাইবার হামলাও চালাতে পারবে।
মস্কোর ৩৪ বছর বয়সী বাসিন্দা নিকোলাই বলেন, ‘ম্যাক্স ব্যবহার করার সময় মনে হয়—আপনি জানেন না আর কে বা কারা আপনাকে নজরদারিতে রাখছে।’ অ্যাপটি দেখতে বেশ আধুনিক এবং আকর্ষণীয় হলেও নিকোলাই জানান, এটি ব্যবহারের সময় সব সময় একটা অশুভ অনুভূতির সৃষ্টি হয়। ‘অন্য অ্যাপগুলোর বিকল্প সুবিধা পাওয়া দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ায় বাধ্য হয়ে এটি বেশি বেশি ব্যবহার করতে হচ্ছে। কিন্তু তা–ও মনে হয় কোথাও যেন একটা বড় ভুল থেকে যাচ্ছে’, উল্লেখ করেন তিনি।
ম্যাক্সকে এত দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে রাশিয়ার সাফল্যকে একটি ‘সতর্কবার্তাসূচক সংকেত’ হিসেবে দেখা উচিত বলে মনে করেন রয়া এনসাফি। চীন ডিজিটাল কর্তৃত্ববাদ প্রতিষ্ঠার বর্তমান পর্যায়ে পৌঁছাতে প্রায় ৩৫ বছর সময় নিয়েছে। অথচ রাশিয়া মাত্র এক দশকের মধ্যেই মানুষের ইন্টারনেট ব্যবহারকে পুরোপুরি রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত–ব্যবস্থার মধ্যে বন্দী করে এই কঠোর বিধিনিষেধ চাপিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে।
রয়া এনসাফি বলেন, ‘পৃথিবী বদলে যাচ্ছে, ব্যক্তিগত যোগাযোগের যে প্রযুক্তিগত পরিকাঠামো—তা–ও পরিবর্তিত হচ্ছে। আর কর্তৃত্ববাদী সরকারগুলোর পক্ষ থেকে আসা এই আক্রমণাত্মক নিয়ন্ত্রণচেষ্টাও অত্যন্ত তীব্র।’
গার্ডিয়ানের পক্ষ থেকে তবে এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে ম্যাক্স ও ভিকোনতাকতের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি।
শরীয়তপুরের কাজীরহাট এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মাস্টার মোস্তফা কাজীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, প্রভাব খাটানো ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হন মোস্তফা কাজী। এরপর থেকে এলাকায় বিভিন্ন জমি দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৬ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে কাজীরহাট বাজারের দোকানপ্রতি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা কাজী। এছাড়া কয়েক মাস আগে কাজীরহাটে একটি দোকান ক্রয়ের সময় ব্যবসায়ী সুমন তপাদারের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী আরও জানান, বি. কে. নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলামের কাছ থেকেও ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন মানুষকে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় ফেলে হয়রানি করার অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন মোস্তফা কাজী। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির ব্যানারে তার কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন অনেকে। এছাড়া বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি নিজ ভগ্নিপতি সিদ্দিক দেওয়ানের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোস্তফা কাজীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সচেতন মহল বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
ইউরোপের রাজধানী ব্রাসেলসে আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা জোরালো করা। এই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত আছেন। গত বছরের শুরু থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের কারণে সারা ইউরোপ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ইউরোপীয় নেতারা এখন যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরিতে কাজ করছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, “আমরা যুদ্ধের মানবিক সংকট বুঝতে পারি এবং এখন আমাদের দায়িত্ব এটি দ্রুত শেষ করার পথ খোঁজা। আমাদের প্রত্যেকের জন্যই শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।” এই বৈঠকে অস্ত্রবিরতি চুক্তি, যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলো যুদ্ধ সমাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এগুলো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ক্রমবর্ধমান পরীক্ষার চাপ এবং পরিবারের পাশাপাশি সমাজের অযৌক্তিক প্রত্যাশা। এ দুটি কারণ মিলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বেড়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা। ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করা যেন শিক্ষার্থীর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ—সব জায়গা থেকেই উচ্চ ফলাফলের প্রত্যাশা তৈরি করছে মানসিক চাপের একটি অব্যক্ত বলয়। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইহান কবির বলেন, “পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে মনে হয়, শুধু আমি না, আমার পুরো পরিবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এটা সহ্য করা খুব কঠিন।” শুধু রাইহান নয়, দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা একই অভিজ্ঞতার কথা বলছে। সামাজিক চাপ ও তুলনার সংস্কৃতি পরিস্থিতি করছে আরও জটিল পরীক্ষার নম্বর নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এখন তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া গর্ব বা অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কোন কলেজে ভর্তি হলো, কে কতো পেল—এসব তুলনার চাপে পড়াশোনার আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা তাবাসসুম বলেন, “প্রত্যাশা থাকা ভালো, কিন্তু তা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায় এবং একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব সক্ষমতা উপেক্ষা করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়। এ থেকেই জন্ম নেয় আত্মগ্লানি, হতাশা এবং মাঝে মাঝে আত্মহননের চিন্তা।” জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ নিয়মিত মানসিক চাপে থাকে। এর মধ্যে ১২ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগে এবং বড় একটি অংশ কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই দিন পার করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে ক্ষতিকর। সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, এবং পরিবারের ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ এই সমস্যার নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম হয়, সেখানে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাকে কেবল ফলাফলের সীমায় না এনে একটি মানবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা চাপ নয়, ভালোবাসা থেকে শিখবে, এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ প্রজন্ম।
বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কৃষিখাতকে চরমভাবে আঘাত করছে। অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘদিন খরা এবং হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ফসল উৎপাদনে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে। চলতি মৌসুমেই অনেক জেলায় ধান, গম, ভুট্টা এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, একদিকে যেমন আবহাওয়ার আচরণ বুঝে ওঠা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সারের দাম, কীটনাশক ও বীজের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পোকার আক্রমণ ও রোগবালাইয়ের হারও বেড়ে গেছে। এই চাপে পড়ে অনেক কৃষকই ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা। তাদের পক্ষে বারবার ক্ষতির ধাক্কা সামলে উঠে আবার নতুনভাবে চাষাবাদ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো অঞ্চলে দেখা গেছে, কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী ফসল বাদ দিয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ ও লাভজনক অন্য চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমানেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। একইসঙ্গে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে এমন জাত ও পদ্ধতি উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে যা কঠিন জলবায়ু পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কৃষি খাতকে সচল রাখা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে এখনই পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
কলম্বোর সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাব ময়দানে চলমান দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে ব্যাট হাতে আবারও ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের। টস জিতে ব্যাট করতে নেমে প্রথম ইনিংসে টাইগাররা সংগ্রহ করে মাত্র ২২০ রান, যেখানে ব্যতিক্রম ছিলেন কেবল শোয়াড ইসলাম (৪৬), মুশফিকুর রহিম (৩৫) ও লিটন দাস (৩৪)। শ্রীলঙ্কার বোলাররা শুরু থেকেই চাপ সৃষ্টি করে রাখে। ডেবিউ করা স্পিনার সোনাল দিনুষা ৩ উইকেট নিয়ে আলো ছড়ান, আর আসিথা ফার্নান্দো ও বিষ্ণু ফার্নান্দো নেন ২টি করে উইকেট। প্রথম ইনিংসের জবাবে দ্বিতীয় দিন সকালে শ্রীলঙ্কা উদ্বোধনী জুটি থেকে ভালো সূচনা পায়। ১৩.১ ওভারে কোন উইকেট না হারিয়ে সংগ্রহ করেছে ৬২ রান। ওপেনার পাথুম নিসান্কা ৩৩ এবং লাহিরু উদারা ২৮ রানে অপরাজিত রয়েছেন। বাংলাদেশের হয়ে তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ বোলিং শুরু করলেও এখনও পর্যন্ত সাফল্যের দেখা মেলেনি। শ্রীলঙ্কা এখনো বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস থেকে ১৫৮ রানে পিছিয়ে আছে, হাতে রয়েছে সকল উইকেট। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে প্রভাব এই টেস্টটি ২০২৩-২৫ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ হওয়ায় দুই দলের জন্যই পয়েন্টের লড়াই গুরুত্বপূর্ণ। সিরিজের প্রথম টেস্টে পরাজিত হওয়ায় বাংলাদেশ সিরিজে টিকে থাকতে হলে এই ম্যাচ জিততেই হবে। পরবর্তী চ্যালেঞ্জ স্লো পিচে বাংলাদেশ বোলারদের আরও পরিকল্পিত বোলিং করতে হবে। দ্রুত উইকেট তুলে না নিতে পারলে শ্রীলঙ্কা বড় লিড নিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে দেবে টাইগারদের। ফিল্ডিংয়ে মনোযোগ এবং টাইট বোলিংয়ের মাধ্যমেই দ্বিতীয় ইনিংসে নিজেদের ফিরে পাওয়ার আশায় বাংলাদেশ। সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড (দিন ২, প্রথম সেশন পর্যন্ত): বাংলাদেশ (১ম ইনিংস): ২২০/১০ শ্রীলঙ্কা (১ম ইনিংস): ৬২/০ (১৩.১ ওভার) নিসান্কা: ৩৩*, উদারা: ২৮* বাংলাদেশ বোলার: তাইজুল, মিরাজ – উইকেটহীন
বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসংকটের চরম বাস্তবতায় যখন সারা দেশে লোডশেডিং এবং বিলের বাড়তি বোঝা জনজীবনকে বিপর্যস্ত করছে, ঠিক তখন সবুজ জ্বালানি বা নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে সরকার ক্রমাগত উৎসাহিত করে যাচ্ছে। তবে নীতি আর নির্দেশনার বাইরে এসে কীভাবে বাস্তব ক্ষেত্রে এই রূপান্তর ঘটানো সম্ভব, তার এক অনন্য ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের জোরারগঞ্জ বৌদ্ধ উচ্চবিদ্যালয় (জেবি স্কুল)। সরকারের আহ্বানে সাড়া দিয়ে স্বপ্রণোদিত উদ্যোগ যে কত বড় সুফল বয়ে আনতে পারে, এই প্রতিষ্ঠান আজ তার এক বাস্তব প্রমাণ।বিদ্যালয়টির তিনটি ভবনের দুটির ছাদে ১২ কিলোওয়াট ক্ষমতার সৌর প্যানেল বসিয়ে চালানো হচ্ছে শতাধিক ফ্যান, বাতি, কম্পিউটার এমনকি প্রধান শিক্ষকের কক্ষের শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্রও (এসি)। তিন বছর আগে প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব অর্থায়নে গৃহীত এই পদক্ষেপ তাদের বিদ্যুৎ বিলের খরচ মাসে ৩০ হাজার টাকা থেকে কমিয়ে চার-পাঁচ হাজার টাকায় নামিয়ে এনেছে। বর্তমান বাজারদর বিবেচনায় যেখানে মাসে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা বিল গুনতে হতো, সেখানে কেবল সৌরবিদ্যুতের সুবাদে প্রতি মাসে প্রতিষ্ঠানের এক বিশাল অঙ্ক সাশ্রয় হচ্ছে।কিন্তু জেবি স্কুলের এই সাফল্যের গল্প কেবল আর্থিক সাশ্রয়েই সীমাবদ্ধ নয়; এর সামাজিক ও শিক্ষাসংক্রান্ত প্রভাব আরও গভীর। উপকূলীয় বা গ্রামীণ এলাকায় বিদ্যুৎ–বিভ্রাটের কারণে শ্রেণিকক্ষে যে তীব্র গরম ও অস্বস্তি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনাকে বিঘ্নিত করে, সৌরশক্তি তা স্থায়ীভাবে নিরসন করেছে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের সুবিধায় শিক্ষার্থীরা গরমে স্বস্তিতে ক্লাস করতে পারছে, যার প্রত্যক্ষ ইতিবাচক প্রতিফলন দেখা গেছে তাদের সাম্প্রতিক ফলাফলে—চলতি বছর মাধ্যমিক পরীক্ষায় মিরসরাই উপজেলায় সেরা হয়েছে এই জেবি স্কুল।জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা এবং বৈশ্বিক জ্বালানিসংকট কাটাতে সৌরবিদ্যুতের মতো পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই। উপজেলা প্রশাসন যেমনটি উল্লেখ করেছে, সরকার বর্তমানে নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসারে নানা প্রণোদনা দিচ্ছে। তবে সরকারি সুবিধার প্রতি মুখাপেক্ষী না হয়ে একটি বেসরকারি বা স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যদি নিজস্ব উদ্যোগে ২৪ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে বিদ্যুতে স্বাবলম্বী হতে পারে, তবে দেশের অন্য সরকারি-বেসরকারি বিদ্যালয়, কলেজ, হাসপাতাল ও সরকারি দপ্তরগুলো কেন নয়?দেশের হাজার হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি-বেসরকারি ভবন যদি জেবি স্কুলের এই ‘সবুজ মডেল’ অনুসরণ করে নিজেদের ছাদগুলোকে সৌরশক্তি উৎপাদনের কেন্দ্রে রূপান্তর করে, তবে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ যেমন অভাবনীয়ভাবে কমবে, তেমনি পরিবেশবান্ধব এক টেকসই বাংলাদেশ গড়ার পথও মসৃণ হবে। জেবি স্কুলের এই উদ্যোগ দেশের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের জন্য এক অনুকরণীয় দিকনির্দেশনা। আমরা জেবি স্কুল কর্তৃপক্ষের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই।
করপোরেট দুনিয়ায় টিকে থাকতে এবং ক্যারিয়ারে সফল হতে এখন আর্থিক জ্ঞান বা ফিন্যান্সিয়াল লিটারেসির কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু যাঁদের অ্যাকাউন্টিং বা হিসাববিজ্ঞানের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাকগ্রাউন্ড নেই, তাঁরা প্রায়ই ব্যবসার হিসাব-নিকাশ বুঝতে এবং কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েন। এই বাস্তব সমস্যা সমাধানে দেশের শীর্ষস্থানীয় বিজনেস স্কুল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (আইবিএ) চালু করেছে একটি বিশেষ সার্টিফিকেট কোর্স। কোর্সটির শিরোনাম ‘অ্যাকাউন্টিং ফর নন-অ্যাকাউন্ট্যান্টস’ বা সংক্ষেপে এএফএনএ। পরিবর্তনশীল অর্থনৈতিক ও ব্যবসায়িক গতিশীলতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে ম্যানেজারদের ব্যবস্থাপনা দক্ষতা আরও শাণিত করতেই আইবিএর ম্যানেজমেন্ট ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের আওতায় এই ছয় সপ্তাহের কোর্স ডিজাইন করা হয়েছে।কেন প্রয়োজনযাঁদের হিসাববিজ্ঞানে সামান্য বা কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই, অথচ ব্যবসায়িক লেনদেন রেকর্ড, সারাংশ ও করপোরেট সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য সেগুলো বোঝা জরুরি, মূলত তাঁদের জন্যই এই কোর্স সাজানো হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএর অধ্যাপক ড. মহিউদ্দিন বলেন, ছয় সপ্তাহব্যাপী এই কোর্সের সিলেবাস বেশ বিস্তৃত ও আধুনিক। এতে ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্টিংয়ের পাশাপাশি কস্ট ও ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্টিংয়ের মূল বিষয়গুলো খুব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। অংশগ্রহণকারীরা অ্যাকাউন্টিং সিস্টেম, আর্থিক বিবরণী (ফিন্যান্সিয়াল স্টেটমেন্ট), বার্ষিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ, আর্থিক কর্মক্ষমতা মূল্যায়ন, খরচ হিসাব করার পদ্ধতি, বাজেট প্রণয়নপ্রক্রিয়া, ভ্যারিয়েন্স অ্যানালাইসিস এবং ইনক্রিমেন্টাল অ্যানালাইসিসের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো শিখতে পারবেন। এর ফলে একজন ম্যানেজার তাঁর দৈনন্দিন ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের দক্ষতা বহুগুণ বাড়িয়ে নিতে সক্ষম হবেন।অস্ট্রেলিয়ায় বিদেশি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পরিবার আনার সুযোগ বন্ধের প্রস্তাবকোর্সের তথ্যকোর্সটির ক্লাস পরিচালনার জন্য সময় নির্ধারণ করা হয়েছে বেশ সুবিধাজনক। প্রতি শুক্রবার সকাল সাড়ে ৯টা এবং বেলা ২টা ১৫ মিনিটে আইবিএতে ক্লাসগুলো অনুষ্ঠিত হবে। এই কোর্সে আবেদন করার জন্য কিছু নির্দিষ্ট যোগ্যতা প্রয়োজন। প্রার্থীকে যেকোনো বিষয়ে ব্যাচেলর ডিগ্রিধারী হতে হবে এবং কোনো খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠানে অন্তত দুই বছরের কাজের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।আবেদনপ্রক্রিয়াঅনলাইনে আবেদনের শেষ তারিখ আগামী ৬ অক্টোবর। এরপর বাছাইকৃত প্রার্থীদের রোলিং ভিত্তিতে ইন্টারভিউর জন্য ডাকা হবে এবং চূড়ান্ত নির্বাচনের পর নির্বাচিতদের মোট ৩২,০০০ টাকা কোর্স ফি পরিশোধ করতে হবে। আগামী ৬ নভেম্বর থেকে এই কোর্সের ক্লাস আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে।বিনা মূল্যে এআই প্রশিক্ষণ, দিনে ভাতা ২০০, যাঁরা আবেদনের যোগ্য যোগাযোগআইবিএ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং দেশের অন্যান্য নামী বিজনেস স্কুলের অভিজ্ঞ শিক্ষক ছাড়াও শিল্প খাতের শীর্ষস্থানীয় পেশাজীবীরা রিসোর্স পারসন হিসেবে এই কোর্সে ক্লাস নেবেন। তত্ত্বীয় জ্ঞানের পাশাপাশি কেস স্টাডি, ব্যক্তিগত ও দলগত অ্যাসাইনমেন্ট এবং পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করা হবে। কোর্স সফলভাবে শেষ করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ থেকে সার্টিফিকেট প্রদান করা হবে, যা অংশগ্রহণকারীদের পেশাগত জীবনে বড় ধরনের ভ্যালু যোগ করবে। বিস্তারিত তথ্য বা আবেদনের জন্য আগ্রহীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএর চতুর্থ তলার (রুম নং-৪০২) ম্যানেজমেন্ট ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামে যোগাযোগ করতে পারেন অথবা ০১৭৬৬-৯৯৩৩৯০ ও ০১৭২৬-৮৮৫৩২৯ নম্বরে ফোন করতে কিংবা mdp@iba-du.edu মেইলে যোগাযোগ করতে পারেন।জার্মানি থেকে মালয়েশিয়া—কম খরচে পড়াশোনার ১০ দেশ
গাইবান্ধা সদর উপজেলার উত্তর ফলিয়া গ্রামে ছোট্ট একটি টিনের ঘরের মেঝেতে বসে রঙিন কাগজ মেপে মেপে কাটছেন শরিফুল ইসলাম। কাগজে আঠা লাগিয়ে ভেতরে কলমের শিষ ঢুকিয়ে পেঁচিয়ে তৈরি করছেন কলম। গত মঙ্গলবার সকালে সেখানে গিয়ে এমন দৃশ্যই দেখা যায়। জন্মগত দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শরিফুল (২৯)। দশম শ্রেণি পর্যন্ত ব্রেইল পদ্ধতিতে পড়েছেন। এরপর অডিও শুনে ও শ্রুতলেখকের সহযোগিতায় এসএসসি থেকে স্নাতকোত্তর পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। অর্থসংকটে পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলে খাতা ও পরে কাগজের কলম বানানো শুরু করেন। সেগুলো বিক্রি করে পাওয়া আয়েই নিজের পড়াশোনার খরচ চালিয়েছেন তিনি। ২০১৫ সালে গাইবান্ধা ইসলামিয়া উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ২০১৭ সালে গাইবান্ধা সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন শরিফুল। ২০১৮ সালে ভর্তি হন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগে। ২০২১ সালে স্নাতক (সম্মান) ও ২০২৫ সালে স্নাতকোত্তর পাস করেন।শরিফুলের বাবা রফিকুল ইসলাম (৭৬) মুদিদোকানি। মা মনোয়ারা বেগম গৃহিণী। পাঁচ ভাই–বোনের মধ্যে শরিফুল চতুর্থ। দুই বোন রাশেদা ও ফরিদার বিয়ে হয়েছে। দুই ভাই শহিদুল ও মোস্তফা ঢাকায় পোশাকশ্রমিকের কাজ করেন। ২০২২ সালে গাইবান্ধা শহরের ব্রিজ রোড এলাকার তানিয়া আকতারের সঙ্গে শরিফুলের বিয়ে হয়।শরিফুল ইসলাম, উদ্যোক্তা‘কাগজের কলম ব্যবহারের পর ফেলে দিলে শুধু শিষ ও নিব ছাড়া বাকি অংশ সহজেই পচে যায়। প্লাস্টিকের অন্যান্য কলমের চেয়ে এতে পরিবেশের ক্ষতি কম হয়।’ ২০২৩ সালের মার্চ মাসে শরিফুল খাতা তৈরির কাজ শুরু করেন। কাগজ কিনে খাতা তৈরি করে বিক্রি করতেন। মাসিক আয় হতো প্রায় এক হাজার টাকা। ওই বছরের অক্টোবরে রংপুরের এক বন্ধুর কাছ থেকে তিনি কাগজ দিয়ে কলম তৈরির কথা জানতে পারেন। স্থানীয় এক বন্ধুর মাধ্যমে ফেসবুকে যশোরের এক নারী উদ্যোক্তার খোঁজ পান। তিনি কাগজ দিয়ে কলম তৈরি করতেন। তাঁর সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করে ১০০টি কলম কিনে নেন শরিফুল। একই সঙ্গে কলম তৈরির পদ্ধতিও শিখে নেন। এরপর নভেম্বর মাসে তিনি নিজেই কলম বানানো শুরু করেন।কাগজের তৈরি কলম। গত মঙ্গলবার সকালে গাইবান্ধা সদর উপজেলার উত্তর ফলিয়া গ্রামেশরিফুল তাঁর কলমের নাম দিয়েছেন ‘গ্রিন ইকোনমি’। তাঁর মতে, এই কলম অনেকটাই পরিবেশবান্ধব। তিনি বলেন, ‘কাগজের কলম ব্যবহারের পর ফেলে দিলে শুধু শিষ ও নিব ছাড়া বাকি অংশ সহজেই পচে যায়। প্লাস্টিকের অন্যান্য কলমের চেয়ে পরিবেশের ক্ষতি কম হয়। ভবিষ্যতে বড় পরিসরে এই কাজ করতে চাই; কিন্তু মূলধনের অভাবে চাহিদা অনুযায়ী কলম ও খাতা তৈরি করতে পারছি না।’একটি কলম তৈরিতে শরিফুলের খরচ হয় ৬ টাকা, বিক্রি করেন ১০ টাকায়। বর্তমানে দিনে প্রায় ৫০টি কলম তৈরি করতে পারেন। পাশাপাশি দিনে প্রায় ১০০টি খাতা তৈরি করেন। প্রতিটি খাতা তৈরিতে খরচ ১৫ টাকা, বিক্রি করেন ২০ টাকায়। এসব কাজে সহযোগিতা করেন তাঁর স্ত্রী তানিয়া আকতার। বাড়িতে তৈরি এসব কলম ও খাতা বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও দোকানে পাইকারি বিক্রি করেন শরিফুল।নিজের তৈরি কলম দেখাচ্ছেন শরিফুল। গত মঙ্গলবার সকালে গাইবান্ধা সদর উপজেলার উত্তর ফলিয়া গ্রামেমা–বাবা ও স্ত্রীকে নিয়ে একই পরিবারে থাকেন শরিফুল। সদর উপজেলার পুলবন্দি বাজারে তাঁর ‘শরিফুল পেপার হাউস’ নামের একটি ছোট দোকান আছে। দোকানের ভাড়া মাসে ৫০০ টাকা। প্রতি মাসে ৯ থেকে ১০ হাজার টাকার খাতা–কলম বিক্রি করেন তিনি। খরচ বাদ দিয়ে মাসে তিন থেকে চার হাজার টাকা আয় হয় তাঁর। তবে এ আয়ে সংসার চলে না। বাবা রফিকুল ইসলামের মুদিদোকানের আয়ে সংসারের বেশির ভাগ খরচ চলে।তানিয়া আকতার বলেন, ‘স্বামী দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হলেও তাঁকে নিয়ে আমি গর্বিত। সব সময় তাঁকে উৎসাহ দিই।’নিজের দোকানে বসে আছেন শরিফুল। গত মঙ্গলবার সকালে গাইবান্ধা সদর উপজেলার পুলবন্দি বাজারেশরিফুল সমাজের বোঝা হয়ে থাকেননি উল্লেখ করে পুলবন্দি গ্রামের স্কুলশিক্ষক জাহিদুল ইসলাম বলেন, নিজের মেধা ও ইচ্ছাশক্তি কাজে লাগিয়ে তিনি নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছেন। তাঁর এই উদ্যোগ অন্যদের জন্যও দৃষ্টান্ত।২৪ সেপ্টেম্বর থেকে গাইবান্ধায় বাণিজ্যমেলা শুরু হবে। মেলায় কলম ও খাতা বিক্রির জন্য একটি স্টল বরাদ্দ পেয়েছেন শরিফুল। আয়োজক গাইবান্ধা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি সামিউল হুদা জানান, মেলায় প্রায় ৭০টি স্টল থাকবে। এর মধ্যে প্রতিবন্ধী ও নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ১০ টাকায় স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।