যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। আবার, মধ্যবর্তী নির্বাচনের বাকি দুই মাসেরও কম। এমন পরিস্থিতিতে ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে নিজের ব্যর্থ প্রচেষ্টার পুরোনো কৌশলে ফিরেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এবার জ্বালানির দাম বাড়ার জন্য ইউক্রেনকেই দায়ী করছেন তিনি।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এমন অবস্থান ইউক্রেনের জন্য কঠিন সময়ে এসেছে। একই সঙ্গে, এটি রাশিয়ার জন্য কূটনৈতিক সুবিধার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
গত রোববার ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ‘জেলেনস্কিকে একটি কাজ করতে হবে। তাকে রাশিয়ায় ডিজেল জ্বালানি উৎপাদনকেন্দ্রে হামলা বন্ধ করতে হবে। এটা বিশ্বকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।’
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির উদ্দেশে তিনি এ মন্তব্য করেন।
ট্রাম্পের বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জ্বালানি বাজার বিশ্লেষকেরা। টেক্সাসভিত্তিক প্রতিষ্ঠান লিপো অয়েল অ্যাসোসিয়েটসের অ্যান্ডি লিপোর হিসাব অনুযায়ী, ইউক্রেনের হামলার জবাবে রাশিয়া ডিজেল রপ্তানি নিষিদ্ধ করায় বিশ্ববাজারে প্রতিদিন প্রায় আট লাখ ব্যারেল ডিজেল কম এসেছে।
অন্যদিকে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে প্রতিদিন প্রায় ১২ লাখ ব্যারেল জ্বালানি বাজারের বাইরে চলে গেছে। তাই ইউক্রেন রুশ তেল শোধনাগারে হামলা বন্ধ করলেই জ্বালানির মূল্যসংকটের সমাধান হবে—এমন দাবি সঠিক নয় বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।
ইউক্রেন দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়ার তেল শোধনাগার ও জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা চালিয়ে আসছে। কিয়েভের দৃষ্টিতে এসব স্থাপনা রাশিয়ার যুদ্ধযন্ত্র সচল রাখার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বিশেষ করে ইউক্রেন যখন রুশ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে রয়েছে এবং আকাশ প্রতিরক্ষার ঘাটতিতে ভুগছে, তখন রাশিয়ার ভূখণ্ডে জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা তাদের হাতে থাকা সীমিত পাল্টা ব্যবস্থাগুলোর একটি।
এর মধ্যেই সামনে আসছে শীতকাল। ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে রাশিয়া হামলা চালাতে পারে—এমন আশঙ্কাও রয়েছে।
সোমবার ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দাবি করেন, রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয়েই একে অপরের জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধ করতে সম্মত হয়েছে।
তবে পরবর্তী বক্তব্যে বিষয়টি নিয়ে ভিন্ন চিত্র পাওয়া যায়। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ প্রস্তাবটিকে ‘খুব ভালো ধারণা’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে।
পেসকভ বলেন, রাশিয়া সব সময় শান্তিপূর্ণ সমাধানের পক্ষে। তবে একই সঙ্গে তিনি রাশিয়ার জ্বালানি রপ্তানির ওপর থাকা বিভিন্ন বাধার বিষয়টি সামনে আনেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানি সরবরাহের সক্ষমতা এখন প্রায় পূর্ণ। সমস্যা উৎপাদনে নয়, বরং এসব পণ্য নির্বিঘ্নে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে দেওয়ায়।
এরপর পেসকভ রুশ তেলবাহী ট্যাংকারে ইউক্রেনের সাম্প্রতিক হামলার প্রসঙ্গ তোলেন। রাশিয়ার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবিও সামনে আনেন তিনি।
পেসকভের বক্তব্য, নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হলেই বিশ্বে জ্বালানি পণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
রাশিয়ার ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা নিয়েও নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হলে এ বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার ওপর থাকা কিছু নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করেছিল।
তবে একই সময়ে রাশিয়ার বিরুদ্ধে নতুন পদক্ষেপও নিয়েছে ওয়াশিংটন। চলতি সপ্তাহে ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে রাশিয়ার অন্যতম বড় একটি ব্যাংকের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন।
এ ছাড়া রাশিয়ার বিরুদ্ধে ব্যাপক নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপের একটি বিল নিয়েও মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে ভোটের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম জীবিত থাকাকালে বিলটির অন্যতম প্রণেতা ছিলেন।
ট্রাম্পের সাম্প্রতিক অবস্থান ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির জন্য নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। মাত্র এক সপ্তাহ আগেই ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির প্রতিনিধিরা প্রথমবারের মতো কিয়েভ সফর করেন। সেখানে তারা জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠক করেন এবং কূটনৈতিক অগ্রগতির সম্ভাবনার কথা বলেন।
তবে এর আগে ওই প্রতিনিধিরা রাশিয়া সফর করেছিলেন। পরে ট্রাম্প রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ফোনে কথা বললেও জেলেনস্কির সঙ্গে ফোনালাপ হয়নি।
ইউক্রেনকে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সরবরাহ নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। ট্রাম্প চলতি সপ্তাহে বলেন, কিয়েভকে প্যাট্রিয়টের ‘কম উন্নত সংস্করণ’ দেওয়ার বিষয়টি তারা বিবেচনা করছেন।
রাশিয়া বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল উৎপাদক দেশ। ফলে মস্কোর ওপর চাপ সৃষ্টি করতে গিয়ে বিশ্ববাজারে জ্বালানির সরবরাহ ও দাম কীভাবে প্রভাবিত হবে, তা নিয়ে যুদ্ধের শুরু থেকেই প্রশ্ন রয়েছে।
জ্বালানির দাম বাড়লে রাশিয়ার ওপর আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের রাজনৈতিক চাপও যেমন বাড়ে, তেমনি নিজেদের অর্থনীতি ও ভোক্তাদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়।
ইউক্রেন যুদ্ধের ক্ষেত্রে তাই যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন আবারও সামনে এসেছে। রাশিয়ার ওপর কীভাবে অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানো হবে, অথচ সেই চাপের কারণে নিজেদের জ্বালানি বাজার ও সাধারণ মানুষের ব্যয় যেন আরও বেড়ে না যায়—এ ভারসাম্যই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
সূত্র: সিএনএন
কেএএ/
শরীয়তপুরের কাজীরহাট এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মাস্টার মোস্তফা কাজীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, প্রভাব খাটানো ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হন মোস্তফা কাজী। এরপর থেকে এলাকায় বিভিন্ন জমি দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৬ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে কাজীরহাট বাজারের দোকানপ্রতি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা কাজী। এছাড়া কয়েক মাস আগে কাজীরহাটে একটি দোকান ক্রয়ের সময় ব্যবসায়ী সুমন তপাদারের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী আরও জানান, বি. কে. নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলামের কাছ থেকেও ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন মানুষকে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় ফেলে হয়রানি করার অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন মোস্তফা কাজী। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির ব্যানারে তার কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন অনেকে। এছাড়া বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি নিজ ভগ্নিপতি সিদ্দিক দেওয়ানের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোস্তফা কাজীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সচেতন মহল বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
ইউরোপের রাজধানী ব্রাসেলসে আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা জোরালো করা। এই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত আছেন। গত বছরের শুরু থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের কারণে সারা ইউরোপ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ইউরোপীয় নেতারা এখন যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরিতে কাজ করছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, “আমরা যুদ্ধের মানবিক সংকট বুঝতে পারি এবং এখন আমাদের দায়িত্ব এটি দ্রুত শেষ করার পথ খোঁজা। আমাদের প্রত্যেকের জন্যই শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।” এই বৈঠকে অস্ত্রবিরতি চুক্তি, যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলো যুদ্ধ সমাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এগুলো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ক্রমবর্ধমান পরীক্ষার চাপ এবং পরিবারের পাশাপাশি সমাজের অযৌক্তিক প্রত্যাশা। এ দুটি কারণ মিলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বেড়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা। ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করা যেন শিক্ষার্থীর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ—সব জায়গা থেকেই উচ্চ ফলাফলের প্রত্যাশা তৈরি করছে মানসিক চাপের একটি অব্যক্ত বলয়। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইহান কবির বলেন, “পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে মনে হয়, শুধু আমি না, আমার পুরো পরিবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এটা সহ্য করা খুব কঠিন।” শুধু রাইহান নয়, দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা একই অভিজ্ঞতার কথা বলছে। সামাজিক চাপ ও তুলনার সংস্কৃতি পরিস্থিতি করছে আরও জটিল পরীক্ষার নম্বর নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এখন তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া গর্ব বা অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কোন কলেজে ভর্তি হলো, কে কতো পেল—এসব তুলনার চাপে পড়াশোনার আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা তাবাসসুম বলেন, “প্রত্যাশা থাকা ভালো, কিন্তু তা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায় এবং একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব সক্ষমতা উপেক্ষা করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়। এ থেকেই জন্ম নেয় আত্মগ্লানি, হতাশা এবং মাঝে মাঝে আত্মহননের চিন্তা।” জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ নিয়মিত মানসিক চাপে থাকে। এর মধ্যে ১২ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগে এবং বড় একটি অংশ কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই দিন পার করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে ক্ষতিকর। সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, এবং পরিবারের ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ এই সমস্যার নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম হয়, সেখানে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাকে কেবল ফলাফলের সীমায় না এনে একটি মানবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা চাপ নয়, ভালোবাসা থেকে শিখবে, এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ প্রজন্ম।
বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কৃষিখাতকে চরমভাবে আঘাত করছে। অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘদিন খরা এবং হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ফসল উৎপাদনে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে। চলতি মৌসুমেই অনেক জেলায় ধান, গম, ভুট্টা এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, একদিকে যেমন আবহাওয়ার আচরণ বুঝে ওঠা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সারের দাম, কীটনাশক ও বীজের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পোকার আক্রমণ ও রোগবালাইয়ের হারও বেড়ে গেছে। এই চাপে পড়ে অনেক কৃষকই ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা। তাদের পক্ষে বারবার ক্ষতির ধাক্কা সামলে উঠে আবার নতুনভাবে চাষাবাদ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো অঞ্চলে দেখা গেছে, কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী ফসল বাদ দিয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ ও লাভজনক অন্য চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমানেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। একইসঙ্গে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে এমন জাত ও পদ্ধতি উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে যা কঠিন জলবায়ু পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কৃষি খাতকে সচল রাখা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে এখনই পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
কলম্বোর সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাব ময়দানে চলমান দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে ব্যাট হাতে আবারও ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের। টস জিতে ব্যাট করতে নেমে প্রথম ইনিংসে টাইগাররা সংগ্রহ করে মাত্র ২২০ রান, যেখানে ব্যতিক্রম ছিলেন কেবল শোয়াড ইসলাম (৪৬), মুশফিকুর রহিম (৩৫) ও লিটন দাস (৩৪)। শ্রীলঙ্কার বোলাররা শুরু থেকেই চাপ সৃষ্টি করে রাখে। ডেবিউ করা স্পিনার সোনাল দিনুষা ৩ উইকেট নিয়ে আলো ছড়ান, আর আসিথা ফার্নান্দো ও বিষ্ণু ফার্নান্দো নেন ২টি করে উইকেট। প্রথম ইনিংসের জবাবে দ্বিতীয় দিন সকালে শ্রীলঙ্কা উদ্বোধনী জুটি থেকে ভালো সূচনা পায়। ১৩.১ ওভারে কোন উইকেট না হারিয়ে সংগ্রহ করেছে ৬২ রান। ওপেনার পাথুম নিসান্কা ৩৩ এবং লাহিরু উদারা ২৮ রানে অপরাজিত রয়েছেন। বাংলাদেশের হয়ে তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ বোলিং শুরু করলেও এখনও পর্যন্ত সাফল্যের দেখা মেলেনি। শ্রীলঙ্কা এখনো বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস থেকে ১৫৮ রানে পিছিয়ে আছে, হাতে রয়েছে সকল উইকেট। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে প্রভাব এই টেস্টটি ২০২৩-২৫ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ হওয়ায় দুই দলের জন্যই পয়েন্টের লড়াই গুরুত্বপূর্ণ। সিরিজের প্রথম টেস্টে পরাজিত হওয়ায় বাংলাদেশ সিরিজে টিকে থাকতে হলে এই ম্যাচ জিততেই হবে। পরবর্তী চ্যালেঞ্জ স্লো পিচে বাংলাদেশ বোলারদের আরও পরিকল্পিত বোলিং করতে হবে। দ্রুত উইকেট তুলে না নিতে পারলে শ্রীলঙ্কা বড় লিড নিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে দেবে টাইগারদের। ফিল্ডিংয়ে মনোযোগ এবং টাইট বোলিংয়ের মাধ্যমেই দ্বিতীয় ইনিংসে নিজেদের ফিরে পাওয়ার আশায় বাংলাদেশ। সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড (দিন ২, প্রথম সেশন পর্যন্ত): বাংলাদেশ (১ম ইনিংস): ২২০/১০ শ্রীলঙ্কা (১ম ইনিংস): ৬২/০ (১৩.১ ওভার) নিসান্কা: ৩৩*, উদারা: ২৮* বাংলাদেশ বোলার: তাইজুল, মিরাজ – উইকেটহীন
স্টার্টআপ ও ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ব্যবসা পরিচালনা, স্বয়ংক্রিয়করণ ও দক্ষতা বাড়াতে এআইভিত্তিক প্রযুক্তি সমাধান দেবে অলীন। এ লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানটি অন্যরকম উদ্যোক্তার সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক সই করেছে।এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। অংশীদারত্বের আওতায় অন্যরকম উদ্যোক্তার অধীন ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা নিজেদের ব্যবসার প্রয়োজন অনুযায়ী অলীনের তৈরি এআইভিত্তিক প্রযুক্তি সমাধান ব্যবহারের সুযোগ পাবেন।অলীনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সহপ্রতিষ্ঠাতা মো. জিয়াউল হক ভূঁইয়া বলেন, ‘আমরা চাই, এআই ও অটোমেশন শুধু বড় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে স্টার্টআপ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের কাছেও সহজলভ্য হোক। এ অংশীদারত্বের মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের বাস্তব ব্যবসায়িক সমস্যার প্রযুক্তিনির্ভর সমাধান দিতে এবং আরও দক্ষ ও সুগঠিত ব্যবসা গড়ে তুলতে সহায়তা করতে চাই।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) এক বছরের মেয়াদ পূর্ণ হওয়া উপলক্ষে নিজেদের কার্যক্রম ও অর্জনের খতিয়ান তুলে ধরেছে ইসলামী ছাত্রশিবির-সমর্থিত প্যানেল ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোটের’ নেতারা। আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে ডাকসু ভবনের সামনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এক বছরের বিভিন্ন উদ্যোগ ও অর্জনের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অসহযোগিতা এবং বাজেট না পাওয়ার অভিযোগ করেন তাঁরা। শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায় ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পুরো বছর কাজ করেছেন এবং এক বছরের কাজকে ৪১টি খাতে ভাগ করে হাজারের বেশি উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন ডাকসুর সহসভাপতি (ভিপি) সাদিক কায়েম।সাদিক কায়েম বলেন, হলের আবাসনসংকট সমাধান, রিডিং রুম আধুনিকায়ন, অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের পরিবহন সমস্যা নিরসন ও স্কিল ডেভেলপমেন্ট কর্মসূচি, নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, যৌন হয়রানি ও সাইবার বুলিং প্রতিরোধ সেল, উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় বরাদ্দ বৃদ্ধি, চিকিৎসাসেবার মান উন্নয়ন, ক্যাম্পাস পরিচ্ছন্নতা এবং বহিরাগত নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।সাদিক কায়েম বলেন, ডাকসুর ইতিহাসে এবার রেকর্ডসংখ্যক, প্রায় তিন ডজন (৩৬টি) প্রকাশনা বের করা হয়েছে।প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে সাদিক কায়েম বলেন, পুরো বছর কাজ করতে গিয়ে তাঁরা প্রশাসনের কাছ থেকে ‘বিমাতাসুলভ’ আচরণ পেয়েছেন। ডাকসুর নির্ধারিত বাজেট দেওয়া হয়নি। এমনকি খরচের সঠিক হিসাবও ডাকসুর প্রতিনিধিদের সরবরাহ করা হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।অসহযোগিতার বিষয়টি ডাকসু নেতাদের নিজস্ব বক্তব্য উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী প্রথম আলোকে বলেন, ‘তারা (ডাকসু নেতারা) যখন আমাদের কাছে এসেছে, আমরা সব কাজেই সহযোগিতা করেছি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের অসহযোগিতা করা হয়নি; বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম মেনে এবং বিধি অনুযায়ী কাজ করার জন্য আমরা তাদের পরামর্শ দিয়েছি। এ কারণে অনেক ক্ষেত্রে তারা হয়তো আমাদের ভুল বুঝতে পারে।’সহ-উপাচার্য আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী আরও বলেন, তারা হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে তাদের মতো করে কাজগুলো করতে চেয়েছে; কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় কিছু বিধি-বিধান ও নিয়মের মধ্যে চলে। কোনো ব্যক্তি বা কোনো দলের আদর্শ অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত হয় না। সে ক্ষেত্রে নিয়ম মানার জন্য তাদের হয়তো কোনো কোনো পর্যায়ে, কোনো কোনো জায়গায় অপেক্ষা করতে হয়েছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থে যেকোনো কাজে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সব সময়ই আন্তরিক ছিল।এদিকে সংবাদ সম্মেলনে পরবর্তী নির্বাচন প্রসঙ্গে সাদিক কায়েম বলেন, ১৪ সেপ্টেম্বর মেয়াদের এক বছর পূর্ণ হয়েছে। ১৫ সেপ্টেম্বর নতুন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আহ্বান জানানো হলেও প্রশাসন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। উপাচার্য ও ডাকসু সভাপতির উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ সভায় নতুন নির্বাচনের রূপরেখা ও তফসিলের দাবি প্রথম এজেন্ডা হিসেবে তোলা হলেও তা ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।সাদিক কায়েম বলেন, নব্বই-পরবর্তী সময়ে যেভাবে ছাত্রসংসদ নির্বাচন বন্ধ করে শিক্ষার্থীদের কণ্ঠ স্তব্ধ করা হয়েছিল, বর্তমান সরকারও সেই পথ অনুসরণ করতে পারে। তবে নব্বইয়ের সেই রাজনৈতিক চর্চা এখন আর চলবে না। অবিলম্বে পরবর্তী ডাকসু নির্বাচনের তফসিল ও রূপরেখা ঘোষণার দাবি জানান তিনি।২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রশিবির-সমর্থিত প্যানেল থেকে ১৪ হাজার ৪২ ভোট পেয়ে সহসভাপতি (ভিপি) নির্বাচিত হন সাদিক কায়েম। সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে ১০ হাজার ৭৯৪ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন এস এম ফরহাদ এবং সহসাধারণ সম্পাদক (এজিএস) পদে ১১ হাজার ৭৭২ ভোট পেয়ে জয়ী হন মহিউদ্দীন খান। শীর্ষ তিন পদের বাইরে ডাকসু ও হল সংসদের প্রায় বেশির ভাগ পদেও শিবির-সমর্থিত প্যানেলের প্রার্থীরা জয়ী হন। গত বছর ১৪ সেপ্টেম্বর তাঁরা আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব নেন।
সৈকতের তীরে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকালে অনেকেরই মনে হয়, বিশাল নীল আকাশ যেন সমুদ্রের জল ছুঁয়ে গেছে। ভ্রমণপিপাসুদের চোখে আরেকটি বিষয়ও সহজেই ধরা পড়ে—সমুদ্রের পানির নিয়মিত ওঠানামা। কখনো পানি এগিয়ে আসে তীরের দিকে, আবার কিছু সময় পর ধীরে ধীরে সরে যায় গভীর সমুদ্রের দিকে। এই নিয়মিত ওঠানামাই জোয়ার-ভাটা নামে পরিচিত।বাংলাদেশের উপকূলসহ বিশ্বের অধিকাংশ উপকূলীয় এলাকায় সাধারণত দিনে দুইবার জোয়ার ও দুইবার ভাটা দেখা যায়। তবে জোয়ার-ভাটার নির্দিষ্ট সময় প্রতিদিন একই থাকে না। চাঁদের পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ এবং পৃথিবীর নিজ অক্ষে ঘূর্ণনের কারণে দুটি উচ্চ জোয়ারের ব্যবধান প্রায় ১২ ঘণ্টা ২৫ মিনিট। ফলে প্রতিদিন জোয়ারের সময় প্রায় ৫০ মিনিট করে পিছিয়ে যায়। স্থানীয় উপকূলের আকৃতি, সমুদ্রের গভীরতা, দ্বীপ, নদীমোহনা ও অন্যান্য ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের কারণে জোয়ার-ভাটার সময় ও উচ্চতাও স্থানভেদে পরিবর্তিত হয়।পর্যটক কিংবা প্রকৃতিপ্রেমীদের মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে—সমুদ্রের জল কেন একবার তীরে উঠে আসে এবং আরেকবার সরে যায় গভীর সমুদ্রের দিকে? এই ওঠানামার পেছনে কী কাজ করে? সমুদ্রের বিশাল জলরাশিকে আসলে কোন শক্তি নিয়মিতভাবে প্রভাবিত করে?অনেকেরই হয়তো জানা আছে, পৃথিবীর জোয়ার-ভাটার প্রধান কারণ হলো চাঁদের মহাকর্ষীয় আকর্ষণ। তবে শুধু চাঁদই নয়, সূর্যের মহাকর্ষও জোয়ার-ভাটায় ভূমিকা রাখে। চাঁদ পৃথিবীর তুলনামূলকভাবে অনেক কাছে থাকায় জোয়ার সৃষ্টিতে তার প্রভাব সূর্যের চেয়ে বেশি।চাঁদ এবং সমুদ্রের জলের মধ্যে কিসের সম্পর্কচাঁদ পৃথিবীর সমুদ্রের জলকে কোনো যান্ত্রিক শক্তি দিয়ে টেনে নেয় না; বরং চাঁদের মহাকর্ষীয় আকর্ষণ পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে ভিন্ন মাত্রায় কাজ করে। চাঁদের সবচেয়ে কাছের পৃথিবীর অংশে এই আকর্ষণ তুলনামূলক বেশি এবং দূরের অংশে তুলনামূলক কম। এই পার্থক্যই সমুদ্রের পানির বণ্টনে পরিবর্তন ঘটায় এবং জোয়ারের সৃষ্টি করে।পৃথিবী থেকে চাঁদের গড় দূরত্ব প্রায় ৩ লাখ ৮৪ হাজার কিলোমিটার। অন্যদিকে সূর্য পৃথিবী থেকে প্রায় ১৫ কোটি কিলোমিটার দূরে। সূর্য চাঁদের তুলনায় অনেক বেশি ভরযুক্ত হলেও এত দূরে অবস্থান করার কারণে জোয়ার সৃষ্টিতে তার প্রভাব চাঁদের চেয়ে কম। তবে সূর্যের মহাকর্ষও গুরুত্বপূর্ণ এবং চাঁদের সঙ্গে মিলিতভাবে এটি জোয়ারের উচ্চতা পরিবর্তন করে।চাঁদের মহাকর্ষ পৃথিবীর সমুদ্রের পানির বণ্টনে এমন পরিবর্তন ঘটায় যে পৃথিবীর চাঁদের দিকে থাকা পাশে একটি জলস্ফীতি তৈরি হয়। একই সময়ে পৃথিবীর বিপরীত পাশেও আরেকটি জলস্ফীতি তৈরি হয়। ফলে পৃথিবীর দুই বিপরীত পাশে জোয়ারের অঞ্চল সৃষ্টি হয়।এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, চাঁদের আলো সমুদ্রের পানিকে আকর্ষণ করে না। চাঁদের আলো আসলে সূর্যের আলো, যা চাঁদের পৃষ্ঠ থেকে প্রতিফলিত হয়ে আমাদের চোখে আসে। জোয়ার-ভাটার সঙ্গে সম্পর্কিত শক্তিটি হলো চাঁদের মহাকর্ষীয় আকর্ষণ।জোয়ার-ভাটা কীভাবে সৃষ্টি হয়চাঁদের মহাকর্ষ পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে সমানভাবে কাজ করে না। পৃথিবীর যে অংশটি চাঁদের দিকে মুখ করে থাকে, সেখানে চাঁদের আকর্ষণ তুলনামূলক বেশি। ফলে ওই পাশের সমুদ্রের পানিতে একটি জলস্ফীতি তৈরি হয়।অন্যদিকে পৃথিবীর বিপরীত পাশে চাঁদের মহাকর্ষীয় আকর্ষণ তুলনামূলক কম। পৃথিবী ও চাঁদের পারস্পরিক গতির কারণে সৃষ্ট জড়তার প্রভাবের সঙ্গে মহাকর্ষীয় পার্থক্যের ফলে বিপরীত পাশেও আরেকটি জলস্ফীতি তৈরি হয়। ফলে পৃথিবীর দুই বিপরীত পাশে দুটি জোয়ারি স্ফীতি তৈরি হয়।পৃথিবী নিজের অক্ষের চারদিকে ঘুরতে থাকায় বিভিন্ন উপকূলীয় অঞ্চল এই জলস্ফীতির মধ্য দিয়ে অতিক্রম করে। কোনো অঞ্চল যখন জোয়ারি স্ফীতির অংশে আসে, তখন সেখানে পানির উচ্চতা বাড়তে থাকে এবং জোয়ার দেখা যায়। আবার সেই অঞ্চল যখন দুই জোয়ারি স্ফীতির মাঝামাঝি অপেক্ষাকৃত নিচু পানির অংশে চলে যায়, তখন ভাটা দেখা যায়।তবে বাস্তব পৃথিবীতে বিষয়টি এতটা সরল নয়। পৃথিবী পুরোপুরি মসৃণ গোলক নয়। মহাদেশের অবস্থান, উপকূলের আকৃতি, সমুদ্রের গভীরতা, উপসাগর, দ্বীপ, নদীর মোহনা, বাতাস ও ঝড়সহ নানা বিষয় জোয়ার-ভাটার সময় ও উচ্চতাকে প্রভাবিত করে। এ কারণেই একই সময়ে পৃথিবীর সব জায়গায় জোয়ার হয় না।দৈনিক দুইবার জোয়ার-ভাটা কেন হয়পৃথিবীর একটি নির্দিষ্ট স্থানকে চাঁদের তুলনায় একই অবস্থানে আবার ফিরে আসতে প্রায় ২৪ ঘণ্টা ৫০ মিনিট সময় লাগে। এই সময়কে বলা হয় চন্দ্রদিন বা লুনার ডে। কারণ, পৃথিবী নিজের অক্ষে ঘোরার পাশাপাশি চাঁদও একই দিকে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করছে। ফলে পৃথিবীকে চাঁদের তুলনায় একই অবস্থানে ফিরে আসতে অতিরিক্ত প্রায় ৫০ মিনিট ঘুরতে হয়।পৃথিবীতে দুটি জোয়ারি স্ফীতি থাকায় একটি উপকূলীয় অঞ্চল সাধারণত একটি চন্দ্রদিনে দুইবার এই স্ফীতির মধ্য দিয়ে যায়। ফলে অধিকাংশ উপকূলীয় এলাকায় দিনে প্রায় দুইবার উচ্চ জোয়ার এবং দুইবার নিম্ন জোয়ার দেখা যায়। দুটি উচ্চ জোয়ারের ব্যবধান প্রায় ১২ ঘণ্টা ২৫ মিনিট। একটি উচ্চ জোয়ার থেকে পরবর্তী নিম্ন জোয়ারে যেতে গড়ে প্রায় ৬ ঘণ্টা ১২ মিনিট সময় লাগে।তবে সব উপকূলে দিনে ঠিক দুইবার জোয়ার ও দুইবার ভাটা দেখা যাবে, এমন নয়। স্থানীয় ভূপ্রকৃতি ও সমুদ্রের গঠন অনুযায়ী কোথাও জোয়ার-ভাটার ধরন ভিন্ন হতে পারে। তাই কোনো নির্দিষ্ট সৈকতে জোয়ার বা ভাটার সময় জানতে স্থানীয় জোয়ারের পূর্বাভাস দেখা প্রয়োজন।সূর্যেরও কি ভূমিকা আছে?জোয়ার-ভাটার ক্ষেত্রে চাঁদের প্রভাব সবচেয়ে বেশি হলেও সূর্যের মহাকর্ষও গুরুত্বপূর্ণ। সূর্য চাঁদের তুলনায় অনেক বেশি ভরযুক্ত, কিন্তু পৃথিবী থেকে অনেক দূরে। ফলে জোয়ার সৃষ্টিতে সূর্যের প্রভাব চাঁদের তুলনায় কম। নাসার তথ্য অনুযায়ী, সূর্যের জোয়ার-ভাটা সৃষ্টিকারী বল চাঁদের তুলনায় অর্ধেকের কম।যখন সূর্য, পৃথিবী ও চাঁদ প্রায় একই সরলরেখায় অবস্থান করে, অর্থাৎ অমাবস্যা ও পূর্ণিমার সময়—চাঁদ ও সূর্যের জোয়ার সৃষ্টিকারী প্রভাব একে অপরকে শক্তিশালী করে। তখন স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি উচ্চ জোয়ার ও বেশি নিম্ন ভাটা দেখা যায়। একে বলা হয় ভরা জোয়ার।অন্যদিকে প্রথম ও শেষ চতুর্থাংশের চাঁদের সময় সূর্য ও চাঁদ পৃথিবীর তুলনায় প্রায় সমকোণে অবস্থান করে। তখন তাদের জোয়ার সৃষ্টিকারী প্রভাব আংশিকভাবে একে অপরের বিপরীতে কাজ করে। ফলে জোয়ারের উচ্চতা তুলনামূলক কম হয়। একে বলা হয় মরা জোয়ার।চেরনোবিলের যে রাত বদলে দিয়েছিল পারমাণবিক ইতিহাসচাঁদ কীভাবে পৃথিবীর ঘূর্ণনেও প্রভাব ফেলেজোয়ার-ভাটার মাধ্যমে চাঁদ শুধু সমুদ্রের পানির ওঠানামাতেই প্রভাব ফেলে না; দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে পৃথিবীর ঘূর্ণনগতিতেও প্রভাব ফেলে। পৃথিবীর সমুদ্রের জোয়ারি স্ফীতি চাঁদের অবস্থানের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এর ফলে পৃথিবী ও চাঁদের মধ্যে জোয়ার-ভাটাজনিত ঘর্ষণ তৈরি হয়। এই প্রক্রিয়া পৃথিবীর ঘূর্ণনকে খুব ধীরে ধীরে মন্থর করে এবং একই সঙ্গে চাঁদকে পৃথিবী থেকে ধীরে ধীরে দূরে সরিয়ে দেয়।তবে এর অর্থ এই নয় যে চাঁদ না থাকলে বর্তমান পৃথিবীর দিন হঠাৎ ৬ থেকে ১২ ঘণ্টার হয়ে যেত। পৃথিবীর ঘূর্ণন, চাঁদের অবস্থান এবং পৃথিবী-চাঁদের পারস্পরিক সম্পর্ক দীর্ঘ কোটি কোটি বছরের বিবর্তনের ফল। তাই চাঁদের অনুপস্থিতিতে পৃথিবীর বর্তমান ঘূর্ণন ও দিনের দৈর্ঘ্য ঠিক কত হতো, তা একটি সরল হিসাব দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না।চাঁদ না থাকলে পৃথিবীতে কি পরিবর্তন হতে পারত?চাঁদ পৃথিবীর জোয়ার-ভাটার প্রধান চালিকা শক্তি হওয়ায় চাঁদ না থাকলে পৃথিবীর সমুদ্রের জোয়ার-ভাটার ধরন অবশ্যই বদলে যেত। সূর্য একাই জোয়ার সৃষ্টি করতে পারত, তবে তা চাঁদ ও সূর্যের সম্মিলিত বর্তমান প্রভাবের তুলনায় অনেক দুর্বল হতো। ফলে পৃথিবীর উপকূলীয় পরিবেশ ও সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটতে পারত।চাঁদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা হলো পৃথিবীর ঘূর্ণন অক্ষের স্থিতিশীলতায় সহায়তা করা। চাঁদের মহাকর্ষ পৃথিবীর অক্ষের দিকের দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। চাঁদ না থাকলে পৃথিবীর অক্ষ তুলনামূলকভাবে বেশি দুলতে পারত এবং দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে পৃথিবীর ঋতু ও জলবায়ুতে বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হতো।অর্থাৎ চাঁদ শুধু রাতের আকাশকে আলোকিত করা একটি সুন্দর মহাজাগতিক বস্তু নয়। পৃথিবীর সমুদ্রের জোয়ার-ভাটা থেকে শুরু করে পৃথিবীর ঘূর্ণন ও অক্ষের স্থিতিশীলতা—বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে চাঁদের গভীর সম্পর্ক রয়েছে।সমুদ্রের তীরে দাঁড়িয়ে যখন দেখা যায়, পানি কখনো ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে, আবার কখনো সরে যাচ্ছে, তখন সেটি শুধু সমুদ্রের স্বাভাবিক নড়াচড়া নয়। এর পেছনে কাজ করছে পৃথিবী, চাঁদ ও সূর্যের পারস্পরিক মহাকর্ষীয় সম্পর্ক এবং পৃথিবীর নিজস্ব ঘূর্ণন। প্রকৃতির এই নিয়মিত ছন্দই আমাদের কাছে জোয়ার-ভাটা নামে পরিচিত।তথ্যসূত্র: নাসা সায়েন্স, ন্যাশনাল ওকেন অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফিয়ার অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এনওএএ)বন্ধু, কক্সবাজার বন্ধুসভা এবং এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর, গ্লোবাল অনবিক রিসার্চ হাব