interview

বাউলেরা খুব বড় সামাজিক শক্তি

অক্টোবর ১৭, ২০২৬
বাউলেরা খুব বড় সামাজিক শক্তি
বাউলেরা খুব বড় সামাজিক শক্তি
<p>গবেষক <strong>আবুল আহসান চৌধুরী</strong>র এ সাক্ষাৎকার নেওয়া হয় মূলত ২০০৭ সালে প্রকাশিত তাঁর <em>লালন সাঁইয়ের সন্ধানে</em> বইটিকে কেন্দ্র করে। তবে কথোপকথনে বইটিকে ছাড়িয়ে লালন বিষয়ে আরও নানা প্রসঙ্গ উঠে আসে। সাক্ষাৎকারটি ২০০৮ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি <em>প্রথম আলো</em>র ‘সাহিত্য সাময়িকী’তে সংক্ষিপ্ত আকারে ছাপা হয়েছিল। <strong>ফিরোজ এহতেশামে</strong>র নেওয়া সাক্ষাৎকারটি এত দিন ছিল শুধু কাগজের পাতাজুড়ে। আজ লালন ফকিরের ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে সাক্ষাৎকারটির পূর্ণাঙ্গ রূপ অনলাইন পাঠকের জন্য তুলে ধরা হলো।</p><p><strong>ফিরোজ এহতেশাম: </strong><em>আপনার </em>লালন সাঁইয়ের সন্ধানে<em> বইটির ভূমিকায় আপনি লিখেছেন, লালন নিয়ে আপনার গবেষণার বয়স ৩২ বছরের বেশি। লালন বিষয়ে আপনার কখন ও কেন আগ্রহ জন্মাল?</em></p> <p><strong>আবুল আহসান চৌধুরী: </strong>আমার জন্ম লালন সাঁইয়ের আখড়া ছেঁউড়িয়ার খুব কাছেই। সেই সূত্রে আমি ছোটবেলা থেকে লালনের আখড়ায় মাঝেমধ্যে যেতাম। ওখানে গিয়ে বাউলদের গান শুনতাম। আর এক-দুইজন বাউলের কাছে সাধারণভাবে ওনাদের কথা জানতে চাইতাম। লালন ও পরবর্তীকালের বাউল সম্পর্কে আমাকে প্রথম অনেক তথ্য দেন সেই সময়ের লালন আখড়ার খাদেম বা সেবায়েত ফকির বেল্লাল শাহ। তাঁর কাছ থেকে আমি অনেক গানও সংগ্রহ করি। পাশাপাশি লালনের এক উৎসবে আমার সঙ্গে আলাপ হয় ভেড়ামারার এক প্রত্যন্ত গ্রামের বাউল সাধক ফকির আজিম শাহের। আজিম শাহ নানা অঞ্চল থেকে আমাকে লালন ও অন্য বাউলদের গান ও জীবনী সংগ্রহ করে দেন। এরপর ছেঁউড়িয়ার লালন-আখড়াতেই আমি প্রথম দেখি অধ্যাপক মুহম্মদ মনসুর উদ্দীনকে। তাঁর লালনের গান সংগ্রহের কথা জানতাম। হারামনির একটি-দুটি খণ্ডও তখন আমার হাতে এসেছে। তিনি আমাকে নানা বাউলের গান সংগ্রহ করে দিতে বলতেন। কিছু কিছু আমি তাঁকে সংগ্রহ করেও দিয়েছি। মূলত এই বাউলদের সান্নিধ্যে এসে এবং মনসুর উদ্দীনের প্রেরণায় লালন সম্পর্কে আমার আগ্রহ জাগে। ১৯৭৪ সালে লালন সাঁইয়ের জন্মের ২০০ বছর পূর্ণ হয়। সে উপলক্ষে আমি লালন সম্পর্কে প্রকাশিত বেশ কিছু দুষ্প্রাপ্য লেখাসহ একটি স্মারক গ্রন্থের পরিকল্পনা করি। আমার বিরল সৌভাগ্য যে বইটি বাংলাদেশ জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র প্রকাশ করে। আমি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের সেই সময়ের পরিচালক কথাশিল্পী সরদার জয়েন উদ্দিন ও উপপরিচালক কবি কায়সুল হকের কাছে। বইটি কবি অন্নদাশঙ্কর রায়কে পাঠালে তিনি ওই বছরের শারদীয় আনন্দবাজারে এই বই সম্পর্কে একটি খুব বড় আলোচনা করেন, প্রবন্ধের আকারে। এ ঘটনাও আমাকে অত্যন্ত অনুপ্রাণিত করেছিল। আরেকটি বিষয়, ওই ১৯৭৪ সালেই লালন ও আরও ৫৫ বাউলের জীবনী ও গান নিয়ে আমার একটি বই প্রকাশিত হয় <em>কুষ্টিয়ার বাউল সাধক</em> নামে। এ বইয়ের ভূমিকা লিখে দেন আমার শিক্ষক ড. আহমদ শরিফ এবং আশীর্বাণী লিখেছিলেন অন্নদাশঙ্কর রায়। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ছাত্র। লালন ও <em>বাউল পদাবলী</em> আমাদের পাঠ্য ছিল। আমাদের শিক্ষকেরা এ বিষয়ে পড়াতে গিয়ে আমার বই দুটির কথাও উল্লেখ করতেন আমার উপস্থিতিতেই। এটিও আমার আরেকটি উৎসাহ ও প্রেরণার বিষয়। এভাবেই লালনের টানে আমি দীর্ঘকাল ধরে তাঁর গান সংগ্রহ এবং তাঁর গান সম্পর্কে আলোচনা করে আসছি। এ পর্যন্ত লালন ও তাঁর অনুষঙ্গী বিষয়ে দেশ ও দেশের বাইরে থেকে আমার আটটি বই বেরিয়েছে।</p> <p><strong>ফিরোজ এহতেশাম: </strong><em>লালন সম্পর্কে গবেষক হিসেবে আপনার মূল্যায়ন কী? আপনার জীবনকে লালন কীভাবে প্রভাবিত করেছে?</em></p> <p><strong>আবুল আহসান চৌধুরী:</strong> লালন সম্পর্কে ভাবতে গেলে আমি খুব বিস্মিত হই। ২০০ বছর আগে তিনি জন্মেছিলন এক অজপাড়াগাঁয়ে। প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়ার কোনো সুযোগ তাঁর ছিল না। কিন্তু তিনি যে গান রচনা করেছেন, সেই গানের ভাব-ভাষা-ভাবনা, ছন্দ-অলংকার-উপমা-উৎপ্রেক্ষা ও সুর তিনি যে একজন নিরক্ষর গ্রাম্য সাধক, সে কথা ভুলিয়ে দেয়। রবীন্দ্রনাথের মতন মানুষকেও তিনি প্রভাবিত করেছেন। যাঁরা ইতিহাস চর্চা করেন, তাঁদের মধ্যেও কেউ কেউ লালনকে রাজা রামমোহন রায়ের সঙ্গে তুলনা করে থাকেন। তাঁরা বলেন, রামমোহন নাগরিক জীবনে যে নবজাগরণ এনেছিলেন, ঠিক একই কাজ গ্রামীণ সমাজে করেছিলেন লালন ফকির। লালনের গানের সঙ্গে অন্যান্য বাউলের গানের তুলনা করলে দেখা যায়, অন্যদের গান কেবলই সাধনার অনুষঙ্গে রচিত। তাঁদের গান বাউল সাধনার ভাষ্যমাত্র। এতে সাধারণত কোনো বৈচিত্র্য কিংবা শিল্পগুণ পাওয়া যায় না। কিন্তু লালন তাঁর গানে সাধনার বিষয় ছাড়াও সামাজিক দায় ও কর্তব্যবোধ থেকে এবং সমকালীন সমাজের কুসংস্কার ও কুপ্রথার বিরুদ্ধে, জাতপাত, সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদ—এসবের বিরুদ্ধে গান বেঁধেছেন। তিনি নিজে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মে বিশ্বাসী ছিলেন না, কোনো শাস্ত্র মানতেন না, কোনো জাত বা ধর্মের গণ্ডিতে নিজেকে আবদ্ধ রাখতে চাননি। তাই তিনি তাঁর এক গানে বলেছেন, ‘জাত না গেলে পাইনে হরি/কী ছার জাতের গৌরব করি/ছুঁসনে বলিয়ে।/লালন কয়, জাত গাতে পেলে পোড়াতাম আগুন দিয়ে।’ তিনি নিজে হিন্দু না মুসলমান, এ ধরনের প্রশ্নের মুখোমুখি বারবার হয়েছেন। তিনি এসব প্রশ্নের জবাবে সরাসরি তাঁর গানে বলেছেন, ‘সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে/লালন বলে, জেতের কী রূপ দেখলাম না এই নজরে।’ এমনই আরও অনেক উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে, যার ভেতরে লালনের উদার মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় আছে। তিনি ছিলেন বিশুদ্ধ, অসাম্প্রদায়িক, মুক্তবুদ্ধির মানুষ। তিনি মানবগুরুকেই তাঁর ঈশ্বর বলে মানতেন। তাঁর গানে বারবার সেই কথাই বলেছেন। আবার ইহজাগতিকতার প্রতিও তাঁর পক্ষপাত আমরা দেখি তাঁর গানে। যেমন, ‘এমন মানবজনম আর কী হবে/মন যা করো ত্বরাই করো এই ভবে।’</p><figure><img alt="" src="https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla/2026-10-12/li5yqskt/30190876.jpg"><figcaption>আবুল আহসান চৌধুরীর ‘লালন সাঁইয়ের সন্ধানে’ বইয়ের প্রচ্ছদ</figcaption></figure><blockquote>লালন নিজেই বলেছেন তাঁর গানে, ‘কুতর্কের দোকান খুলিসনে আর’। আমি আগেই বলেছি যে লালন কোন সম্প্রদায়ের মানুষ ছিলেন, এটি বড় তুচ্ছ কথা। লালন কী বলেছিলেন, সেটিই হচ্ছে বড় কথা। সে কারণে যাঁরা লালনকে সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধি দিয়ে বুঝতে চান বা বিরোধিতা করতে চান বা লালনকে সুফি-দরবেশ বানাতে চান কিংবা খাঁটি বৈষ্ণব বানাতে চান, এসব কিছুর বিরুদ্ধেই আমার তীব্র প্রতিবাদ। কেননা, লালন এসব কিছুই ছিলেন না।</blockquote><p>লালনের শিল্পবোধ এত উচ্চাঙ্গের ছিল যে রবীন্দ্রনাথ ছন্দ সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে লালনের নিটল ছন্দের প্রশংসা করেছেন। লালনের শব্দ ব্যবহারে একটা ভিন্ন বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়। হিন্দু ও মুসলমানের ভেতর যে বিভেদ আছে, শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও লালন সেই বিভেদ অগ্রাহ্য করেছেন তাঁর গানে। দৃষ্টান্ত দিয়ে বলা যায়, তাঁর একটি গানে আছে, ‘পেয়েছি এক ভাঙা নৌকা, জনম গেল সেচতে পানি’। আবার তাঁর আরেকটি গানে তিনি বলছেন, ‘মাটি কি পবন জল কি হুতাশন’। তাহলে আমরা লক্ষ করছি যে মুসলমানের ব্যবহৃত ‘পানি’ এবং হিন্দুর ব্যবহৃত ‘জল’কে তিনি এক পাত্রে রেখেছেন। তাই উনিশ শতকের যে প্রধান সামাজিক সমস্যা ছিল হিন্দু মুসলমানের বিরোধ, তা নিরসনেও লালনের চিন্তাচেতনা কাজ করেছিল। আরও বিস্ময়ের বিষয়, এই আত্মনিমগ্ন, সংসারনিস্পৃহ ভোলা বাউল তাঁর সামাজিক কর্তব্য পালন করতে গিয়ে তাঁর বিপন্ন বন্ধু <em>গ্রামবার্তা প্রকাশিকা</em>র সম্পাদক কাঙাল হরিনাথ মজুমদার যখন প্রজাপীড়নের সংবাদ প্রকাশ করতে গিয়ে শিলাইদহের ঠাকুর-জমিদারদের কোপানলে পড়েন, তখন জমিদারের লেলিয়ে দেওয়া লাঠিয়ালদের বিরুদ্ধে লালন তাঁর শিষ্যদের নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। এই যে নানাভাবে লালনকে আমরা দেখি, এর ভেতর দিয়ে একজন বহুমাত্রিক, অনন্যসাধারণ, সমাজমনস্ক সাধক বাউলকে আবিষ্কার করা যায়। আমি সেভাবেই লালনকে মূল্যায়ন করি। আরেকটি কথা এখানে বলার আছে, লালন যে বিরুদ্ধ পরিবেশে জন্ম নিয়েছিলেন, যে প্রতিকূলতা তাঁর সামনে ছিল, তিনি তা অতিক্রম করার চেষ্টা করেছেন তাঁর গানে ও সাধনায়। কিন্তু মৌলবাদী, সাম্প্রদায়িক, শাস্ত্র ও ধর্মধ্বজী মানুষেরা তাঁর ও তাঁর অনুসারীদের ওপর নির্যাতন-নিগ্রহ চালিয়েছে। লালন ও তাঁর সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের তরফ থেকেই আঘাত এসেছে, জারি হয়েছে <em>বাউল ধ্বংস ফতোয়া</em> কিংবা <em>রদ্দে নাড়া</em>। হিন্দুদের পক্ষ থেকে লিখিত হয়েছে <em>পাষণ্ড পীড়ন</em>; এখানেও বাউল সাধনা ও লালন সম্প্রদায়কে অভিযুক্ত ও নিন্দা করা হয়েছে। লালনের ধর্ম ছিল মানুষের ধর্ম। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ভেতরে যে আদর্শ লালন করতেন, তা অনেকাংশে বাউলদের মত ও আদর্শের সঙ্গে মিলে যায়। লালন ছিলেন মহৎ জীবনের অভিসারের যাত্রী। কিন্তু এই বিরুদ্ধ সমাজে তিনি নিজেকে বিকশিত করতে পারেননি বলে তাঁর অন্তরে অতৃপ্তির বেদনা ছিল। তাঁর গানে পাওয়া যায়, ‘এ দেশেতে এই সুখ হলো আবার কোথা যায় না জানি’। আরেকটি গানে তিনি বলছেন, ‘সাঁই আমারে রাখলেন কূপজল করে আন্ধেলা পুকুরে। কবে হবে সজল বরষা, রেখেছি মন সেই ভরসা’। এ থেকে আমরা বুঝি, যার বেগবান নদী হওয়ার কথা ছিল, তরঙ্গসংকুল স্রোতস্বতী হওয়ার কথা ছিল, সে কিনা হয়ে রইল বদ্ধ জলাশয়। এই আফসোস, এই হাহাকার লালনকে আত্মজিজ্ঞাসার মুখোমুখি করেছিল। লালনকে নিয়ে কুটতর্কে আমরা মেতে উঠেছি। কোথায় তাঁর জন্ম, কী তাঁর ধর্ম—এ নিয়ে আমাদের তর্ক ও বিবাদ। কিন্তু এসব তুচ্ছ। লালন সব সম্প্রদায় ও ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠেছিলেন। লালন মানুষ হতে চেয়েছিলেন, বিশুদ্ধ মানুষ, যে মানুষ কল্যাণের পথে, প্রেমের পথে, শুভ চেতনার পথে ভিন্ন ধর্ম ও শাস্ত্রের অনুসারীকেও আলিঙ্গন করতে পারেন। তাই আজ আমরা লক্ষ করি যে কেবল বাংলাভাষী অঞ্চল নয়, বিদেশেও লালনের এ আদর্শ, লালনের এ বাণী সমাদর পাচ্ছে। বিদেশে লালনকে নিয়ে ভালো ভালো কাজ হচ্ছে।</p><p>লালন আমার জীবনকে এতটাই প্রভাবিত করেছেন যে আমি যখন লালনের গান শুনি, একই গান বারবার শুনি, প্রতিবার একটা নতুন তাৎপর্য আবিষ্কার করি। লালনের গানের ভেতর দিয়ে একটি গভীর জীবনবোধ আমার ভেতরে সঞ্চারিত হয়। সেই অর্থে বলা যায়, লালন আমার আবেগ, লালন আমার চেতনা, লালন আমার প্রেরণা।</p> <p><strong>ফিরোজ এহতেশাম: </strong><em>লালন নিজেই সব প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম ত্যাগ করেছিলেন, যার প্রমাণ তাঁর জীবনযাপন ও গানগুলোয় বিধৃত আছে। সে ক্ষেত্রে লালন হিন্দু নাকি মুসলমান, এ নিয়ে বিভিন্ন গবেষকের উত্তর অনুসন্ধানকে আপনি কীভাবে দেখেন?</em></p> <p><strong>আবুল আহসান চৌধুরী:</strong> লালন নিজেই বলেছেন তাঁর গানে, ‘কুতর্কের দোকান খুলিসনে আর’। আমি আগেই বলেছি যে লালন কোন সম্প্রদায়ের মানুষ ছিলেন, এটি বড় তুচ্ছ কথা। লালন কী বলেছিলেন, সেটিই হচ্ছে বড় কথা। সে কারণে যাঁরা লালনকে সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধি দিয়ে বুঝতে চান বা বিরোধিতা করতে চান বা লালনকে সুফি-দরবেশ বানাতে চান কিংবা খাঁটি বৈষ্ণব বানাতে চান, এসব কিছুর বিরুদ্ধেই আমার তীব্র প্রতিবাদ। কেননা, লালন এসব কিছুই ছিলেন না। থাকলে তিনি শাস্ত্রদ্রোহী হতেন না, তিনি প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মকে অগ্রাহ্য করতেন না। তিনি যা হতে চাননি, গবেষকেরা তাঁকে তা-ই বানাতে চান। সে জন্য এই সব গবেষণা-আলোচনাকে আমি অনধিকারচর্চা বলে মনে করি। ধীরে ধীরে লালনের গানই প্রমাণ দেবে, লালন কী ছিলেন এবং লালন কী চেয়েছিলেন।</p><figure><img alt="" src="https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla/2026-10-12/3tzvxlj4/Abul_A_Chowdaury__1_.jpg"><figcaption>আবুল আহসান চৌধুরী</figcaption></figure><blockquote>আজ যে অপসংস্কৃতি চলছে, আমরা দেখি যে আজ বাউলের গান বা লোকসংস্কৃতি নয়, ব্যান্ড সংগীত তরুণ প্রজন্মকে একেবারে উন্মাদ করে তুলেছে। তারা কিন্তু লালনের ভাষায় ‘নিজের ঘরের খবর’ জানে না। তারা হাসন রাজা, রাধারমন, মনমোহন, জালাল শাহের গান শোনেনি, এমনকি শাহ আবদুল করিমের গানও তারা শ্রদ্ধার সঙ্গে শোনেনি। কবিয়াল রমেশ শীলের নামও জানে না তারা। যদি এই লোকসংগীত তথা লোকসংস্কৃতির চর্চা আমাদের দেশে হতে পারত অবাধ ও স্বতঃস্ফূর্ত, তাহলে আমরা বিশুদ্ধ বাঙালি হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিতে পারতাম।</blockquote><p><strong>ফিরোজ এহতেশাম: </strong><em>রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে লালনের সাক্ষাৎ নিয়ে বিভিন্ন গবেষকের মধ্যে যে মতদ্বৈধ, সে বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?</em></p> <p><strong>আবুল আহসান চৌধুরী:</strong> এটা নিয়ে একটা রহস্য রয়েই গেছে। এর জন্য রবীন্দ্রনাথের নিজেরও কিছুটা দায় ও ভূমিকা আছে। রবীন্দ্রনাথ একসময় শ্রী নিকেতনের আদর্শ কেমন হবে, সে বিষয়ে কালীমোহন ঘোষের সঙ্গে আলাপচারিতায় বলেছিলেন, কথাটি অনেকটা এ রকম, ‘তুমি তো দেখেছ, শিলাইদহে লালন শাহ ফকিরের শিষ্যদের সঙ্গে আমার কেমন ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলাপ জমত।’ এখানে যদি লালনের সঙ্গেই তাঁর পরিচয় থাকত, তাহলে তিনি ‘লালন ও তাঁর শিষ্যদের সঙ্গে’—এইভাবে কথাটি বলতেন। কিন্তু সরাসরি তিনি লালনের শিষ্যদের কথা বলেছেন। আবার আরেক জায়গায় দেখি, বসন্তকুমার পাল, যিনি প্রথম লালনের জীবনী লিখেছিলেন, লালনের জীবনী লেখার জন্য কিছু তথ্য জানতে রবীন্দ্রনাথকে তিনি চিঠি লিখেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ সে সময় বয়সের ভারে ন্যুব্জ। তাঁর একান্ত সচিব সুধীরচন্দ্র কর রবীন্দ্রনাথের বরাত দিয়ে সেই চিঠির জবাব দেন। তাতে লেখা হয়েছিল যে কবি ফকির সাহেবকে জানতেন। কিন্তু সে তো বহুকাল আগের কথা। এই সব কথা আজ আর তাঁর মনে স্পষ্ট নয়। এখানে ‘ফকির সাহেবকে জানতেন’ বাক্যটি থেকে আবার ধারণা করা যায় যে নিশ্চয়ই তাঁদের মধ্যে দেখা-সাক্ষাৎ হয়েছে, আলাপ-পরিচয় হয়েছে। নইলে ‘জানতেন’ কথাটি কেন তিনি বলবেন? এই দুটি প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের নিজের কথাতেই কিন্তু তাঁর স্ববিরোধ আমরা লক্ষ করি। আমার নিজের মনে হয় যে এ রহস্যমোচনের আর বেশি সুযোগ নেই এবং প্রয়োজনও নেই। কেননা রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে লালনের সাক্ষাৎ হোক আর না-ই হোক, তাতে কিছু আসে যায় না। লালন রবীন্দ্রনাথকে গভীরভাবে প্রাণিত ও প্রভাবিত করেছিলেন, এটাই সত্য।</p> <p><strong>ফিরোজ এহতেশাম: </strong><em>লালনের সময়ের তুলনায় এখন সামাজিক-রাজনৈতিক সমস্যাগুলো নতুন নতুন মাত্রায় আমাদের সামনে উপস্থিত হচ্ছে। লালনের তত্ত্ব ও মতবাদ বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে কতটা প্রাসঙ্গিক?</em></p> <p><strong>আবুল আহসান চৌধুরী: </strong>লালনের কাল থেকে একালের যে ব্যবধান, এটিকে আমাদের বুঝতে হবে। যেমন লালনের গানের কথাই বলি; তাঁর গানের আদি আখড়াই সুর প্রায় হারিয়ে গেছে। এখন রেডিও-টেলিভিশন কিংবা মঞ্চে লালনের যেসব গান গাওয়া হয়, তার সুর ও বাণী দুটোই বিকৃত হয়ে যাচ্ছে। আর বাউলেরা তো সামাজিকভাবে চিরকাল, এখনো.... যদিও সাধারণত মুসলমান বা হিন্দু বাউলদের একেক ধরনের বিধান; মৃত্যুর পরে বাউলদের যে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া, সেটা হচ্ছে তাঁদের সমাধিস্থ করা। মুসলমান বাউল হলে তাঁদের জানাজার প্রয়োজন হয় না। কেননা দীক্ষার সময়ই তাঁর জানাজার যেসব আচরিক কাজ, সেগুলো দীক্ষগুরু করে থাকেন। কিন্তু এখন সামাজিক চাপে, একঘরে হওয়ার ভয়ে বাউলকে আবার মোল্লা-পুরুত ডেকে মুসলমানদের জানাজা এবং হিন্দুদের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া করতে হয়। বাউলেরা একটা খুব বড় সামাজিক শক্তি। বাউলদের সঙ্গে ভদ্রলোকেদের পার্থক্য হচ্ছে যে বাউলেরা অসত্য বলেন না, দুর্নীতি করেন না। বাউলেরা কপট নন, দুঃশাসকও নন। সে জন্য লালনের গান, সাধনা ও দর্শন আজকের দিনে বড় পথ দেখাতে পারে, আমাদের বাংলাদেশের এই ক্রান্তিলগ্নে। যেমন লালন তাঁর গানে বলেছেন, ‘সত্য বল, সুপথে চল, ওরে আমার মন’, ‘পরের দ্রব্য, পরের নারী হরণ কোরো না’ ইত্যাদি। লালনের প্রতিটি পঙ্‌ক্তিকে সুভাষণ বলে মনে হতে পারে আমাদের কাছে। তো সে জন্য বাউল সম্প্রদায়কে যদি আমরা বাঁচিয়ে রাখি, তাঁদের সাধনা ও দর্শনকে যদি প্রচার করতে দিই, তাহলে আমরা যে সমাজ চাচ্ছি, দুর্নীতিমুক্ত মুক্তবুদ্ধির সমাজ, তা পাব, যা কপট, শিক্ষিত, দুর্নীতিবাজ কথিত সুশীল সমাজের মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। এই আউল-বাউল এবং গ্রামের সহজ, সরল ও সাধারণ মানুষই আমাদের সত্য ও সঠিক পথ দেখাতে পারে। তার জন্য আমাদের প্রয়োজন বাঙালির ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির শেকড়ের সন্ধান করা। আজ যে অপসংস্কৃতি চলছে, আমরা দেখি যে আজ বাউলের গান বা লোকসংস্কৃতি নয়, ব্যান্ড সংগীত তরুণ প্রজন্মকে একেবারে উন্মাদ করে তুলেছে। তারা কিন্তু লালনের ভাষায় ‘নিজের ঘরের খবর’ জানে না। তারা হাসন রাজা, রাধারমন, মনমোহন, জালাল শাহের গান শোনেনি, এমনকি শাহ আবদুল করিমের গানও তারা শ্রদ্ধার সঙ্গে শোনেনি। কবিয়াল রমেশ শীলের নামও জানে না তারা। যদি এই লোকসংগীত তথা লোকসংস্কৃতির চর্চা আমাদের দেশে হতে পারত অবাধ ও স্বতঃস্ফূর্ত, তাহলে আমরা বিশুদ্ধ বাঙালি হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিতে পারতাম। এটা তো ভাষা আন্দোলনের মাস। এ মাসে লালন, দুদ্দু শাহ ও মহীন শাহ—এই তিন বাউলের আমাদের স্মরণ করতে হয়।</p><figure><img alt="" src="https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla/2026-10-12/k0mjig97/WhatsApp_Image_2026_10_05_at_5_08_47_PM___.jpeg"><figcaption>সাক্ষাৎকারটি ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০০৮ ‘প্রথম আলো’র ‘সাহিত্য সাময়িকী’তে এভাবেই প্রকাশিত হয়েছিল</figcaption></figure><blockquote>লালন মানুষকে যে কতখানি প্রভাবিত করতে পারেন, তার প্রমাণ ফাদার রিগন। তিনি লালনের প্রায় ৩০০ গান ইতালীয় ভাষায় অনুবাদ করেছেন এবং রোববারে যখন গির্জায় প্রার্থনা শুরু হয়, তিনি শুরুতেই লালনের গানের বাণী উচ্চারণ করে প্রার্থনা শুরু করেন। এর চেয়ে বড় স্বীকৃতি, সম্মান আর কী হতে পারে! লালনের গান শুনে জার্মানির এক সংগীতবিশেষজ্ঞ ড. মেনরিন উইনিয়স মন্তব্য করেছিলেন যে লালনের গান তাঁকে মরমি চেতনায় আবিষ্ট করে।</blockquote><p>যেমন লালন তাঁর একটি গানে বলেছেন, আরবি কিতাব পড়ার আগে বাংলা কিতাবখানা পড়ে নাও। দুদ্দ শাহ বাংলা ভাষার পক্ষে গান রচনা করেছেন। আর মহীন শাহ কবি জসীমউদ্‌দীনের প্রেরণায় ৫২ সালে সারিন্দা নিয়ে ভাষা আন্দোলনের গান গেয়ে পুলিশি নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। কজন আমরা সে খবর রাখি? আমরা তো নাগরিক জন যাঁরা ভাষা আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন, তাঁদের ভাষাসৈনিক বলি। ফকির মহীন শাহ প্রত্যক্ষভাবে ভাষা আন্দোলনের সময় রাস্তায় রাস্তায় গান গেয়েছেন, পুলিশের নির্যাতন সহ্য করেছেন, পলাতক থেকেছেন, কই তাঁকে তো আমরা ভাষাসৈনিক বলি না। এই মহীন বাউলসহ আরও অনেক বাউল আছেন, যাঁরা আমাদের ক্রান্তিকালে তাঁদের গান দিয়ে, সুর দিয়ে আমাদের সেই আন্দোলন-সংগ্রামকে অনুপ্রাণিত করেছেন। প্রসঙ্গক্রমে বলি, লালনের গানের খুব বড় অসাধারণ শিল্পী মকসেদ আলী সাঁই মুক্তিযুদ্ধের সময় শরণার্থীশিবিরে ও মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে ঘুরে ঘুরে তাঁদের অনুপ্রেরণা দিয়েছেন, তাঁদের মনোবল রক্ষা করেছেন। কোথায় আমরা সেই বাউলের খবর রাখি? অথচ আমরা ঢাকা শহরে বাস করেন যাঁরা, যাঁরা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে গান গেয়েছেন বা কোনো অনুষ্ঠান করেছেন, তাঁদের কথা লিখি, ইতিহাসে তাঁদের নাম আছে। কিন্তু মকসেদ আলী সাঁই, মহীন সাঁইয়ের নাম কোথায়? তো তাই আজ, আপনি খুব মূল্যবান একটি প্রশ্ন করেছেন, সেই পরিপ্রেক্ষিতে আমি বলতে চাই, আমাদের বিদ্যাসাগর যেমন বলেছিলেন যে এই বাংলাদেশে সাতস্তর মাটি তুলে যদি নতুন মানুষ নিয়ে এসে বসতি স্থাপন করা যায়, তো আমাদের বাঙালি চরিত্রের পরিবর্তন হবে। আমার মনে হয় যে আজ লোকসংস্কৃতি বা লোকজীবনের কাছ থেকে অনেক দূরে সরে গেছি বলেই আমরা আমাদের অস্তিত্বের শেকড় খুঁজে পাই না। আমরা স্বাধীন হয়েছি বটে, আমাদের রাষ্ট্রভাষা বাংলা বটে, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে বটে, কিন্তু এ ভাষার যাঁরা প্রকৃত চর্চা করেন, গ্রামের বাউল কিংবা সমধর্মী অন্য সাধকেরা, যাঁরা বাংলা ভাষার জন্য গান বাঁধেন, তাঁদের খবর আমরা করি না, করতে পারি না। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন যে দেহের সব রক্ত মুখে উঠে আসার নাম স্বাস্থ্য নয়। তেমনি ঢাকা মহানগরী বাংলাদেশ নয়। তো সেইভাবে আমরা বলতে চাই যে ঢাকার বাইরেও আমাদের একটু তাকাতে হবে। হাসন, মনমোহন, জালাল শাহ, দুদ্দু শাহ, সর্বোপরি লালন শাহ আমাদের জন্য আলো জ্বেলে রেখেছেন। সেই আলোয় পথ চিনে আমরা সত্য, সুন্দর, কল্যাণ, আনন্দের গন্তব্যে পৌঁছাতে পারব। আলেক সাঁই।</p> <p><strong>ফিরোজ এহতেশাম: </strong><em>দুই বিদেশি লালন গবেষক—মার্কিন মুলুকের ডক্টর ক্যারল গোল্ডবার্গ সলোমন ও ইতালীয় ধর্মযাজক ফাদার মারিনো রিগন। আপনার নেওয়া এ দুজনের সাক্ষাৎকার আছে </em>লালন সাঁইয়ের সন্ধানে<em> বইটিতে। এই গবেষকদ্বয় সম্পর্কে আপনি কী মূল্যায়ন করবেন?</em></p> <p><strong>আবুল আহসান চৌধুরী: </strong>আমি মনে করি যে ড. ক্যারল সলোমন বাঙালি–বিদেশি মিলিয়ে লালনের গানের অর্থ ও তাৎপর্য সবচেয়ে ভালো বোঝেন। লালন সম্পর্কে তাঁর জ্ঞান ও উপলব্ধি আমাকে বিস্মিত করে। আমরা দীর্ঘদিন একসঙ্গে কাজ করেছি। লালনের জীবিতকালে তাঁর শিষ্যরা যেসব গান লিখে রাখতেন, আমরা দুজন মিলে লালনের সেই আদি গানের প্রামাণ্য সংকলন বের করার চেষ্টা করছি। ড. আহমদ শরীফ সেই বইয়ের নাম দিয়েছিলেন <em>আয়নামহল</em>। এ নামেই হয়তো একসময় আমাদের বইটি প্রকাশিত হবে। এটি দ্বিভাষিক, মূল গান এবং পাশাপাশি ইংরেজি অনুবাদ থাকবে।</p><p>ঠিক আজকের দিনে (৫ ফেব্রুয়ারি) যাঁর জন্মদিন, তিনি একজন খ্রিষ্টীয় ধর্মযাজক ফাদার মারিনো রিগন। তিনি সুন্দরবনের প্রায় কাছাকাছি থাকেন। বাংলাদেশে প্রায় ৫৩ বছর ধরে আছেন। লালন মানুষকে যে কতখানি প্রভাবিত করতে পারেন, তার প্রমাণ ফাদার রিগন। তিনি লালনের প্রায় ৩০০ গান ইতালীয় ভাষায় অনুবাদ করেছেন এবং রোববারে যখন গির্জায় প্রার্থনা শুরু হয়, তিনি শুরুতেই লালনের গানের বাণী উচ্চারণ করে প্রার্থনা শুরু করেন। এর চেয়ে বড় স্বীকৃতি, সম্মান আর কী হতে পারে! লালনের গান শুনে জার্মানির এক সংগীতবিশেষজ্ঞ ড. মেনরিন উইনিয়স মন্তব্য করেছিলেন যে লালনের গান তাঁকে মরমি চেতনায় আবিষ্ট করে। এ রকম বিদেশিদের নাম আরও অনেক বলা যায়, যাঁরা লালনকে নিয়ে কাজ করেছেন এবং লালনের গানের ভেতর দিয়ে বাঙালিকে চিনেছেন, বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও বাংলাদেশকে চিনেছেন। এ অর্থে লালন বাঙালি সংস্কৃতির দূত, বাঙালি সংস্কৃতির মহান প্রতিনিধি।</p><figure><img alt="" src="https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla/2026-10-12/wdoammln/3jb6fpwh.jpeg"><figcaption>লালন ফকির</figcaption></figure><blockquote>যেকোনো মরমি সাধনায়, বাউলদের সাধনায় তো বটেই, একটা গূঢ়, গুহ্য সাধনার ধারা তাঁরা অনুসরণ করেন। দীক্ষিতজন ছাড়া, নিজেদের সম্প্রদায়ের মানুষ ছাড়া তাঁদের সাধনার গোপন কথা অন্য কাউকে বলা তাঁদের জন্য নিষিদ্ধ। তবে যখন কেউ বাউল হবেন বা দীক্ষা নেবেন, তখন তিনি ধীরে ধীরে জানতে পারবেন।</blockquote><p>ফাদার রিগনকে তো আমি বলি যে উনি একজন বিশুদ্ধ বাঙালি। ফাদার রিগন মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করেছেন। তখন তিনি ফরিদপুরের একটি ফিল্ড হাসপাতালে কাজ করতেন। ওই সময় তিনি যে ডায়েরি লিখতেন, সেই ডায়েরি ইতালিয়ান ভাষায় লিখতেন বলেই তিনি বেঁচে গেছেন, ইরেজিতে লিখলে তাঁর বিপদ হতো। সেই ডায়েরি তিনি গত বছর মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে দান করেছেন। সবচেয়ে বড কথা যে তিনি রবীন্দ্রনাথের ৩০টি বই ইতালিয়ান ভাষায় অনুবাদ করেছেন এবং তা প্রকাশিতও হয়েছে। এ ছাড়া তিনি জসীমউদ্‌দীনের দু-তিনটি বই ইতালিয়ান ভাষায় অনুবাদ করেছেন। লালনের ৩০০ গান অনুবাদ করেছেন। আমি তাঁকে প্রশ্ন করেছিলাম যে লালন ও রবীন্দ্রনাথের মধ্যে কে তাঁকে বেশি অনুপ্রাণিত করে। তিনি মৃদু হেসে বলেছিলেন, লালনই তাঁকে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রেরণা জোগায়। এ থেকে আমরা বুঝি যে যদি লালনের বাণীকে আত্মস্থ করা যায়, লালন কী বলতে চেয়েছেন, তা যদি উপলব্ধি করা যায়, তবে বারবার আমাদের লালনের কাছে যেতে হবে। লালনের কাছে আমাদের ঋণ অপরিসীম। লালনকে আমরা এখনো চিনি না। লালন নিজেই বলছেন, ‘ঘরের কাছে হয় না খবর, কী দেখতে যাও দিল্লি লাহোর’। আসলে আমাদের ঘরের মানুষ লালনকে আমরা আবিষ্কার করতে পারিনি। আবিষ্কার করেছেন ফাদার মারিনো রিগন, ক্যারল সলোমন, মাশাহিকো তোগাওয়া, এন্ড্রিন উইনিয়স, চার্লস ক্যাপলসহ অনেক বিদেশি গবেষক। আমাদের সম্পদ, আমরা তার কদরও বুঝিনি, তার ব্যবহারও জানিনি। বিদেশিরা সেটা পেরেছেন, সেটা করেছেন।</p> <p><strong>ফিরোজ এহতেশাম: </strong><em>বাউলদের মধ্যে একটা কথা প্রচলিত আছে, ‘আপন ভজন কথা, না কহিবে যথা-তথা, আপনাতে আপনি সাবধান’। কেন এ সতর্কতা?</em></p> <p><strong>আবুল আহসান চৌধুরী:</strong> সতর্কতার কারণ হচ্ছে, যেকোনো মরমি সাধনায়, বাউলদের সাধনায় তো বটেই, একটা গূঢ়, গুহ্য সাধনার ধারা তাঁরা অনুসরণ করেন। দীক্ষিতজন ছাড়া, নিজেদের সম্প্রদায়ের মানুষ ছাড়া তাঁদের সাধনার গোপন কথা অন্য কাউকে বলা তাঁদের জন্য নিষিদ্ধ। তবে যখন কেউ বাউল হবেন বা দীক্ষা নেবেন, তখন তিনি ধীরে ধীরে জানতে পারবেন।</p> <p><strong>ফিরোজ এহতেশাম: </strong><em>আপনি এখন কী নিয়ে ব্যস্ত? শুনেছি আরেক সাধক হাসন রাজাকে নিয়ে গবেষণা করছেন। এ বিষয়ে জানতে চাচ্ছি।</em></p> <p><strong>আবুল আহসান চৌধুরী:</strong> আমার নানামুখী কাজের মধ্যে <em>প্রসঙ্গ হাসন রাজা</em> নামে একটি বই বেশ আগেই বেরিয়েছিল বাংলা একাডেমি থেকে। এবারের বইমেলায় হাসন রাজা সম্পর্কে আরও দুটি বই বের হচ্ছে। <em>হাসন রাজার গান</em> নামে একটি বই বেরিয়ে গেছে বর্ণায়ন প্রকাশনী থেকে। উৎস প্রকাশনী থেকে বের হচ্ছে <em>হাসন রাজা: মরমি মৃত্তিকার ফসল</em> বইটি। আর আমার ফোকলর–বিষয়ক লেখা নিয়ে একটি বই বের করছে মনন প্রকাশ, নাম <em>বাংলার লোকসংস্কৃতির চালচিত্র</em>। আর লালন নিয়ে আমার সবচেয়ে বড় যে কাজ <em>লালন সমগ্র</em>, সেটিও এই বইমেলায় পাঠক সমাবেশ থেকে প্রকাশিত হচ্ছে, সেটির আমি সংকলন ও সম্পাদনা করেছি। এই বইয়ের ভেতরে লালনের গান শুধু নয়, লালন সম্পর্কে এযাবৎ যত গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ বেরিয়েছে, তার একটি নির্বাচিত সংকলনও আছে। বইটিতে লালনের প্রচুর তথ্য-দলিল এবং লালনপন্থী বাউলদের ছবি ও অন্যান্য অ্যালবাম এখানে থাকছে। লালন ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে এ বইয়ের সঙ্গে আমরা লালনগীতির একটি সিডিও প্রকাশ করব, যাতে একেবারে খাঁটি বাউলের কণ্ঠে লালনের আখড়াই ঘরানার গান পরিবেশিত হয়েছে। আমি মনে করি যে এটি বড় গুরুত্বপূর্ণ কাজ। লালনের নামে যেসব জাল-বিকৃত-খণ্ডিত গান বিভিন্ন সংকলনে স্থান পেয়েছে, আমরা আদি খাতা থেকে যাচাই করে সেসব গান বাদ দিয়েছি এবং যতটা সম্ভব পারা যায়, আমরা <em>লালন সমগ্র</em> বইটিকে লালনের গানের প্রামাণ্য সংকলন হিসেবে প্রকাশের চেষ্টা করেছি। এ ছাড়া আমার আরও কিছু বই আসছে, যেমন সূচীপত্র বের করছে <em>মীর মোশারফ হোসেন</em>। অন্বেষা থেকে প্রকাশ পাচ্ছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বড় বই <em>কাঙাল হরিনাথ: গ্রামীণ মনীষার প্রতিকৃতি</em>। শোভা প্রকাশ বের করছে <em>নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর অপ্রকাশিত পত্রাবলি</em>। তারা আরেকটি চমকপ্রদ ও ব্যতিক্রমধর্মী বই <em>অবিদ্যার অন্তঃপুরে</em> প্রকাশ করছে। বইটি উনিশ ও বিশ শতকের পতিতাদের আত্মকথার একটি সংকলন। বইটির প্রচ্ছদ ও অলংকরণ করেছেন কাউয়ুম চৌধুরী। এ ছাড়া গতিধারা বের করছে <em>উনিশ শতকের সাহিত্যসাধক</em>, নবযুগ প্রকাশনী এনেছে <em>কাজী মোতাহার হোসেন: জীবন ও সৃষ্টি</em> ইত্যাদি।</p>

Prothomalo

View more
পর্যটকদের জন্য তিন্দু সড়ক বন্ধ ঘোষণা, নয়নাভিরাম এ জায়গায় যেতে হবে বাড়তি পথ ঘুরে
পর্যটকদের জন্য তিন্দু সড়ক বন্ধ ঘোষণা, নয়নাভিরাম এ জায়গায় যেতে হবে বাড়তি পথ ঘুরে

আলীকদম-থানচি সড়কের ২১ কিলোমিটার পয়েন্ট থেকে তিন্দুবাজার পর্যন্ত সংযোগ সড়কটি থানচি-তিন্দু সড়ক নামে পরিচিত। এটি দিয়ে বড় পাথর, রেমাক্রী ও নাফাখুমে যাওয়া যায়।

অক্টোবর ১৭, ২০২৬
নাসার স্যাটেলাইটের তোলা ছবিতে অস্ট্রেলিয়ার মরুভূমিতে অদ্ভুত গর্তের সন্ধান
নাসার স্যাটেলাইটের তোলা ছবিতে অস্ট্রেলিয়ার মরুভূমিতে অদ্ভুত গর্তের সন্ধান

<p>অস্ট্রেলিয়ার মরুভূমিতে লুকিয়ে থাকা বিশাল আকারের অদ্ভুত এক গর্তের স্যাটেলাইট ছবি প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা। পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার কিম্বার্লি অঞ্চলের ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় এই গর্তের ছবি তুলেছে নাসার ল্যান্ডস্যাট ৯ স্যাটেলাইট। পায়ের আদলে তৈরি অদ্ভুত গড়নের গর্তটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘স্পাইডার ক্রেটার’। দুর্গম এলাকা হওয়ায় গর্তটির পুরো অংশ কেবল আকাশ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়।</p><p>স্যাটেলাইটের তোলা উচ্চ রেজোল্যুশনের ছবি ও খনিজ বিশ্লেষণের মাধ্যমে স্পাইডার ক্রেটারটি পর্যবেক্ষণ করে সেখানে প্রাচীনকালে উল্কাপাত হওয়ার কথা জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। বিজ্ঞানীদের তথ্যমতে, অদ্ভুত এই গর্ত মূলত উল্কাপাতের স্থান, যা কোটি কোটি বছর ক্ষয়ের ফলে মাকড়সার মতো আকৃতি ধারণ করেছে। ডিম্বাকৃতির এই গর্ত ৮ বাই ৭ মাইল এলাকাজুড়ে বিস্তৃত রয়েছে। গর্তের কেন্দ্রে থাকা মাকড়সার মতো অংশটি আকারে প্রায় আড়াই মাইল। পৃথিবীর ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস ও প্রাচীন মহাজাগতিক আঘাতের প্রভাব বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে নতুন এই অনুসন্ধান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।</p><p>বিজ্ঞানীরা স্পাইডার ক্রেটার তৈরির কারণ জানতে পারলেও এটি কত কোটি বছর আগে তৈরি হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। ধারণা করা হচ্ছে, ৬০ থেকে ৯০ কোটি বছর আগে এই উল্কাপাত হয়েছিল। স্পাইডার ক্রেটারের কেন্দ্রে বিজ্ঞানীরা শ্যাটার কোন নামের বিশেষ ধরনের ফাটল খুঁজে পেয়েছেন। তীব্র শকওয়েভ পাথরের ভেতর দিয়ে গেলে কেবল এই বিশেষ ফাটল তৈরি হয়ে থাকে।</p><p>গবেষণার প্রধান লেখক বিজ্ঞানী ক্রিস কার্কল্যান্ড বলেন, নর্থ পোল ডোমে আঘাতের ফলে একটি দীর্ঘস্থায়ী ফাটল ব্যবস্থা তৈরি হয়েছিল। আদি পৃথিবীতে এ ধরনের প্রক্রিয়া পাথর এবং আদি মহাসাগরের রাসায়নিক আদান–প্রদানকে প্রভাবিত করার মাধ্যমে খনিজের পরিবর্তন ঘটিয়ে অণুজীব জীবনের জন্য পরিবেশ সংশোধন করতে পেরেছিল। এসব আঘাতের ফলে প্রাচীনকালে জিরকন খনিজ তীব্র উত্তাপে আংশিকভাবে আবার ক্রিস্টাল বা কেলাসে পরিণত হয়েছে।</p><p>সূত্র: ডেইলি মেইল</p>

অক্টোবর ১৭, ২০২৬
মারজাহানের হাত ধরে কীভাবে বদলে গেল পাতাইপাড়ার ৩০০ নারীর জীবন
মারজাহানের হাত ধরে কীভাবে বদলে গেল পাতাইপাড়ার ৩০০ নারীর জীবন

<p>পাতাইপাড়া গ্রামের হতদরিদ্র নারীরা নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছেন। মুষ্টির চাল জমা করা থেকে শুরু করে হস্তশিল্পের কাজে অন্তত ৩০০ নারীকে স্বাবলম্বী করেছেন মরজাহান ইয়াসমিন। বিস্তারিত ভিডিও প্রতিবেদনে...</p><figure></figure>

অক্টোবর ১৭, ২০২৬
কেবল একাডেমিক শিক্ষা নয়, শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে ব্যবহারিক ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার সমন্বয় অপরিহার্য: শিক্ষামন্ত্রী
কেবল একাডেমিক শিক্ষা নয়, শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে ব্যবহারিক ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার সমন্বয় অপরিহার্য: শিক্ষামন্ত্রী

শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, একাডেমিক শিক্ষার সঙ্গে ব্যবহারিক ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার সমন্বয় অপরিহার্য; সরকার এদিকেই গুরুত্ব দিচ্ছে।

অক্টোবর ১৭, ২০২৬
কক্সবাজারে রিসোর্টে আগুন, মৃত্যু ও নিখোঁজের তথ্য নেই পুলিশের কাছে
কক্সবাজারে রিসোর্টে আগুন, মৃত্যু ও নিখোঁজের তথ্য নেই পুলিশের কাছে

যে রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে এটির নাম টুপটুপ রিসোর্ট। অগ্নিকাণ্ডে পাঁচজন মারা গেছেন বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। তবে তাঁদের পরিচয় জানা যায়নি।

অক্টোবর ১৭, ২০২৬
আজ শনিবার, তবে অফিস খোলা
আজ শনিবার, তবে অফিস খোলা

দুর্গাপূজায় ২০–২২ অক্টোবর ছুটি। তবে তার আগে আজ ১৭ অক্টোবর সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও সব সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, আধা স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি অফিস খোলা

অক্টোবর ১৭, ২০২৬
ইসলামের দৃষ্টিতে বংশের চার পুরুষের ধারণা
ইসলামের দৃষ্টিতে বংশের চার পুরুষের ধারণা

চার নম্বর প্রজন্মে এসে উত্তরসূরিরা দেখতে পায়, তাদের পূর্বপুরুষদের কীর্তিগাথা স্বর্ণের সিংহাসনে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তারা ধরে নেয় এই উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত খ্যাতি চিরস্থায়ী।

অক্টোবর ১৭, ২০২৬
২০১৯ সালের সেই স্মৃতি ফেরানোর আশা বাংলাদেশের
২০১৯ সালের সেই স্মৃতি ফেরানোর আশা বাংলাদেশের

বিকেল সাড়ে পাঁচটায় জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে শুরু হচ্ছে বাংলাদেশের অভিযান।

অক্টোবর ১৭, ২০২৬
সংসার চালাতে চাটনি বিক্রি করতেন মা, মেয়ে এখন ৬০ কোটি টাকার মালিক
সংসার চালাতে চাটনি বিক্রি করতেন মা, মেয়ে এখন ৬০ কোটি টাকার মালিক

সংসারের খরচ চালাতে নানা কাজ করতেন তাঁর মা। কখনো চাটনি বিক্রি করতেন, কখনো বানাতেন টিফিন।

অক্টোবর ১৭, ২০২৬
Popular post
কাজীরহাটে বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও ভূমি দখলের অভিযোগ

শরীয়তপুরের কাজীরহাট এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মাস্টার মোস্তফা কাজীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, প্রভাব খাটানো ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হন মোস্তফা কাজী। এরপর থেকে এলাকায় বিভিন্ন জমি দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৬ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে কাজীরহাট বাজারের দোকানপ্রতি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা কাজী। এছাড়া কয়েক মাস আগে কাজীরহাটে একটি দোকান ক্রয়ের সময় ব্যবসায়ী সুমন তপাদারের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী আরও জানান, বি. কে. নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলামের কাছ থেকেও ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন মানুষকে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় ফেলে হয়রানি করার অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন মোস্তফা কাজী। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির ব্যানারে তার কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন অনেকে। এছাড়া বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি নিজ ভগ্নিপতি সিদ্দিক দেওয়ানের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোস্তফা কাজীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সচেতন মহল বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

ইউক্রেন যুদ্ধের মাঝে শান্তি আলোচনা জোরালো করতে ইউরোপীয় নেতাদের বৈঠক

ইউরোপের রাজধানী ব্রাসেলসে আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা জোরালো করা। এই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত আছেন। গত বছরের শুরু থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের কারণে সারা ইউরোপ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ইউরোপীয় নেতারা এখন যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরিতে কাজ করছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, “আমরা যুদ্ধের মানবিক সংকট বুঝতে পারি এবং এখন আমাদের দায়িত্ব এটি দ্রুত শেষ করার পথ খোঁজা। আমাদের প্রত্যেকের জন্যই শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।” এই বৈঠকে অস্ত্রবিরতি চুক্তি, যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলো যুদ্ধ সমাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এগুলো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলছে পরীক্ষার চাপ ও সামাজিক প্রত্যাশা

দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ক্রমবর্ধমান পরীক্ষার চাপ এবং পরিবারের পাশাপাশি সমাজের অযৌক্তিক প্রত্যাশা। এ দুটি কারণ মিলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বেড়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা।   ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করা যেন শিক্ষার্থীর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ—সব জায়গা থেকেই উচ্চ ফলাফলের প্রত্যাশা তৈরি করছে মানসিক চাপের একটি অব্যক্ত বলয়। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইহান কবির বলেন, “পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে মনে হয়, শুধু আমি না, আমার পুরো পরিবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এটা সহ্য করা খুব কঠিন।” শুধু রাইহান নয়, দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা একই অভিজ্ঞতার কথা বলছে।   সামাজিক চাপ ও তুলনার সংস্কৃতি পরিস্থিতি করছে আরও জটিল পরীক্ষার নম্বর নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এখন তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া গর্ব বা অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কোন কলেজে ভর্তি হলো, কে কতো পেল—এসব তুলনার চাপে পড়াশোনার আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা তাবাসসুম বলেন, “প্রত্যাশা থাকা ভালো, কিন্তু তা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায় এবং একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব সক্ষমতা উপেক্ষা করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়। এ থেকেই জন্ম নেয় আত্মগ্লানি, হতাশা এবং মাঝে মাঝে আত্মহননের চিন্তা।”   জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ নিয়মিত মানসিক চাপে থাকে। এর মধ্যে ১২ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগে এবং বড় একটি অংশ কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই দিন পার করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে ক্ষতিকর।   সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, এবং পরিবারের ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ এই সমস্যার নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম হয়, সেখানে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাকে কেবল ফলাফলের সীমায় না এনে একটি মানবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা চাপ নয়, ভালোবাসা থেকে শিখবে, এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ প্রজন্ম।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ফসলের উৎপাদন হুমকিতে, কৃষকদের দুশ্চিন্তা বেড়েছে

বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কৃষিখাতকে চরমভাবে আঘাত করছে। অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘদিন খরা এবং হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ফসল উৎপাদনে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে।   চলতি মৌসুমেই অনেক জেলায় ধান, গম, ভুট্টা এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, একদিকে যেমন আবহাওয়ার আচরণ বুঝে ওঠা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সারের দাম, কীটনাশক ও বীজের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পোকার আক্রমণ ও রোগবালাইয়ের হারও বেড়ে গেছে। এই চাপে পড়ে অনেক কৃষকই ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।   জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা। তাদের পক্ষে বারবার ক্ষতির ধাক্কা সামলে উঠে আবার নতুনভাবে চাষাবাদ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো অঞ্চলে দেখা গেছে, কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী ফসল বাদ দিয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ ও লাভজনক অন্য চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমানেও প্রভাব ফেলতে পারে।   বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। একইসঙ্গে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে এমন জাত ও পদ্ধতি উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে যা কঠিন জলবায়ু পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে।   দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কৃষি খাতকে সচল রাখা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে এখনই পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।

ব্যাটিং বিপর্যয়ে দিন শুরু, লড়াইয়ে ফিরতে মরিয়া টাইগাররা

কলম্বোর সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাব ময়দানে চলমান দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে ব্যাট হাতে আবারও ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের। টস জিতে ব্যাট করতে নেমে প্রথম ইনিংসে টাইগাররা সংগ্রহ করে মাত্র ২২০ রান, যেখানে ব্যতিক্রম ছিলেন কেবল শোয়াড ইসলাম (৪৬), মুশফিকুর রহিম (৩৫) ও লিটন দাস (৩৪)। শ্রীলঙ্কার বোলাররা শুরু থেকেই চাপ সৃষ্টি করে রাখে। ডেবিউ করা স্পিনার সোনাল দিনুষা ৩ উইকেট নিয়ে আলো ছড়ান, আর আসিথা ফার্নান্দো ও বিষ্ণু ফার্নান্দো নেন ২টি করে উইকেট। প্রথম ইনিংসের জবাবে দ্বিতীয় দিন সকালে শ্রীলঙ্কা উদ্বোধনী জুটি থেকে ভালো সূচনা পায়। ১৩.১ ওভারে কোন উইকেট না হারিয়ে সংগ্রহ করেছে ৬২ রান। ওপেনার পাথুম নিসান্কা ৩৩ এবং লাহিরু উদারা ২৮ রানে অপরাজিত রয়েছেন। বাংলাদেশের হয়ে তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ বোলিং শুরু করলেও এখনও পর্যন্ত সাফল্যের দেখা মেলেনি। শ্রীলঙ্কা এখনো বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস থেকে ১৫৮ রানে পিছিয়ে আছে, হাতে রয়েছে সকল উইকেট। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে প্রভাব এই টেস্টটি ২০২৩-২৫ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ হওয়ায় দুই দলের জন্যই পয়েন্টের লড়াই গুরুত্বপূর্ণ। সিরিজের প্রথম টেস্টে পরাজিত হওয়ায় বাংলাদেশ সিরিজে টিকে থাকতে হলে এই ম্যাচ জিততেই হবে। পরবর্তী চ্যালেঞ্জ স্লো পিচে বাংলাদেশ বোলারদের আরও পরিকল্পিত বোলিং করতে হবে। দ্রুত উইকেট তুলে না নিতে পারলে শ্রীলঙ্কা বড় লিড নিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে দেবে টাইগারদের। ফিল্ডিংয়ে মনোযোগ এবং টাইট বোলিংয়ের মাধ্যমেই দ্বিতীয় ইনিংসে নিজেদের ফিরে পাওয়ার আশায় বাংলাদেশ। সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড (দিন ২, প্রথম সেশন পর্যন্ত): বাংলাদেশ (১ম ইনিংস): ২২০/১০ শ্রীলঙ্কা (১ম ইনিংস): ৬২/০ (১৩.১ ওভার) নিসান্কা: ৩৩*, উদারা: ২৮* বাংলাদেশ বোলার: তাইজুল, মিরাজ – উইকেটহীন