<p>গণতন্ত্র রক্ষা ও একে সুসংহত করতে বিরোধী দলের এবং একই সূত্রে সরকারি দলেরও ভূমিকা নিয়ে আলোচনার সময় আমরা প্রায়ই একটি মৌলিক প্রশ্ন এড়িয়ে যাই: আমরা ঠিক কোন ধরনের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চাই? </p><p>গণতন্ত্রের রূপ নানাবিধ হতে পারে। অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক যাত্রার কেবল সূচনাই ঘটে; কিন্তু অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনও দুটি ভিন্ন রূপ নিতে পারে। একদিকে ক্ষমতা একক দল বা ব্যক্তির হাতে পুঞ্জীভূত হয়ে তৈরি হতে পারে ‘সংখ্যাগুরুর স্বৈরতন্ত্র’; অন্যদিকে ক্ষমতার সমীকরণ বদলে গিয়ে জন্ম নিতে পারে ‘অভিজাতদের স্বৈরতন্ত্র’, যেখানে সাধারণ মানুষ প্রান্তিক হয়ে পড়ে। গণতন্ত্রের মূল সংগ্রামটিই হলো এই দুই চরমপন্থার মাঝখানে সঠিক ভারসাম্য খুঁজে নেওয়া। লক্ষ্য একটাই, যাতে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে নীতিনির্ধারণের সময় জনগণের আসল কণ্ঠস্বর ও উদ্বেগের প্রতিফলন ঘটে। তাই গণতন্ত্রে বিরোধী দলের ‘আদর্শ’ ভূমিকা কেমন হবে, তা নির্ভর করে আমরা রাষ্ট্রে ঠিক কোন ধরনের গণতান্ত্রিক কাঠামো দেখতে চাই, তার ওপর।</p><p>বাংলাদেশে অনেকের কাছেই গণতন্ত্রের ধারণাটি অত্যন্ত সংকুচিত। পাঁচ বছর পরপর একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার রদবদল ঘটলেই এখানে রাষ্ট্রকে ‘গণতান্ত্রিক’ বলে ধরে নেওয়া হয়। গণতন্ত্রের এই ন্যূনতম সংজ্ঞাকে পুরোপুরি ভুল বলা যাবে না। তবে আমাদের মনোযোগ যদি কেবল নির্বাচনের দিনটিতেই নিবদ্ধ থাকে, তবে মধ্যবর্তী সময়ে বিরোধী দলের কাছ থেকে গঠনমূলক কিছু আশা করা অর্থহীন। এমন ব্যবস্থায় প্রতি পাঁচ বছর পরপর ভোট হবে ঠিকই, কিন্তু দুই নির্বাচনের মধ্যবর্তী সময়ে সব ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত থাকবে ক্ষমতাসীনদের হাতে; রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো হারাবে স্বাধীনতা এবং নাগরিকদের ভূমিকা কেবল ব্যালট পেপারে সিল মারাতেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে। এই কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে বিরোধী দল পাঁচ বছর ধরে নির্বাহী বিভাগকে জবাবদিহির আওতায় আনার কোনো সুযোগ পায় না, অথচ পাঁচ বছর পর বিশাল ক্ষমতা নিয়ে সরকার গঠনের দৌড়ে নেমে পড়ে। এমন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় বিরোধীদের কাছ থেকে দায়িত্বশীল আচরণ আশা করা যায় না।</p><figure><img alt="" src="https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla/2026-11-03/68g2nkos/Prothomalo-Atol28.jpeg"></figure><p>অন্যদিকে আমরা যদি গণতন্ত্রকে একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখি যেখানে সরকারি নীতি নির্ধারিত হবে রাজনৈতিক আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে, যেখানে একক আধিপত্যের সুযোগ থাকবে না এবং ক্ষমতার অপব্যবহার রুখতে নির্বাহী বিভাগের ওপর কঠোর নজরদারি থাকবে, তাহলেই বিরোধী দলের কার্যকর ভূমিকার সুযোগ তৈরি হয়। মূলত আমরা এমন এক প্রতিনিধিত্বমূলক উদার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চাই, যা রাজনীতিকে ‘বিজয়ীই সব নিয়ে নেয়’ নীতি থেকে সরিয়ে ‘কিছু জেতো কিছু হারো’ নীতির ওপর দাঁড় করায়।</p><p>তবে কোনো ক্ষমতাসীন দলই স্বেচ্ছায় নিজেদের ক্ষমতা সীমিত করতে চায় না। তাই এই রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলার যৌক্তিকতা তুলে ধরা, নাগরিক সমাজের সঙ্গে মিত্রতা গড়ে তোলা এবং কাঠামোগত সংস্কারের জন্য সরকারের ওপর চাপ তৈরি করাই বিরোধী দলের মূল কাজ হতে হবে। </p><p>তবে প্রতিনিধিত্বমূলক উদার গণতন্ত্রেরও একটি বড় সীমাবদ্ধতা রয়েছে। প্রায়ই এই ব্যবস্থা অভিজাতদের দর-কষাকষির ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরশীল করে ফেলে এবং নীতিনির্ধারণে সাধারণ মানুষের সরাসরি প্রভাবের পথ সংকুচিত করে। প্রতিনিধিরা যেন সুনির্দিষ্ট এলাকাভিত্তিক সংকীর্ণ দাবির ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, এই তত্ত্বের সুযোগ নিয়ে বাস্তবে নাগরিকদের মতামতকে উপেক্ষিত রাখা হয়। এই সীমাবদ্ধতা থেকেই জন্ম নিয়েছে ‘অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের’ ভাবনা, যেখানে সিদ্ধান্ত গ্রহণপ্রক্রিয়ায় জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। এই ধারা হতে পারে বেশ পরিবর্তনকামী, যেমন নাগরিক সমাবেশ বা নিয়মিত গণভোটের মাধ্যমে বড় নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া। আবার এটি হতে পারে একটি কার্যকর পরামর্শমূলক ব্যবস্থা, যেখানে নাগরিকেরা সহজেই তাঁদের দাবি নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে পৌঁছে দিতে পারেন। অবশ্যই এমন অংশগ্রহণমূলক ব্যবস্থাকে সাংবিধানিক সুরক্ষার আওতায় রাখতে হয়, যাতে সংখ্যাগরিষ্ঠের চাওয়ায় সংখ্যালঘুর অধিকার ক্ষুণ্ন না হয়। আমরা যদি এমন প্রাণবন্ত গণতন্ত্র গড়ে তুলতে চাই, তবে বিরোধী দলকে সাধারণ মানুষের আরও কাছাকাছি আসতে হবে।</p><p>গণতন্ত্রের এই তিন ধরন নির্বাচনী—উদার প্রাতিষ্ঠানিক এবং অংশগ্রহণমূলক পরস্পরের বিরোধী নয়। অবাধ নির্বাচন যদি ভিত্তিপাথর হয়, তবে উদার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো হলো ক্ষমতার অপব্যবহার রোধের বর্ম, আর অংশগ্রহণমূলক ব্যবস্থা হলো সাধারণ মানুষের ক্ষমতার চাবিকাঠি। আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই তিন মাত্রাকে একটি সুতায় গাঁথা। আমরা যত বেশি নিছক ‘ভোটকেন্দ্রিক’ চিন্তা থেকে বেরিয়ে এসে নীতিনির্ধারণে নাগরিককে সম্পৃক্ত করার দিকে যাব, বিরোধী দলের গুরুত্ব ততটাই বাড়বে। বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিরোধীদের ভূমিকা আরও বেশি সংবেদনশীল ও জরুরি। শাসক দল যখন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্নির্মাণে অনিচ্ছুক, সমালোচনা সহ্য করতে নারাজ, আমলাতন্ত্রের দলীয়করণে ব্যস্ত, দল ও সরকারকে একাকার করে ফেলছে এবং নিজস্ব কর্মীদের নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ, তখন ক্ষমতাসীন দল নিজে থেকে কোনো সংস্কার করবে, এমন আশা করা ভুল। স্বৈরাচারী প্রবণতার মুখে ক্ষমতার লাগাম টানতে বিরোধী দলকেই রাজপথ ও নাগরিক সমাজের সমন্বয়ে এক শক্তিশালী প্রতিরোধ ও বিকল্প ব্যবস্থার রূপরেখা তৈরি করতে হবে।</p><figure><img alt="" src="https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla/2026-11-03/xb5qttsz/Supply-2.png"><figcaption>অধ্যাপক আসিফ মোহাম্মদ শাহান</figcaption></figure><p>প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশে বর্তমান বাস্তবতায় বিরোধী দলগুলো কি সেই দায়িত্ব পালন করছে? দুঃখজনকভাবে বিরোধীদের রাজনীতি এখনো সংঘাতকেন্দ্রিক এবং নাগরিকমুখী চিন্তাভাবনা থেকে দূরে। একটি প্রগতিশীল ও গঠনমূলক বিরোধী রাজনীতি বাস্তবায়নে তাদের কয়েকটি সুনির্দিষ্ট বিষয়ে জোর দেওয়া জরুরি।</p><p>প্রথমত, শুধু সরকারি কর্মকাণ্ডের সমালোচনায় সীমাবদ্ধ না থেকে কীভাবে একটি টেকসই রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার আনা যায়, তার স্পষ্ট যৌক্তিকতা জনগণের সামনে উপস্থাপন করা। ক্ষমতাসীন অভিজাত জোটে ফাটল ধরাতে সুশীল সমাজ ও প্রাতিষ্ঠানিক অংশীদারদের নিয়ে একটি পাল্টা সংস্কারবাদী রাজনৈতিক অক্ষ গড়ে তোলা প্রয়োজন।</p><p>দ্বিতীয়ত, ‘লংমার্চ’ বা শক্তি প্রদর্শনের চিরাচরিত কর্মসূচির রাজনৈতিক কার্যকারিতা এখন তলানিতে। কেবল নিজেদের সমর্থক জমায়েত না করে বিরোধী দলকে পৌঁছাতে হবে আপামর জনগণের দোরগোড়ায়। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বেকারত্ব, খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা কিংবা দুর্নীতির মতো দৈনন্দিন সংকটগুলো যে বিদ্যমান শাসনব্যবস্থারই ফসল, তা সাধারণ মানুষকে প্রাঞ্জল ভাষায় বোঝাতে হবে। এই ক্লান্তিহীন ও ধৈর্যশীল কাজ ছাড়া গণ–আস্থা অর্জন করা সম্ভব নয়।</p><p>তৃতীয়ত, একটি সমতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার স্পষ্ট ভিশন থাকা চাই। জনতুষ্টিবাদ, ধর্মীয় চরমপন্থা কিংবা বৈষম্যমূলক মানসিকতার ওপর ভর করে কোনো দল গণতান্ত্রিক কাঠামো ব্যবহার করলেও তা শেষ পর্যন্ত সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বৈরতন্ত্রেই রূপ নেয়। বিরোধী দলকে সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করতে হবে যে ধর্ম, জাতি বা লিঙ্গপরিচয়–নির্বিশেষে প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার রক্ষা এবং ভিন্নমতকে শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্রহণের এক উদার সংস্কৃতি তারা গড়ে তুলবে। সংখ্যালঘুর অধিকার সুরক্ষা ছাড়া কোনো রাষ্ট্রই উদার গণতান্ত্রিক হতে পারে না।</p><h3>বাংলাদেশের বর্তমান বিরোধী দলগুলো এই জায়গায় কতটুকু সফল?</h3><p>সবচেয়ে বড় বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি জামায়াতে ইসলামীর কথাই ধরা যাক। দলটি রাজনৈতিক সমঝোতা কিংবা বস্তুনিষ্ঠ সংস্কার প্রস্তাবের চেয়ে মুখোমুখি সংঘাত ও আবেগসর্বস্ব রাজনীতিতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। ‘সংস্কার’ শব্দটিকে তারা রাজনৈতিক মুখরোচক স্লোগান হিসেবে ব্যবহার করলেও নিজেদের আদর্শের সঙ্গে মেলে না এমন সংস্কার প্রস্তাব (যেমন নারীদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন) তারা স্রেফ এড়িয়ে যায়। গঠনমূলক বিকল্প নীতি উপস্থাপন না করে ১৯৯০-এর দশকের পুরোনো কৌশল নিয়েই তারা হাঁটছে।</p><blockquote>তুলনামূলক তরুণ রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির (এনসিপি) অবস্থান কিছুটা আলাদা। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রতি তাদের আন্তরিকতা রয়েছে এবং তাদের তরুণ সংসদ সদস্যরা সংসদে যুক্তিনিষ্ঠ ও গঠনমূলক ভূমিকা রাখছেন।</blockquote><p>একই সঙ্গে জামায়াত যে সমাজের স্বপ্ন দেখায়, তা একটি উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তারা দলে প্রচুর নারী নেতৃত্বের দাবি করলেও নির্বাচনে নারী প্রার্থী মনোনয়নে নীরব থাকে। ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সংখ্যালঘুদের আস্থা অর্জনে তারা চরমভাবে ব্যর্থ। বাংলাদেশ যে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও মূলত একটি সর্বজনীন গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র, যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত জোর করে চাপিয়ে দেওয়া যায় না—এই সত্য গ্রহণে দলটির ঐতিহাসিক দ্বিধা রয়েছে। রাজনৈতিক সুবিধাবাদের অংশ হিসেবে তারা সমাজে সাংস্কৃতিক বিভাজন বাড়াতে এবং ডানপন্থী জনতুষ্টিবাদী জনস্রোতে ভাসতে মুখিয়ে থাকে। ফলে তাদের পরিবর্তনকামী রূপরেখা কোনোভাবেই অন্তর্ভুক্তিমূলক নয়।</p><p>এর বিপরীতে তুলনামূলক তরুণ রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির (এনসিপি) অবস্থান কিছুটা আলাদা। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রতি তাদের আন্তরিকতা রয়েছে এবং তাদের তরুণ সংসদ সদস্যরা সংসদে যুক্তিনিষ্ঠ ও গঠনমূলক ভূমিকা রাখছেন। তাঁরা বিকল্প নীতির রূপরেখাও তুলে ধরছেন। তবে দলটি নাগরিকদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়া কিংবা তাদের দৈনন্দিন চাহিদার সঙ্গে সংস্কার এজেন্ডাকে যুক্ত করার দিকে খুব কমই মনোযোগ দিচ্ছে। নাগরিকদের উদ্বুদ্ধ না করেই তারা একটি অসম্ভব যুদ্ধ জেতার চেষ্টা করছে। তদুপরি এনসিপি একটি স্পষ্ট ‘হ্যামলেটীয় দ্বিধা’র মুখোমুখি হচ্ছে বলে মনে হয়, যেখানে একদিকে বহুত্ববাদ, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও সব নাগরিকের সমান অধিকারের প্রতি তাদের ঘোষিত অঙ্গীকার এবং অন্যদিকে রক্ষণশীল সংখ্যাগরিষ্ঠ মনোভাবকে তুষ্ট করার রাজনৈতিক চাপ—এই দুইয়ের মাঝখানে তারা আটকে পড়ছে।</p><blockquote>একটি দেশে বিরোধী দলের প্রকৃত শক্তি শুধু সরকার ফেলার ক্ষমতা বা নির্বাচনে জেতার সম্ভাবনার ওপর নির্ভর করে না। তা পরিমাপ করা হয় প্রতিষ্ঠান গড়ার অঙ্গীকার, নাগরিক সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি এবং অজনপ্রিয় হলেও সত্য ও অন্যের অধিকার রক্ষার সৎ সাহসের মাধ্যমে।</blockquote><p> দলটি প্রকাশ্যে নারীর অধিকার এবং বাংলাদেশের বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে রক্ষা করার কথা বললেও প্রায়ই নিজেদের নীতিগত অবস্থানে অবিচল থাকতে ব্যর্থ হয় এবং দ্রুতই আপস করার পথ বেছে নেয়। শেক্সপিয়ারের হ্যামলেটের মতো এনসিপি কোনো একটি নীতিগত অবস্থানের দিকে এগোয় ঠিকই, কিন্তু সেই অবস্থানের জন্য যখন রাজনৈতিক সাহসের প্রয়োজন হয়, তখনই তারা দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। জামায়াতের সঙ্গে তাদের জোট অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ প্রতিষ্ঠার নীতির বিষয়ে তাদের অবস্থানকেও ক্ষুণ্ন করেছে।</p><p>এনসিপি অন্য একটি সমস্যায়ও ভুগছে। তাদের কোনো কোনো নেতা কেবল জনতুষ্টিবাদী বক্তব্যই গ্রহণ করেননি, বরং ব্যক্তিগত অপমান, কুরুচিপূর্ণ নামে ডাকা এবং ষড়যন্ত্রতত্ত্ব ছড়িয়ে দেওয়ার মতো তথাকথিত কাদা–ছোড়াছুড়ির রাজনীতিতে জড়িয়েছেন। এনসিপির কিছু নেতা তাঁদের সহকর্মীদের চর্চিত এই রাজনীতির দায় নিতে অস্বীকৃতি জানালেও দলটি এ পর্যন্ত জড়িতদের বিরুদ্ধে কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেয়নি। এ ধরনের রাজনীতি সমাজে রাজনৈতিক বিভাজন আরও বাড়ায় এবং ‘আমরা বনাম তারা’ নামের এক ক্ষতিকর সামাজিক মনস্তত্ত্ব তৈরি করে। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য এটি অত্যন্ত আশঙ্কাজনক।</p><p>এ ছাড়া সংসদের বাইরে থাকা অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তির কথা বললে বামপন্থী দলগুলোর রয়েছে তীব্র সাংগঠনিক সক্ষমতার অভাব; চরম-ডানপন্থী দলগুলোর দর্শন উদার গণতন্ত্রের সম্পূর্ণ বিপরীত; আর তরুণ রাজনৈতিক মঞ্চগুলোর সদিচ্ছা ও আধুনিক মূল্যবোধ থাকলেও রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে দাঁড়াতে তাদের আরও দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে।</p><p>একটি দেশে বিরোধী দলের প্রকৃত শক্তি শুধু সরকার ফেলার ক্ষমতা বা নির্বাচনে জেতার সম্ভাবনার ওপর নির্ভর করে না। তা পরিমাপ করা হয় প্রতিষ্ঠান গড়ার অঙ্গীকার, নাগরিক সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি এবং অজনপ্রিয় হলেও সত্য ও অন্যের অধিকার রক্ষার সৎ সাহসের মাধ্যমে। বাংলাদেশের আজ এমন এক বিরোধী রাজনীতি প্রয়োজন, যা ক্ষমতার লড়াইয়ের ঊর্ধ্বে উঠে জবাবদিহি, সুশাসন ও সহনশীল সমাজ প্রতিষ্ঠার নিশ্চয়তা দেবে। এমন বিরোধী দল ছাড়া ‘গণতন্ত্র’ কেবল ভোটের দিনের একটি আনুষ্ঠানিকতা হয়েই থাকবে, আর প্রকৃত গণতান্ত্রিক শাসনের স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে। l</p><p><strong>* আসিফ মোহাম্মদ শাহান: </strong>অধ্যাপক, উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়</p>
<p>কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থায় আইন ও আদালতের একটা প্রধান উপযোগিতা রেজিমের বৈধতা প্রদান করা। তা করার একটি বিশেষ উপায় হলো রাষ্ট্রের প্রধান ও গুরুতর রাজনৈতিক বিতর্কগুলো সমাধানের ক্ষেত্রে অতিমাত্রায় আদালতনির্ভরতা। তাত্ত্বিকেরা এর নাম দিয়েছেন ‘রাজনীতির বিচারিকীকরণ’। এ প্রক্রিয়ায় ‘রাজনৈতিক আদালত’–এর উত্থান ঘটে এবং রাজনৈতিক পরিসরকে ব্যাপকভাবে বিভাজিত করা হয়। সরকার তার ক্ষমতা ও বৈধতা-সংক্রান্ত প্রধান প্রশ্নগুলো বা সংস্কারের ইস্যুগুলো আদালতের কাঁধে বন্দুক রেখে সমাধান করে নেয়। বাজেট, নিয়োগ ও পদোন্নতি নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণে রেখে, উচ্চ আদালতে বেঞ্চ পুনর্গঠন করে কিংবা অবসর-পরবর্তী নিয়োগের প্রলোভন সামনে রেখে বিচার বিভাগকে নতজানু করে রাখা হয়। ঘটে ‘বিচারব্যবস্থার রাজনীতিকরণ’।</p><p>এই দুই প্রক্রিয়ার মিথস্ক্রিয়ায় আরও একটা লক্ষণ প্রকট হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক পরিসরে আইনি ডিসকোর্স, বাগাড়ম্বর, বিধি, প্রক্রিয়ার বিস্তৃতি ঘটে এবং নীতি প্রণয়ন প্রক্রিয়াও আধা বিচারিক বিধিবিধান ও প্রক্রিয়ায় রূপান্তরিত হয়।</p><p><strong>২</strong></p><p>বাংলাদেশে রাজনীতির বিচারিকীকরণ নিয়ে কিছু আলোচনা হলেও এর যে প্রধান প্রবণতা এখনো চিহ্নিত করা হয়নি, তা হলো বিচার বিভাগের ‘কৌশলগত দলবদল’। অর্থাৎ, রেজিমের জারি করা সাংবিধানিক সংশোধনীগুলোতে সাধারণত হাত না দেওয়া, এড়িয়ে যাওয়া কিংবা প্রয়োজনে বৈধতা দেওয়া। গত তিন দশকের বিভিন্ন তুলনামূলক গবেষণায় দেখা যায়, বিচারকেরা সাধারণত সব রাজনৈতিক পরিবেশের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নেন। তাঁরা তাঁদের ক্ষমতার ব্যাপ্তি ও সীমা সম্পর্কে সচেতন থাকেন এবং ক্ষমতাসীনদের সম্ভাব্য রাজনৈতিক পতনের অপেক্ষায় থাকেন।</p><figure><img alt="" src="https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla/2026-11-03/jimlylnx/Prothomalo-Atol28.jpeg"></figure><p>কর্তৃত্ববাদী আমলে আদালত শাসকদের হাতের খেলনায় রূপান্তরিত হন, এই পূর্বানুমানও বিচারকদের মধ্যে একধরনের বাড়তি দায়মুক্তির বোধ তৈরি করে। ফলে দেখা যায়, সংবিধানে ব্যাপক কাঁটাছেঁড়া কিংবা সামরিক শাসন জারি হওয়ার পরও সংস্কারমনস্ক বিচারকেরা কখনো কখনো রাজনৈতিক সংস্কারের জন্য সূক্ষ্ম চাপ প্রয়োগ করেন, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে নির্বাহী স্বেচ্ছাচারের ওপর প্রগতিশীল রুল জারি করেন; কিন্তু আইনে জুডিশিয়াল রিভিউর পূর্ণ ক্ষমতা থাকলেও সামরিক আইন কিংবা জরুরি অবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করে কোনো রায় দেন না।</p><p>কর্তৃত্ববাদী শাসন দীর্ঘস্থায়ী হলে বিচারকেরা কৌশলী ভূমিকায় সিদ্ধহস্ত হয়ে ওঠেন; রেজিম দুর্বল হওয়ার অপেক্ষায় থাকেন। ফলে ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর প্রতি আপাত–আনুগত্য প্রদর্শন করলেও রেজিমের পতনের রেখা স্পষ্ট হলেই তার মৌলিক স্বার্থগুলো চ্যালেঞ্জ করা হয়।</p><p><strong>৩</strong></p><p>বাংলাদেশের রাজনীতির বিচারিকীকরণের একটা প্রধান ক্ষেত্র হলো সংবিধান সংশোধনের রাজনীতি। বিচার বিভাগ কীভাবে বিচারিক রক্ষণশীলতা ও কৌশলগত দলবদলের মাধ্যমে ক্ষমতার হাত ধরে চলেছে, তার একটা খোঁজ পাওয়া যাবে সংবিধান সংশোধনী–সংক্রান্ত মামলাগুলোর পটভূমি বিশ্লেষণে। বাংলাদেশে সংবিধান সংশোধন হয়েছে ১৭ বার। উচ্চ আদালত কর্তৃক সংশোধনী বাতিলের ঘটনা ঘটেছে ছয়বার। একটি ব্যতিক্রম ছাড়া প্রতিটি ক্ষেত্রেই সংশোধনীগুলো বাতিল করা হয়েছে চলমান রেজিমের চূড়ান্ত পতনের কালে কিংবা অনেক পরের ভিন্ন রেজিমে কিংবা। </p><figure><img alt="" src="https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla/2026-11-03/wy9t3zan/Supply-10.png"><figcaption>রাশেদ রাহম</figcaption></figure><p>সংবিধানের মৌল কাঠামোর প্রথম আমূল পরিবর্তন করা হয় ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে। দুই সপ্তাহের মধ্যে এই সংশোধনী আদালতের পর্যবেক্ষণের আওতায় আসে। বিচার্য বিষয় বাহাত্তরের সংবিধানের ১০২ নম্বর অনুচ্ছেদে প্রদত্ত হাইকোর্টের ‘ইন্টেরিম অর্ডার’ পাস করার ক্ষমতা চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সম্পূর্ণভাবে কেড়ে নেওয়া হয়েছে কি না। কিছুটা সংশয়, কিছুটা জটিলতার ইঙ্গিত দিলেও ‘জাতির পিতার দ্বিতীয় বিপ্লব’–এর প্রতি অনুমোদনের স্বরই উঠে আসে বিচারপতি মুনীম ও বিচারপতি সায়েমের পর্যবেক্ষণ থেকে। কিন্তু রেজিম পড়ে যাওয়ার পরে ১৯৮১ সালের হাইকোর্ট ঠিকই স্বীকার করে নেন, চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো এমনভাবে ধ্বংস করা হয়েছে যে একে ‘আগের সংবিধান বলে চেনাই মুশকিল’ হয়ে পড়েছিল।</p><p>পাকিস্তানের সাবেক প্রধান বিচারপতি (১৯৫৪-৬০) মুনীরের নেতৃত্বাধীন সুপ্রিম কোর্ট সামরিক শাসনকে বৈধতা দান করেছিলেন ‘ডকট্রিন অব নেসেসিটি’ দিয়ে। বাংলাদেশের বিচারালয়ে সেই তত্ত্ব সর্বরোগ নিরাময়কারী মহৌষধ হিসেবে পুনরাবৃত্ত হয়ে চলেছে। এমনকি চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানের পরও সংস্কার কিংবা পুনর্গঠনের পক্ষ-বিপক্ষনির্বিশেষে বহু মহাজনকে এই তত্ত্বের ব্যবহার করতে দেখা যায়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জারি করা সামরিক শাসন বলবৎ থাকে ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল পর্যন্ত। পঞ্চম সংশোধনী জারি করে সব সামরিক ফরমান ও কার্যক্রমের বৈধতা দেওয়া হয়। বিভিন্ন মামলায় সামরিক শাসনের বিষয়টি সামনে আসে। আদালত যথারীতি তার রক্ষণশীলতার বর্ম পরে জানান, সামরিক শাসন আইনবিজ্ঞানের ‘পরিচিত ধারণা’; ‘সাধারণ আইনের আওতার বাইরে কিছু সংশোধনমূলক/সংস্কারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণের স্বার্থে’ জারি করা যায়, কিংবা আদালতের ‘সুপারভাইজরি ক্ষমতা’ সামরিক আইন দ্বারা ‘সম্পূর্ণভাবে বাতিল’ হয়ে যায়।</p><blockquote>২০১০ সালে আপিল বিভাগ পঞ্চম সংশোধনী অবৈধ মর্মে প্রদত্ত হাইকোর্টের রায় বহাল রাখেন। সরকারি-বেসরকারি প্রচারযন্ত্রে বিপুলভাবে উদ্যাপিত এই ‘ঐতিহাসিক রায়ের’ মাধ্যমে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির রাজনৈতিক বৈধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার বিরাট পুঁজি হাসিল করে সরকারি দল আওয়ামী লীগ।</blockquote><p>হাসিনাশাহির কবজা করা আদালত জিয়াউর রহমানকে ‘ক্ষমতা-দখলকারী’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। কিন্তু জিয়াউর রহমানের ক্ষমতার বেসামরিকীরণে বিচার বিভাগেরও ভাগ আছে। বাংলাদেশ আর্মি রেগুলেশন (ভলিউম ১, রুলস)-এর ২৯৩ নম্বর বিধি অনুযায়ী সামরিক বাহিনীর সদস্যরা কোনো নির্বাচনে দাঁড়াতে পারবেন না, মর্মে প্রধান সামরিক শাসক সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নপত্র জমাদানের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা হয়েছিল। আদালত তা খারিজ করে দেন।</p><p>২০০৫ সালে খায়রুল হক-ফজলে কবীরের হাইকোর্ট বেঞ্চ যখন ১৯৭৫-৭৯ পর্বের সামরিক শাসনকে বৈধতাদানকারী ৫ম সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করেন, তত দিনে হাইকোর্টের নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শ করার দীর্ঘদিনের প্রথা ভেঙে পড়েছে, অতিরিক্ত বিচারক নিয়োগের প্রক্রিয়াকে দলীয় নিয়োগের প্রবেশদ্বার বানানো হয়েছে এবং রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডগুলোর বিচারকে কেন্দ্র করে বিচার বিভাগের চূড়ান্ত দলীয়করণের প্রাতিষ্ঠানিকীরণ ঘটে গেছে। ২০১০ সালে আপিল বিভাগ পঞ্চম সংশোধনী অবৈধ মর্মে প্রদত্ত হাইকোর্টের রায় বহাল রাখেন। সরকারি-বেসরকারি প্রচারযন্ত্রে বিপুলভাবে উদ্যাপিত এই ‘ঐতিহাসিক রায়ের’ মাধ্যমে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির রাজনৈতিক বৈধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার বিরাট পুঁজি হাসিল করে সরকারি দল আওয়ামী লীগ। </p><blockquote>২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার এসে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে। বিচার বিভাগ পৃথক্করণের সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতির আংশিক বাস্তবায়নের বিনিময়ে উচ্চ আদালতের নিরঙ্কুশ আনুগত্য অর্জন করে।</blockquote><p>১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সেনাপ্রধান জেনারেল এরশাদ সামরিক শাসন জারি করে সংবিধান স্থগিত করেন। তিনি এপ্রিলেই প্রধান বিচারপতিসহ আপিল বিভাগের চার বিচারপতিকে সরিয়ে তাঁর আজ্ঞাবহ বিচারপতি মুনীমকে প্রধান বিচারপতি করেন। বিনিময়ে সামরিক শাসনের বৈধতা দেন বিচারপতি মুনীম। এরশাদের সামরিক শাসনকে বৈধতা দিয়ে জারি করা সপ্তম সংশোধনীও অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হয় খায়রুল হক কোর্টে (২০১১-১২)। হাইকোর্টে বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক (পরবর্তীকালে রাজনৈতিক বিবেচনায় ২১ জনকে ডিঙিয়ে আপিল বিভাগে নিযুক্ত) এবং আপিল বিভাগে দুজনকে ডিঙিয়ে প্রধান বিচারপতি হওয়া খায়রুল হকের প্রযোজনায়। সংবিধানের একচ্ছত্র রক্ষক হিসেবে আওয়ামী লীগের অবস্থান আরও পোক্ত হয়। প্রধান বিরোধী দলের পাশাপাশি তৃতীয় শক্তিশালী রাজনৈতিক দলকেও সামরিক শাসন–জাত দল হিসেবে কলঙ্কিত করে খেলার পুতুলে পরিণত করা যায় সহজেই।</p><p>এরশাদ যাবতীয় কলাকৌশল ব্যবহার করেও বিরোধীদের বাগে আনতে ব্যর্থ হয়ে শেষ রাজনৈতিক চাল হিসেবে দুটি প্রধান ক্ষমতাকেন্দ্রকে প্রভাবিত করার পদ্ধতি অবলম্বন করেছিলেন। ১৯৮৮ সালের ৭ জুনের অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে ইসলামকে ‘রাষ্ট্রধর্ম’ করার মাধ্যমে তিনি রাজনীতিতে ধর্ম-প্রশ্ন চিরস্থায়ীভাবে গেঁথে দেন এবং হাইকোর্টের বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে বিরোধী রাজনীতির একটা বড় শক্তি আইনজীবী সমাজকেও বাগে আনার উদ্যোগ নেন। এই সংশোধনী পাস হওয়ার দিনেই বিরোধী সব পক্ষ এই সংশোধনীকে নাকচ করে আন্দোলন শুরু করে। কৌশলগত দলবদলের এ রকম মোক্ষম সময়ে এসেই কেবল প্রথমবারের মতো আদালতকে সংবিধান-দলনকারী কোনো শাসকের বিরুদ্ধে কথিত ‘সংবিধানের অভিভাবক’–এর ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে দেখা যায়। আপিল বিভাগ অষ্টম সংশোধনীর হাইকোর্ট-সংক্রান্ত বিধান অবৈধ ঘোষণা করে। কিন্তু তত দিনে এরশাদের আয়ুরেখা শেষ দিকে, পতন অবশ্যম্ভাবী। </p><p>২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার এসে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে। বিচার বিভাগ পৃথক্করণের সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতির আংশিক বাস্তবায়নের বিনিময়ে উচ্চ আদালতের নিরঙ্কুশ আনুগত্য অর্জন করে। জরুরি অবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে রিট হয়। আদালত সরকারকে ক্ষমতা হস্তান্তরের রূপরেখা দিতে বলে তার দুই বছরের ‘সংস্কার’ প্রকল্পে সহায়তা করেন। </p><p>ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে প্রবর্তিত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার সাংবিধানিক বৈধতা হাইকোর্টে চ্যালেঞ্জ করা হয় ১৯৯৮ সালে। ২০০৪ সালে ত্রয়োদশ সংশোধনীকে বৈধ ও সাংবিধানিক ঘোষণা করে হাইকোর্টের রায়ের পর ২০০৫ সালেই আপিল হয়। কিন্তু তার শুনানি হয় আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরলে—২০১০ সালের ১ মার্চ। সেপ্টেম্বর নাগাদ প্রধান বিচারপতির আসনে খায়রুল হক। ২০১১ সালের ১০ মে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন সাত বিচারপতির আপিল বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতে ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল ঘোষণা করেন। রায় লেখেন এক সপ্তাহ পরে পদত্যাগ করতে যাওয়া প্রধান বিচারপতি, এদিন কেবল সংক্ষিপ্ত রায়ে অবৈধ ত্রয়োদশ সংশোধনীকে ঘোষণা করেন। পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয় তাঁর অবসর গ্রহণের ১৬ মাস <br>পর ২০১২ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর। তার আগেই সংক্ষিপ্ত রায় ঘোষণার মাস দেড়েকের মধ্যেই ২০১১ সালের ৩০ জুন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার বিলুপ্তিসহ ৫৪টি সংশোধনীসহ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী জাতীয় সংসদে পাস হয়। ১৫ আগস্ট ও ৩ নভেম্বরের জেলখানা হত্যাকাণ্ডের বিচার এবং ৫ম ও ৭ম সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করার মাধ্যমে ইতিমধ্যে সরকারের আইন ও সংবিধাননিষ্ঠা এবং প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর অগণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা সম্পর্কে ব্যাপক সম্মতি উৎপাদন করে ফেলা হয়। রাজনীতির চরম বিচারিকীকরণের মাধ্যমে দেশে চূড়ান্ত কর্তৃত্ববাদী শাসন সংহত হয়, পরের নির্বাচনগুলো রূপান্তরিত হয় প্রহসনে। সংবিধান ও আইনের শাসন রক্ষার বুলিতে দেশ বিভোর-বিহ্বল হয়ে ওঠে, কিন্তু নাগরিক অধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে সংবিধান উধাও হয়ে যায়। রাজনীতি ও নীতি পরিণত হয় বিচারিক বা আধা বিচারিক বিধিবিধান ও প্রক্রিয়ায়। কিন্তু এ বিষয়ে বিচার বিভাগের ঘুম ভাঙতে একটা অভ্যুত্থানের প্রয়োজন হয়।</p><p>২০১৬-১৭ সালে এসে বিচার বিভাগ অভূতপূর্বভাবে কর্তৃত্ববাদী রেজিমের অসাংবিধানিকতার বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। বিবাদের বিষয় বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের পরিবর্তে সংসদের হাতে ন্যস্ত করে জারি করা ২০১৪ সালের ষোড়শ সংশোধনী। ২০১৭ সালের ৩ জুলাই প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার আপিল বিভাগ সর্বসম্মতভাবে এই সংশোধনীকে অবৈধ ও সংবিধান পরিপন্থী ঘোষণা করে। সরকারপক্ষের প্রবল প্রতিক্রিয়া, নিরাপত্তা বাহিনীর হুমকি-ধমকি ও চরম অপমানের মুখে প্রধান বিচারপতি সিনহা চার মাসের মাথায় দেশ ছাড়তে বাধ্য হন।</p><p>বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রশ্নে বিচারপতি সিনহার অনমনীয় অবস্থানকে এই নিগ্রহের কারণ হিসেবে পড়া যায়। কিন্তু তাঁর নিজের ভাষ্যেই জানা যায়, কীভাবে ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের বিচার ও যুদ্ধাপরাধের বিচারকে কেন্দ্র করে বিচারব্যবস্থার রাজনীতিকীকরণের বিস্তৃত প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল এবং তিনি তার প্রধান কুশীলবের একজন হয়ে উঠেছিলেন। শেষ পর্যন্ত কেবল চাওয়া-পাওয়ার হিসাবটাই মেলেনি। </p><p><strong>৪</strong></p><p>রাষ্ট্রকাঠামো পুনর্গঠনের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে ২০২৪ সালের আগস্টে গণ–অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। কিন্তু সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার ভূত গণ–অভ্যুত্থানকে তাড়িয়ে নিয়ে যায় বিচারের রাজনীতিকরণ ও রাজনীতির বিচারিকীকরণের পথে। আন্দোলনের মুখে ১০ আগস্ট পদত্যাগকারী প্রধান বিচারপতিসহ আপিল বিভাগের ছয়জন বিচারপতি ছিলেন হাসিনাশাহীর ‘রাজনৈতিক আদালতে’র ঘুঁটি। তাঁদের প্রত্যেককেই আপিল বিভাগে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে, একান্ত দলীয় বিবেচনায়। কিন্তু পদত্যাগ করানোর আগে তাঁদের কাছ থেকেই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সরকারের বৈধতা নিতে হয়, যে সরকারের প্রধান ম্যান্ডেটই ছিল সংস্কার বা রাষ্ট্র পুনর্গঠন-প্রক্রিয়ার তদারকি করা। এর মাধ্যমেই রাষ্ট্র গঠনের রাজনীতিকে পুনরায় আইন-আদালতের কাছে সমর্পণ করা হয়, করা হয় এর বিচারিকীকরণ।</p><p>আইন মন্ত্রণালয় ও অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসসহ আদালত প্রাঙ্গণই হয়ে ওঠে সংস্কার–প্রক্রিয়ার প্রধান কেন্দ্র। তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা পুনর্বহাল, পঞ্চদশ সংশোধনী কিংবা ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে জুডিশিয়াল কাউন্সিল পুনর্বহালের মাধ্যমে পুরোনো ব্যবস্থাকে প্রয়োজনীয় ঘষামাজা-মেরামত করে অক্ষুণ্ন রাখার যাবতীয় নির্দেশনা আসে আদালতের বরাতে। ঐকমত্য কমিশনের প্রস্তাবিত জুলাই সনদ, গণভোটের রায় হয়ে ওঠে ফলস লাইন মাত্র। এভাবে গণ–অভ্যুত্থান, নতুন বন্দোবস্ত, সংস্কার আদালত প্রাঙ্গণে গোত্তা খেতে থাকে। অনুমিতভাবেই নির্বাচনী বৈতরণি পার হয়ে নতুন সরকার গঠন করে ‘সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা’। সংস্কারও চলতে থাকে, ‘অক্ষরে অক্ষরে’ পুরোনো ছক মেনে। ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৮টি আইন আকারে পাস হয়, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় ও সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগবিধি হয় না। গুম প্রতিরোধ কিংবা দুর্নীতি দমন কমিশন অধ্যাদেশ হয় না; হতে থাকে সাইবার সুরক্ষা আইন, র্যাব থেকে এসআরবি ইত্যাদি। কারণ, নব-অঙ্গশোভাপ্রাপ্ত পুরোনো ব্যবস্থা অক্ষুণ্ন রাখতে আমাদের দরকার কাঁধে বন্দুক রেখে আরাম হয় এমন নমনীয় বিচার বিভাগ, বৈধতা উৎপাদনের সফেদ কারখানা।</p> <p><strong>* রাশেদ রাহম: </strong>আইনের ইতিহাসবিষয়ক গবেষক</p>
<figure>https://admin-prothomalo-video.chorki.net/v1/bytes/trun-pesarder-nahider-updes</figure>
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর ক্ষমতায় আসা যেকোনো দলের সামনেই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ থাকত—একটি ধ্বংসপ্রায় রাষ্ট্রব্যবস্থার পুনর্গঠন।
বস্তুত, সংস্কার ব্যর্থ হয়নি; বরং সংস্কার ঠেকানোর প্রকল্প সফল হয়েছে। তাই আসল প্রশ্ন দুটি—কে, কীভাবে সেই সাফল্য নিশ্চিত করল, আর এখন কী করা যায়।
<figure>https://admin-prothomalo-video.chorki.net/v1/bytes/mathe-kean-vy-oo-cape-bzatsmzanra</figure>
<p>বাংলাদেশের সংবিধান প্রসঙ্গে দুটো পরস্পরবিরোধী কথা একসঙ্গে বলা যায়। বাংলাদেশের সংবিধান মুক্তিযুদ্ধের ফল। ১৯৬০–এর দশকের নিপীড়ক রাষ্ট্রবিরোধী সব সংগ্রামের প্রতিফলন এখানে আছে। কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে দর্শন ও আকাঙ্ক্ষার বাণী দিয়ে বিচার করতে গেলে আমাদের সংবিধান অত্যন্ত অগ্রসর একটা দলিল। ব্যতিক্রমের মধ্যে অন্যতম হলো এই সংবিধানের উগ্র জাতীয়তাবাদী প্রবণতা, যা নিয়ে গণপরিষদেও কথা উঠেছিল।</p><p>অন্যদিকে এই একই সংবিধানকে কার্যপ্রক্রিয়ার দিক দিয়ে বিচার করা হলে দেখা যাবে, তা জনগণকে যথাসম্ভব ক্ষমতাহীন করেছে এবং ক্ষমতাকে করেছে এক ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত। গণপরিষদের সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত একে এককথায় এভাবে প্রকাশ করেছিলেন, ‘পাকিস্তানের ১৯৬২ সালের সংবিধানে আইয়ুব খানকে কেন্দ্র করে যেভাবে যা রচিত হয়েছিল, ঠিক আজকে আমাদের ১৯৭২ সালের বাংলাদেশের সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীকে কেন্দ্র করে সেইভাবে তাই রচনা করা হয়েছে।’</p><p>বাংলাদেশের সংবিধানের এই বৈপরীত্য নিয়ে সংবিধান প্রণয়নের সময়েই কথা উঠেছিল, গণপরিষদ সদস্য মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা বলেছিলেন, ‘এক হাতে অধিকার দেওয়া হয়েছে এবং অন্য হাতে সেটা কেড়ে নেওয়া হয়েছে।’ </p><p>বহু দশক পর সংবিধানের দর্শন ও কার্যপ্রক্রিয়ার এই বৈপরীত্যই রাজনীতির মাঠে প্রধান প্রশ্ন হিসেবে সামনে চলে এসেছে।</p><p><strong>২</strong></p><p>পৃথিবীজুড়েই এখন সংস্কারের মৌসুম চলছে। শ্রীলঙ্কা-বাংলাদেশের পথ ধরে নেপালেও সরকার উড়ে গেল। ভারতের তরুণেরা বহু দশক পর রাজপথ উত্তাল করেছে। এরপর এল ইউরোপজুড়ে বিক্ষোভের ঢেউ।</p><p>দুনিয়াজুড়ে এই তারুণ্যের বিদ্রোহের মধ্যে কি কোনো গোপন যোগসাজশ, কোনো গোপন ঐকতান আছে, যেমন ছিল অগ্নিঝরা ১৯৬০–এর দশকের ছাত্র আন্দোলনে, কিংবা ২০ বছর আগেকার আরব বসন্তে? কিংবা তাদের আকাঙ্ক্ষার ধরনে কি কোনো সাদৃশ্য আছে?</p><p>মিলের জায়গা একটাই। আন্দোলনগুলোর সূচনা হয়েছে কিছু একটার প্রতিবাদে তরুণদের বিক্ষোভে ফেটে পড়া থেকে। তারপর কোনো কোনো আন্দোলনে শ্রমিক, মধ্যবিত্ত, অন্যান্য রাজনৈতিক দল নানান মাত্রায় যুক্ত হয়েছে। কিন্তু আন্দোলনের সূচনার সূচিমুখ হিসেবে সব সময় তরুণেরাই থেকেছে।</p><figure><img alt="" src="https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla/2026-11-03/rmwagu6y/Prothomalo-Atol28.jpeg"></figure><p>বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের মিলটা এখানে দেখা যাক। বাংলাদেশের বৈষম্যবিরোধী তরুণদের অপমানসূচকভাবে ‘রাজাকার’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন সরকারি লোকজন। বলা যায়, ২০১৮ সাল থেকে তরুণদের কয়েকবারের বিস্ফোরণের পরিণতি হলো চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থান। ভারতের এই তরুণদের ‘তেলাপোকা’ বলে অভিহিত করেছিলেন সেখানকার প্রধান বিচারপতি। প্রতিবাদে ‘তেলাপোকা’ পরিণত হলো বিদ্রোহের প্রতীকে। তারা একভাবে এমন একটা ন্যায্যতার ভাবমূর্তি তৈরি করতে পেরেছে যে বাকি সব রাজনৈতিক দলকে তাদের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই এই আন্দোলনে নামতে হয়েছে।</p><p>ফ্রান্সের তরুণদেরও একটা কথা বারবার উচ্চারিত হয়েছে—আমাদের কথা কেউ শুনতে চায় না। শ্রেণিকক্ষের পরিস্থিতি নিয়ে যে আন্দোলনের সূচনা, তা শেষ পর্যন্ত শ্রেণিগত, বণবাদী, জাতিগত এবং সম্পদের বৈষম্যের বিষয়গুলো নিয়ে সর্বস্তরের ক্ষোভকে ভাষা দিয়েছে। </p><p>অমিলের জায়গাও অনেক। কিন্তু অমিলগুলোর একটা বড় কারণ সম্ভবত রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়ার ধরন থেকে এসেছে। বাংলাদেশে নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের মতো ঘটনায় যেভাবে শিশুদের রক্ত ঝরানো হয়েছিল, কোটা আন্দোলনে হাতুড়ি আর হেলমেটের যে দাপট মানুষ দেখেছে এবং সর্বশেষ গণ–অভ্যুত্থানের শুরু থেকেই পুলিশ-র্যাব-বিজিবি যেভাবে বেপরোয়া গুলিবর্ষণ ও অন্যান্য ধরনের নিপীড়ন করেছে, তা দুনিয়াজুড়ে সাম্প্রতিক সময়ের কোনো আন্দোলনেই এতটা ছিল না। অথচ শেষ অধ্যায়ের আগপর্যন্ত বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলন শুধু অহিংস ছিল না, নিজের বৈধতা উৎপাদনের ভাষাতেও হিংসাত্মক আহ্বান প্রায় ছিল না।</p><blockquote>বাংলাদেশে সাংবিধানিক সংকট বলি, অর্থনৈতিক সংকট বলি, সমাজের গতিশীলতার সংকট বলি—সব একটা সূচিমুখে জমা হয়েছে। তা হলো বিদ্যমান বন্দোবস্ত তরুণ সমাজের সম্ভাবনা বিকাশের পথ রুদ্ধ করে দিয়েছে। এটা সব ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।</blockquote><p>কারণ, এই দেশগুলোর গণতন্ত্রের ক্ষয়িষ্ণুতা নিয়ে, বৈষম্য নিয়ে, সম্পদের নিয়ন্ত্রণ যতই আলোচনা করা হোক না কেন, সেখানে এখনো শক্তিশালী সব প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রীয়ভাবে কার্যকর রয়েছে। আর বাংলাদেশে সংবিধানের আদি প্রবণতাগুলো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে আদৌ তৈরিই হতে দেয়নি।</p><p>এ কারণেই বাংলাদেশে সংবিধানের সংস্কারের প্রশ্নটা বারবার আসছে। সেটা সংস্কারের মাধ্যমে অর্জিত হবে, নাকি বিপ্লবাত্মক রূপ নিতে পারে, সেই বিষয়ে ভাবনাটা জরুরি। কেননা, যেকোনো রাষ্ট্র ও সমাজে কোনো একটা কাঠামোগত বিভাজন কিংবা বৈষম্য যদি ক্রমেই বাড়তে থাকে এবং রাজনীতির প্রক্রিয়াগুলো তা অনুধাবন করতে, তার সমাধান সন্ধান করতে ব্যর্থ হয়, মানুষ যখন বুঝতে পারে, স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় তাদের নালিশ কেউ শুনবে না, রাজনীতির চেনা পথগুলোয় তার সমাধান নেই, তখনই একটা পর্যায়ে বিস্ফোরণগুলো ঘটে। বিস্ফোরণ প্রতিদিন ঘটে না বলে আমরা ধরে নিই মানুষ শান্ত আছে, মানুষ মেনে নিয়েছে। রাজনীতিতে এটা একটা অত্যন্ত ভুল ‘ধরে নেওয়া’।</p><p><strong>৩</strong></p><p>জনগোষ্ঠীর মনে যখন ক্ষোভ–অসন্তোষ জমে ওঠে, তখন শাসকেরা যোগ্য ও বিচক্ষণ হলে সংস্কারের পথে তার নিরসন হয়। শাসকেরা অযোগ্য, দুর্নীতিপরায়ণ কিংবা অন্ধ হলে বিস্ফোরণ বা সহিংসতায় তার প্রকাশ ঘটে। এ কারণেই সমাজে কী কী অসন্তোষ ধূমায়িত হচ্ছে, তা নিয়ে সচেতন থাকা যেকোনো বুদ্ধিমান শাসকের কর্তব্য।</p><p>বাংলাদেশে সাংবিধানিক সংকট বলি, অর্থনৈতিক সংকট বলি, সমাজের গতিশীলতার সংকট বলি—সব একটা সূচিমুখে জমা হয়েছে। তা হলো বিদ্যমান বন্দোবস্ত তরুণ সমাজের সম্ভাবনা বিকাশের পথ রুদ্ধ করে দিয়েছে। এটা সব ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।</p><blockquote>রাষ্ট্রের শাসনতান্ত্রিক কাঠামো যদি কতিপয়ের হাতে কুক্ষিগত থাকে, তাহলে তরুণ উদ্যোক্তা, তরুণ পণ্ডিত, তরুণ চিকিৎসক, তরুণ প্রকৌশলী, তরুণ বুদ্ধিজীবী—কেউই নিজের সম্ভাবনা বিকশিত করার যথেষ্ট পরিসর পান না। </blockquote><p>গণ–অভ্যুত্থানের কল্যাণে রাজনীতিতে কিছু তরুণ মুখ এসেছেন। কিন্তু তাঁদেরও একটা বড় অংশ রাষ্ট্রচিন্তার ক্ষেত্রে পুরোনো বন্দোবস্তের লোক। ফলে এত বড় একটা গণ–অভ্যুত্থানের ফল হয়েছে কিছু নতুন মুখের অন্তর্ভুক্তি।</p><p>রাজনীতি করে, রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় নিজেকে গড়ে তুলে নিজেকে জনগণের সামনে নেতৃত্ব আকারে হাজির করা বাংলাদেশ থেকে বলতে গেলে উধাও হয়েছে। গত সরকারের আমলে আমরা দেখেছি, রাজনৈতিক দলে জায়গা করে নেওয়া ও পদোন্নতির জন্য প্রধান যে গুণটা প্রয়োজন ছিল, তা গুন্ডামি। বহু ক্ষেত্রেই গুন্ডারা আলোকচিত্রীদের অনুরোধ করতেন তাঁদের নৃশংসতার ছবি ছাপাতে, কারণ তাতে পদপদবিতে এগোনো যাবে।</p><p>এটা কিন্তু শুধু রাজনীতিতে নয়, অর্থনীতিরও অধিকাংশ পরিসরে প্রযোজ্য। যোগাযোগ ছাড়া কোনো সৎ উদ্যোক্তার পক্ষে টিকে থাকা মুশকিল। সাধারণভাবে দেশের উদ্যোক্তা শ্রেণি জিম্মি আমলাতন্ত্র ও রাজনৈতিক চক্রের কাছে। এর মধ্যে দ্বিতীয়টা পরিবর্তনশীল হলেও প্রথমটা পাকিস্তান আমল থেকেই অনড়-অচল।</p><p>এর প্রভাব সমাজে সর্বত্র পড়ে। রাষ্ট্রের শাসনতান্ত্রিক কাঠামো যদি কতিপয়ের হাতে কুক্ষিগত থাকে, তাহলে তরুণ উদ্যোক্তা, তরুণ পণ্ডিত, তরুণ চিকিৎসক, তরুণ প্রকৌশলী, তরুণ বুদ্ধিজীবী—কেউই নিজের সম্ভাবনা বিকশিত করার যথেষ্ট পরিসর পান না। </p><figure><img alt="" src="https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla/2026-11-03/crp3pk4a/Supply-6.png"><figcaption>ফিরোজ আহমেদ</figcaption></figure><p>তরুণদের সঙ্গে রাষ্ট্রের সংঘাত একেক রাষ্ট্রে একেক সময়ে একেক কারণে হয়। আবার, সংঘাত প্রকাশের ধরনেও ভিন্নতা থাকে। বাংলাদেশের বেলায় নিশ্চিত করে বলা যায়, বহু বছর ধরেই এ দেশের কম বয়সীরা রাষ্ট্রকে প্রতিবন্ধক হিসেবে বিবেচনা করেছেন। পুলিশ, রাজনীতিবিদ, আমলা, এমনকি সাধারণভাবে জ্যেষ্ঠ জনগোষ্ঠী—সবাই বর্গ আকারেই তরুণদের প্রতিপক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। ক্ষমতা কুক্ষিগত করার যে প্রক্রিয়া বাহাত্তরের সংবিধানে শুরু হয়েছিল, এটা তারই পরিণতি এবং এটা বিপজ্জনক। কোনো সমাজে স্বাভাবিক বিকাশের সুযোগ না থাকলে দুর্নীতি ও সহিংসতা সেই সমাজের সাধারণ বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়।</p><p>পঁচাত্তর–পরবর্তী শাসকেরা বাহাত্তরের সংবিধানে বিসমিল্লাহ, রাষ্ট্রধর্ম ইত্যাদি যুক্ত করলেও এর ক্ষমতাকাঠামোতে মৌলিক কোনো বদল করেনি। এর ব্যাখ্যায় বদরুদ্দীন উমর লিখেছিলেন, ‘তার কারণ গুণগতভাবেই এই সংবিধানটি এমন ছিল যে এই কাঠামোর ভেতর ছোটখাট কিছু সংশোধনীর মাধ্যমেই সামরিক শাসকেরা নিজেদের কাজকর্ম চালিয়ে নিতে পেরেছিল।’</p><p>অর্থাৎ উৎপাদনশীলতা নয়, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, ক্ষমতা ব্যবহার–অপব্যবহার করে অবৈধ অর্থ আদায়, এমনকি নিয়োগ–বাণিজ্য পরিণত হয়েছে বিত্তবান হওয়ার প্রধান উপায়ে। ফলে বহু ক্ষেত্রেই এ দেশে পরিশ্রমী শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদের চেয়ে রাজনীতিঘনিষ্ঠ ব্যক্তি ও আমলারা বেশি সম্পদশালী। সংবিধানের কাঠামো এই বাস্তবতা নির্মাণ করায় বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। এটাই সমাজে মোট সম্ভাব্য সুযোগ তৈরির সম্ভাবনাকে সীমিত করে রাখে, যার ছাপ আমরা দেখি সব পেশায়, এমনকি সৃজনশীল কর্মকাণ্ডেও।</p><p><strong>৪</strong></p><p>সংবিধান সংস্কার কমিশন বিদ্যমান সংবিধানের ক্ষমতাকাঠামোর সংস্কারে যে কয়টি সুপারিশ করেছে, সেগুলো হলো ক্ষমতার প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা, প্রধানমন্ত্রীর পদের একচ্ছত্র ক্ষমতা হ্রাস, বিচার বিভাগের বিকেন্দ্রীকরণ, শক্তিশালী স্থানীয় সরকারব্যবস্থা সুনিশ্চিতকরণ, মৌলিক অধিকারের আওতা সম্প্রসারণ, সাংবিধানিক সুরক্ষা ও বলবৎকরণ নিশ্চিতকরণ।</p><p>কিন্তু বাংলাদেশে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে বলা যায়, সম্পদের প্রবাহের ওপর একচ্ছত্র কর্তৃত্ব কায়েম করা রাজনৈতিক সরকার ও আমলাতন্ত্র—উভয়েই এই বিষয়ে ন্যূনতম আগ্রহী থাকবে। অন্যদিকে তরুণ জনগোষ্ঠীকে এই ক্ষমতাকাঠামোতে বেঁধে রাখার যে বন্দোবস্ত কার্যকর ছিল, আওয়ামী লীগের অপসারণের মাধ্যমে সেটার অবসান ঘটেছে। আওয়ামী লীগের আমলের বড় সময়জুড়েই এ দেশের শিক্ষাঙ্গনগুলোয় প্রায় কবরের শান্তি বিরাজ করেছে, মাঝেমধ্যে যে শব্দটুকু শোনা গেছে, তা নিপীড়নের শিকারদের আর্তনাদ। নিরাপদ সড়কের আন্দোলন ও কোটা সংস্কারের প্রথম আন্দোলনকে হাতুড়িপেটা করে দমন করতে সক্ষম হয়েছিল হাসিনার সরকার। এমন কাজ এখন করা ততটা সহজ হবে না। চেষ্টা চলতে পারে, কিন্তু প্রতিরোধ ও প্রতিবাদও আগের চেয়ে অনেক দ্রুত সংগঠিত হবে।</p><p>কারণ, অজস্র ব্যর্থতা থাকলেও গণ–অভ্যুত্থানের অন্তত একটা বড় অর্জন হলো, তৃণমূল থেকে গণরুম-গেস্টরুমের মতো নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থার অপসারণ। চাঁদাবাজির মতো যত অভিযোগ সরকারি দলের বিরুদ্ধে থাকুক, অভ্যুত্থান–পরবর্তী বাংলাদেশের বিদ্যমান বাস্তবতার কারণেই আওয়ামী লীগের মতো করে তৃণমূলে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের কাঠামো তৈরি করা বিএনপির পক্ষে প্রায় অসম্ভব। ফলে সংস্কার না হলে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তরুণদের সংঘাত বৃদ্ধি পেতে থাকবে। সংঘাতের পরণতিতে দঙ্গলবাজির নিপীড়ক সংস্কৃতি শক্তিশালী হবে, নাকি প্রগতিশীল আন্দোলনের বিকাশ ঘটাবে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। সমুদ্রমন্থনের পর শুরুতে উঠে এসেছিল বিষ, তারপর অমৃত। অভ্যুত্থানের পর বিষাক্ত ও সহিংস দঙ্গলবাজির সংস্কৃতি আমরা দেখেছি। অমৃত উঠবে কি না, তা নির্ভর করবে রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতির ওপর।</p><p>এসব আলোচনা জরুরি, কেননা বাংলাদেশের তরুণেরা যদি সত্যিই ইতিবাচক আন্দোলনের পথে দানা বাঁধতে পারে, তাহলে গণ–অভ্যুত্থান যেসব সংস্কারের স্বপ্ন ও সম্ভাবনা তৈরি করেছিল, সেগুলো বাস্তবে রূপ পাবে। দার্শনিক কার্ল মার্ক্স যেমন বলেছিলেন, মানুষ গ্রহণ করলে তত্ত্ব নিজেই একটা বস্তুগত শক্তিতে পরিণত হয়। l</p> <p><strong>* ফিরোজ আহমেদ: </strong>লেখক ও রাজনৈতিক সংগঠক</p>
<p>যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির জয় নিশ্চিত করতে মরিয়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নির্বাচনী বৈতরণি পার হতে তিনি নানা প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রণোদনার লোভনীয় প্রস্তাব দিয়েছেন। তবে এর মধ্যেই ট্রাম্পের কণ্ঠে শোনা গেছে এক বিষণ্ন ও বিদায়ী সুর, যা মার্কিন রাজনীতিতে একটি যুগের অবসানের ইঙ্গিত দিচ্ছে।</p><p> কানসাসের স্যালিনা আঞ্চলিক বিমানবন্দরে নিজের মধ্যবর্তী নির্বাচনের শেষ র্যালিতে (রোববার) বক্তব্য দেওয়ার সময় ট্রাম্প আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। ৩২ দিনের ৩০ সমাবেশের ইতি টেনেছিলেন স্যালিনায়। ১১ বছর ধরে চলা তাঁর কোলাহলপূর্ণ ও জমকালো রাজনৈতিক সমাবেশগুলোর ইতি টানার ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, ‘আজ রাতেই আমি এটা বন্ধ করে দিচ্ছি। এটাই শেষ।’</p><blockquote>দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: dp@prothomalo.com</blockquote><p>বিভিন্ন সমাবেশে ট্রাম্প আবার প্রমাণ করেছেন রিপাবলিকান পার্টিতে তাঁর নিরঙ্কুশ আধিপত্য। রক কনসার্টের উন্মাদনা, ধর্মীয় পুনরুজ্জীবন আর ক্রীড়া প্রতিযোগিতার উত্তেজনার এক অপূর্ব মিশ্রণ ছিল এই রাজনৈতিক সমাবেশগুলো। তবে নিজের নিম্ন জনসমর্থন এবং রাষ্ট্রপতির মেয়াদের অন্তিম পর্যায়ে এসে ট্রাম্প এমন এক ভবিষ্যতের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন, যেখানে হাজার হাজার ভক্তের উন্মাদনা ও গর্জনের সেই দিনগুলো হয়তো আর থাকবে না। ২০১৫ সালে আলাবামার মোবাইলে প্রথম বিশাল সমাবেশের পর থেকে ট্রাম্পের র্যালির ফরম্যাটে খুব একটা পরিবর্তন আসেনি। এলভিস প্রিসলি কিংবা ফ্র্যাঙ্ক সিনাত্রার গান, ট্রাম্পকে ‘ত্রাণকর্তা’ হিসেবে তুলে ধরা ভিডিও প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে শুরু হতো এই শো। ভাষণে ট্রাম্প বরাবরের মতোই ডেমোক্র্যাটদের তীব্র সমালোচনা করেছেন এবং নানা বিতর্কিত মন্তব্য টেনে এনেছেন। তবে এবার ভোটারদের আকর্ষণ করতে তিনি একটি বড় অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। রিপাবলিকানরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখলে দেশের প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিককে ৫,০০০ ডলারের ‘ট্রাম্প ডিভিডেন্ড’ বা চেক দেওয়ার ঘোষণা দেন তিনি। যদিও এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন নিয়ে খোদ তাঁর সমর্থকদের অনেকেও সংশয় প্রকাশ করেছেন। এ ছাড়া নির্বাচনে জয় পেতে ডেমোক্র্যাটরা ভোটার উপস্থিতি বাড়াতে সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। অন্যদিকে বিভিন্ন রাজ্যে ব্যালট কারচুপির অভিযোগ তুলে সরকারি দলের প্রার্থীরা আগে থেকেই আদালতে আপিল করে রেখেছেন। দীর্ঘ ১১ বছর ধরে আমেরিকার রাজনৈতিক দৃশ্যপটকে আমূল বদলে দেওয়া এই র্যালির শেষ মুহূর্তে এসে ট্রাম্প তাঁর চিরাচরিত ভঙ্গিমায় কানসাসের তরুণ ও মেগা সমর্থকদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমি চেয়েছিলাম সেরাটি দিয়ে তোদের শেষটা করতে। ভাষণ শেষে বরাবরের মতো যুক্তরাষ্ট্রকে শক্তিশালী, সম্পদশালী, স্বাস্থ্যবান এবং সব শেষে ‘আমেরিকাকে আবারও মহান করে তোলার’ প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভিলেজ পিপল-এর জনপ্রিয় গান ‘ওয়াই.এম.সি.এ’–এর তালে তালে চিরচেনা ভঙ্গিতে ঘুষি উঁচিয়ে ও কোমর দুলিয়ে সমর্থকদের বিদায় জানান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।</p><aside><a href="https://nagorik.prothomalo.com/durporobash/vvtbulyoiv">চোখধাঁধানো এয়ার শো—যেন নীল আকাশে পাখির মেলা</a></aside>
শরীয়তপুরের কাজীরহাট এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মাস্টার মোস্তফা কাজীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, প্রভাব খাটানো ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হন মোস্তফা কাজী। এরপর থেকে এলাকায় বিভিন্ন জমি দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৬ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে কাজীরহাট বাজারের দোকানপ্রতি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা কাজী। এছাড়া কয়েক মাস আগে কাজীরহাটে একটি দোকান ক্রয়ের সময় ব্যবসায়ী সুমন তপাদারের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী আরও জানান, বি. কে. নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলামের কাছ থেকেও ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন মানুষকে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় ফেলে হয়রানি করার অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন মোস্তফা কাজী। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির ব্যানারে তার কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন অনেকে। এছাড়া বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি নিজ ভগ্নিপতি সিদ্দিক দেওয়ানের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোস্তফা কাজীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সচেতন মহল বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
ইউরোপের রাজধানী ব্রাসেলসে আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা জোরালো করা। এই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত আছেন। গত বছরের শুরু থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের কারণে সারা ইউরোপ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ইউরোপীয় নেতারা এখন যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরিতে কাজ করছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, “আমরা যুদ্ধের মানবিক সংকট বুঝতে পারি এবং এখন আমাদের দায়িত্ব এটি দ্রুত শেষ করার পথ খোঁজা। আমাদের প্রত্যেকের জন্যই শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।” এই বৈঠকে অস্ত্রবিরতি চুক্তি, যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলো যুদ্ধ সমাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এগুলো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
মো. কায়সার নামে আরেক বাসিন্দা বলেন, “যে জায়গা দিয়ে সংযোগ সড়ক হওয়ার কথা, সেটি বাংলাদেশ রেলওয়ের জমি। সেখানে কিছু মানুষ বাড়িঘর করে বসবাস করছেন। তাই জমির বিষয়টি যেন সড়ক নির্মাণের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতার কারণ না হয়, সেটিই স্থানীয়দের প্রত্যাশা।”
দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ক্রমবর্ধমান পরীক্ষার চাপ এবং পরিবারের পাশাপাশি সমাজের অযৌক্তিক প্রত্যাশা। এ দুটি কারণ মিলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বেড়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা। ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করা যেন শিক্ষার্থীর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ—সব জায়গা থেকেই উচ্চ ফলাফলের প্রত্যাশা তৈরি করছে মানসিক চাপের একটি অব্যক্ত বলয়। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইহান কবির বলেন, “পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে মনে হয়, শুধু আমি না, আমার পুরো পরিবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এটা সহ্য করা খুব কঠিন।” শুধু রাইহান নয়, দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা একই অভিজ্ঞতার কথা বলছে। সামাজিক চাপ ও তুলনার সংস্কৃতি পরিস্থিতি করছে আরও জটিল পরীক্ষার নম্বর নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এখন তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া গর্ব বা অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কোন কলেজে ভর্তি হলো, কে কতো পেল—এসব তুলনার চাপে পড়াশোনার আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা তাবাসসুম বলেন, “প্রত্যাশা থাকা ভালো, কিন্তু তা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায় এবং একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব সক্ষমতা উপেক্ষা করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়। এ থেকেই জন্ম নেয় আত্মগ্লানি, হতাশা এবং মাঝে মাঝে আত্মহননের চিন্তা।” জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ নিয়মিত মানসিক চাপে থাকে। এর মধ্যে ১২ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগে এবং বড় একটি অংশ কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই দিন পার করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে ক্ষতিকর। সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, এবং পরিবারের ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ এই সমস্যার নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম হয়, সেখানে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাকে কেবল ফলাফলের সীমায় না এনে একটি মানবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা চাপ নয়, ভালোবাসা থেকে শিখবে, এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ প্রজন্ম।
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (যবিপ্রবি) আনন্দ-উদ্দীপনা ও বর্ণাঢ্য আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয়েছে ব্যতিক্রমী ‘লুঙ্গি প্যারেড’।