জাতীয়

হালাল বিনিয়োগ: কেন, কোথায় ও কীভাবে করবেন

News সেপ্টেম্বর ১৬, ২০২৬ 0
হালাল বিনিয়োগ: কেন, কোথায় ও কীভাবে করবেন
হালাল বিনিয়োগ: কেন, কোথায় ও কীভাবে করবেন

ইসলামে বিনিয়োগ কোনো সংকীর্ণ আর্থিক হিসাব-নিকাশ নয়। এটি শুধু ধনী বা ঝানু ব্যবসায়ীদের বিশেষ সুবিধাও নয়; বরং সাধারণ প্রতিটি মানুষের জন্য নিজের পায়ে দাঁড়ানোর এক মহৎ সামাজিক দায়।

পবিত্র কোরআনে মানুষকে পৃথিবীর দায়িত্বশীল প্রতিনিধি হিসেবে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলা হয়েছে, “তিনিই তোমাদের মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং সেখানে তোমাদের বসতি স্থাপন ও তা আবাদ করার দায়িত্ব দিয়েছেন।” (সুরা হুদ, আয়াত: ৬১)

ইসলামের নীতি মেনে যখন কোনো মানুষ নিজের উপার্জিত অর্থ উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করে, কর্মসংস্থান তৈরি করে এবং সমাজকে স্বনির্ভর হতে সাহায্য করে, তখন সেই বিনিয়োগ আর শুধু ব্যবসা থাকে না; তা রূপ নেয় এক জীবন্ত ইবাদতে।

কেন বিনিয়োগ করবেন

শেয়ারবাজার, বন্ড কিংবা কোনো ব্যবসায় প্রথম টাকাটি খাটাতে যাওয়ার আগে একজন বিশ্বাসী মানুষের মনে এই স্পষ্ট উদ্দেশ্য থাকা দরকার যে সে আসলে কী অর্জন করতে চায়।

কোরআনের দর্শন হলো জাগতিক সমৃদ্ধিকে পরকালের পাথেয় বানানো, “আল্লাহ তোমাকে যা দিয়েছেন তা দিয়ে পরকালের কল্যাণ অনুসন্ধান করো, তবে দুনিয়া থেকে তোমার ন্যায্য অংশটুকু নিতে ভুলো না; আর মানুষের প্রতি তেমন সুন্দর আচরণ করো যেমন আল্লাহ তোমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন।” (সুরা কাসাস, আয়াত: ৭৭)

এই মূলনীতির আলোকে একজন সচেতন মানুষের বিনিয়োগের পেছনে মূলত তিনটি মহৎ লক্ষ্য থাকে:

পরিবারের ভবিষ্যৎ সুরক্ষা: নিজের রক্ত-ঘামে উপার্জিত অর্থ দিয়ে পরিবারের অন্ন-বস্ত্র ও ভবিষ্যতের নিরাপত্তা দেওয়া ইসলামের দৃষ্টিতে একটি বড় দায়িত্ব। রাসুলুল্লাহ (সা.) সতর্ক করে বলেছেন: “কারও পাপী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে সে যাদের ভরণপোষণের দায়িত্বে রয়েছে, তাদের অবহেলা করল বা বঞ্চিত রাখল।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৯৯৬)

আয়ের বিকল্প উৎস তৈরি: একটি নির্দিষ্ট বেতনের বাইরে সৎপথে উপার্জনের প্রবাহ থাকলে মানুষ কারও করুণার মুখাপেক্ষী হয় না। ঋণ বা সুদের মতো আত্মঘাতী ফাঁদ থেকে বাঁচতে এটি সবচেয়ে বড় ঢাল।

আর্থিক স্বনির্ভরতা: অলস টাকা ঘরের সিন্দুকে বা ব্যাংকে ফেলে না রেখে তা সচল রাখলে অর্থনীতি গতিশীল হয়, নতুন কাজের সুযোগ সৃষ্টি হয় এবং সমাজ পরনির্ভরশীলতার অভিশাপ থেকে মুক্তি পায়।

মাঠে নামার আগে ৩ প্রস্তুতি

কোনো ব্যবসায় বা সম্পদে টাকা খাটানোর আগে নিজের আর্থিক ভিত্তিটি মজবুত করা দরকার। অপরিকল্পিতভাবে ঝুঁকি নিলে বড় ধরনের বিপদের আশঙ্কা থাকে। এ ক্ষেত্রে প্রাথমিক তিনটি পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি:

১. সন্দেহজনক লেনদেন থেকে মুক্তি: কোনো বিনিয়োগের আগে ব্যক্তিগত দায়দেনা শোধ করা এবং অতীত জীবনের সুদি বা হারাম লেনদেন থেকে তওবা করে বেরিয়ে আসা প্রাথমিক শর্ত। কারণ যে পথে সন্দেহ থাকে, সে পথে কল্যাণ আসতে পারে না।

রাসুল (সা.) স্পষ্ট পথনির্দেশ দিয়ে বলেছেন, “হালালও সুস্পষ্ট এবং হারামও সুস্পষ্ট; আর উভয়ের মাঝে রয়েছে বহু সন্দেহজনক বিষয়। অতএব যে ব্যক্তি সন্দেহজনক বিষয়গুলো এড়িয়ে চলল, সে নিজের দ্বীন ও আত্মমর্যাদাকে নিরাপদ রাখল।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২০৫১)

২. জরুরি তহবিল: সঞ্চয়ের সবটুকু টাকা কোনো ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবসায় ঢেলে দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়। হঠাৎ চাকরি চলে যাওয়া, রোগব্যাধি কিংবা পরিবারের আকস্মিক সংকটের জন্য অন্তত ৩ থেকে ৬ মাসের মৌলিক খরচের সমপরিমাণ টাকা ‘জরুরি তহবিল’ হিসেবে আলাদা রাখা উচিত।

এই প্রস্তুতি নেওয়ার অনুপ্রেরণা কোরআনেও পাওয়া যায়, “আর তোমরা পাথেয় সংগ্রহ করো; নিশ্চয়ই সর্বোত্তম পাথেয় হলো তাকওয়া।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৯৭)

পাশাপাশি নিজের সম্পদের নিসাব পূর্ণ হলে প্রতিবছর নির্ধারিত হারে জাকাত পরিশোধ করে অর্থকে পবিত্র রাখা বাধ্যতামূলক।

৩. হালাল উপার্জনের প্রতি শ্রদ্ধা: বিনিয়োগের আসল শক্তি তৈরি হয় পরিশ্রমের মাধ্যমে সৎভাবে সঞ্চিত মূলধন থেকে।

রাসুল (সা.) মেহনতি মানুষের মর্যাদাকে সম্মানিত করে বলেছেন, “নিজের হাতের উপার্জনের চেয়ে উৎকৃষ্ট কোনো খাবার মানুষ কখনো গ্রহণ করেনি; আর কোনো ব্যক্তি নিজের ও পরিবারের পেছনে যা ব্যয় করে, তা তার জন্য সদকা হিসেবে পরিগণিত হয়।” (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২১৩৮)

প্রচলিত সুদি বন্ডের মূল ভিত্তি হলো সুদের বিনিময়ে ঋণ দেওয়া, যা ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এর বিপরীতে সুকুক হলো কোনো বাস্তব ভৌত সম্পদ বা প্রকল্পের প্রত্যক্ষ অংশীদারত্ব।

নতুনদের বিনিয়োগের ৩ সহজ উপায়

যাঁরা খুব বেশি ঝুঁকি না নিয়ে কিংবা ব্যবসা পরিচালনার জটিলতা ছাড়াই সঞ্চিত অর্থ বিনিয়োগ করতে চান, তাঁদের জন্য ইসলামি অর্থনীতিতে বেশ কিছু কার্যকর মাধ্যম রয়েছে:

১. হালাল মিউচুয়াল ফান্ড: এটি হলো সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অর্থ একত্র করে পরিচালিত এমন একটি বিনিয়োগ তহবিল, যা অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে শুধু হালাল খাতে খাটানো হয়।

এতে এক জায়গায় সব টাকা ডুবে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে না। ইসলাম অন্যের অন্যায় বা ভুলের বোঝা বহনের বিপক্ষে অবস্থান নেয়। পবিত্র কোরআনের ভাষায়, “কোনো বহনকারী অন্যের বোঝার ভার বহন করবে না।” (সুরা আনআম, আয়াত: ১৬৪)

ফলে হারাম বা ধ্বংসাত্মক কোম্পানি এড়িয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ পোর্টফোলিওতে অর্থ খাটাতে এটি বেশ উপযোগী।

২. সুকুক বা ইসলামি বন্ড: প্রচলিত সুদি বন্ডের মূল ভিত্তি হলো সুদের বিনিময়ে ঋণ দেওয়া, যা ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এর বিপরীতে সুকুক হলো কোনো বাস্তব ভৌত সম্পদ বা প্রকল্পের প্রত্যক্ষ অংশীদারত্ব।

এতে নির্দিষ্ট কোনো সুদের প্রতিশ্রুতি থাকে না; বরং প্রকল্পের লাভ-ক্ষতির অংশীদার হওয়ার মাধ্যমে অর্থ উৎপাদনমুখী খাতে যুক্ত হয় এবং সমাজ ঋণভিত্তিক অর্থনীতির ফাঁদ থেকে বাঁচে।

৩. বাছাইকৃত কোম্পানির শেয়ার: যেসব কোম্পানি নীতিগতভাবে মদ্যপান, জুয়া, তামাক, পর্নোগ্রাফি কিংবা সুদি ব্যাংকিংয়ের সাথে জড়িত নয় এবং ঋণগ্রস্ততার ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট ইসলামের সীমারেখা মেনে চলে—এমন প্রতিষ্ঠানের সাধারণ শেয়ার ক্রয় করে একজন মানুষ হালাল মুনাফা অর্জন করতে পারেন। এতে নিজের মূলধন বৃদ্ধির পাশাপাশি সৎ ও উৎপাদনশীল ব্যবসায়ীদের পৃষ্ঠপোষকতা করা হয়।

বিনিয়োগের নৈতিক সূত্র

ইসলামের বাণিজ্যিক আইনের মূল লক্ষ্য হলো মানুষের মধ্যে ন্যায়বিচার ও পারস্পরিক সন্তুষ্টি বজায় রাখা। কোরআনের সুস্পষ্ট বিধান, “হে বিশ্বাসীরা, তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস কোরো না; তবে পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে যে ব্যবসা পরিচালিত হয়, তা বৈধ।” (সুরা নিসা, আয়াত: ২৯)

আরেকটি বড় বিষয় হলো যেকোনো ধরনের অস্পষ্টতা বা অতিরিক্ত ফাটকাবাজি (গারার) এড়িয়ে চলা। অবাস্তব মুনাফার লোভ দেখিয়ে যেসব প্রতারণামূলক স্কিম বা স্ক্যাম চালানো হয়, সেখানে পা দেওয়া কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। হাদিসে স্পষ্ট এসেছে, “নবীজি পাথর নিক্ষেপের মাধ্যমে ক্রয়-বিক্রয় এবং যেকোনো ধরনের প্রতারণামূলক ও ঝুঁকিপূর্ণ লেনদেন (গারার) করতে নিষেধ করেছেন।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৫১৩)

অর্থাৎ বিনিয়োগ হতে হবে স্বচ্ছ, পরিষ্কার এবং বাস্তবসম্মত। আর সব ধরনের সাবধানতা ও বৈজ্ঞানিক প্রস্তুতি গ্রহণের পরই শুধু আল্লাহর ওপর ভরসা করতে হবে।

আল্লাহ বলেছেন, “অতঃপর যখন তুমি দৃঢ় সংকল্প করবে, তখন আল্লাহর ওপর ভরসা করো।” (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৫৯)

এক ফসলে সাতটি শিষ

ইসলামে যেকোনো আর্থিক কর্মযজ্ঞের মূল শিকড় হলো মানুষের নিয়ত ও দৃষ্টিভঙ্গি। রাসুল (সা.) বলেছেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র, তিনি পবিত্র বস্তু ছাড়া অন্য কিছু গ্রহণ করেন না।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০১৫)

আর আমাদের এই সব চেষ্টা সার্থক হবে শুধু তখনই, যখন অন্তরের সংকল্প থাকবে শুদ্ধ। রাসুল (সা.) স্মরণ করিয়ে দেন, “নিশ্চয়ই সমস্ত কাজের ফলাফল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল, আর প্রতিটি মানুষ তার নিয়ত অনুযায়ী প্রতিদান পাবে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১)

একজন মানুষ যখন সমাজের ভালো কাজের জন্য, মানুষের কল্যাণের জন্য এবং নিজের পরিবারকে হালাল উপার্জনে প্রতিপালন করার জন্য একটি পয়সা লগ্নি করে, তখন আল্লাহর কাছে তার মর্যাদা বহুগুণ বেড়ে যায়। 

কোরআনের উপমায় এই বরকতের রূপ তুলে ধরা হয়েছে, “যারা আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে নিজেদের ধনসম্পদ ব্যয় করে, তাদের দৃষ্টান্ত একটি শস্যবীজের মতো—যা থেকে সাতটি শিষ জন্মায় এবং প্রতিটি শিষে একশত করে শস্যদানা থাকে; আর আল্লাহ যাকে ইচ্ছা বহু গুণে বাড়িয়ে দেন, তিনি প্রাচুর্যময় ও সর্বজ্ঞ।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৬১)

Popular post
কাজীরহাটে বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও ভূমি দখলের অভিযোগ

শরীয়তপুরের কাজীরহাট এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মাস্টার মোস্তফা কাজীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, প্রভাব খাটানো ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হন মোস্তফা কাজী। এরপর থেকে এলাকায় বিভিন্ন জমি দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৬ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে কাজীরহাট বাজারের দোকানপ্রতি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা কাজী। এছাড়া কয়েক মাস আগে কাজীরহাটে একটি দোকান ক্রয়ের সময় ব্যবসায়ী সুমন তপাদারের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী আরও জানান, বি. কে. নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলামের কাছ থেকেও ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন মানুষকে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় ফেলে হয়রানি করার অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন মোস্তফা কাজী। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির ব্যানারে তার কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন অনেকে। এছাড়া বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি নিজ ভগ্নিপতি সিদ্দিক দেওয়ানের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোস্তফা কাজীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সচেতন মহল বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

ইউক্রেন যুদ্ধের মাঝে শান্তি আলোচনা জোরালো করতে ইউরোপীয় নেতাদের বৈঠক

ইউরোপের রাজধানী ব্রাসেলসে আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা জোরালো করা। এই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত আছেন। গত বছরের শুরু থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের কারণে সারা ইউরোপ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ইউরোপীয় নেতারা এখন যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরিতে কাজ করছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, “আমরা যুদ্ধের মানবিক সংকট বুঝতে পারি এবং এখন আমাদের দায়িত্ব এটি দ্রুত শেষ করার পথ খোঁজা। আমাদের প্রত্যেকের জন্যই শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।” এই বৈঠকে অস্ত্রবিরতি চুক্তি, যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলো যুদ্ধ সমাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এগুলো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলছে পরীক্ষার চাপ ও সামাজিক প্রত্যাশা

দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ক্রমবর্ধমান পরীক্ষার চাপ এবং পরিবারের পাশাপাশি সমাজের অযৌক্তিক প্রত্যাশা। এ দুটি কারণ মিলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বেড়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা।   ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করা যেন শিক্ষার্থীর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ—সব জায়গা থেকেই উচ্চ ফলাফলের প্রত্যাশা তৈরি করছে মানসিক চাপের একটি অব্যক্ত বলয়। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইহান কবির বলেন, “পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে মনে হয়, শুধু আমি না, আমার পুরো পরিবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এটা সহ্য করা খুব কঠিন।” শুধু রাইহান নয়, দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা একই অভিজ্ঞতার কথা বলছে।   সামাজিক চাপ ও তুলনার সংস্কৃতি পরিস্থিতি করছে আরও জটিল পরীক্ষার নম্বর নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এখন তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া গর্ব বা অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কোন কলেজে ভর্তি হলো, কে কতো পেল—এসব তুলনার চাপে পড়াশোনার আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা তাবাসসুম বলেন, “প্রত্যাশা থাকা ভালো, কিন্তু তা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায় এবং একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব সক্ষমতা উপেক্ষা করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়। এ থেকেই জন্ম নেয় আত্মগ্লানি, হতাশা এবং মাঝে মাঝে আত্মহননের চিন্তা।”   জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ নিয়মিত মানসিক চাপে থাকে। এর মধ্যে ১২ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগে এবং বড় একটি অংশ কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই দিন পার করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে ক্ষতিকর।   সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, এবং পরিবারের ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ এই সমস্যার নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম হয়, সেখানে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাকে কেবল ফলাফলের সীমায় না এনে একটি মানবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা চাপ নয়, ভালোবাসা থেকে শিখবে, এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ প্রজন্ম।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ফসলের উৎপাদন হুমকিতে, কৃষকদের দুশ্চিন্তা বেড়েছে

বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কৃষিখাতকে চরমভাবে আঘাত করছে। অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘদিন খরা এবং হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ফসল উৎপাদনে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে।   চলতি মৌসুমেই অনেক জেলায় ধান, গম, ভুট্টা এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, একদিকে যেমন আবহাওয়ার আচরণ বুঝে ওঠা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সারের দাম, কীটনাশক ও বীজের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পোকার আক্রমণ ও রোগবালাইয়ের হারও বেড়ে গেছে। এই চাপে পড়ে অনেক কৃষকই ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।   জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা। তাদের পক্ষে বারবার ক্ষতির ধাক্কা সামলে উঠে আবার নতুনভাবে চাষাবাদ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো অঞ্চলে দেখা গেছে, কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী ফসল বাদ দিয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ ও লাভজনক অন্য চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমানেও প্রভাব ফেলতে পারে।   বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। একইসঙ্গে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে এমন জাত ও পদ্ধতি উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে যা কঠিন জলবায়ু পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে।   দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কৃষি খাতকে সচল রাখা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে এখনই পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।

ব্যাটিং বিপর্যয়ে দিন শুরু, লড়াইয়ে ফিরতে মরিয়া টাইগাররা

কলম্বোর সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাব ময়দানে চলমান দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে ব্যাট হাতে আবারও ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের। টস জিতে ব্যাট করতে নেমে প্রথম ইনিংসে টাইগাররা সংগ্রহ করে মাত্র ২২০ রান, যেখানে ব্যতিক্রম ছিলেন কেবল শোয়াড ইসলাম (৪৬), মুশফিকুর রহিম (৩৫) ও লিটন দাস (৩৪)। শ্রীলঙ্কার বোলাররা শুরু থেকেই চাপ সৃষ্টি করে রাখে। ডেবিউ করা স্পিনার সোনাল দিনুষা ৩ উইকেট নিয়ে আলো ছড়ান, আর আসিথা ফার্নান্দো ও বিষ্ণু ফার্নান্দো নেন ২টি করে উইকেট। প্রথম ইনিংসের জবাবে দ্বিতীয় দিন সকালে শ্রীলঙ্কা উদ্বোধনী জুটি থেকে ভালো সূচনা পায়। ১৩.১ ওভারে কোন উইকেট না হারিয়ে সংগ্রহ করেছে ৬২ রান। ওপেনার পাথুম নিসান্কা ৩৩ এবং লাহিরু উদারা ২৮ রানে অপরাজিত রয়েছেন। বাংলাদেশের হয়ে তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ বোলিং শুরু করলেও এখনও পর্যন্ত সাফল্যের দেখা মেলেনি। শ্রীলঙ্কা এখনো বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস থেকে ১৫৮ রানে পিছিয়ে আছে, হাতে রয়েছে সকল উইকেট। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে প্রভাব এই টেস্টটি ২০২৩-২৫ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ হওয়ায় দুই দলের জন্যই পয়েন্টের লড়াই গুরুত্বপূর্ণ। সিরিজের প্রথম টেস্টে পরাজিত হওয়ায় বাংলাদেশ সিরিজে টিকে থাকতে হলে এই ম্যাচ জিততেই হবে। পরবর্তী চ্যালেঞ্জ স্লো পিচে বাংলাদেশ বোলারদের আরও পরিকল্পিত বোলিং করতে হবে। দ্রুত উইকেট তুলে না নিতে পারলে শ্রীলঙ্কা বড় লিড নিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে দেবে টাইগারদের। ফিল্ডিংয়ে মনোযোগ এবং টাইট বোলিংয়ের মাধ্যমেই দ্বিতীয় ইনিংসে নিজেদের ফিরে পাওয়ার আশায় বাংলাদেশ। সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড (দিন ২, প্রথম সেশন পর্যন্ত): বাংলাদেশ (১ম ইনিংস): ২২০/১০ শ্রীলঙ্কা (১ম ইনিংস): ৬২/০ (১৩.১ ওভার) নিসান্কা: ৩৩*, উদারা: ২৮* বাংলাদেশ বোলার: তাইজুল, মিরাজ – উইকেটহীন

জাতীয়

View more

0 Comments